
নিউইয়র্কের ব্যস্ত ফুটপাত, শিল্প-গ্যালারির কোলাহল আর দৈনন্দিন আলাপের স্বতঃস্ফূর্ত ছন্দকে যিনি কবিতায় রূপ দিয়েছিলেন তিনি ফ্রাঙ্ক ও’হারা। ‘নিউইয়র্ক স্কুল অব পোয়েট্রি’র অন্যতম প্রধান কণ্ঠস্বর হিসেবে ও’হারা আধুনিক কবিতার গাম্ভীর্য ভেঙে এনে দেন তাৎক্ষণিকতা, কৌতুক আর নগরজীবনের প্রাণচাঞ্চল্য।
• ভূমিকা ও ভাষান্তর: রাব্বী আহমেদ
মার্কিন কবি ফ্রাঙ্ক ও’হারাকে (২৭ মার্চ ১৯২৬, বাল্টিমোর—২৫ জুলাই ১৯৬৬, বোস্টন) ধরা হয় ‘নিউইয়র্ক স্কুল অব পোয়েট্রি’ আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কণ্ঠস্বর হিসেবে। ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে এ আন্দোলন গড়ে ওঠে, যা এর নামকরণের সূত্র। আন্দোলনটির অন্য প্রধান কবিরা হলেন জন অ্যাশবেরি (১৯২৭-২০১৭), কেনেথ কচ (১৯২৫-২০০২), জেমসস্কাইলার (১৯২৩-১৯৯১) ও বারবারা গেস্ট (১৯২০-২০০৬)। সে সময়ের প্রচলিত আধুনিক ধারার গুরুগম্ভীর কবিতার বিপরীতে এ ধারার কবিরা তাঁদের কবিতায় একধরনের স্বতঃস্ফূর্ততা আর কৌতুক নিয়ে হাজির হন, একদম ‘নন-একাডেমিক’ মেজাজে। জোর দেন দৈনন্দিন কথোপকথনের ভাষা আর বিষয়-কাঠামোর দিকে।
নিউইয়র্ক শহরের ভাইব্র্যান্ট জীবনধারায় মশগুল ফ্রাঙ্ক সাদরে গ্রহণ করেন সেখানকার গতি, বিশৃঙ্খলা আর প্রাণচাঞ্চল্যকে—সড়ক, শিল্পজগৎ আর মানুষের যোগাযোগের ভঙ্গি থেকে খুঁজে পান কবিতা লেখার অনুপ্রেরণা। এ কারণে ফ্রাঙ্কের কবিতায় একদিকে যেমন পাওয়া যায় দৈনন্দিনের টুকরো আলাপ, অন্যদিকে তাৎক্ষণিকতা আর নগরজীবনের অতি ছোট ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম মুহূর্তের দিকে মনোযোগ। আরও আছে—হাস্যরস, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও শিল্পবোধের মিশ্রণ। গবেষকেরা মনে করেন, ‘ফ্রাঙ্কের কবিতা হলো মুহূর্তের স্ন্যাপশট, যেখানে একত্রে মিশে গেছে নানা নৈমিত্তিক ভাবনা আর দৈনন্দিনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা।’ শহরের কংক্রিট জীবন, চিত্রকলা আর সংগীতের মতো থিমগুলোকে স্তরে স্তরে বসিয়ে তিনি নির্মাণ করেছেন কবিতার এক বহুমাত্রিক ভবন, যার একেকটা চিলেকোঠা থেকে চিলিক মেরে ওঠে মমতাপ্রবণ এক কবিহৃদয়ের নানা মুডস, যা আপাতভাবে মনে হতে পারে বিচ্ছিন্ন, কিন্তু গভীর পাঠে এদের মধ্যে একধরনের অন্তরঙ্গ যোগসূত্র টের পাওয়া যায়।
পঞ্চাশের দশকে মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্টে (মোমা) কাজ করতেন ফ্রাঙ্ক। এই অভিজ্ঞতায় তাঁর কবিতার ভিত আরও মজবুত হয়ে উঠে সেখানে জায়গা করে নেয় শিল্পের উপস্থিতি, প্রবলভাবে। মোমাতে কাজ করার সুবাদে ও’হারার সঙ্গে তাঁর সমসাময়িক চিত্রশিল্পীদেরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়। এই তালিকায় ছিলেন জ্যাকসন পোলক (১৯১২১৯৫৬), উইলেম ডি কুনিং (১৯০৪-১৯৯৭) ও জোয়ান মিচেল (১৯২৫-১৯৯২)-এর মতো চিত্রশিল্পীরা। চিত্রকরেরা যেভাবে ক্যানভাসে রং ছুড়ে তাৎক্ষণিক আবেগ (অ্যাকশন পেইন্টিং) প্রকাশ করতেন, ও’হারাও শব্দ দিয়ে কবিতায় সেই তাৎক্ষণিকতা ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন। এ ছাড়া ফ্রাঙ্কের কাব্যদর্শনে রুশভবিষ্যদ্বাদী ও বিপ্লবী কবি ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কির (১৮৯৩-১৯৩০) গভীর ও স্পষ্ট প্রভাব ছিল। মায়াকোভস্কিকে ও’হারা কেবল পছন্দই করতেন না, বরং তাঁকে তাঁর অন্যতম প্রধান অনুপ্রেরণা বা ‘গুরু’ হিসেবেও গণ্য করতেন। ও’হারা একবার লিখেছিলেন, তিনি ‘মায়াকোভস্কির কবিতার সেই “প্রচণ্ড প্রাণশক্তি” আর “আবেগের সততা” কেনিজের কবিতায়’ ধারণ করতে চেয়েছিলেন।
তাঁর জননন্দিত বইগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘লাঞ্চ পোয়েমস’ (১৯৬৪), ‘মেডিটেশনস ইন অ্যান ইমার্জেন্সি’ (১৯৫৭) এবং ‘দ্য কালেক্টেড পোয়েমস অব ফ্র্যাঙ্ক ও’হারা’ (১৯৭১, তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত)। ১৯৫০-এর দশকের শুরুতে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেখাপড়া শেষ করে নিউইয়র্কে এসে কবিতা লিখতে চাওয়া এই তরুণ কবির জীবন ১৯৬৬ সালের এক দুর্ঘটনায় আকস্মিক থেমে যায়। মাত্র ১৫ থেকে ১৬ বছরের সক্রিয় কাব্যজীবনে মায়াকোভস্কির তেজ আর সমকালীন চিত্রকলার বিমূর্ততার মিশেলে কবিতার যে ব্যতিক্রমী কাঠামো তিনি নির্মাণ করেছেন, নিউইয়র্কের ব্যস্ত ফুটপাত থেকে আজকের তরুণ কবির খসড়া খাতায় তাঁর চিরচেনা ‘তাৎক্ষণিকতা’ আর ‘চিরযৌবনা প্রাণশক্তি’ নিয়ে আজও তা প্রোজ্জ্বল।
১
আমি বুঝি ওই সব কেরানিদের একঘেয়েমি যাদের
চোখের ভেতর জমে ওঠে ক্লান্তি মরুভূমির বালুর ঢিবির
মতো, একটা জঘন্য বমি-বমি ভাব ওদের সব কাজ অচল
করে দেয়, যাকে একসময় ভাবা হতো ছদ্মবেশী কোনো
আগ্রাসন। তোমার কি মনে পড়ে? তখন চাঁদটা কী নির্ভার
মৃত মনে হতো, যখন কারখানার ওপর দিয়ে এর নিস্তেজতা
পিছলে যেত হৃদয়ের ঊর্ধ্বে এক সিসার গোলার মতো,
কামনার উগ্র খতিয়ান। এখন নারীরা ঘুরে বেড়ান
আমাদের স্বপ্নের ভেতর টাকা হাতে আর আমাদের ঘুমের
লজ্জায় আমাদের হাত আর কেঁপে ওঠে না রক্তডোবা
ক্ষিপ্র যুদ্ধজাহাজের জন্য, না শিথিল সাদা ঘোড়ার দল না
কুখ্যাতির জন্য, বরং সজোরে আঁকড়ে ধরি সেই কামনার
কুঁচকি, যা মেঘ দিয়ে ঢেকে দেয় ফ্যাকাশে আকাশ, যেখানে
অট্টালিকারা তলিয়ে যাচ্ছে তাদের সাধারণ চোখে।
২
আমার জাহাজ ছিটকে পড়েছে নর্দমার কবজিতে
আর সাহায্য চাইছে ঝড়ের কাছে সেই শরীরকে
লঙ্ঘন করতে তোমার কৌতূহল যাকে রক্তিম
করেছে অ-নে-ক দেরিতে। তোমার অন্তরঙ্গ জিহ্বা
যে কাণ্ডকে পেঁচিয়ে ধরত, সেটা আজ ডুবে গেছে
নিস্তরঙ্গ বুকের কুয়াশায় শহরের ঊরু, প্রেতচ্ছায়া,
ঘৃণা, আর সেই মিনার, যার কোমল ঘুঘুরা পালিয়ে ঢুকে
পড়েছে আমার রক্তে, যেখানে তারা কোনো চুমু পায় না।
তুমি আমাকে ফেলে গেছ নর্দমার এই অন্তর্বর্তী
সময়ে, আর আমি সাড়া দিয়েছি সমুদ্রের উন্মুক্ত
কামনায়, যা আমাকে ভালোবাসবে যেমন বনফায়ারের
সতর্ক হাত লাল করে পাহারা দেয় সৈকতকে আর পাহারা
দেয় রোমশ বেলাভূমিকে, আমাদের চরম মার্জিত লম্পট
পিত্তকে, আমার জাহাজ ডুবে যাচ্ছে নর্দমার মাছদের অতলে।
৩
তাহলে কী করে আমি, ও আমার প্রিয়তম শীতের গান,
উগরে দেব সেই সুস্বাদু কৃমিকে যা আমাকে কুরে খাচ্ছে
আছড়ে পড়ে কোনো এক মহাসড়কের কাণ্ডে
যার উদগ্র রংধনু হলো চামচের চ্যাপ্টা পেয়ালা
আর নীল পোশাক পরা জঘন্যতম শক্তির মধ্যে উত্তপ্ত
সুচের বাহুর মোহে আচ্ছন্ন হয়ে, সেবক খুঁজে পায় নিজ
জিহ্বার অনুশোচনা রক্তের এত কাছে আর ক্ষতি থেকে
এখনো কত দূরে, এভাবেই তাহলে ভক্ষিত হওয়া আর
গোগ্রাসে গিলে ফেলা স্পিডোমিটারের আগ্নেয়গিরিদের,
সেই আঘাত যা চোখের মণিকে পুড়িয়ে করে তোলে শিখা
আর ফুলে হাঁপাতে থাকা সেই পানপাত্র যেন এক ঘূর্ণায়মান শূল:
তুমি নও তেমন যেভাবে দেবতারা প্রত্যাখ্যান করেছিল মরতে
আর চোখের নিচটায় আমি দাগ হয়ে আছি আজীবনের।
৪
আমার চোখ দুটো তবে কী? যদি তাদের আমাকে
খাওয়াতেই হয়, বিস্মৃতির সঙ্গে একই সারিতে, চকচকে
আঘাতের ঈর্ষাতুর অরণ্যে, ধোঁয়া আর আলোর মধ্যে এমন
উজ্জ্বল শূন্যতায়। সব ম্লান, বিশ্রামরত, তবু আমি ছুটে চলছি
সেই ভয়ের দিকে যা তাদের মেরে ফেলে রাখে, বন্ধু আর প্রেমিকেরা,
অশ্রুর ভেতর দিয়ে ছুটে যাচ্ছি দ্রুতগতিতে পাহাড়ের কণ্ঠনালিতে
উচ্চমাত্রার অ্যালকোহলের মতো আর রাতের পাহাড়েরা, প্রলুব্ধকর!
তাদের কালো উল্লাসধ্বনি আমার কানে এসে বিঁধছে
পেরেকের মতো। আর সেখানে গরাদগুলো ঘন হয়ে ওঠে
স্বমেহনকারী আর শিবিরে এবং গদা হাতে ভালুকদের অস্থায়ী আস্তানায়,
তাদের ন্যায্য আঘাত বেগুনি বাতির নিচে বিলিয়ে দেয় মৃত্যুকে আর
আমাকেও! আমি দৌড়াই! সর্বদা আরও কাছে সরে যাই,
নিজের নাম ধরে চিল্লাই মৃতদের খেতে যাদের আমি ভালোবাসি।
