জন্মনিবন্ধন সনদ তৈরিতে বা এতে ভুল সংশোধন করতে এআই বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এ ধরনের নাগরিক সেবায় এআই–এর ব্যবহার যেমন ভোগান্তি কমাবে, প্রশাসনিক কাজেও আসবে গতি ও স্বচ্ছতা।
জন্মনিবন্ধন সনদ তৈরিতে বা এতে ভুল সংশোধন করতে এআই বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এ ধরনের নাগরিক সেবায় এআই–এর ব্যবহার যেমন ভোগান্তি কমাবে, প্রশাসনিক কাজেও আসবে গতি ও স্বচ্ছতা।

মতামত

এআই যেভাবে ডিজিটাল সেবায় বৈষম্য ও ভোগান্তি ঘুচাতে পারে

২০০৭ সালে সেনাবাহিনী থেকে আমাকে একটা জনমুখী প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হলো। যখনই কোনো সেবাগ্রহীতা সার্ভিস নিতে গিয়ে আটকে যেতেন, তাঁদের অনেকেই আমার কাছে আসতেন। কারণ, ওই এজেন্সির ওয়েবসাইটে আমার মুঠোফোন নম্বরটা দিয়ে রেখেছিলাম নিজেই। আমি নিজেও ‘ওপেন ডোর’ পলিসিতে বিশ্বাসী ছিলাম। ফলে হাজারো মানুষ ফোন করতেন, দেখা করতেন। শুনতাম। বৈধ রাস্তায় দ্রুত কাজ ওঠানোর চেষ্টা করতাম।

৩০ বছর রাষ্ট্রযন্ত্রে থাকার পর একটা জিনিস পরিষ্কার হয়ে গেছে—আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র তার নাগরিককে সেভাবে চেনে না। একজন মানুষ কতটা কষ্টে আছেন, কোথায় তাঁর সাহায্য দরকার, কোন সার্ভিসের জন্য তিনি আসলে যোগ্য—এই সহজ তথ্যগুলো রাষ্ট্রের কাছে নেই। থাকলেও সেটা ছড়িয়ে আছে দশটা আলাদা মন্ত্রণালয়ের দশটা আলাদা ফাইলে। ই-নথি দিয়েও ঠিকমতো আলাপ করা যায় না।

তবে এই সমস্যার সমাধান এখন সম্ভব। কারণ এআই। এই এআইয়ের কারণে রাষ্ট্র, বড় বড় প্রতিষ্ঠান বিশালাকার সফটওয়্যারে লিখতে পারছে।

আর এই এআই নিয়ে পড়ে থাকার পেছনের কারণ এটাই। একটা বিশালাকার অ্যান্ড-টু-অ্যান্ড সফটওয়্যার, যেটা প্রত্যেক নাগরিককে আলাদাভাবে চিনবে। তার আয় জানবে, তার পরিবার জানবে, তার কষ্ট জানবে। কোথায় রাষ্ট্র তাকে সাহায্য করতে পারে, সেটা নিজেই বের করবে। তার ট্যাক্স হিসাব করবে। আর যখন সে সত্যিকারের বিপদে পড়বে—চাকরি নেই, সংসার চলছে না—তখন একটা ‘ন্যূনতম ভাতা’ তার মুঠোফোনে পৌঁছে দেবে। কোনো অফিসে যেতে হবে না। কোনো দালাল লাগবে না। কোনো তদবিরের প্রয়োজন হবে না। রাষ্ট্র হিসেবে আইনি সহযোগিতার কথা আর না–ই বললাম। উদাহরণ হিসেবে, একজন মানুষ মিথ্যা মামলায় পড়লে ওই মানুষটা ছাড়া কেউ জানেন না রাষ্ট্র কতটা বিবেকহীন হতে পারে। অথচ মানুষের সাহায্য ছাড়াই এআই বলে দিতে পারবে মামলাটা মিথ্যা কি না?

