অলংকরণ: আনিসুজ্জামান সোহেল
অলংকরণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

প্রবন্ধ

বইপাঠ, বই লেখা ও কুন্ডেরার দুঃস্বপ্ন

সবাই লিখছে, কিন্তু পাঠক কমে যাচ্ছে—এই বৈপরীত্য থেকেই জন্ম নিচ্ছে এক নতুন সাংস্কৃতিক সংকট। কুন্ডেরার ‘গ্রাফোম্যানিয়া’ থেকে জেমস ম্যারিয়টের ‘পোস্ট-লিটারেট সমাজ’—বইমেলা উপলক্ষে এই প্রবন্ধে লেখক বিশ্লেষণ করেছেন বইপাঠ, লেখালেখি ও ডিজিটাল যুগের ভবিষ্যৎ।

আমরা বই লিখি, কারণ স্ত্রী-সন্তানেরা আমাদের কথায় আর কান দেয় না। বাড়িতে আমরা পাত্তা পাই না। সে জন্য বাড়ির বাইরে আমাদের শ্রোতা বা কান খুঁজতে হয়। তাই বই লেখা হলো অক্ষমের কানানুসন্ধান।

প্যারিসের রাস্তায় এক ট্যাক্সিচালক কথাটা বলেছিলেন মিলান কুন্ডেরার উপন্যাসের নায়ককে। ওই ট্যাক্সিচালক শৌখিন খণ্ডকালীন লেখক। নিজের বই লেখার কারণ বলতে গিয়ে তিনি এ রকম সাধারণীকরণ করেছিলেন।

কুন্ডেরার সেই উপন্যাসের ইংরেজি নাম দ্য বুক অব লাফটার অ্যান্ড ফরগেটিং। সরল কাহিনি, কিন্তু বড় জটিল উপন্যাস। সেখানে কুন্ডেরা ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর স্মৃতি নিয়ে তাঁর কিছু ভাবনাচিন্তার অবতারণা করেছেন।

উপন্যাসের এক জায়গায় তিনি ‘গ্রাফোম্যানিয়া’ নামে এক ধারণার প্রসঙ্গ তুলেছেন। সেটা বড় কৌতূহলোদ্দীপক। গ্রাফোম্যানিয়া কী? এটা হচ্ছে লেখার তাড়না বা বাসনা। সুতীব্র, অদম্য বাসনা বাতিকের পর্যায়ে। তা কেবল কাজে-অকাজে চিঠিপত্র লেখা বা ডায়েরির পাতায় সারা দিনের সব কর্মকাণ্ড লিখে রাখার বাতিক নয়। কুন্ডেরার চোখে গ্রাফোম্যানিয়া হলো বিশেষ করে বই লেখার বাতিক বা বইয়ের লেখক হওয়ার বাসনা। ইংরেজিতে যাকে বলা অথরশিপ। বই লেখার গোড়ার ঘটনাটি হলো আপনি আপনার লেখার এমন পাঠক পেতে চান, যাঁদের আপনি ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না। চিঠি বা ডায়েরির মাধ্যমে তা সম্ভব নয়। তো, তা হলে কুন্ডেরার উপন্যাসের ট্যাক্সিচালক এবং মহামতি গ্যেটের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না। দুজনেরই নিয়ত অভিন্ন। তফাত কেবল তকদিরে।

গ্রাফোম্যানিয়া হলো বিশেষ করে বই লেখার বাতিক বা বইয়ের লেখক হওয়ার বাসনা। ইংরেজিতে যাকে বলা অথরশিপ। বই লেখার গোড়ার ঘটনাটি হলো আপনি আপনার লেখার এমন পাঠক পেতে চান, যাঁদের আপনি ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না।

বই লেখার বাসনা বা গ্রাফোম্যানিয়া মানুষের আদিরোগ। হয়তো বইয়ের জন্মের চেয়ে তা প্রাচীন। কুন্ডেরার মতে, আধুনিক সমাজে এসে এই গ্রাফোম্যানিয়া মহামারির রূপ পরিগ্রহ করেছে। যে যে সমাজ অর্থবিত্তে একটু এগিয়েছে, সেই সেই সমাজে এ রোগের মারণ উপদ্রব দেখা দিয়েছে। কুন্ডেরা বলছেন, তিন ধরনের ঘটনা এ মহামারির পূর্বলক্ষণ:

