গ্রাফিক্স: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি
গ্রাফিক্স: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি

বিশ্লেষণ

গোল্লাছুট, জব্বারের বলী, ডাংগুলি ও গিলা খেলার মেধাসম্পদ অধিকার সুরক্ষা কেন জরুরি

লোকজ গ্রামীণ খেলার মেধাসম্পদ সুরক্ষা ও অধিকার নিয়ে লিখেছেন পাভেল পার্থ

‘পাতা-পলান্তি’ নামে একটা খেলা ছিল আমাদের শৈশবে। একেকজনকে একেক গাছের পাতা এনে মাটির তলায় লুকাতে হতো। তারপর সবাই এক এক করে ছড়া কেটে যে গাছের নাম বলত, আরেকজনকে লুকানো সেই পাতাটি খুঁজে বের করতে হতো। এই খেলার অবদান আমার জীবনে কতটুকু জানি না। তবে আতাফল, শরিফা, গোলাপজাম, ভুবি, মেরা, দইপাতা, দণ্ডকলস, বিলিম্বি, কালোকেশী, ধুতরা কিংবা বিদ্যাপাতার মতো গাছ চিনেছিলাম সেই তখনই।

গোল্লাছুট, বৌচি, ডাংগুলি, দাড়িয়াবান্ধা, চি-কুতকুত, ষোলোগুটি, সুই চোর, বাঘাডুলি, লারেলাপ্পা, সাত চাড়া, লাটিম, কড়ি, ফুলটোকা, কইল্যা, কানামাছি, এক্কাদোক্কা, গাইগোদানি, মোরগ লড়াই, বরফ পানি, বাঘ বাঘ, টোপাভাতি, পলাপলি, নুনতা, এলাটিং বেলাটিং, আগডুম বাগডুম, ওপেনটি বায়োস্কোপ, এলোনা বেলোনার মতো খেলা ছিল পাহাড়-সমতলের চারধারজুড়ে। স্থানীয় প্রাণপ্রকৃতি এবং গ্রামীণ সমাজকাঠামো পাঠের এক দুর্বিনীত সামষ্টিক অনুশীলন এসব লোকজ খেলা। কেবল শারীরিক ও মানসিক সুস্বাস্থ্যের উপহার নয়, বরং প্রকৃতি ও প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্বশীল হতে শেখায় এসব খেলা। কিন্তু নিদারুণভাবে আজ দেশ থেকে পাখি, মাছ, গাছ, খেলার মাঠ, উদ্যান, নদী বা পাহাড়ের মতোই নিখোঁজ হয়েছে গ্রামীণ লোকজ খেলার জগৎ।

একবার সুনামগঞ্জের ছায়ার হাওরে গিয়ে একটা খেলা দেখলাম ‘বট্টইসা বটের গাইল’। গচি, রাতা, টেপি ধান কাটার পর বিস্তার জমিনে শিশুরা খেলছে আর কৃষিকাজের পর্বগুলো মনে করছে। রাজশাহীর মোহনপুরে কডা আদিবাসী গ্রামের শিশুরা একবার দেখি খেলছে ‘ককরকলা-ককরকলা-ঠান্ডা-ঠান্ডা’, কোকাকোলায়নের ক্ষমতাকে পাঠ করছে শিশুরা। পাহাড়ে গিয়ে চাকমা শিশুদের গিলেহারা কিংবা নাদেংহারা দেখে বুঝতে পেরেছি প্রতিটি খেলার জন্য গাছপালা ও প্রাণজগতের সুরক্ষা কত দরকারি। কত বিচিত্র নাম ও ধরনের লোকজ খেলা যে আছে এই ভূগোলে কে জানে!

গ্রামীণ লোকজ খেলার কোনো জাতীয় রেজিস্টার আমাদের নেই। সংস্কৃতি বা ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কিংবা বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কেউই এই দায়িত্ব নেয়নি। এ নিয়ে রাষ্ট্রীয় আয়োজন, প্রণোদনা কিংবা গবেষণা অতি সামান্য। তা–ও আবার বাইনারি, বর্ণবাদ ও উপনিবেশিকতার ছলে পরিবেশিত। গ্রামীণ খেলার শক্তি ও বহুমাত্রিক সম্পর্ক কিংবা প্রান্তিকতার কারণ অনুসন্ধান নয়; বরং অধিকাংশ সময় এসব খেলাকে ‘দুর্বল’, ‘শিশু বিনোদন’ এবং ‘অপর সংস্কৃতি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। ড. নজরুল ইসলামের ‘বাংলাদেশের লোকজ খেলাধুলা (২০০২)’, হুমায়ূন রহমানের ‘বাংলাদেশের গ্রামীণ খেলাধুলা (২০১৫)’ কিংবা ওয়াহিদ আল হাসানের ‘ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ খেলা (২০২৩)’ শিরোনামে কিছু বই আছে।

নয়া উদারবাদী ক্রীড়া–বাণিজ্যের ময়দানে লোকজ খেলাগুলো ক্রমেই সর্বপ্রান্তিক হয়েছে। তাই এসবের মেধাসম্পদ অধিকার ও সুরক্ষা বিষয়েও কোনো পাবলিক আলাপ বা রাষ্ট্রীয় তৎপরতা গড়ে ওঠেনি। ২০০০ সালে জাতিসংঘের ‘বিশ্ব মেধাসম্পদ সংস্থা (ডব্লিউআইপিও)’ ২৬ এপ্রিলকে ‘বিশ্ব মেধাসম্পদ অধিকার দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। ২০২৬ সালের মেধাসম্পদ দিবসের প্রতিপাদ্য ‘খেলা ও মেধাসম্পদ’। ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ বিশ্ব মেধাসম্পদ সংস্থার সদস্য হলেও দেশের হারানো ও ক্ষয়িষ্ণু লোকজ ক্রীড়াজগতের মেধাসম্পদ অধিকার প্রতিষ্ঠায় তৎপর হয়নি এখনো। নেই কোনো সুরক্ষা নীতিমালা। এমনকি জাতিসংঘের ‘স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি)’ ১৭টি লক্ষ্য অর্জন করতেও খেলাধুলাসহ সব প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক প্রবাহের মেধাসম্পদ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। 

খেলাধুলার সঙ্গে মেধাসম্পদের কী সম্পর্ক

গ্রামীণ খেলাধুলাগুলো সৃজনশীল সামাজিক সাংস্কৃতিক সৃষ্টিময়তার অংশ। প্রতিটি খেলার বিন্যাস, কারিগরি, ধরন, উপস্থাপন এবং এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নানা প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক সরঞ্জাম গুরুত্বপূর্ণ মেধাসম্পদ এবং বিমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য (ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ)। সমতল থেকে পাহাড় গ্রামবাংলার মানুষ কখনোই প্রাণসত্তা থেকে জ্ঞানপ্রবাহ কোনো কিছুর স্বত্ব বা মালিকানা দাবি করেনি। মেধাকে ঘিরে স্বত্ব ও মালিকানার এই তর্ক মূলত উপনিবেশিক ক্ষমতা ও করপোরেট বাণিজ্য সম্প্রসারণের সঙ্গে জড়িত।

মেধাসম্পদ অধিকার প্রশ্নে আজ আমাদেরও লড়তে হচ্ছে। দেখা যায়, গ্রামীণ লোকজ খেলার মেধাসম্পদের সুরক্ষা না দিয়ে বহু কোম্পানি কি এজেন্সি একতরফাভাবে ক্রীড়াজগতের মালিকানা দখল করছে। কিংবা গ্রামীণ জনগণের সম্মতি ছাড়া এবং কোনো লভ্যাংশ বিনিময় না করে বহু গ্রামীণ খেলাকে ঘিরে মুনাফার বাণিজ্য করছে। নিম, হলুদ, বাসমতী চালের একতরফা পেটেন্ট নিয়ে যেমন বৈশ্বিক তর্ক আছে, লোকজ খেলাধুলার মেধাসম্পদ প্রশ্নেও আজ ঘূর্ণন শুরু করেছে অধিকারের লাটিম।

ফুটবল, ক্রিকেট, বাস্কেটবল, আইস স্কেটিং বা টেবিল টেনিস আজ শুধু খেলা নয়। বাণিজ্যিক বিশ্বায়ন, মুনাফা অর্থনীতি এবং ক্ষমতা রাজনীতির আলোচিত ময়দান। তাই এসব খেলা সম্পর্কিত উপকরণ, পণ্য, নকশা, আয়োজন এবং প্রচারণা আজ প্রবলভাবে মেধাসম্পদ সুরক্ষা প্রশ্নে মরিয়া। কোনো জুতার নকশা, ইভেন্ট লোগো কিংবা কোনো খেলার স্মরণীয় মুহূর্তের প্রচার ভিন্নভাবে ঘটলেই পেটেন্ট, ট্রেডমার্ক কিংবা কপিরাইটের তর্কগুলো সামনে আসছে।

