রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান
রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান

মতামত

তুরস্কের এরদোয়ানের কৌশলের ভান্ডার কি ফুরিয়ে আসছে

এপ্রিল মাসে হাঙ্গেরিতে ভিক্টর অরবানের নির্বাচনী পরাজয় বিশ্বকে আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে যে রাজনৈতিক খেলায় নিজের সুবিধামতো নিয়ম বদলে ফেললেও একজন শক্তিমান শাসক শেষ পর্যন্ত হারতে পারেন; এমনকি যখন নির্বাচন পুরোপুরি স্বাধীন বা সুষ্ঠু না-ও হয়।

তুরস্কে রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান রাজনৈতিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করে ভিক্টর অরবানের চেয়েও দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় টিকে আছেন; তাঁর মতো এমন কঠোর ও কৌশলী রাজনৈতিক দক্ষতা খুব কম নেতার মধ্যেই দেখা যায়। টানা ২৩ বছর ক্ষমতায় থাকার পরও তাঁর হাতে এখনো কিছু কৌশল রয়ে গেছে।

গত মাসে তুরস্কের একটি আদালত প্রধান বিরোধী দলকে দুর্বল করে দেয়। তারা দলটির কার্যকর ও জনপ্রিয় নেতাকে সরিয়ে এমন এক সাবেক চেয়ারম্যানকে বসায়, যিনি এরদোয়ানের বিরুদ্ধে বারবার নির্বাচনে হেরে যাওয়ার জন্য পরিচিত। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এটাই কি তাঁর ক্ষমতায় থাকার মেয়াদ আরও বাড়ানোর জন্য যথেষ্ট হবে?

দশকের পর দশক তুরস্কের সামরিক ও বেসামরিক নেতারা মুস্তফা কামাল আতাতুর্কের প্রবর্তিত ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক মডেল অনুসরণ করেছেন। তুরস্কের বড় শহরগুলোতে জাতীয়তাবাদী ও কট্টর ধর্মনিরপেক্ষ অভিজাতদের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত ছিল। কিন্তু ২০০২ সালে এরদোয়ান ও তাঁর দল জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (একে পার্টি), যাদের সমর্থন ছিল অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা ও ধর্মপরায়ণ মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে, তারা আনাতোলিয়ার জনপদকে তুরস্কের রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসে।

এরদোয়ান ১১ বছর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পর ২০১৪ সালে দেশের প্রথম সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হন। এরপর ২০১৭ সালের সাংবিধানিক গণভোটের মাধ্যমে তিনি সংসদ থেকে ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের হাতে কেন্দ্রীভূত করেন। নতুন ক্ষমতাবলে তিনি নতুন আইন করতে, পুরোনো আইন পরিবর্তন করতে, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়োগ দিতে, আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুমোদন করতে এবং দেশের সশস্ত্র বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হন।

দক্ষ রাজনীতিক এরদোয়ান ২০১৮ ও ২০২৩ সালে আবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। বিভিন্ন পর্যবেক্ষক সংস্থা অভিযোগ করে যে তিনি তুরস্কের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া, গণমাধ্যম এবং বিচারব্যবস্থাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

আবারও মনে হচ্ছে এরদোয়ান তাঁর সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রতিদ্বন্দ্বীকে সাময়িকভাবে সরিয়ে দিয়েছেন এবং বিরোধী শিবিরকে বিভক্ত করেছেন। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে; কারণ, তাঁর বিকল্প পথগুলো দ্রুত সংকুচিত হয়ে আসছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থনীতি ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতা, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অক্ষমতা এবং ক্রমবর্ধমান স্বৈরতান্ত্রিক আচরণের কারণে ভোটাররা এরদোয়ান ও তাঁর দলকে প্রত্যাখ্যান করতে শুরু করেছেন। ২০২৪ সালে বিরোধী দল রিপাবলিকান পিপলস পার্টি (সিএইচপি) স্থানীয় নির্বাচনে বড় সাফল্য অর্জন করে। আতাতুর্ক এই পার্টি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং তখন এর নেতৃত্বে ছিলেন। তরুণ ও জনপ্রিয় সিএইচপি নেতা একরেম ইমামোলু ইস্তাম্বুলের মেয়র নির্বাচিত হন, ১৯৯০-এর দশকে যে শহরের মেয়র ছিলেন এরদোয়ান নিজেও।