এক. যদি সমাজে সার্বিক বৈষয়িক সমৃদ্ধি দেখা দেয় এবং মানুষজনের হুদা কামে ব্যয় করার মতো অলস অবকাশের প্রাচুর্য ঘটে।

দুই. সমাজে পরিবার, সংঘ ও প্রতিষ্ঠান এমন খণ্ডবিখণ্ড হয়ে অণু-পরমাণুতে পর্যবসিত হয় যে ব্যক্তি বিচ্ছিন্ন ও নিঃসঙ্গ বোধ করে।

তিন. দেশে নানান ঘটনার ঘনঘটা থাকলেও যখন সমাজে তার কোনো ছাপ থাকে না, সমাজ থাকে নিস্তরঙ্গ, স্থবির।

কুন্ডেরা লিখেছেন, ‘রাজনীতিবিদ, ক্যাবচালক, প্রসূতি নারী, দয়িতা, আততায়ী, দুরাচারী, গণিকা, দারোগা, ডাক্তার ও রোগী—সবার মধ্যে গ্রাফোম্যানিয়ার এই গণবিস্তার দেখে মনে হয় ঘুমিয়ে আছে সকল লেখক সক্কলেরই অন্তরে এবং সকল মানবসমাজ রাস্তায় ছুটে বেরিয়ে এসে বেমালুম চিৎকার করে ঘোষণা দিতে পারে: ‘আমরা সবাই লেখক।’

একটা সমাজে লেখক হওয়ার বাসনা মহামারির রূপ নিলে কী ঘটবে? কুন্ডেরা ওই উপন্যাসেই তার কিছু আলোচনা করেছেন। তাঁর মতে, সমাজে ব্যক্তির বিচ্ছিন্নতাবোধ যদি লেখক হওয়ার বাতিক তৈরি করে থাকে, সে ক্ষেত্রে লেখকের উপর্যুপরি অতিফলন সমাজে ব্যক্তির বিচ্ছিন্নতার আরও বৃদ্ধি ঘটাবে। ছাপাখানার উদ্ভাবন একদা মানুষে মানুষে যোগাযোগের বৃদ্ধি ঘটিয়ে মানবসমাজে এক অভিন্ন উপলব্ধির বোধ জাগ্রত করেছিল। আর গ্রাফোম্যানিয়ার কালে এসে বেশুমার বইপত্র উল্টো ফল ফলাচ্ছে: প্রত্যেকে তাঁর নিজের চারপাশে নিজের লেখকত্বের প্রাচীর তুলে দিচ্ছেন, যে প্রাচীরের আয়নায় লেখক অহর্নিশ কেবল নিজেকেই বিম্বিত দেখতে পান। প্রত্যেকে আমরা এক একটি স্বনির্মিত কারাগার গড়ে তুলছি।

বই লেখার বাসনা বা গ্রাফোম্যানিয়া মানুষের আদিরোগ। কুন্ডেরার মতে, আধুনিক সমাজে এসে এই গ্রাফোম্যানিয়া মহামারির রূপ পরিগ্রহ করেছে। যে যে সমাজ অর্থবিত্তে একটু এগিয়েছে, সেই সেই সমাজে এ রোগের মারণ উপদ্রব দেখা দিয়েছে।

কুন্ডেরার মতে, সবাই লেখক হয়ে উঠলে চরাচরজুড়ে এমন এক বধিরতা নেমে আসবে, আমরা কেউ আর কারও কথা শুনতে ও বুঝতে পারব না।

কুন্ডেরা এ দুঃস্বপ্ন দেখেছিলেন ১৯৭৯ সালে। তখনো পারসোনাল কম্পিউটারের যুগ শুরু হয়নি। ইন্টারনেট আসেনি। মুঠোফোন নামক এক যন্ত্র আমাদের সবার পকেটে ঢুকে পড়েনি।