এ স্বপ্ন আগে কল্পকাহিনি মনে হতো। এখন আর মনে হবে না। পৃথিবীর বর্তমান ট্রেন্ড হলো সরকারকে ছোট করে আনা, সরকারের খরচ কমিয়ে আনা। এটার সবচেয়ে বড় সুবিধা, সরকার চালাতে যে খরচ, সেটার ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনতে পারবে এই গভর্ন্যান্স টুল। বর্তমান সরকারকে রাষ্ট্রযন্ত্র চালানোর খরচের জন্য বাইরে হাত পাততে হবে না।

৩০ বছর রাষ্ট্রের ভেতরে থেকে এটুকু বুঝেছি—সমস্যা মানুষের নয়, সিস্টেমের। সিস্টেম ঠিক করলে মানুষ এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে। আর এই ‘বিশালাকার’ সিস্টেমটা বানাতে পারবে একমাত্র এআই।

গার্টনার বলছে, ২০২৮ সালের মধ্যে ৮০ শতাংশ গভর্নমেন্ট সার্ভিসে এআই যুক্ত হয়ে যাবে। পারমিট থেকে বেনিফিট—রুটিন কেসের প্রায় সবকিছুই এআই নিজেই ডিসিশন নেবে। মানুষ শুধু এক্সেপশনগুলো দেখবে। মানে মানুষের সঙ্গে মানুষের দেখা হওয়ায় যে দুর্নীতি হয়, সেটা আর থাকবে না। আরও বড় কথা, পার্সোনালাইজড প্রোঅ্যাকটিভ সার্ভিস চলছে বিভিন্ন দেশে। মানে এআই আপনার ডেটা দেখে নিজেই আপনাকে জানাবে, আপনি এই প্রোগ্রামের (বিভিন্ন ভাতা) জন্য যোগ্য, এই ডেডলাইন আসছে, এই সুবিধা আপনার প্রাপ্য। আপনাকে খুঁজতে হবে না, রাষ্ট্র নিজে খুঁজে নেবে।

এই মুহূর্তে পৃথিবীজুড়ে এআই নিয়ে সবচেয়ে বড় আলোচনাটা চাকরি নিয়ে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম বলছে, এআই ৮৫ মিলিয়ন চাকরি সরিয়ে দেবে। নতুন চাকরি আসবে ৯৭ মিলিয়ন, কিন্তু সেগুলোর বেশির ভাগের জন্য দরকার উচ্চশিক্ষা আর ডিজিটাল দক্ষতা। যাঁরা এই ট্রানজিশনে পিছিয়ে পড়বেন, তাঁদের জন্য রাষ্ট্রকে দাঁড়াতে হবে। সেটা করার হাতিয়ার হবে ‘ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম’ বা সর্বজনীন ন্যূনতম ভাতা। মানে তাদের রিস্কিলিং করে দাঁড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।

ফিনল্যান্ড পাইলট প্রজেক্ট করে দেখিয়েছে, বেসিক নিড মিটে গেলে মানুষ কাজ ছেড়ে দেয় না; বরং আরও মানবিক কাজে হাত দেয়। শিল্পকলা, কমিউনিটি সার্ভিস, উদ্যোক্তা হতে সময় দেয়। আলস্য বাড়ে না, মানুষ মুক্ত হয় ইচ্ছেমতো কাজ করার জন্য।

বাংলাদেশের প্রসঙ্গে আসি। আমাদের দেশে এ স্বপ্ন অনেক বড় মনে হতে পারে। কিন্তু আমাদেরই তো নজির আছে। মোবাইল ব্যাংকিং একলাফে পৌঁছে গেছে কোটি মানুষের কাছে। যে মানুষের কোনো দিন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ছিল না, সে এখন মুঠোফোনে লেনদেন করছে। এনআইডি দিয়ে একটা ডিজিটাল আইডেনটিটি তৈরি হয়েছে। ভিত্তিটা আছে। আমি এই জায়গায় লম্বা সময় কাজ করে দেখেছি, এটা সম্ভব। শুধু দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

