অভিমত–বিশ্লেষণ

তিস্তা প্রকল্প কি ভূরাজনৈতিক খেলায় পরিণত হচ্ছে

তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ভারত ও চীনের ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের সম্মুখীন হয়েছে। সম্প্রতি এ প্রকল্প নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রেরও কিছু আগ্রহ দৃশ্যমান হয়েছে। তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্প কীভাবে ভূরাজনৈতিক খেলায় পরিণত হয়েছে এবং এর ক্ষতিকর প্রভাব কীভাবে এড়ানো যায়, তা নিয়ে দুই পর্বে লিখেছেন নজরুল ইসলাম। আজ প্রকাশিত হলো প্রথম পর্ব

বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন সস্ত্রীক গত ৩০ আগস্ট লালমনিরহাট ও নীলফামারীতে অবস্থিত তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্প পরিদর্শন করেছেন। ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের ঊর্ধ্বতন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কর্মকর্তারাও এই দলে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। রাজধানী থেকে সুদূর তিস্তা এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের সফর স্বাভাবিকভাবেই জনগণের মনে কৌতূহলের উদ্রেক করেছে।

রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসেনের পরিদর্শন তিস্তা ব্যারাজে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি সে এলাকার বিভিন্ন অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানও ঘুরে দেখেন। এর মধ্যে ছিল রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলায় প্যারাগন গ্রুপের প্যারাগন ডেইরি, পঞ্চগড়ে গ্রিন ফিল্ড টি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড এবং পার্বতীপুরে দেশের কেন্দ্রীয় ও বৃহত্তম রেলওয়ে কারখানা।

তিস্তা সফর এবং সাম্প্রতিক বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যচুক্তি 

বিজ্ঞজনদের অনেকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং অন্য পদস্থ কর্মকর্তাদের তিস্তা এলাকা সফরের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্প্রতি (৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে) স্বাক্ষরিত বাণিজ্যচুক্তির সম্পর্ক দেখছেন।

বহুল আলোচিত এ চুক্তির একটি সাধারণ প্রয়াস হলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য বাজারের সম্প্রসারণ। তার মধ্যে দুগ্ধজাত পণ্যের কথা এ চুক্তিতে উল্লেখিত হয়েছে। তবে এ বাজার শুধু পণ্যের নয়, বিভিন্ন ধরনের সেবার জন্যও প্রযোজ্য। নির্মাণকাজের ঠিকাদারি তার অন্যতম।

এ ক্ষেত্রে সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়িত বিরাট বাজেটসম্পন্ন প্রকল্পের ঠিকাদারির কাজ বিশেষভাবে আকর্ষণীয়। এসব কাজ যাতে মার্কিন কোম্পানিগুলোও পেতে পারে, তার প্রতি এ বাণিজ্যচুক্তিতে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে জোর দেওয়া হয়েছে।

স্বাভাবিকভাবেই এ প্রসঙ্গে তিস্তা প্রকল্পের কথা না এসে পারে না। বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যচুক্তির আলোকে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা বাজেটের এ প্রকল্প নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যদি আগ্রহী হয়, তাহলে তা বিস্ময়ের কিছু হবে না। কিন্তু তিস্তা প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ভারত-চীন ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের সম্মুখীন হয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশ নিঃসন্দেহে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করবে। প্রশ্ন হলো, জটিল এ পরিস্থিতি বাংলাদেশ কীভাবে সামাল দিতে পারবে?

তিস্তা এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের সফর। ৩০ আগস্ট ২০২৬

তিস্তা নদী, ব্যারাজ ও সংকট

বিষয়টি বোঝার জন্য প্রথমেই তিস্তা নদী ও প্রকল্প সম্পর্কে কিছু তথ্য জানা থাকা দরকার। বাংলাদেশের চতুর্থ বৃহত্তম নদী তিস্তা হিমালয়ের পাদদেশে ভারতের সিকিম রাজ্যে উৎপত্তি হয়ে পশ্চিমবঙ্গ অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করে এবং কুড়িগ্রামের চিলমারীর কাছে যমুনার সঙ্গে মিলিত হয়।

