
ছোটবেলাতেই আমরা শিশুদের ‘থ্যাংক ইউ’ বা ‘সরি’ বলা শেখাই। কেউ কোনো উপহার দিল? সঙ্গে সঙ্গে আমরা শিশুকে স্মরণ করিয়ে দিই, ‘থ্যাংক ইউ বলো।’ একইভাবে খেলতে গিয়ে কাউকে ব্যথা দিলেও শিশুকে শেখাই, ‘কেন ওকে ব্যথা দিলে? সরি বলো।’
কিন্তু বড় হতে হতে এই শিশুটিই এমন এক দুনিয়ায় পা রাখে, যেখানে তুচ্ছ কারণেও কাউকে গালাগাল, বিদ্রূপ, কিংবা আদবকেতার ধার না ধারা খুব স্বাভাবিক। ভদ্র, বিনয়ী বা ভালো মানুষ হওয়া মানে কী—সেটাই বোধ হয় আজকাল লোকে ভুলতে বসেছে।
আজকের সময়ে ভদ্রতার কোনো একক সংজ্ঞা নেই। তবে বিশেষজ্ঞরা কিছু সাধারণ বিষয়ে একমত। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলির গ্রেটার গুড সায়েন্স সেন্টারের বিজ্ঞান পরিচালক এমিলিয়ানা সাইমন-টমাস বলেন, ‘ভদ্র হওয়া মানে হলো—আপনি যাঁদের সঙ্গে দেখা করছেন, তাঁদের সম্পর্কে ভালো মনোভাব ধারণ করা। ধরে নেওয়া যে তাঁরা জীবন থেকে সেই একই আনন্দ ও পরিপূর্ণতা চান, যেমনটা আপনার চাওয়া। তাঁরাও কষ্ট, ব্যথা বা বিপদে পড়তে চান না—যেমনটা আপনিও চান না।’
সাইমন-টমাসের মতে, মানুষের মস্তিষ্ক এমনভাবেই তৈরি; আমরা যখন কারও জন্য ভালো কিছু করতে পারি, তখন একটা ‘উষ্ণ ভালো লাগা’ অনুভূত হয়। এতে আনন্দের সঙ্গে সম্পর্কিত মস্তিষ্কের অংশ সক্রিয় হয়।
ভদ্র ব্যবহার করে অন্যের পছন্দনীয় হয়ে ওঠার কিছু বিজ্ঞানসম্মত উপায় তুলে ধরেছেন বিশেষজ্ঞরা।
অন্যের প্রতি রূঢ় না হওয়ার একটি ভালো উপায় হলো—ইচ্ছা করে প্রত্যেক মানুষের সঙ্গে কোনো না কোনো মিল খোঁজা। সাইমন-টমাস বলেন, ‘হয়তো তাঁর সঙ্গে আপনার পোশাকে কিছু মিল আছে। কিংবা দাঁড়ানোর ভঙ্গি, হাতের নড়াচড়া, বা কণ্ঠস্বর। নিজেকে প্রশ্ন করুন—এমনটা কি আমিও করি? যেকোনো মানুষের সঙ্গেই মানবিক কোনো না কোনো মিল খুঁজে পাওয়া সম্ভব।’ এতে আমরা আরও সহানুভূতিশীল হই। এভাবে একেবারে আলাদা জগতের মানুষের সঙ্গেও ভদ্র ব্যবহার করা সহজ হয়ে যায়।
অন্যের উপকার হয়—এমন কাজ করলে ভালো লাগাটা স্বাভাবিক, বিজ্ঞান তা-ই বলে। স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করা বা দান করা—এগুলো গবেষণায় প্রমাণিত উপায়। তবে আরও অনেকভাবে সাহায্য করা যায়। যেমন রক্তদান, বিপদে পাশে থাকা, অন্যের জন্য রান্না করা—এসবই অর্থবহ ও গুরুত্বপূর্ণ সাহায্যের উদাহরণ।
কারও পছন্দনীয় হওয়ার সহজ উপায়গুলোর একটি হলো—আপনি মন দিয়ে তাঁর কথা শুনছেন, এটা বোঝানো। ইউনিভার্সিটি অব কানেটিকাটের অধ্যাপক আমান্ডা কুপার বলেন, ‘শোনা আদতে পরিশ্রমের কাজ। কাউকে সত্যি শুনতে হলে মানসিক জায়গা দিতে হয়।’