৫
আমি গভীর ডুব দিই এই জমাট বাঁধা হ্রদের অতলে
যার প্রতিবিম্বিত দুর্গেরা আমার হৃদয়কে ভরিয়ে দেয়
যেখানে অশ্রুরা লঘু চপলতা থেকে চলে শিল্পের অভিমুখে
সবকিছুই সাদা আর লালাসিক্ত, আর ভুলবশত তারাই
হয়ে ওঠে আকাশ। আমি তিমি নই যে একা একা ঘুরে
বেড়াব আমার তীব্র দুর্গন্ধ, আমার মঙ্গল, আমার চিহ্নের
প্রতি নির্বিকার প্রান্তরে, চূর্ণ সমুদ্রের দিকে যা ধসে পড়ে
নকল স্তম্ভের মতো! বীজ রোপণ করব হৃদয়কে জাগাতে
আর তুমি কার্পণ্য কোরো না। তুষার নিচুতেই ভেসে আসে
আর তা সত্ত্বেও আমাকে ঢেকে দিতে অবহেলা করে, আর
আমি ঠিক এগিয়েই নাচি আমার হৃৎপিণ্ডকে নজরে রাখতে।
কী সম্রাজ্ঞী-সুলভ ঈর্ষাকাতর চোখে খুঁজে ফেরে সেই মুখখানি
তোমার থেকে যা পালিয়ে যায়, লুকানো শহর, সাদা রাজহাঁস।
আমাকে মুক্ত করবার শিল্প নেই, এই রকম অন্ধ করা হয়েছে।
এটা আমার লাঞ্চ-আওয়ার, তাই আমি
হাঁটতে বের হই মাটি-রঙা ট্যাক্সিদের মধ্য
দিয়ে। প্রথমে যাই ফুটপাথ ধরে যেখানে
শ্রমিকেরা ওদের নোংরা, তেল চিটচিটে
ধড়কে খাওয়ায় স্যান্ডউইচ আর
কোকা-কোলা, মাথার ওপর
ওদের হলুদ হেলমেট।
এসবই ওদের রক্ষা করে থাকবে পড়ন্ত
ইটপাটকেল থেকে—আমার অনুমান। এরপর
যাই সড়কে, যেখানে স্কার্টগুলো উশ্টা
খায় গোড়ালিতে আর ফুলে ওঠে নিকাশির
জালির ওপর।
সূর্য প্রখর, কিন্তু এই ট্যাক্সিরা
নাড়িয়ে দিচ্ছে বাতাসকে। আমি তাকাই
হাতঘড়ির দরাদরির দিকে। সেখানে
বিড়ালরা খেলছে কাঠের গুঁড়োর ভেতর।
এরপর
টাইম স্কোয়ারের দিকে, যেখানে সাইনবোর্ডটি
ধোঁয়া ওড়াচ্ছে আমার মাথার ওপর, আর তারও ওপরে
ঝরনাটা ঝরে পড়ছে ধীর বেগে। একজন
নিগ্রো লোক দাঁড়িয়ে আছেন দরজার মুখে
টুথপিক হাতে, অলস অথচ অস্থির।
এক সোনালি চুলের কোরাস—মেয়ে ক্লিক করছে: পুরুষটি
হাসছে আর ঘষছে নিজের থুতনি। সবকিছু
হঠাৎ হর্ন বাজিয়ে ওঠে: এটা বারোটা চল্লিশ
এক বৃহস্পতিবারের।
দিনের আলোয় নিয়ন এক
বিরাট আনন্দের ব্যাপার, যেমন এডউইন ডেনবি
লিখতেন, ঠিক তেমন দিনের আলোয় জ্বলা বাল্বও।
আমি একটা চিজবার্গার কিনতে থামি ‘জুলিয়েটস
কর্নারে’। জিউলিয়েটা মাসিনা, ফেদেরিকো
ফেলিনির স্ত্রী, এ বেলে আত্রিচে (এক রূপসী অভিনেত্রী)
আর চকলেট মল্টেড। এ রকম এক দিনে
শিয়ালের পশমের পোশাক পরা এক নারী তার পুডল
কুকুরটিকে তুলে দেন একটা ট্যাক্সিতে।
অনেকগুলো পুয়ের্তো
রিকান আজ সড়কে রয়েছেন, যা
এটিকে করে তুলেছে সুন্দর আর উষ্ণ। প্রথমে
বানি মরে গেল, তারপর জন লাতুশ,
তারও পর জ্যাকসন পোলক। কিন্তু পৃথিবী কি
ততটা পরিপূর্ণ যতটা ছিল ওরা বেঁচে থাকতে?
