ভালো শ্রোতা হওয়া যায় কীভাবে, আসলেই কি আমরা অন্যের কথা শুনি

ধরুন, খুব কথা বলতে ভালোবাসে, এমন এক বন্ধুর সঙ্গে গল্প করছেন। বন্ধুটি হঠাৎ একটি প্রশ্ন করল। ঠিক তখনই আপনার মাথা বাস্তবে ফিরে এল; কিন্তু সে আসলে কী বলছিল, আপনি জানেন না। তবু লজ্জা ঢাকতে মাথা নাড়লেন, যেন সবই শুনেছেন। এ পরিস্থিতি কি খুব অচেনা? অনেকেরই এমন হয়। আমরা শব্দ শুনি ঠিকই; কিন্তু কথার অর্থ, অনুভূতি বা ভেতরের বার্তাটা ধরতে পারি না।

আপনি যদি মন দিয়ে না শোনেন, খুব সম্ভবত অপর পক্ষও আপনাকে মন দিয়ে শুনছে না; এতে ভুল–বোঝাবুঝির ঝুঁকি বাড়ে
ভালো শ্রোতা হওয়া যায় কীভাবে, আসলেই কি আমরা অন্যের কথা শুনি

মার্কিন কথোপকথন–বিশেষজ্ঞ ডেব্রা ফাইন (‘দ্য ফাইন আর্ট অব স্মল টক’ বইয়ের লেখক) বলেন, ‘অনেক সময় আমরা মনে করি, এ কথা তো আগেও শুনেছি; আর তখনই মন অন্য দিকে চলে যায়। ফলে কথার ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ সূক্ষ্ম দিকগুলো আমাদের মন এড়িয়ে যায়।’ তাই ভালো শ্রোতা হওয়া আদতে ভদ্রতার চেয়েও বেশি কিছু। এটা ভালো সম্পর্ক আর বোঝাপড়ার বড় শর্ত।

ভালো শ্রোতা হওয়া কেন এত জরুরি

কথার মাঝখানে মন হারিয়ে ফেলা—সে স্বামী–স্ত্রী হোক, বন্ধু, সহকর্মী বা পরিবারের কেউ, সব ক্ষেত্রেই অশোভন; কিন্তু সমস্যা শুধু এটুকু নয়।

আপনি যদি মন দিয়ে না শোনেন, খুব সম্ভবত অপর পক্ষও আপনাকে মন দিয়ে শুনছে না। এতে ভুল–বোঝাবুঝির ঝুঁকি বাড়ে।

২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, শ্রোতাদের মন প্রায় ২৪ শতাংশ সময় অন্য দিকে চলে যায়; কিন্তু তবু বক্তারা ভাবেন, তাঁদের কথা মন দিয়ে শোনা হচ্ছে। অর্থাৎ আমরা শুনছি, এমন ভান করতে বেশ পারদর্শী।

২০২২ সালের আরেকটি গবেষণা বলছে, আপনি যদি কাউকে মন দিয়ে শোনেন, তাঁর সঙ্গে দ্বিমত হলেও তিনি আপনার কথা গ্রহণ করতে বেশি আগ্রহী হন।

শোনা কি এক রকমের হয়?

সব শোনাই এক নয়।

প্যাসিভ লিসনিং (নিষ্ক্রিয় শোনা)
হালকা গল্পগুজবের সময় যেমন হয়—শব্দ কানে ঢোকে; কিন্তু মন পুরোপুরি থাকে না।

অ্যাকটিভ লিসনিং (সক্রিয় শোনা)
গুরুত্বপূর্ণ কথোপকথনে আমরা যা করি—মন, চোখ, শরীর, অনুভূতি—সব দিয়ে শোনা।

অ্যাকটিভ লিসনিংয়ের তিনটি দিক আছে—

  • বুদ্ধিবৃত্তিক শোনা: কথার মানে বোঝা

  • আচরণগত শোনা: চোখের দৃষ্টি, ভঙ্গি দিয়ে আগ্রহ দেখানো

  • আবেগগত শোনা: কথার পেছনের অনুভূতিটা ধরা

ভালো শ্রোতা হতে চাইলে যেসব চর্চা করা জরুরি

১. মনোযোগ নষ্ট করে, এমন সবকিছু সরান
মোবাইল সাইলেন্ট করে উল্টো করে রাখুন। টিভি বন্ধ করুন। চেষ্টা করুন শান্ত জায়গায় কথা বলতে।
মন ধরে রাখতে কষ্ট হলে ডেব্রা ফাইনের পরামর্শ—
কথাগুলো মনে মনে আবার বলুন, বা অন্য ভাষায় অনুবাদ করার চেষ্টা করুন।