ইতিহাস বলছে, নিজের দলের জন্য ধাক্কা এলে এরদোয়ান প্রতিদ্বন্দ্বীদের জীবন কঠিন করে তোলেন। অপরাধ তদন্তের নামে শত শত বিরোধী রাজনীতিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যেটাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো ও সিএইচপি। ইমামওগলু, যিনি পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এরদোয়ানের বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নিজেকে প্রস্তুত করছিলেন, তাঁকে ২০২৫ সালে দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযোগগুলোতে তাঁর সম্মিলিত সাজা হতে পারে ২ হাজার ৩০০ বছরের বেশি। এক বছরের বেশি সময় ধরে তিনি বিচার শুরুর অপেক্ষায় কারাগারে আছেন।

বিরোধী দলের ওপর সর্বশেষ বিচারিক আঘাত আসে ২১ মে, যখন একটি আপিল আদালত সিএইচপির অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব নির্বাচনের ফল বাতিল করে দেয়। এই নির্বাচনের মাধ্যমে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা ওজগুর ওজেল দলটির নেতা হয়েছিলেন। আদালত তাঁকে সরিয়ে তাঁর পূর্বসূরি কেমাল কিলিচদারওগলুকে পুনর্বহাল করেন।

৭৭ বছর বয়সী কিলিচদারওগলু সবচেয়ে বেশি পরিচিত ২০১১ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত টানা পাঁচটি সংসদ নির্বাচনে সিএইচপিকে পরাজয়ের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য এবং সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এরদোয়ানের কাছে হেরে যাওয়ার জন্য। আদালতের এই সিদ্ধান্ত আবারও রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। এতে দেশের শেয়ারবাজারে বড় ধস নেমেছে এবং তুরস্কের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।

আবারও মনে হচ্ছে এরদোয়ান তাঁর সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রতিদ্বন্দ্বীকে সাময়িকভাবে সরিয়ে দিয়েছেন এবং বিরোধী শিবিরকে বিভক্ত করেছেন। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে; কারণ, তাঁর বিকল্প পথগুলো দ্রুত সংকুচিত হয়ে আসছে। তুরস্কের বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী একজন প্রেসিডেন্ট দুই মেয়াদের বেশি ক্ষমতায় থাকতে পারেন না। ফলে ২০২৮ সালের নির্বাচনে এরদোয়ানের পুনর্নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই।

দুটি সম্ভাব্য পথ খোলা আছে—তিনি সংবিধান সংশোধনের চেষ্টা করতে পারেন, অথবা আগাম নির্বাচন ডেকে দ্বিতীয় মেয়াদ সংক্ষিপ্ত করে তৃতীয়বার প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ নিতে পারেন। কিন্তু এই দুই পথের কোনোটিই বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা বর্তমানে এরদোয়ান ও একে পার্টির হাতে নেই।

তবু এরদোয়ানের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো স্পষ্ট করে যে তিনি নীরবে রাজনৈতিক মঞ্চ ছাড়ার কোনো পরিকল্পনা করেননি। আপাতত বিরোধীদের নিজেদের পুনর্গঠিত করতে হবে, একক প্রার্থীর পক্ষে ঐক্য গড়ে তুলতে হবে এবং অপেক্ষা করতে হবে—এরদোয়ানের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয় তা দেখার জন্য।

  • ইয়ান ব্রেমার আন্তর্জাতিক রাজনীতিবিষয়ক বিশ্লেষক এবং টাইমের সম্পাদকীয় পরামর্শক

    টাইম থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ।