
শিশুদের কাছে অর্থের গুরুত্ব বোঝানো অনেক সময়ই মা–বাবার জন্য অনেক চ্যালেঞ্জিং বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। তারা শুধু আবদার করে—এটা লাগবে ওটা লাগবে। কিন্তু ভবিষ্যতে তাদের আর্থিকভাবে স্বনির্ভর করে গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। শিশুদের বোঝানো দরকার যে টাকা একাই সুখ এনে দেয় না, টাকা জীবনে বিকল্প তৈরি করে এবং জীবনমান উন্নত করে। অর্থ সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা একটি গুরুত্বপূর্ণ জীবনদক্ষতা। আপনি জাপানে থাকুন বা পৃথিবীর অন্য কোথাও—এই বাস্তবসম্মত পদ্ধতিগুলো আপনার শিশুকে আর্থিক সচেতনতার একটি মজবুত ভিত্তি গড়ে তুলতে সাহায্য করবে। শিশুদের টাকার মূল্য বোঝানোর ৬টি কার্যকর উপায় তুলে ধরা হলো।
জাপানি শব্দটি ‘ওকোজুকাই’ অর্থ হলো পকেট মানি বা ব্যক্তিগত খরচের জন্য নির্ধারিত মাসিক ভাতা। সাধারণত জাপানে পরিবার থেকে শিশুদের নিয়মিত ওকোজুকাই দেওয়া হয়। সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তোলা, মানি ম্যানেজমেন্ট, দায়িত্ববোধ শেখাতে একটি কার্যকর উপায় হলো শিশুকে নিয়মিত পকেট মানি বা ভাতা দেওয়া।
তবে শিশুদের কখন থেকে ভাতা দেওয়া উচিত, আর কত টাকা দেবেন? সাধারণত শিশুর বয়স ৭-৮ বছর হলেই ভাতা দেওয়া শুরু করতে পারেন। জাপানিরা এই বয়সে পকেট মানি দেয়। এ বয়সে শিশুরা সংখ্যা চিনতে শেখে, যোগ-বিয়োগ বোঝে এবং টাকার প্রাথমিক ধারণা পায়।
এভাবে শুরু করতে পারেন
শিশুর বয়স যত বছর, প্রতি সপ্তাহে ততসংখ্যক ২০-৫০ টাকা করে ভাতা দিতে পারেন।
যেমন—
৭ বছর বয়সী শিশুর ভাতা: সপ্তাহে প্রায় ১৪০-৩৫০ টাকা।
১৬ বছর বয়সী কিশোরের ভাতা: সপ্তাহে প্রায় ৩২০-৮০০ টাকা।
তবে এই অঙ্ক নির্ভর করবে পরিবারের আয়ের ওপর। তাই অন্ধভাবে কোনো নিয়ম অনুসরণ না করে নিজের বাস্তবতা অনুযায়ী পরিমাণ ঠিক করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
এরপর ভাতার টাকাকে তিন ভাগে ভাগ করতে বলুন
খরচ: টিফিন বা পছন্দের ছোট জিনিস কেনার জন্য।
সঞ্চয়: মাটির ব্যাংক বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা করা।
দান: কোনো সামাজিক কাজে।
শিশুকে ভাতা দেওয়া মানে শুধু হাতে টাকা ধরিয়ে দেওয়া নয়। এটি শিশুকে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি দক্ষতা শেখানোর প্রক্রিয়া। এ সময় তারা ভুল করবেই। এসব ভুলই তাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
নিজের টাকা নিজে সামলানোর সুযোগ পেলে শিশুরা ধীরে ধীরে বুঝতে শেখে কোনটি সঠিক সিদ্ধান্ত, আর কোনটি সঠিক নয়। এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাই ভবিষ্যতে তাদের আত্মনির্ভরশীল হিসেবে গড়ে তুলবে।
জাপানে ‘ওতসুকাই’ নামে একটি সুন্দর ও শিক্ষণীয় সংস্কৃতি আছে। ওতসুকাই বলতে বোঝায় শিশুকে একা বাজারে বা দোকানে পাঠানো, অর্থাৎ ঘরের ছোটখাটো কাজে তাকে যুক্ত করা।
