গ্রাফিকস: প্রথম আলো
গ্রাফিকস: প্রথম আলো

আলোকচিত্রে গল্প

মহাশূন্যে পরমাণু মেঘ

অতীত পাঠের অনেক ধরনের উপায় রয়েছে। তারিখ, দলিল, স্মৃতিচারণ বা বিবরণীর মধ্য দিয়ে যেমন, আবার এমন কিছু মুহূর্ত রয়েছে যাদের সমস্ত ভার, আবেগ ও বাস্তবতা সবচেয়ে সংক্ষেপে ধারণ করে কেবল একটি আলোকচিত্র। সময়ের সীমানা ভেদ করে টিকে থাকা এসব ছবির পেছনে থাকে একাধিক গল্প। এই ধারাবাহিকের প্রতিটি পর্বে আমরা তুলে ধরব এমনই কোনো বিশ্ববিখ্যাত আলোকচিত্রের অন্তরঙ্গ ইতিহাস।

‘আমারও একটি পারমাণবিক বোতাম আছে, তবে আমার বোতামটি তার চেয়ে অনেক বড় ও শক্তিশালী, এবং সেটি সত্যিই কাজ করে!’ উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উনের উদ্দেশে একটি টুইটবার্তায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন কথাগুলো লিখলেন, তখন পৃথিবী একাধিক যুদ্ধের দামামায় জর্জরিত। এগিয়ে আসছে ইউক্রেন–রাশিয়ার যুদ্ধ, চলছে ফিলিস্তিনের ওপর ইসরায়েলের মহা শোষণ পর্ব, সম্পূর্ণ আরব বিশ্বে ছড়িয়ে যাচ্ছে চূড়ান্ত অস্থিরতা, কিছুদিন পরে প্রায় একই সময় সংঘটিত হবে ইরান-ইসরায়েল এবং ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ। আমেরিকা দিন দিন এগিয়ে গেছে ভেনেজুয়েলার দিকে, চীন এগিয়ে যাচ্ছে তাইওয়ানের ওপর মার্কিন আধিপত্য বিনাশের লক্ষ্যে, জাতিসংঘের মতে, ইয়েমেন যুদ্ধে ২০২১ সাল পর্যন্ত মারা গিয়েছেন ৩৭ লাখ মানুষ।

বর্তমান বৈশ্বিক রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে পরমাণু অস্ত্রের পুনরুজ্জীবিতের হুমকির সম্পর্ক ১৯৬২ সালের কিউবান ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের পর আর কখনো এত গভীর ও জটিল হয়ে ওঠেনি। এমন এক সময়ে এসে আমরা দাঁড়িয়ে আছি, ইতিহাসের এমন এক সন্ধিক্ষণে, যেখানে কূটনৈতিক নিরাপত্তা-বলয়ের ক্রমাগত ক্ষয় মিলেছে আঞ্চলিক অস্থিরতা ও উচ্চ ঝুঁকির ‘কৌশলগত সংকেত প্রদর্শন’-এর বিস্ফোরণের সঙ্গে।

পূর্ব ইউরোপ থেকে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত বিভিন্ন সংঘাতে পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো তাদের অস্ত্রভান্ডারকে একধরনের ‘ঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করছে। প্রচলিত যুদ্ধ চালিয়ে যেতে প্রতিদ্বন্দ্বীদের হস্তক্ষেপের সাহস পরীক্ষা করছে, আর তাতে করে ভয়াবহ ভুল হিসাবের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে দ্রুত অগ্রগতি এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের জোটনীতির পরিবর্তনের ফলে দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো প্রকাশ্যে নিজেদের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে। এই ‘পারমাণবিক ডমিনো’ তত্ত্ব বলছে: একটি দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতাই পুরো অঞ্চলকে অপ্রসারণ নীতি ত্যাগে বাধ্য করতে পারে।