ডব্লিউআইপিওর ক্রীড়া–সংক্রান্ত মেধাসম্পদ গাইডলাইন (২০২২) জানায়, ক্রীড়া খাতে উদ্ভাবন, ব্র্যান্ডিং ও বাণিজ্যিক মূল্য নিশ্চিত করতে মেধাসম্পদ ভূমিকা রাখে। খেলার দল, লিগ বা ইভেন্টের লোগো, নাম ও মাসকট ট্রেডমার্কের মাধ্যমে সুরক্ষিত থাকলে স্পনসরশিপ থেকে আয় বাড়ে। খেলাধুলার সম্প্রচারের মেধাসম্পদ কপিরাইট এবং কোনো নতুন উদ্ভাবন পেটেন্টের মাধ্যমে সুরক্ষিত হলে মুনাফা বেশি হয়।

বাংলাদেশের বিখ্যাত হাডুডু, বলী, বাইচ বা গিলা খেলোয়াড়দের নাম, ভঙ্গি বা অভিব্যক্তির মেধাসম্পদ কীভাবে সুরক্ষিত হবে? এসব খেলার সামগ্রিক পরিসরের মেধাসম্পদ সুরক্ষায় অবশ্যই সামাজিক মালিকানা ও সিদ্ধান্তের সংস্কৃতিকে স্বীকৃতি দিতে হবে। 

লোকজ খেলা, বহুজাতিক ছিনতাই ও ‘অপরায়ণ’

আদিবাসী ও গ্রামীণ জনগণের বহু খেলা তাদের আধ্যাত্মিক পবিত্র পরিবেশনা কৃত্য। এসবের কোনো একক পেটেন্ট মালিকানা হয় না। কিন্তু বিশ্বব্যাপী এই বার্তাকে চুরমার করে লোকজ খেলার একতরফা বাণিজ্যিকীকরণ ঘটছে, যেখানে নিশ্চুপ থাকছে লোকায়ত মেধাসম্পদ অধিকার প্রশ্ন। মারমাদের বর্ষবিদায় ও বরণের সাংগ্রাই উৎসবের জনপ্রিয় আয়োজন ‘মৈতা রিলং পোয়ে বা মৈত্রী পানিবর্ষণ’। সমুদ্র উপকূলের রাখাইনরাও এমন আয়োজন করে। বাঙালিরা এর নাম চাপিয়েছে ‘পানি খেলা’ বা ‘জলকেলি’। বাঙালি জাত্যভিমানের অপরায়ণের আয়নায় মৈতা রিলং পোয়ের পবিত্র সামাজিক ও আধ্যাত্মিক শক্তি আড়াল হয়ে যাচ্ছে। এই ‘খেলার’ ছবি, ভিডিও বা পর্যটনের মাধ্যমে এর বাণিজ্যিক ব্যবহার জনগোষ্ঠীর প্রথাগত মেধাসম্পদ অধিকার লঙ্ঘন করছে।

নিউজিল্যান্ডের মাওরি আদিবাসীরা কোনো খেলার আগে ‘হাকা’ করে। বহু কোম্পানি মাওরি-হাকাকে তাদের বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করে বাণিজ্যিক সুবিধা নেয়, কিন্তু জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কোনো লভ্যাংশ বিনিময় করে না। উত্তর আমেরিকার ইরুক্যুয়িস বা হাইডেনোসাউনি আদিবাসীদের ল্যাক্রোস খেলাটি আজ এক বাণিজ্যিক ক্রীড়া, যে বাণিজ্যে আদিবাসীরা অংশীদার নয়। অথচ খেলাটি মূলত ভেষজবিদ্যা অনুশীলনের এক কঠিন অনুশীলন, যা প্রকৃতির সঙ্গে সমাজের আধ্যাত্মিক সম্পর্ক গড়ে তোলে।