এ পদ্ধতিতে শিশুদের ধীরে ধীরে ঘরের সাধারণ কাজ ও পারিবারিক বাজেট ব্যবস্থাপনার সঙ্গে পরিচিত করা হয়। ফলে তাদের বাস্তব জীবনের আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিজ্ঞতা হয়। এ পদ্ধতিতে শিশুকে একটি নির্দিষ্ট তালিকা দিয়ে স্থানীয় দোকান থেকে প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে আনতে বলা হয়।
এতে তারা হাতে-কলমে শেখার সুযোগ পায়, দাম সম্পর্কে ধারণা তৈরি হয়, হিসাব করতে শেখে এবং কোন জিনিস প্রয়োজনীয় আর কোনটি নয়, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা বাড়ে।
জাপানে ‘হাজিমেতে নো ওতসুকাই’ নামে একটি জনপ্রিয় টিভি অনুষ্ঠান আছে, যেখানে শিশুদের প্রথমবার একা বাজারে যাওয়ার গল্প তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানটি বর্তমানে নেটফ্লিক্সেও দেখে নিতে পারেন এবং এটি শিশুদের সক্ষমতা ও দায়িত্ববোধের একটি অনুপ্রেরণামূলক উদাহরণ।
একটু বড় শিশুদের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বা পানির মতো নিয়মিত খরচের বিষয়গুলো সহজভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। এতে তারা বুঝতে শেখে দৈনন্দিন জীবনে অর্থ কীভাবে খরচ হয়।
জাপানিদের মতো, আপনি আপনার শিশুকে অতিরিক্ত কাজের জন্য পারিশ্রমিক দিতে পারেন। যেমন—ঘরের আলমারি বা তাক গোছানো।ভারী বই বা জিনিসপত্র এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরানো।বাগানের ফুল বা গাছের পরিচর্যা করা।
ছোট ভাই বা বোনকে সাহায্য করা বা টিফিনের বাটি গোছানো। এতে শিশুরা শেখে টাকা আসে সময় ও পরিশ্রমের বিনিময়ে।
এই পদ্ধতি তাদের মধ্যে দায়িত্ববোধ ও কাজের প্রতি সম্মানবোধ তৈরি করে। ফলে তাদের কাছে টাকার মূল্য আরও স্পষ্ট হয় এবং তারা সঞ্চয় ও খরচে সচেতন হয়।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশুকে জোর করে কোনো কাজ করাবেন না। বরং তাকে নিজের পছন্দে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিন। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শুরুতেই কাজের শর্ত ও পারিশ্রমিক স্পষ্ট করে জানান।
এতে শিশুরা জানবে কী করতে হবে এবং কত টাকা পাবে, যা তাদের দায়িত্ববোধ ও অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা তৈরি করে।
আপনি শুধু দান করলেই তো হবে না, শিশুদের দান করতে শেখানোও জরুরি। দান করার ফলে শিশু সহানুভূতি, কৃতজ্ঞতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ শিখবে। দান শিশুদের শেখায় নিজের প্রয়োজনের বাইরে অন্যদের কথাও ভাবতে হয়।
এতে তারা বুঝতে শেখে সঞ্চয়, খরচ ও ভাগ করে নেওয়ার মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে রাখতে হয়। এ পদ্ধতিতে শিশুকে বলুন, সঞ্চয়ের ৫-১০ শতাংশ নিয়মিত দানের জন্য আলাদা রাখতে।
যেসব পরিবার দান করে, তারা শিশুদেরও নিজস্ব টাকা থেকে দান বা অনুদান দিতে উৎসাহিত করতে পারে। এতে শিশুরা বুঝতে শেখে ছোট ছোট প্রচেষ্টা মিলিত হলে বড় পরিবর্তন করা সম্ভব।