ডেটা আছে, দরকার শুধু একটা সংযুক্ত সিস্টেম। ট্যাক্স ডেটা, স্বাস্থ্য ডেটা, ভূমি ডেটা, সামাজিক সুরক্ষার ডেটা—এগুলো এক জায়গায় আনা। তারপর এআই দিয়ে প্রত্যেক মানুষের একটা প্রোফাইল তৈরি করা। কে কতটা ভালনারেবল, কার কী দরকার—এটা রাষ্ট্র নিজে বুঝবে। এটার একটা অংশ করা আছে সিভিল রেজিস্ট্রেশন এবং ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকসের ডেটাবেজে। দরকার একজন আর্কিটেক্ট।

আমি জানি এখানে প্রশ্ন উঠবে। প্রাইভেসি কী হবে? ডেটা কে নিয়ন্ত্রণ করবে? সরকার কি এই ক্ষমতার অপব্যবহার করবে না?

একজন হাওরের কৃষক আর ঢাকার একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা—দুজনেই এই রাষ্ট্রের নাগরিক। কিন্তু রাষ্ট্রের সুবিধা কে বেশি পাচ্ছে, সেটা আমরা সবাই জানি। এআই দিয়ে সেই ভারসাম্য আনা সম্ভব। কারণ, এআই কাউকে চেনে না, কারও সঙ্গে আত্মীয়তা নেই, কারও তদবিরে কাজ করে না। ডেটা দেখে ডিসিশন নেয়। সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে, যখন সরকারের কাছে টাকা নেই, তখন এটা সরকারের অপারেটিং খরচ কমিয়ে আনবে অর্ধেকে।

এই প্রশ্নগুলো ফেলে দেওয়ার না। কিন্তু প্রশ্নের ভয়ে এগোনো বন্ধ করলে চলবে না। এটার সমাধান আছে। একটা না, অনেকগুলো প্রযুক্তিগত সমাধান আছে। এ ছাড়া এস্তোনিয়াসহ বেশ কিছু দেশ এটা করেছে। তাদের নাগরিকেরা ঘরে বসে ভোট দিতে পারে, ট্যাক্স দেয়, সন্তানের নাম রেজিস্ট্রেশন করে। পুরোটা ডিজিটাল, পুরোটাই সংযুক্ত। এস্তোনিয়া পারলে বাংলাদেশ পারবে না কেন? আর আমরা কি করব, সেটা নিয়ে আলাপটা শুরু করতে হবে। এখন চাকা নতুনভাবে তৈরি করার সময় নেই।

রাষ্ট্রযন্ত্রকে দক্ষ করার এ স্বপ্ন আমার কাছে শুধু প্রযুক্তির আলোচনা নয়; এটা ন্যায্যতার আলোচনা। একজন হাওরের কৃষক আর ঢাকার একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা—দুজনেই এই রাষ্ট্রের নাগরিক। কিন্তু রাষ্ট্রের সুবিধা কে বেশি পাচ্ছে, সেটা আমরা সবাই জানি। এআই দিয়ে সেই ভারসাম্য আনা সম্ভব। কারণ, এআই কাউকে চেনে না, কারও সঙ্গে আত্মীয়তা নেই, কারও তদবিরে কাজ করে না। ডেটা দেখে ডিসিশন নেয়। সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে, যখন সরকারের কাছে টাকা নেই, তখন এটা সরকারের অপারেটিং খরচ কমিয়ে আনবে অর্ধেকে।

৩০ বছর রাষ্ট্রের ভেতরে থেকে এটুকু বুঝেছি—সমস্যা মানুষের নয়, সিস্টেমের। সিস্টেম ঠিক করলে মানুষ এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে। আর এই ‘বিশালাকার’ সিস্টেমটা বানাতে পারবে একমাত্র এআই।

সে কারণেই হয়তোবা সারা দিন এআই নিয়ে পড়ে থাকি।

  • রকিবুল হাসান টেলিকম, অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক লেখক

    মতামত লেখকের নিজস্ব