বাংলাদেশ, ভারত, নেপালসহ কাবাডি দক্ষিণ এশিয়ার এক লোকজ প্রচলিত খেলা হলেও ‘প্রো-কাবাডি লিগ’ খেলাটিকে বাণিজ্যিক করেছে। ২০১৪ সালে শুরু হওয়া এই কাবাডি লিগ এখন আইপিএলের পর ভারতের সর্বাধিক জনপ্রিয় লিগ। ডিজনি স্টার এই খেলার মূল বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে। মশাল স্পোর্টস প্রাইভেট লিমিটেড এটি আয়োজন করে। একতরফাভাবে এই গ্রামীণ জনক্রীড়ার ওপর করপোরেট কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠত হয়েছে। খেলার নাম ও লোগো এবং সম্প্রচার ট্রেডমার্ক ও কপিরাইট দ্বারা নিবন্ধিত করেছে কোম্পানি। এমনকি তারা ঐতিহ্যবাহী এই খেলায় কিছু নিয়ম পরিবর্তন করেছে।

চট্টগ্রাম লালদীঘি মাঠে জব্বারের বলীখেলা

হুমগুটি, জব্বারের বলী, গিলা খেলা বা বাইচের মেধাসম্পদ

জামদানি, টাঙ্গাইল শাড়ি, মুক্তাগাছার মণ্ডা, তুলসীমালা ধান বা বগুড়ার দইয়ের মতো বাংলাদেশের বহু গ্রামীণ খেলাও সেই এলাকার ভৌগোলিক মহিমা। যেমন ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ার তালুক পরগনার হুমগুটি খেলা। ব্রিটিশ উপনিবেশের সময় মুক্তাগাছার রাজা শশীকান্ত আচার্য এবং ত্রিশালের জমিদার হেমচন্দ্র রায়ের ভেতর জমি পরিমাপের বিরোধ মীমাংসা করতে এই জনক্রীড়ার প্রচলন ঘটে। আমন মৌসুমের ধান কাটার পর পৌষসংক্রান্তি বা পুহুরার দিনে পিতলের তৈরি ৪০ কেজি ওজনের এক হুমগুটি নিয়ে দুই পক্ষ শক্তি পরীক্ষার এই খেলা খেলে। বিকেল থেকে খেলা শুরু হয় এবং শেষ হয় পরের দিন ভোরে।

চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে প্রতিবছর ১২ বৈশাখে অনুষ্ঠিত জব্বারের বলীখেলাও আরেক ভৌগোলিক মহিমা। চট্টগ্রাম অঞ্চলের আদি মল্লবীরদের মাধ্যমে এই বিশেষ কুস্তি খেলার প্রচলন ঘটে। ১৯০৯ সালে ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার সওদাগর লালদীঘিতে এটি প্রতিযোগিতা হিসেবে শুরু করেন। বলীখেলাকে কেন্দ্র করে জমে ওঠে চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় বৈশাখী মেলা।

বাংলাদেশের বহু আদিবাসী সমাজে গিলাগাছের বীজ দিয়ে নানা নাম ও পদ্ধতির গিলা খেলা প্রচলিত। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের আদমপুর ইউনিয়নের নয়াপত্তন গ্রামের ক্যাংশংয়ে মণিপুরিদের ঐতিহ্যবাহী গিলা খেলাটি ‘ক্যাং সঙনাবি’ নামে আয়োজিত হয়। ১৯৯৭ সালে শুরু হওয়া এই টুর্নামেন্ট উৎসবে রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশ মণিপুরি কাং ফেডারেশন এটি আয়োজন করে। মেয়ে ও ছেলেরা আলাদাভাবে প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। গিলা বীজের পাশাপাশি হাতির দাঁত, কচ্ছপের খোল ও মহিষের শিং দিয়েও কাং বানানো হয়। হুমগুটি, নৌকাবাইচ, জব্বারের বলী বা গিলা খেলার মতো বৃহত্তম লোকজ ক্রীড়া উৎসবগুলো এখনো গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত। তবে এসব খেলার করপোরেট বাণিজ্যিকীকরণ ঘটছে এবং মেধাসম্পদ প্রশ্ন বরাবরই অনুচ্চারিত থাকছে।

বহু লোকজ খেলার সঙ্গে নানা প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র মিলেমিশে আছে। নৌকাবাইচ, পলো দিয়ে মাছ ধরা, হাজংদের জাখা মারা, ডুবসাঁতারসহ ঋতুভিত্তিক বহু খেলা গড়ে উঠেছে অবিরল জলপ্রবাহে। নদীর মৃত্যু ও সমাজ রূপান্তরের ধারাবাহিকতায় জলক্রীড়াগুলো নিখোঁজ হয়েছে।