বর্তমান রাজনৈতিক সংকট পরমাণু বোমাকে নীরব প্রতিরোধের প্রতীক থেকে সক্রিয় রাজনৈতিক ব্ল্যাকমেলের অস্ত্রে রূপান্তর করেছে। ‘রগ আমেরিকা’ ভীতি, রাশিয়ার আগ্রাসী অবস্থান এবং চীনের বিস্তারবাদী বাস্তবতায়, বিশ্বব্যবস্থার কোনো একীভূত দৃষ্টিভঙ্গির অনুপস্থিতি—অকল্পনীয়কে আবারও সম্ভব বলে মনে করিয়ে দিচ্ছে।

বর্তমান রাজনৈতিক সংকট পরমাণু বোমাকে নীরব প্রতিরোধের প্রতীক থেকে সক্রিয় রাজনৈতিক ব্ল্যাকমেলের অস্ত্রে রূপান্তর করেছে। ‘রগ আমেরিকা’ ভীতি, রাশিয়ার আগ্রাসী অবস্থান এবং চীনের বিস্তারবাদী বাস্তবতায়, বিশ্বব্যবস্থার কোনো একীভূত দৃষ্টিভঙ্গির অনুপস্থিতি—অকল্পনীয়কে আবারও সম্ভব বলে মনে করিয়ে দিচ্ছে।

পারমাণবিক বোমা ফ্যাট ম্যান, টিনিয়ান দ্বীপ, আগস্ট ১৯৪৫

এমন অবস্থায়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন প্রকাশ্যে এক্স বার্তায় বাক্যগুলো লেখেন, তখন উত্তেজনার সুর ক্রমাগত চড়তে থাকে এবং ভবিষ্যতে এক পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কা আবারও ঘনিয়ে ওঠে। ফলে পুনরায় প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে বিগত বিশ্বযুদ্ধ এবং অনাগত পারমাণবিক লড়াই। পুনরায় প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে ১৯৪৫ এবং জাপান। হিরোশিমা ও নাগাসাকি। পুনরায় প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে ‘ফ্যাট ম্যান’।

ফেসবুকে অন্য আলো ফলো করুন

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর আত্মজৈবনিক ‘অর্ধেক জীবন’ বইয়ে লিখেছেন, ‘সবাই হোটেলে ফিরছেন, ট্রুমান আড়ালে ডেকে নিয়ে গেলেন স্ট্যালিনকে। অদূরে দাঁড়িয়ে চুরুট ফুঁকতে ফুঁকতে কৌতুকহাস্যময় মুখে অপেক্ষা করতে লাগলেন চার্চিল। এখানে একটি ক্ষুদ্র নাটক অনুষ্ঠিত হলো। ট্রুমান জানালেন, তাঁরা একটা অসাধারণ বিধ্বংসী নতুন অস্ত্র আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু ট্রুমান নিউক্লিয়ার বা অ্যাটমিক শব্দ দুটি উল্লেখ করলেন না। কোনো মন্তব্যই করলেন না স্ট্যালিন। তিনি আগে থেকেই জানতেন? তা সম্ভব নয়। কিংবা ক্লান্ত ছিলেন, নিজের কক্ষে ফিরে বিশ্রাম নেবার জন্য উদ্‌গ্রীব ছিলেন? ফিরে এসে ট্রুমান চার্চিলকে বললেন, উনি তো কোনো প্রশ্ন করলেন না। চার্চিল এমন একখানি হাসি দিলেন যাতে বোঝা গেল, তিনি সেটাই ধরে নিয়েছিলেন। চার্চিল এ রকমই লিখে গেছেন তাঁর আত্মজীবনীতে।

মাশরুম ক্লাউড ওভার নাগাসাকি, ৯ আগস্ট ১৯৪৫। আলোকচিত্র: লেফটেন্যান্ট চার্লস লেভি

এই ঘটনার ঠিক ১৩ দিন পর ৬ আগস্ট সকাল ৮টা ১১ মিনিটে মার্কিন বিমান থেকে জাপানের হিরোশিমা শহরে প্রথম অ্যাটম বোমা নিক্ষিপ্ত হলো। কয়েক মিনিটের মধ্যে ধ্বংস হলো শহরের ৬০ ভাগ অংশ, ৭৮ হাজার জীবন্ত মানুষ শব হয়ে গেল যেন চোখের নিমেষে। অগ্নিদগ্ধ হয়ে ছটফট করতে লাগল আরও হাজার হাজার মানুষ, বহু গর্ভিণীর গর্ভপাত হয়ে গেল, পুরুষত্ব হারাল বহু পুরুষ, বিকলাঙ্গ হয়ে গেল কত সহস্র, এই ধ্বংসের প্রক্রিয়া চলতেই লাগল। নরকের কল্পনাও এত বীভৎস নয়।

ট্রুমান হয়তো আশা করেছিলেন, এই এক আঘাতেই জাপানে ত্রাহি ত্রাহি রব উঠবে। আত্মসমর্পণের আর এক দিনও দেরি হবে না। কিন্তু জাপানের দিক থেকে কোনো সাড়াশব্দই নেই। নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ। যাঁরা জীবন রক্ষার চেয়েও আত্মসম্মান রক্ষাকে বেশি মূল্য দেয়, তাঁরা করবে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ? সম্রাটের মর্যাদা রক্ষার কোনো শর্ত থাকবে না। জাপানি যুদ্ধ-অপরাধীদের বিচার হবে জাপানের বাইরে। জাপানি সৈন্যদের হাত থেকে অস্ত্র কেড়ে নেবে আমেরিকানরা, সৈন্যরা তা মেনে নেবে?

এমন অবস্থায় যখন উত্তেজনার সুর ক্রমাগত চড়তে থাকে এবং ভবিষ্যতে এক পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কা আবারও ঘনিয়ে ওঠে। ফলে পুনরায় প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে বিগত বিশ্বযুদ্ধ এবং অনাগত পারমাণবিক লড়াই। পুনরায় প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে ১৯৪৫ এবং জাপান। হিরোশিমা ও নাগাসাকি। পুনরায় প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে ‘ফ্যাট ম্যান’।

তা ছাড়া আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেবে কে? প্রধানমন্ত্রী, প্রধান সেনাপতি, উপদেষ্টা পরিষদের কেউই সে দায়িত্ব নিতে রাজি নন। যিনি নেবেন, তিনিই দেশবাসীর চোখে ঘৃণ্য হবেন। একদল উগ্রবাদী যুবক পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তারা ঘোষণা করেছে, যে আত্মসমর্পণের কথা উচ্চারণ করবে, তাকেই হত্যা করা হবে। সেনাধ্যক্ষদের মধ্যেও অনেকেরই এ রকম মনোভাব। একমাত্র এ দায়িত্ব নিতে পারেন সম্রাট, তাঁর কথার প্রতিবাদ করার সাধ্য কারোর নেই। জাপানিদের কাছে তাঁদের সম্রাট স্বয়ং দেবতা, জাপানে যাঁরা আত্মহত্যা করে, তারা সম্রাটের প্রাসাদের দিকে মুখ করে বসে পেটে ছুরি চালায়।

নাগাসাকির ওপর ক্রমবর্ধমান মাশরুমের মেঘ, পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের কয়েক মিনিট পরে, ৯ আগস্ট ১৯৪৫। ছবিটি নাগাসাকির কেন্দ্র থেকে ৫ মাইল দূরে কোয়াগি-জিমা থেকে তোলা

তিন দিন অপেক্ষা করার পর ট্রুমান দ্বিতীয় বোমাটি ফেলার আদেশ দিলেন। কোকুরা ও নাগাসাকি, এই দুটি শহরের মধ্যে বেছে নেওয়া হবে যেকোনো একটিকে। বিমানটি প্রথমে উড়ে এল কোকুরাতে, সেখানকার আকাশ মেঘাচ্ছন্ন, ওপর থেকে শহরটি দেখাই যায় না। বিমানটি চক্রাকারে ঘুরতে লাগল, কিন্তু বিশাল ওজনের বোমাটি নিয়ে বেশিক্ষণ ঘোরা যাবে না, জ্বালানি ফুরিয়ে আসছে, তাই বিমানের মুখ ঘুরে গেল নাগাসাকির দিকে। সেখানকার আকাশেও ঘন মেঘের আবরণ। কিছুই দেখা যায় না। তবে কি ফিরে যেতে হবে? হঠাৎ মেঘ একটু ফাঁক হলো, নিচে দেখা গেল পাহাড় প্রান্তের শহরটিকে একঝলক। বৈমানিক আর মুহূর্তও দেরি না করে বোমাটি সেখানে নিক্ষেপ করে চম্পট দিল। আকাশের মেঘ বাঁচিয়ে দিল কোকুরা শহরের মানুষদের, আবার সেই আকাশের মেঘ আচম্বিতে নাগাসাকির লক্ষ লক্ষ মানুষের ওপর নেমে এল মৃত্যুঝড় হয়ে। এবারের বোমাটি আরও শক্তিশালী, ধ্বংসলীলা আরও প্রচণ্ড।’

জোসেফ স্ট্যালিন, হ্যারি ট্রুম্যান এবং উইনস্টন চার্চিল, পোস্টড্যাম কনফারেন্স, জুলাই ১৯৪৫। সূত্র: ইউনাইটেড স্টেটস ইনফরমেশন সার্ভিস

২৬ বছর বয়সী লেফটেন্যান্ট চার্লস লেভি বি-২৯ এয়ারক্রাফট ‘দ্য গ্রেট আর্টিস্ট’-এ চড়ে নাগাসাকির ধ্বংসযজ্ঞের সেই ছবি ধারণ করেছিলেন। বি-২৯ এয়ারক্রাফট একটি পর্যবেক্ষণ বিমান, যা বিস্ফোরণের শক্তি রেকর্ড করতে স্ট্রাইক প্লেন বকস্কারের কাছে আকাশে উড়ছিল। ক্রিটিক্যাল অ্যাসেম্বলি বই অনুসারে, একটি উচ্চগতির ফাস্ট্যাক্স ক্যামেরাসহ একজন পদার্থবিজ্ঞানী মূলত ক্যামেরা প্লেন, বিগ স্টিঙ্ক থেকে বিস্ফোরণটি ক্যাপচার করার জন্য নির্ধারিত ছিল। কিন্তু প্রস্তুতি নেওয়ার সময় তিনি ভুলবশত একটি প্যারাস্যুটের পরিবর্তে একটি দ্বিতীয় লাইফ র‍্যাফট ধরে ফেলেন। ফলে বাধ্য হয়ে এয়ারফিল্ডে থাকতে হয়। তদুপরি মিশনে থাকা অন্য দুটি প্লেনে যোগ দেওয়ার জন্য ক্যামেরা প্লেনটি সময়মতো মিটিং পয়েন্টে পৌঁছায়নি। ফলস্বরূপ, লেভি, দ্য গ্রেট আর্টিস্টের বোম্বিংয়ে বিস্ফোরণের সবচেয়ে সংজ্ঞায়িত আলোকচিত্রগুলোর মধ্যে একটি হয়ে ওঠে। লেভি মূলত বক্সাকারে উড়ে যাওয়ার জন্য নির্ধারিত ছিল, কিন্তু তার ক্রুরা শেষ মুহূর্তের জটিলতায় পড়ে প্লেন বদল করে, অন্যথায় এই আলোকচিত্রটি ধারণ করা সম্ভব না–ও হতে পারত।