২. অস্থির নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণে রাখুন
কারও কারও ক্ষেত্রে নড়াচড়া মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করে; কিন্তু পা দোলানো, কলম ঠোকা—এসব দেখে মনে হতে পারে, আপনি শুনছেন না।
নড়াচড়া করার দরকার হলে আংটি, ব্রেসলেট বা নীরব ফিজেট ব্যবহার করুন।

৩. চোখে চোখ রাখুন
চারদিকে তাকালে বক্তার মনে হতে পারে, আপনি বিরক্ত।
আদর্শ হলো, কথা বলার সময় ৬০–৭০ শতাংশ সময় চোখে চোখ রাখা।
যাঁদের জন্য চোখে চোখ রাখা কঠিন, তাঁরা মুখের অন্য কোনো অংশ, যেমন নাকের দিকে তাকাতে পারেন।

৪. মাথার ভেতর উত্তর বানানো বন্ধ করুন
অনেক সময় আমরা শুনতে শুনতেই ভাবি, এরপর কী বলব। এতে গুরুত্বপূর্ণ কথা মিস হয়। অন্যজন পুরো কথা শেষ না করা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। প্রয়োজনে একটু থামুন, তারপর উত্তর দিন।

অনেক সময় আমরা শুনতে শুনতেই ভাবি, এরপর কী বলব

৫. কথা বলার পালা বুঝে নিন
খুব তাড়াতাড়ি ঢুকে পড়া বা অস্বস্তিকর নীরবতায় কথা বলা, দুটিই সমস্যা।
ভালো কৌশল হতে পারে—
‘আর কিছু বলার আছে?’—এই প্রশ্নটা করা।

৬. ছোট শব্দে জানান, আপনি শুনছেন
‘হুম’, ‘ঠিক’, ‘বলুন’—এই ছোট শব্দগুলো বক্তাকে নিশ্চিন্ত করে।
সহানুভূতির ভাষা ব্যবহার করুন—
‘শুনে খারাপ লাগছে’, ‘কঠিন ছিল নিশ্চয়ই’—এতে বক্তা আশ্বস্ত হয় যে আপনি সত্যিই সহানুভূতির সঙ্গে শুনছেন।

৭. কথার সারসংক্ষেপ নিজের ভাষায় বলুন
‘তুমি বলতে চাইছ, আসলে…’—এভাবে বললে বক্তা বুঝতে পারেন, আপনি তাঁর বক্তব্য ধরতে পেরেছেন। এতে বক্তার সব কথা আপনারও মনে থাকবে।

৮. প্রশ্ন করুন
নিজের গল্প না টেনে এনে প্রশ্ন করুন—
‘তখন তোর কেমন লেগেছিল?’
‘এটা বলতে কী বোঝাতে চেয়েছ?’
‘এরপর কী হবে বলে মনে করেন?’

৯. শরীরী ভাষার দিকেও খেয়াল রাখুন
হালকা সামনে ঝুঁকে বসা আগ্রহ দেখায়। হাত–পা জড়ো করে রাখা দূরত্ব তৈরি করে।
মনে রাখবেন, শরীরী ভাষা অনেক সময় ভুল বার্তাও দেয়।

চোখে চোখ না রাখা মানেই আগ্রহ নেই, এটা ঠিক নয়। যিনি শুনছেন বা বলছেন, তিনি হয়তো চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারেন না। তাই সব সময় সবকিছু একই সূত্রে ফেলে বিচার করবেন না।

মন দিয়ে শোনা মানে শুধু শব্দ শোনা নয়, মানুষকে গুরুত্ব দেওয়া

১০. না শুনলে বা সময় না থাকলে সৎ থাকুন
শুনেছেন ভান করার চেয়ে বলা ভালো—
‘দুঃখিত, একটু জোরে বলবেন?’
বা
‘এখন ঠিক মনোযোগ দিতে পারছি না, পরে কথা বলব?’
আর হ্যাঁ, সব কথোপকথনে আপনাকে মনোযোগী থাকতেই হবে, এমনটাও কিন্তু নয়। প্রয়োজনে ভদ্রভাবে সরে যাওয়া ঠিক আছে।

শেষ কথা

ভালো শ্রোতা হওয়া কোনো জন্মগত গুণ নয়, এটা চর্চার বিষয়। মন দিয়ে শোনা মানে শুধু শব্দ শোনা নয়, মানুষকে গুরুত্ব দেওয়া। আর এই ছোট অভ্যাসই সম্পর্কগুলোকে অনেক বড় করে তোলে।

সূত্র: রিডার্স ডাইজেস্ট