অভিভাবকেরা শিশুদের আগ্রহ অনুযায়ী বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠান বেছে নিতে সাহায্য করতে পারেন। এ ছাড়া সুবিধাবঞ্চিত ও অসুস্থ শিশুদের সহায়তা করতে বলতে পারেন। দরিদ্র পরিবারের জন্য খাবার ও সহায়তা দিতেও উৎসাহিত করতে পারেন।
শিশুকে নিজে সিদ্ধান্ত নিতে দিলে তারা গর্বিত হয় ও দায়িত্ববোধ অনুভব করে। চাইলে শিশুদের সঙ্গে মিলিতভাবে খাবার বিতরণ, বই দান এবং স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমেও অংশ নিতে পারেন। এতে সে শেখে দান করলে দরিদ্র ও অসহায় মানুষ বিপদমুক্ত হয়।
শিশুকে অর্থের মূল্য শেখানোর একটি মজার ও কার্যকর উপায় হলো তাদের পুরোনো খেলনা বা অব্যবহৃত জিনিস বিক্রি করতে শেখানো।
শিশুরা এসব বিক্রির জন্য ফেসবুক মার্কেটপ্লেস, বিক্রিয় ডটকমের মতো জনপ্রিয় অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে পারে।
শিশুর সঙ্গে বসে ঠিক করুন কোন খেলনাগুলো আর ব্যবহার করে না।
তাদের ছবি তোলার, বর্ণনা লেখার ও বিজ্ঞাপন তৈরি করার কাজে যুক্ত করুন।
এতে তারা বিপণন ও উপস্থাপনার গুরুত্ব শেখে।
বিক্রির পুরো প্রক্রিয়ায় শিশুকে যুক্ত করুন। এতে শিশুরা দাম নির্ধারণ করা, ক্রেতার প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, প্যাকেটিং ও পাঠানোর ব্যবস্থা করা শেখে। এভাবে তারা চাহিদা-জোগানের ধারণা, দামের মূল্যায়ন এবং লেনদেনের গুরুত্ব শিখতে পারে। পাশাপাশি শিশুরা অর্থের মূল্য, সঞ্চয় ও খরচের ভারসাম্য এবং উদ্যোক্তা মনোভাব শেখে, যা ভবিষ্যতে তাদের স্বনির্ভর ও দায়িত্বশীল করে তুলবে।
অর্থ নিয়ে আপনার দৃষ্টিভঙ্গির ফলে ধীরে ধীরে শিশুর মানসিকতা গড়ে তোলে। শিশুরা অনেক সময় কথা মনে রাখে না, কিন্তু বড়দের আচরণ ও অভ্যাস অনুকরণ করে। আপনি যদি সব সময় বলেন, ‘টাকা নেই’, ‘টাকা মানেই ঝামেলা’ তাহলে শিশুর মনে অর্থ নিয়ে ভয় বা সংকোচ তৈরি হতে পারে। আর আপনি যদি টাকাকে শেখার সুযোগ, নিরাপত্তা ও উন্নতির একটি মাধ্যম হিসেবে দেখেন, শিশুরাও সেটাই শিখবে।
‘অ্যাবানডান্স মাইন্ডসেট’ অর্থাৎ সুযোগ ও সম্ভাবনা সব সময় আছে—এই বিশ্বাস শিশুদের আত্মবিশ্বাসী করে তোলে এবং সুস্থ আর্থিক অভ্যাস গড়ে ওঠে। সঞ্চয়, খরচ বা কোনো আর্থিক সিদ্ধান্তের সময় শিশুদের সঙ্গে সহজভাবে কথা বলুন। কেন এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, তা ব্যাখ্যা করুন। এতে তারা প্রশ্ন করতে সাহস পাবে এবং ভবিষ্যতে অর্থের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক হবে স্বাভাবিক ও আত্মবিশ্বাসী।
শিশুদের অর্থ শিক্ষা এক দিনের বিষয় নয়, এটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। যত আগে এই শিক্ষা শুরু করা যায়, ভবিষ্যতে তারা তত বেশি সচেতন ও আত্মবিশ্বাসীভাবে আর্থিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
সূত্র: আর্জেন্টাম ডটকম