হিমালয়ের কাছে হওয়ায় এই নদী খরস্রোতা (ঢাল বেশি), হড়কা প্রবাহপ্রবণ, ঋতুভেদসম্পন্ন ও পলিবাহী। পলিবাহী ও ঋতুভেদসম্পন্ন নদী সাধারণত বিনুনি চরিত্রের হয়। কারণ, স্বল্প প্রবাহের ঋতুকালে পলিপতনের ফলে চর পড়ে এবং নদী তখন চরের আশপাশ দিয়ে বহু খাতে বিভক্ত হয়ে প্রবাহিত হয়। সে জন্য প্রবাহের তুলনায় বিনুনি নদী বেশি প্রশস্ত হয়।

নদ–নদীর প্রতি বাণিজ্যিক পন্থা অনুসরণে ভারত পাহাড়ি তিস্তার জলবিদ্যুৎ–সম্ভাবনা ব্যবহারের জন্য সিকিমে তিস্তা এবং এর বিভিন্ন উপনদীর ওপর বহু বাঁধ নির্মাণ করে। এদিকে বাংলাদেশের পানি কর্তৃপক্ষ তিস্তার মধ্যে সেচের সম্ভাবনা দেখে এবং তা বাস্তবায়নের জন্য তিস্তার ওপর ব্যারাজ নির্মাণের কথা ভাবে।

বাংলাদেশের পানি কর্তৃপক্ষ আমাদের এসব সমালোচনা দ্বারা রুষ্ট হয়েছিল। কারণ, তাদের ইচ্ছা ছিল যথাশিগগির সম্ভব প্রকল্প অনুমোদিত করা এবং এর বাস্তবায়নে অগ্রসর হওয়া। এ প্রকল্প সত্যিই তিস্তার সমস্যার সমাধান করবে কি না, তা নিয়ে আপাতদৃষ্টিতে তারা তেমন ভাবিত ছিল না।

ভারতের কর্তৃপক্ষও তিস্তার পানি ব্যবহার করে পশ্চিমবঙ্গে সেচ সম্প্রসারণে আগ্রহী হয় এবং সেই লক্ষ্যে ১৯৮৭ সালের মধ্যেই গজলডোবা ব্যারাজ নির্মাণ সম্পন্ন করে। বাংলাদেশ ব্যারাজের চিন্তাটি ভারতের আগে শুরু করলেও বাস্তবায়নে পিছিয়ে পড়ে এবং ১৯৯০ সালে ডালিয়াতে ব্যারাজ নির্মাণ সম্পন্ন করে।

কিন্তু ভারত থেকে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার কতটা প্রবাহ পাওয়া যাবে, সে বিষয়ে কোনো চুক্তি ও নিশ্চয়তা ছাড়াই ডালিয়াতে ব্যারাজ নির্মাণ বাংলাদেশের জন্য খুব একটা সুবুদ্ধির পরিচায়ক হয় না; কারণ, উজান অবস্থানের সুযোগ নিয়ে ভারত ক্রমে সেচ এলাকা ও তিস্তা থেকে অপসারিত পানির পরিমাণ বৃদ্ধি করতে থাকে। ফলে ডালিয়া ব্যারাজের উদ্দেশ্য বহুলাংশে ভন্ডুল হয়ে যায় এবং এ ব্যারাজ বাংলাদেশের জন্য বরং একটি সমস্যায় পরিণত হয়।

প্রথমত, শুষ্ক মৌসুমে সেচের জন্য নদীতে পর্যাপ্ত পানি থাকে না। দ্বিতীয়ত, সামান্য যেটুকু পানি পৌঁছায়, সেটুকুও যদি ডালিয়া ব্যারাজ দ্বারা অপসারিত হয়, তাহলে ডালিয়া থেকে চিলমারী পর্যন্ত ১০২ কিলোমিটার দীর্ঘ বাংলাদেশে তিস্তার মূল অংশে কোনো পানি থাকে না।