লেভির ধারণ করা ছবিটি দেখায় যে ধোঁয়া এবং ধ্বংসালীলার একটি বিশাল কুণ্ডলী পৃথিবী থেকে বের হচ্ছে এবং তা মেঘের মধ্য দিয়ে বিদ্ধ হচ্ছে, যা মূলত আকাশে আট মাইল উচ্চতা পর্যন্ত পৌঁছেছে। আলোকচিত্রটি সামরিক শক্তির সর্বোচ্চ মাত্রার প্রয়োগের একটি অভূতপূর্ব দৃশ্যায়ন, দেখতে মাশরুমের রূপায়ণ।

সেদিন লেভির দায়িত্ব ছিল বিস্ফোরণের তীব্রতা পরিমাপের যন্ত্রপাতি পরিচালনায় সহায়তা করা। কিন্তু একের পর এক লজিস্টিক বিপর্যয়ের ফলে, বিশেষ করে প্রধান ফটোগ্রাফি বিমান বিগ স্টিংক নির্ধারিত রেন্ডেভুতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হওয়ায়, লেভি অজান্তেই পরিণত হন শতাব্দীর এক অনিচ্ছাকৃত দলিলকারে। হাতে ধরা একটি ফেয়ারচাইল্ড কে–২০ ক্যামেরা নিয়ে তিনি বি–২৯ বিমানের প্লেক্সিগ্লাস নাকের অংশে ভর দিয়ে বিস্ফোরণের মুহূর্ত বন্দী করেন।

বি–২৯ বিমান। সূত্র: ইউএস আর্মি এয়ারফোর্স

২১ কিলোটন ক্ষমতাসম্পন্ন প্লুটোনিয়াম বোমাটি বিস্ফোরিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দ্য গ্রেট আর্টিস্ট-এর ক্রু এমন এক দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে, যার কোনো তুলনা তৎকালীন ভাষায় খুঁজে পাওয়া যায়নি। লেভি পরে সেই আলোকে বর্ণনা করেন, ‘দ্বিগুণ দিনের আলো থেকেও উজ্জ্বল।’

লেভি মোট ১৬টি ছবি তুলেছিলেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছবিটিতে দেখা যায় প্রায় ৬০ হাজার ফুট (প্রায় ১৮ হাজার ২৮৮ মিটার) উচ্চতায় উঠে যাওয়া এক বিশাল মাশরুম মেঘ। সেই ছবিতে মেঘটি যেন তিনটি স্তরে বিভক্ত—নিচে ধ্বংসস্তূপ ও ধূলিকণায় ঘন, অন্ধকার স্তম্ভ; মাঝখানে মাশরুমের কাণ্ড; আর ওপরে এক সুবিশাল, সাদা, ফেনিল আবরণ, যেন আকাশ ভেদ করে উঠে যেতে চায়।

লেভির ধারণ করা ছবিটি দেখায় যে ধোঁয়া এবং ধ্বংসালীলার একটি বিশাল কুণ্ডলী পৃথিবী থেকে বের হচ্ছে এবং তা মেঘের মধ্য দিয়ে বিদ্ধ হচ্ছে, যা মূলত আকাশে আট মাইল উচ্চতা পর্যন্ত পৌঁছেছে। আলোকচিত্রটি সামরিক শক্তির সর্বোচ্চ মাত্রার প্রয়োগের একটি অভূতপূর্ব দৃশ্যায়ন, দেখতে মাশরুমের রূপায়ণ। মাশরুমের মাথাটি ধোঁয়ার স্তম্ভ থেকে ফুসকুড়িতে ফুটে উঠলে বিস্ফোরণটি তার নিজের জীবন গ্রহণ করেছে বলে মনে হয়। একটি ভয়ংকর বোতাম থেকে যার জন্ম, যে বোতাম কখনো চাপা উচিত না।