৪৫ বছর পর আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এসে দেখছি, কুন্ডেরার দুঃস্বপ্ন পূর্ণমাত্রায় ফলে গেছে। ফেসবুক আর ইউটিউবের কালে আমরা এখন প্রত্যেকে লেখক এবং প্রত্যেকে বক্তা ও নির্মাতায় পরিণত হয়েছি। তাতে মতপ্রকাশের সুযোগ উন্মুক্ত হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। কিন্তু তার উল্টো পিঠে কুন্ডেরার দুঃস্বপ্ন লুকানো। শুধু ফেসবুকের কথাই ধরা যাক। এখানে প্রত্যেকে তাঁর নিজস্ব ‘দেয়ালে’ (ওয়াল) এমন এক সার্বভৌম লেখকত্ব বা অথরশিপের প্রাচীর তুলে দিয়েছে, যার ওপারে কোনো পাঠকসমাজ বলে আর কিছু নাই। কারণ, প্রত্যেকের প্রাচীরের ঠিক ওপারেই আরেকজনের লেখকত্বের চৌহদ্দি।

আমার আতঙ্ক আরও বাড়ে যখন স্মরণ করি কিছুকাল আগে আরেক ফরাসি দার্শনিক রল্যাঁ বার্থ লেখকের রীতিমতো মৃত্যু ঘোষণা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, আমরা লিখি বটে, কিন্তু যা লিখি তার অর্থের (মিনিং) ওপর আমাদের মালিকানা থাকে না, যদিও প্রকাশক আমাদের নামেই রয়্যালটি দেন বটে। এখন রল্যাঁ বার্থকে সত্যজ্ঞান করলে পরিস্থিতি ঘোরতর দুঃস্বপ্নময় হয়ে ওঠে, যেখানে গ্রাফোম্যানিয়ার এক সর্বব্যাপী অতিমারিতে জনপদ উজাড় হয়ে আমরা সবাই সমবেতভাবে মৃত লেখকে পরিণত হয়েছি। চরাচরব্যাপী এক জম্বিল্যান্ডে আমরা ঘোরগ্রস্তের মতো হেঁটে চলেছি।

তবে কুন্ডেরার দুঃস্বপ্নের চেয়েও বড় দুঃস্বপ্ন আমাদের দেখাচ্ছেন জেমস ম্যারিয়ট নামের এক ব্রিটিশ লেখক। আর এই দুঃস্বপ্ন আসছে লেখকের উল্টো দিক থেকে। পাঠকের দিক থেকে। লন্ডনভিত্তিক সংবাদপত্র দ্য টাইমস-এর এই তরুণ কলামিস্ট বলছেন, ‘এ যুগে আমরা শুধু যে বই পড়ছি না, তা-ই নয়, আমরা আসলে পড়তেই ভুলে যাচ্ছি। আমরা অশিক্ষিত হয়ে উঠছি। আর সেটা গণহারে, সম্মিলিতভাবে।’

এটা অস্বীকার করার আর উপায় নেই, সার্বক্ষণিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আর ইউটিউবের যুগে আমাদের সামনে দেখার ও শোনার কনটেন্ট এত বিপুল পরিমাণে বেড়েছে যে আমরা ছবি ও শব্দের সমুদ্রে অবগাহন করছি। তথ্যসংগ্রহ, জ্ঞান, বিদ্যার্জন ও বিনোদনে আমরা ক্রমাগত অডিওভিজ্যুয়াল কনটেন্টের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি। পাঠ বা রিডিং কর্মটি তার আবশ্যিকতা হারাচ্ছে। অবকাশ-বিনোদন হিসেবেও বইপাঠের চল উঠে যাচ্ছে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে। আর সেটা ব্যাপকভাবে। সব ধরনের জরিপ সেই চিত্রই তুলে ধরছে আমাদের সামনে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোর কক্ষে উঁকি দিলে আমরা আর অলস শয্যায় বইপাঠরত কোনো তরুণকে দেখতে পাব না, এ কথা হলফ করেই বলা যায়। জেমস ম্যারিয়ট বলছেন, এটা মানবজাতির নিছক অভ্যাসের বদল নয়। এর গভীর ও সুদূর প্রভাব পড়বে আমাদের সামগ্রিক অবধারণের জগতে, সমাজে ও রাষ্ট্রের কাঠামোয়।