তৃতীয়ত, বর্ষাকালে ও হড়কা প্রবাহের সময় ভারত সম্ভাব্য বন্যা এড়ানোর জন্য গজলডোবা ব্যারাজের সব কপাট খুলে দেয় এবং বাংলাদেশও ডালিয়া ব্যারাজের উজানে বন্যা এড়ানোর জন্য সব কপাট খুলে দেয়। তখন বিশাল জলরাশি ভাটির দিকে ধেয়ে আসে এবং বন্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

চতুর্থত, এর সঙ্গে যোগ হয় আরেক সমস্যা। শুষ্ক মৌসুমে পানি না থাকার কারণে বাংলাদেশে তিস্তার তলদেশ শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়, বহু চর পড়ে, নদী অগভীর হয়। ফলে এই নদী বর্ষাকালের পানি ধারণ করতে পারে না; বরং নুড়ি ও বালুময় পাড় ভেঙে প্রশস্ত হয়। এভাবেই তিস্তার প্রশস্ততা আগের তুলনায় গড়ে প্রায় তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ৩ দশমিক ১ কিলোমিটারে পৌঁছেছে। হাজার হাজার পরিবার নিঃস্ব হয়েছে। তারা উদ্বাস্তু হয়ে কেউ ঢাকার বস্তিতে ঠাঁই নিয়েছে, কেউ চরে গিয়ে শূন্য থেকে জীবন শুরু করায় সচেষ্ট হয়েছে।

পাওয়ারচায়নার তিস্তা প্রকল্পের নানা সমস্যা 

বাংলাদেশের পানি কর্তৃপক্ষেরই দায়িত্ব ছিল তিস্তার এ মনুষ্যসৃষ্ট সংকটের সমাধান খুঁজে পাওয়া এবং বাস্তবায়ন করা। কিন্তু তারা সেই পারঙ্গমতা দেখাতে পারে না, বরং বিদেশের স্মরণাপন্ন হয়। এভাবেই তিস্তাবিষয়ক পাওয়ারচায়না কোম্পানির প্রকল্পের উদ্ভব ঘটে। পাওয়ারচায়না এ প্রকল্পের জন্য চীনের এক্সিম ব্যাংকের কাছ থেকে বাণিজ্যিক শর্তে প্রায় এক বিলিয়ন ডলারের ঋণেরও বন্দোবস্ত করে।

সন্দেহ নেই, প্রযুক্তির বিভিন্ন ক্ষেত্রে চীন এখন পৃথিবীর সবচেয়ে অগ্রসর দেশ। বিশেষত নদীর ওপর সেতু, বাঁধ ও ব্যারাজ নির্মাণে তাদের পারদর্শিতা অনস্বীকার্য। কিন্তু বাংলাদেশের নদ–নদীর চরিত্র চীনের নদ–নদী থেকে খুবই ভিন্ন।

ফলে তিস্তা নদীর স্বকীয়তা অনুধাবন করা এবং তার ভিত্তিতে কার্যকর সমাধানে উপনীত হওয়া চীনা বিশেষজ্ঞদের পক্ষেও কঠিন হয়। সূচনায় (২০১৯ সালের বাস্তবায়ন সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনুযায়ী) তাদের প্রস্তাবিত প্রকল্পের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো ছিল নিম্নরূপ:

১. তিস্তা নদীর বিনুনি চরিত্র অস্বীকার করে এটিকে এক খাতবিশিষ্ট (সর্পিল) নদীতে রূপান্তর করা;

২. এ নদীর গড় প্রশস্ততা এক লাফে বর্তমানের প্রায় ৩ কিলোমিটার থেকে ৮১৬ মিটারে (ডালিয়া থেকে কাউনিয়া পর্যন্ত ৭০০ মিটার এবং কাউনিয়া থেকে চিলমারী পর্যন্ত ১ কিলোমিটারে) হ্রাস;

৩. খনন করে নদীর গভীরতা ৫ মিটার থেকে ১০ মিটারে বর্ধিত করা;

৪. খননকৃত মাটি দিয়ে নদীগর্ভের বাকি অংশ ভরাট করে নগরায়ণ, শিল্পায়ন ইত্যাদির জন্য ব্যবহার;

৫. ডালিয়া থেকে চিলমারী পর্যন্ত পুরো তিস্তার দুপাশে বাঁধ নির্মাণ করে তিস্তার বর্ষাকালীন প্রবাহকে ৮১৬ মিটার প্রশস্ত খাতে সীমাবদ্ধ রাখা এবং