আর একজনের খাওয়া শেষ আর একজন হাঁটছে,
নগ্ন ছবিওয়ালা নানা ম্যাগাজিন এবং
‘বুলফাইট’-এর পোস্টারগুলো পেরিয়ে আর
ম্যানহাটান স্টোরেজ ওয়্যার হাউসটিকেও,
যেটা অচিরেই ওরা খানখান করে দেবে। আমি
একসময় ভাবতাম ওখানেই আর্মারি শো হতো।
এক গ্লাস পেঁপের জুস
আর আবার কাজে ফেরা। আমার হৃদয় আমার
পকেটে রাখা, সেটা পিয়ের রেভার্দির কবিতা সংকলন।
ভেজা শহরের নিঃসঙ্গ এই রাত
দেশের বুদ্ধিশুদ্ধি স্মরণযোগ্য নয়।
বাতাস বইল হু হু—উপড়াল সব গাছ
কিন্তু এই সব উদ্বেগ দাঁড়িয়ে এখনো,
হৃদয়ের স্বনির্বাচিত ব্যথা ও ভয়ের কুঠুরি হয়ে
সবুজ অ্যাপার্টমেন্টের জানালা থেকে
হীরার মতো যা দেখায় ঝলমল
আর বিমানের জানলা থেকে
যেন কোনো মাঠ।
সামান্য নয় তা, নিছক ছিমছাম নয়
যদিও সারি সারি, সংখ্যাত;
আক্ষরিক রঙিনভাবে প্রবাহিত,
আর চুল আঁচড়ানো সেতু দিয়ে,
সব বোঝাপড়া ঝাঁপ দেয়
তারকাখ্যাতি ও আলোয়।
যদি একে ভালোবাসতে পারি, একাই—
সেই গম্ভীর স্বরগুলো,
চাকরির উৎকণ্ঠা,
আমার কাছে তা মিষ্টি।
বাড়ন্ত সবুজ শ্যামলিমা থেকে দূরে,
শুধুই কঠিন পথ
এই দিকে।
আমি কি তবে হয়ে উঠব চরিত্রহীন যেন আমি কোনো স্বর্ণকেশী? নাকি ধার্মিক যেন
আমি ফরাসি?
যতবার আমার হৃদয় ভেঙে যায়, সেটা আমাকে আরও বেশি দুঃসাহসী অনুভব করায় (আর কীভাবে যে
একই নামগুলো ঘুরেফিরে আসতে থাকে সেই ক্লান্তিহীন দীর্ঘ তালিকায়!), কিন্তু এই দিনগুলোর কোনো
একদিন আর কিচ্ছু বাকি থাকবে না, যা নিয়ে সামনে এগোনো যায়।
আমি তোমাকে শেয়ার করব কেন? একঘেয়েমি কাটাতে কেন অন্য কাউকে
সরিয়ে দিচ্ছ না?
আমি পুরুষদের মধ্যে সবচেয়ে কম জটিল। আমার একটাই চাওয়া, সেটা উথালপাতাল প্রেম।
এমনকি গাছেরাও আমাকে বোঝে! হায় খোদা! আমি তো ওদের নিচে শুয়েও থাকি,
থাকি না? আমি ঠিক এক ঝরা পাতার স্তূপ।
যাহোক, গ্রামীণ জীবনের প্রশংসায় আমি নিজেকে কখনোই ভারাক্রান্ত করিনি, না
নস্টালজিয়ায় ভুগেছি মাঠে-ঘাটের বিকৃত কর্মকাণ্ডের কোনো নিষ্কলঙ্ক অতীতের। না। একজন
যতটুকু সবুজের আকাঙ্ক্ষা করে, সেটা পেতে নিউইয়র্কের গণ্ডি ছাড়িয়ে যাওয়ার কোনো দরকার
পড়েনি—আমি একটা ঘাসের ডগাও উপভোগ করতে পারি যদি না জানি নাগালের মধ্যে
একটা সাবওয়ে আছে বা একটা রেকর্ডস্টোর বা এমন কোনো চিহ্ন যে মানুষ এখনো পুরোপুরি
জীবনকে আফসোস করে না। সবচেয়ে কম আন্তরিক জিনিসটাকেও স্বীকার করা অধিক জরুরি মেঘেরা
এমনিতেও যথেষ্ট মনোযোগ পায় আর তারপরও তারা চলতেই থাকে। তারা কি জানে তারা কী হারাচ্ছে? উঁ-হুঁ।
আমার চোখ দুটো অস্পষ্ট নীল, ঠিক আকাশের মতো, আর সব সময়ই পাল্টায় তারা
বাছবিচারহীন অথচ ক্ষণস্থায়ী, ভীষণ সুনির্দিষ্ট আর বিশ্বাসঘাতক, এমন যে কেউ-ই আমাকে
বিশ্বাস করে না। আমি সব সময় অন্যদিকে তাকাই। বা পরে আবার তাকাই কোনো কিছুর
দিকে যেটা আমাকে ছেড়ে দিয়েছে। এটা আমাকে অস্থির করে তোলে আর তা আমাকে অসুখী
করে, কিন্তু আমি তাদের স্থির রাখতে পারি না। যদি আমার চোখগুলো কেবল ধূসর, সবুজ, কালো,
বাদামি, হলুদ হতো, আমি বাসাতেই থাকতাম আর কিছু একটা করতাম। এমন নয় যে আমি খুব
কৌতূহলী। বরং আমি বিরক্ত কিন্তু মনোযোগী হওয়া আমার কর্তব্য, পৃথিবীর ওপর আকাশের থাকাটা
যেমন প্রয়োজন, ঠিক এই সব জিনিসেরও আমাকে প্রয়োজন, আর ইদানীং, তাদের দুশ্চিন্তা এতটাই
বেড়েছে যে আমি নিজের জন্য সামান্যই ঘুম বের করতে পারি।
এখন শুধু একজন মানুষই আছে, যাকে আমার শেভ না করা অবস্থায় চুমু খেতে ভালো লাগে।
বিষমকামিতা! তুমি অনিবার্যভাবে এগিয়ে আসছো। (তাকে নিরুৎসাহিত
করবার সেরা উপায় কী?)