পাঠ না করা এবং পাঠ করতে না পারার মধ্যে তফাত খুব সামান্যই।

ফেসবুক আর ইউটিউবের কালে আমরা এখন প্রত্যেকে লেখক এবং প্রত্যেকে বক্তা ও নির্মাতায় পরিণত হয়েছি। তাতে মতপ্রকাশের সুযোগ উন্মুক্ত হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। কিন্তু তার উল্টো পিঠে কুন্ডেরার দুঃস্বপ্ন লুকানো।
বইমেলার একটি স্টলে ক্রেতারা

‘দ্য ডন অব দ্য পোস্ট: লিটারেট সোসায়েটি’ নামের একটি দীর্ঘ নিবন্ধ লিখে ম্যারিয়ট সম্প্রতি পশ্চিমা বিদ্বৎসমাজকে গভীরভাবে বিচলিত করে তুলেছেন।

এখন পোস্ট-লিটারেট সোসাইটির কথাটির মানে আসলে কী? কথাটা তেমন জটিল নয়। ছাপাখানা আসার আগে বইপাঠ বা সামগ্রিকভাবে পাঠ ব্যাপারটা সমাজে অতিবিরল, অতিনির্বাচিত একটি গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। লিখতে ও পড়তে পারা লোকের দেখা মিলত কালেভদ্রে। শোনা যায়, এমনকি মহাবিদ্যোৎসাহী মোগল বাদশা আকবরও নাকি পড়তে পারতেন না।

ছাপাখানা এসে সমাজের চিত্রটা আমূল পাল্টে দিয়েছে। বই সহজলভ্য ও সর্বব্যাপী হয়েছে। দিকে দিকে তৈরি হয়েছে পাঠশালা। শিক্ষা এমন বাধ্যতামূলক হয়ে গেছে যে আমরা নিরক্ষর লোক এখন আর প্রায় দেখিই না। আমাদের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামো, অর্থনীতি, বিনোদন—সবকিছু গড়ে উঠেছে গণসাক্ষরতাকে পূর্বশর্ত ধরে নিয়ে।

এখন বইপাঠ সমাজ থেকে উঠে গেলে যেটা ঘটবে, তা হলো, আমরা ছাপাখানা-পূর্ব দশায় ফিরে যাব আবার। একটা পুনর্মূষিকায়ন ঘটবে সবকিছুর। গলে যেতে শুরু করবে প্রতিষ্ঠানগুলোর সংবন্ধন, যেভাবে অতিপঠনে পুরোনো পুস্তকের পাতা আলগা হয়ে যায়। পাঠক্রিয়া না থাকলে পুস্তক রচনাও থাকবে না। মানুষ চিন্তার যে দীর্ঘ শৃঙ্খলাবদ্ধ অবয়ব সৃষ্টির ক্ষমতা অর্জন করেছে, একমাত্র বইয়ের মধ্যেই সেটা আকার নিতে পারে। কার্ল মার্ক্স ডাস ক্যাপিটাল নাকম বই না লিখে অন্য কোনোভাবে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির রূপান্তরসংক্রান্ত তার বৈপ্লবিক ধারণাটি তৈরি করতে পারতেন না।

জেমস ম্যারিয়ট যে দুঃস্বপ্নটি দেখাচ্ছেন, তা হলো, আমরা সম্মিলিতভাবে একটি ‘পোস্ট-লিটারেট’ (পরক্ষর) সমাজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, যেটি প্রি-লিটারেট (প্রাক্ষর) সমাজের হুবহু প্রতিবিম্ব না হলেও এই নতুন জমানায় আমাদের এমন অনেক কিছু বিসর্জন দিতে হবে, যা অতিশয় দুর্মূল্য, সাত রাজার ধন। আমরা সেই সমাজকে সানন্দে বরণ করতে হয়তো রাজি হব না। কিন্তু এই অগস্ত্যযাত্রা অমোঘ।