‘মাশরুম ক্লাউড ওভার নাগাসাকি’ আলোকচিত্রটি পারমাণবিক বোমাকে এক গোপন অস্ত্র থেকে রূপান্তরিত করেছে এক দৃশ্যমান প্রতীকে। আমেরিকান আধিপত্য ও বৈজ্ঞানিক ‘জয়’-এর প্রতীক হিসেবে। এই প্রতীকী মহিমা প্রায়ই ঢাকা দিয়ে দেয় নিচে হারিয়ে যাওয়া আনুমানিক ৮০ হাজার মানুষের জীবনের মানবিক মূল্যকে।

সেই সময়ে লেভি যেমন ফ্রি ল্যান্স স্টার সংবাদপত্রকে বলেছিলেন, ‘বিস্ফোরণটি ছিল এত তীক্ষ্ণ আর প্রবল উজ্জ্বল যে মনে হচ্ছিল বিমানটির ভেতরেই দিনের আলোর দ্বিগুণ আলো একসঙ্গে ঝলসে উঠেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা দেখলাম বিরাট এক ধোঁয়ার স্তম্ভ ধীরে ধীরে আকাশের দিকে উঠছে—উঁচুতে, আরও উঁচুতে। তার রং কখনো বেগুনি, কখনো লাল, সাদা—সব রং মিলেমিশে, যেন ফুটন্ত কফির মতো কাঁপছিল। পুরো দৃশ্যটা যেন জীবন্ত মনে হচ্ছিল…আমরা সবাই ভীষণ আতঙ্কিত হয়েছিলাম।’

আগে এবং পরে। সূত্র: ইউনাইটেড স্টেটস আর্মি

টাইম-এর মতে, মাটিতে বোমার বিধ্বংসী ছবিগুলো মার্কিন কর্মকর্তাদের দ্বারা সেন্সর করা হয়েছিল। তবু লেভির বিস্ফোরণের চিত্রটি নিজেই পুরো বিশ্বকে প্রদক্ষিণ করেছিল। এটিই একমাত্র আলোকচিত্র, যা সম্পূর্ণরূপে দেখার মতো করে হাজির করে বিশাল মেঘটিকে; এটি এমন এক বিস্ফোরণকেও দেখায়, যেন এটি বিস্ফোরিত হয়েছিল শূন্যস্থানে।

লেফটেন্যান্ট চার্লস লেভি

অন্যদিকে আলোকচিত্রটি পৃথিবীতে তিন মাইলের বেশি ব্যাসার্ধের গণহত্যা দেখায়নি বা মানবজীবনের জন্য অবিশ্বাস্য ক্ষতিকে ধারণ করেনি। পরিবর্তে, একটি বৈপরীত্য–ধূসর আকাশের বিপরীতে বিচ্ছিন্ন একটি স্বর্গীয় সাদা আকৃতিকে তুলে ধরেছিল। লেভি যে বিস্ফোরক রূপটি আলোকচিত্রের মাঝে ধারণ করেছিলেন, তা আমেরিকান শক্তির একটি প্রধান আখ্যান ব্যাখ্যা করে এবং পারমাণবিক যুগের প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হয়।

যুদ্ধ শেষে চার্লস লেভি ফিরে যান ফিলাডেলফিয়ায়। তিনি সাধারণ নাগরিক জীবনে কাজ করেন। প্রথমে বিক্রয়কর্মী হিসেবে, পরে নগর দমকল বিভাগের একজন পরিদর্শক হিসেবে। ১৯৯৭ সালে, ৭৯ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।

নিজেকে কখনো আলোকচিত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার বাসনা তাঁর ছিল না। তবু তাঁর তোলা সেই এক মুহূর্তের স্ন্যাপশট আজ ইতিহাসের সবচেয়ে বহুল পুনর্মুদ্রিত ছবিগুলোর একটি—এক শীতল স্মারক, যা মনে করিয়ে দেয় সেই ক্ষণটির কথা, যখন মানবসভ্যতা প্রথম বুঝতে শিখেছিল, চাইলে সে নিজেকেই ধ্বংস করতে পারে।