মেধাসম্পদ সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয় সুরক্ষাবলয়

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ট্রিপস কিংবা যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক চুক্তিগুলোর ধারাবাহিকতায় দেশীয় লোকজ খেলাগুলোর মেধাসম্পদ প্রশ্ন নানাভাবে ঝুঁকিতে পড়তে পারে। কিন্তু এ বিষয়ে বিদ্যমান নীতি ও আইন স্পষ্ট সুরক্ষা বার্তা দেয় না। বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আইনে (২০২০) প্রতিষ্ঠানের বহু কাজের একটি হলো, ‘বিভিন্ন দেশীয় খেলাধুলার বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতা আয়োজন’। দেশীয় লোকজ খেলাগুলো নিশ্চিহ্নকরণের জন্য এই প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।  

বাংলাদেশে বিদ্যমান ‘কপিরাইট আইন ২০০৫’ মূলত সাহিত্য, নাট্য, সংগীত, চলচ্চিত্র, আলোকচিত্র, শব্দ রেকর্ডিং, শিল্পকর্ম এবং কম্পিউটার প্রোগ্রামের কপিরাইট বা স্বত্বের আইনি সুরক্ষা করে। এ ছাড়া ‘ট্রেডমার্ক আইন ২০০৯’ কোনো পণ্য/উপকরণের বাণিজ্যিকীকরণের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত ট্রেডমার্কের নিবন্ধন স্বত্ব রক্ষা করে। এসব আইনে লোকজ খেলার মেধাসম্পদ বিষয়ে কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা নেই। এমনকি ‘বাংলাদেশ পেটেন্ট আইন ২০২২’ এ বিষয়ে নিশ্চুপ। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন (২০১০) লোকজ খেলাকে ‘সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে বিবেচনা করেনি। তাহলে দেশের লোকজ ক্রীড়াজগতের মেধাসম্পদ অধিকার কীভাবে সুরক্ষিত হবে?

বাংলাদেশের উদ্ভিদ জাত সংরক্ষণ আইনে (২০১৯) ‘চিরায়ত জ্ঞানের’ ব্যাখ্য়ায় বলা হয়েছে, ‘...জীববৈচিত্র্য ও জীবসম্পদ সংশ্লিষ্ট সকল ধরনের জ্ঞান, মেধা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ও কৃষ্টি, যা লিখিত, মৌখিক, লোককথা ও কাহিনি আকারে প্রচলিত এবং যা যুক্তিসম্মত, বাস্তব বা রূপক, প্রতীকধর্মী বা রেখাচিত্রমূলক এবং যা কোনো একক ব্যক্তির উদ্ভাবন বা প্রচেষ্টার ফল নয় তাই “চিরায়ত জ্ঞান”।’ বাংলাদেশের অধিকাংশ লোকজ গ্রামীণ খেলার চিরায়ত জ্ঞানের সঙ্গে প্রাণবৈচিত্র্য ও স্থানীয় প্রাণসম্পদের ঐতিহাসিক সম্পর্ক আছে। 

জাতীয় খেলা হাডুডু নিয়ে কোনো হালনাগাদ তথ্য নেই। লোকজ খেলাগুলোর জাতীয় নিবন্ধন তালিকা তৈরি করতে হবে। গ্রামীণ খেলাধুলা–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে জাতীয় নীতিমালা, বাজেট ও কর্মতৎপরতা প্রণয়ন করতে হবে। লোকজ খেলাধুলার মেধাসম্পদ সুরক্ষা জনগোষ্ঠী ও সমাজভিত্তিক হওয়া জরুরি। খেলার নাম ট্রেডমার্ক, খেলার সরঞ্জাম ও খেলায় ব্যবহৃত লোকছড়া বা গান জনগোষ্ঠীভিত্তিক পেটেন্ট এবং খেলার নিয়মাবলিসহ বিখ্যাত খেলোয়াড়দের অভিব্যক্তি কপিরাইট হিসেবে সুরক্ষিত হতে পারে।

  • পাভেল পার্থ লেখক ও গবেষক

  • মতামত লেখকের নিজস্ব