৬. এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তিস্তাকে সব শাখা ও উপনদী থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন করে ফেলা এবং এগুলোর তীরেও বাঁধ নির্মাণ করা।

ভারতের পানি প্রত্যাহারে শুকনো মৌসুমে তিস্তা নদী

বাপা, বেন ও তিস্তা রক্ষা আন্দোলনের পক্ষ থেকে আমি এবং যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্বের অধ্যাপক ড. খালেকুজ্জামান পাওয়ারচায়নার এ প্রকল্পের ডিজাইন ঘনিষ্ঠভাবে পর্যালোচনা করে দেখি যে এটা বিভিন্ন কারণেই অবাস্তব। প্রথমত, প্রাকৃতিক কারণে যে নদী বিনুনি চরিত্রসম্পন্ন, সেটাকে বলপূর্বক এক খাতবিশিষ্ট নদীতে রূপান্তর করা সম্ভব নয়; যদিও-বা সব প্রকৌশলী শক্তিমত্তা ব্যবহার করে সেটা করা হয়, প্রকৃতিবিরুদ্ধ এ রূপান্তর স্থায়িত্বশীল হবে না এবং দ্রুতই নদী তার আদি বিনুনি চরিত্র ফিরে পাওয়ায় সচেষ্ট হবে।

দ্বিতীয়ত, সংকুচিত তিস্তার পাড় ও তীরে নির্মিত বাঁধ—উভয়ই ভাঙনের সম্মুখীন হবে এবং বাঁধের বাইরে নদী ভরাট করে যে শহর ও শিল্পকারখানা নির্মিত হবে, সেগুলো প্লাবিত হবে।

তৃতীয়ত, তিস্তা নদী দিয়ে প্রতিবছর যে প্রায় চার কোটি টন পলিবালু প্রবাহিত হয়, তা তলদেশে জমা হয়ে খননের মাধ্যমে তিস্তার গভীরতা বৃদ্ধিকে অচিরেই নাকচ করে দেবে এবং তার ফলে তিস্তার বর্ষাকালীন পানি ধারণক্ষমতা আরও হ্রাস পাবে। সব মিলিয়ে পাওয়ারচায়নার সমগ্র প্রকল্প ভন্ডুল হয়ে যাবে এবং তিস্তার সমস্যা আরও জটিল হবে। (এসব বিষয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনার জন্য দ্রষ্টব্য সংকটে তিস্তা নদী–সমাধান কোন পথে শীর্ষক পুস্তিকা)

বাংলাদেশের পানি কর্তৃপক্ষ আমাদের এসব সমালোচনা দ্বারা রুষ্ট হয়েছিল। কারণ, তাদের ইচ্ছা ছিল যথাশিগগির সম্ভব প্রকল্প অনুমোদিত করা এবং এর বাস্তবায়নে অগ্রসর হওয়া। এ প্রকল্প সত্যিই তিস্তার সমস্যার সমাধান করবে কি না, তা নিয়ে আপাতদৃষ্টিতে তারা তেমন ভাবিত ছিল না।

তিস্তাপারের কিছু লোকজনও অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। তাঁদের মনে হয়েছিল, তিস্তা সমস্যার সমাধানে পথে আমরা অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছি। অবশ্য এ জন্য তাদের তেমন দোষ দেওয়া যায় না। কারণ, বিগত সরকার তিস্তা প্রকল্প নিয়ে চরম গোপনীয়তা অবলম্বন করছিল। ফলে এ প্রকল্পের বিস্তারিত ডিজাইন সম্পর্কে তাদের পরিষ্কার ধারণা ছিল না এবং এ প্রকল্পের সঠিকতা সম্পর্কে সুচিন্তিত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব ছিল না।

তবে প্রতীয়মান হয় যে চীনের বিশেষজ্ঞদের পক্ষে আমাদের বিশ্লেষণ উপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না। ফলে তাঁরা ২০২৩ সালে প্রকল্পের একটি সংশোধিত ডিজাইন হাজির করেন। এ ডিজাইনে তিস্তাকে বিনুনি নদী থেকে এক খাতবিশিষ্ট নদীতে রূপান্তরের এবং গড় প্রশস্ততা ৮১৬ মিটারে হ্রাসের লক্ষ্য বজায় রাখা হয়। কিন্তু কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়।

রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার বালাপাড়া ইউনিয়নে তিস্তার ভাঙন।

প্রথমত, নদীর তীরবর্তী বাঁধগুলো নদীখাত বরাবর না করে বরং নদীখাত থেকে গড়ে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে নির্মাণের প্রস্তাব করা হয় (দুই তীরের বাঁধের মধ্যে গড় দূরত্ব ২.৮ কিলোমিটার)।

দ্বিতীয়ত, নদীকে খননের মারফত ১০ মিটার গভীর করার লক্ষ্য পরিত্যাগ করে নদীর তলদেশের জন্য এক জটিল প্রোফাইল প্রস্তাব করা হয়। এসব পরিবর্তন আরও নতুন সমস্যার উদ্রেক করে। যেমন বাঁধ যদি নদীখাত থেকে গড়ে এক কিলোমিটার দূরে হয় এবং বাঁধের ভেতরের এলাকা যদি দ্বিবার্ষিক প্লাবনের অধীন হয়, তাহলে সেখানে নগরায়ণ ও শিল্পায়ন কীভাবে সম্ভব? নদীখাতের প্রশস্ততা যদি ৮১৬ মিটার থেকে যায়, তাহলে পাড়ভাঙন থেকে এগুলো রক্ষা পাবে কীভাবে?

তৃতীয়ত, সংকীর্ণ খাড়া গিরিখাতসম্পন্ন নদীর তলদেশের ডিজাইন বার্ষিক চার কোটি টন পলিবালুর প্রবাহের সম্মুখে টিকে থাকবে কী করে? ২০২৫ সালের ১৭ জুলাই পানি ভবনে অনুষ্ঠিত এক সভায় বাপা, বেন ও তিস্তা রক্ষা আন্দোলনের পক্ষ থেকে পাওয়ার-চায়নার সংশোধিত প্রকল্প নিয়ে এসব প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়। পাওয়ারচায়না তার সদুত্তর দিতে পারেনি।

তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ভারত-চীন টানাপোড়েন 

পাওয়ারচায়নার তিস্তা প্রকল্পের কারিগরি সমস্যা নিয়ে যখন এসব আলোচনা চলছিল, তার মধ্যেই এ প্রকল্প নিয়ে ভারত-চীনের ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন প্রকাশ্য হয়ে পড়ে।

বিভিন্ন সূত্রমতে, ভারত তার পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্যে প্রবেশের সংকীর্ণ পথের এত কাছে চীনাদের এ প্রকল্প নিয়ে অস্বস্তি বোধ করে এবং বাংলাদেশের কাছে নিজেই এ প্রকল্প বাস্তবায়ন ও অর্থায়ন করার প্রস্তাব দেয়। ভারতের এ প্রস্তাব তদানীন্তন আওয়ামী লীগ সরকারকে বিপাকে ফেলে; যদিও ভারতের কাছ থেকে তিস্তা চুক্তির বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া না পেয়েই এ সরকার চীনের দিকে ঝুঁকেছিল। কিন্তু ভারতের এ প্রস্তাবকে উপেক্ষা করা তার পক্ষে কঠিন ছিল।

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর এই মতপরিবর্তন চীনকে রুষ্ট করে এবং ২০২৪ সালে তাঁর সফরকালে চীন তা জানিয়ে দেয়। এভাবেই তিস্তা প্রকল্প ভূরাজনীতির বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এ প্রকল্পে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশের আগ্রহ নিঃসন্দেহে পরিস্থিতি আরও জটিল করবে। এখন প্রশ্ন হলো, ভূরাজনীতির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বাংলাদেশ কীভাবে তিস্তা সমস্যার সমাধান করতে পারে?

  • নজরুল ইসলাম এশীয় প্রবৃদ্ধি গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও জাতিসংঘের উন্নয়ন গবেষণার সাবেক প্রধান

    মতামত লেখকের নিজস্ব