চোখে চোখ রেখে কথা বলা, শরীর সামান্য সামনে ঝুঁকিয়ে রাখা—এসব ইঙ্গিত দেয় যে আপনি মনোযোগী। একসঙ্গে অনেক কাজ করবেন না। ভাবতে পারেন, ফোনের দিকে তাকিয়েও তো অন্যের কথা শোনা যায়। কিন্তু সামনে থাকা মানুষটি তা না-ও ভাবতে পারেন। আলোচনার মাঝখানে আপনি ফোন হাতে নিলেই তিনি হয়তো ধরে নেবেন—আপনি তাঁকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না।
এমন প্রশ্ন করুন, যার উত্তর আপনি আগে জানতেন না। এতে উল্টো দিকের মানুষটা বুঝবে, আপনি তাঁকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। অপরজনের কথা শেষ হওয়ার আগেই নিজের গল্প বলতে যাবেন না। বরং তাঁকে উৎসাহ দিন, আরও বলার সুযোগ দিন। তাঁকে বোঝান—আপনি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
কখনো কখনো হাসি ভদ্রতার খুব সহজ উপাদান। কিন্তু সেটা হতে হবে খাঁটি। নকল হাসি কাজে আসে না। মানুষ সাধারণত একে অপরের অনুভূতি নকল করে—একজন হাসলে অন্যজনও হাসতে চায়। অপরিচিত কারও সঙ্গে হাসি বিনিময় হলে একধরনের বিশ্বাস আর স্বস্তি তৈরি হয়—‘আমরা ঠিক আছি।’
কোনো বিব্রতকর পরিস্থিতি হালকা করার চেষ্টা করুন। ধরুন, দোকানে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন, সবাই বিরক্ত। পেছনের জনের সঙ্গে গল্প করার চেষ্টা করুন, রসিকতা করুন। তাঁকে মন হালকা করার সুযোগ দিন। অচেনা মানুষের সঙ্গেও অল্প সময়ের এমন সংযোগ মন ভালো করতে পারে।
কারও নাম মনে রাখা ও ব্যবহার করা খুবই শক্তিশালী একটি সদয় আচরণ। কুপার বলেন, ‘মানুষ নিজের নাম শুনতে ভালোবাসে।’ কাউকে নাম ধরে ডাকলে তাতে বোঝায়—‘আমি আপনাকে চিনি, আপনাকে গুরুত্ব দিচ্ছি।’ প্রতিবেশী, সহকর্মী, তাঁদের সন্তান, এমনকি তাঁদের পোষা প্রাণীর নাম জানাও অনেক দূর পর্যন্ত ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
রাজনৈতিক বা অন্য মতের পার্থক্যের কারণে সবাইকে এড়িয়ে চলতে হবে—এমন নয়। চাইলে সেতু তৈরি করা যায়। এটা সহজ নয়, তাই এ প্রসঙ্গে সাইমন-টমাসের মত, ‘এটিই ভদ্রতার সবচেয়ে উন্নত স্তর।’ অর্থাৎ যাঁর সঙ্গে আপনার মতের মিল নেই, তাঁর সঙ্গে আপনি কেমন ব্যবহার করছেন, সেটিই আদতে প্রমাণ করে আপনি মানুষ হিসেবে কেমন।
প্রথমে মিল আছে—এমন বিষয় নিয়ে সুন্দরভাবে কথা বলুন। এতে মতবিরোধ অস্বীকার করা হয় না, বরং ভবিষ্যতে গঠনমূলক আলোচনার ভিত্তি তৈরি হয়।
মতভেদ থাকতেই পারে। একই বিশ্বাস না থাকলেও একসঙ্গে সময় উপভোগ করা সম্ভব। সাইমন টমাস বলেন, ‘জোর করে কাউকে এক ঘরে ঢোকানো ঠিক নয়। কিন্তু মানুষ চাইলে একটু থেমে, নিজের বিশ্বাসকে সম্মান করেও ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষের প্রতি সহানুভূতি ও উদারতা দেখাতে পারে।’
সূত্র: টাইমডটকম