সেন্ট সেরাপিয়ন, আমি তোমার সেই শুভ্রতায় নিজেকে মুড়িয়ে নিই, যা ঠিক
দস্তয়েভস্কির মধ্যরাতের মতো। আমি কীভাবে একজন কিংবদন্তি হয়ে উঠব, প্রিয় আমার? আমি
ভালোবাসার চেষ্টা করেছি, কিন্তু সেটা তোমাকে অন্য কারও বক্ষে আটকে রাখে আর আমি সব সময়
এটা থেকে পদ্মের মতো বেরিয়ে আসি—সব সময় ফেটে বেরিয়ে আসার কী যে তীব্র আনন্দ! (কিন্তু এটা দিয়ে কারও বিক্ষিপ্ত হওয়া উচিত নয়!) অথবা যেন একটা জলজ ফুল, ‘জীবনের ময়লাগুলোকে দূরে রাখার
জন্য,’ হ্যাঁ, সেখানে, হৃৎপিণ্ডের ভেতরেও, যেখানে নোংরা আবর্জনা পাম্প করে ঢোকানো হয় আর প্রবাহিত হয় আর দূষিত করে আর নির্ধারণ করে দেয়। আমি আমার ইচ্ছাকেই চালিত করি, যদিও আমি হয়তো বিখ্যাত হতে পারি ওই বিভাগের একটা রহস্যজনক শূন্যতার জন্য, সে-ই গ্রিনহাউস।
নিজেকে ধ্বংস করে দাও, যদি তুমি না জানো!
সুন্দর হওয়া সহজ তেমন দেখাতে পারাটা কঠিন। আমি তোমাকে প্রশংসা করি,
প্রিয়তম, যে ফাঁদ তুমি পেতেছ সেটার কারণে। এটা যেন এক চূড়ান্ত অধ্যায় কেউ পড়ে না। কারণ,
মূল কাহিনি শেষ হয়ে গেছে।
‘ফ্যানি ব্রাউন পালিয়েছে—অশ্বারোহী বাহিনীর এক করনেটের সঙ্গে ভেগে গেছে, আমি ওই ছোট্ট
ডানপিটে মেয়েটাকে খুব ভালোবাসি, আর আশা করি, হয়তো সে সুখী হতে পারে। যদিও সে আমাকে একটু বেশিই জ্বালিয়েছে তার এই দুঃসাহসিক কীর্তি দিয়ে।—আহা রে পাগলি চেচিনা! বা এফ. বি. যে নামে আমরা ওকে ডাকতাম।—আমি ইচ্ছা করি ও যদি কষে একটা চাবুকের বাড়ি আর ১০,০০০ পাউন্ড পেত।’—মিসেস থ্রাল।
আমাকে এখান থেকে বেরোতেই হবে। আমি একটা শালের টুকরো আর আমার সবচেয়ে নোংরা খাকি
পোশাকটা বেছে নিই। আমি ফিরে আসব, আবার আবির্ভূত হব, পরাজিত হয়ে, উপত্যকা থেকে তুমি আমাকে যেতে দিতে চাও না যেখানে তুমি যাও, তাই আমি যাই যেখানে তুমি চাও না আমি যাই। এখন মাত্র বিকেল, সামনে আরও অনেকটা বাকি। নিচতলায় কোনো চিঠিপত্র থাকবে না। ঘুরে, আমি তালার ভেতর থুতু ছিটাই আর নবটা ঘুরে যায়।