এআই ব্যবহার করে আশির দশকের ট্রেন্ডে আকর্ষণীয় সব ছবিতে ভেসে যাচ্ছে ফেসবুক টাইমলাইন। তবে এআই ব্যবহার নিয়ে পরিবেশগত একটা দিক আবারও হাজির হয়েছে
এআই ব্যবহার করে আশির দশকের ট্রেন্ডে আকর্ষণীয় সব ছবিতে ভেসে যাচ্ছে ফেসবুক টাইমলাইন। তবে এআই ব্যবহার নিয়ে পরিবেশগত একটা দিক আবারও হাজির হয়েছে

মতামত

আশির দশকের ট্রেন্ডে গা ভাসালে পানির অপচয় হয় কীভাবে!

জেন-জি যুগে আচমকা আশির দশক নেমে এসেছে যেন। সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করতে গেলে মনে হতে পারে—মানুষ কি টাইম মেশিনে চড়ে আশির দশকে ফিরে গেল? হ্যাঁ, এই টাইম মেশিনের নাম এআই, যাকে বাংলায় একটু খটমট ভাষায় আমরা ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ বলে থাকি। এই কৃত্রিম বুদ্ধির সহায়তায় মানুষ তার পুরোনো স্মৃতিতে ফিরছে, তা নিশ্চয় কৃত্রিম নয়।

কয়েক দশক পেছনে ফেলে আসা সময়ের দিকে তাকানো—অনেকের জন্য তা স্মৃতি অন্বেষণ হতে পারে, আবার অনেকের কাছে তা আবিষ্কার। কারণ, এআই দিয়ে আশির দশকের যে ছবির ট্রেন্ডে মেতেছে মানুষ, তাদের অনেকে যে সময়েই জন্ম নেননি।

এই ট্রেন্ডে আশির দশকের ফ্যাশন, লুক, নস্টালজিয়া—সবকিছু মিলেমিশে দারুণ একটা ক্যানভাসে পরিণত হয়েছে আমাদের ফেসবুকের টাইমলাইন। রাজনৈতিক, সামাজিক, পারিবারিক বা ব্যক্তিগত নানা দৈনন্দিন হতাশাকে ছাপিয়ে নাগরিক সমাজ এক সম্মিলিত আনন্দে মেতেছে, যেখানে যোগসূত্র হিসেবে কাজ করেছে স্মৃতি। কিন্তু মানুষ আশির দশকেই কেন ফিরতে চাইল?

আশির দশক কেন আলাদা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের হতাশা কাটিয়ে পশ্চিমে ‘ভাইব্রেন্ট সিক্সটিজ’ মানুষকে আশাজাগানিয়া এক দারুণ রোমান্টিসিজমে ভাসিয়ে নিয়েছিল। তবে সত্তরের দশকে বিশ্বের আনাচকানাচে ঔপনিবেশিক ক্ষমতার ওপর শেষ পেরেক পড়ছিল। সোভিয়েত যুগও পতনের মুখে। স্নায়ুযুদ্ধের মধ্য দিয়ে মার্কিন পুঁজিবাদ বা অর্থনীতি তখন উত্তুঙ্গে।

এ সময় আশির দশকে মানুষের ভাবনা, চিন্তা, কালচার বা লাইফস্টাইলে যে পরিবর্তন দেখা গেল, তাকে বলা যায় ভাইব্রেন্ট সিক্সটিজের রঙিন ও প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর এক এক্সটেনশন।

এমটিভির হাত ধরে সংগীত শুধু আর শোনা নয়, দেখার অনুভূতিতেও পরিণত হলো। সেখানে জাদুকরি চমক হিসেবে হাজির হলো মাইকেল জ্যাকসন, ম্যাডোনা, কুইনের পারফরম্যান্স। হলিউডে স্টার ওয়ার্সের যাত্রা আর স্টিভেন স্পিলবার্গের পপ কালচার ক্ল্যাসিক। মেটাল, রক আর পপ কালচারের সঙ্গে বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করে প্রিন্সেস ডায়ানার ক্রেজ।

পশ্চিমে আশির দশক নিয়ে যে আবেগ, সেটিই উছলে দিয়েছেন সেখানকার ইনফ্লুয়েন্সার ও তারকারা

সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তরের অনন্য একটা ব্লেন্ড বা মিশেলের সময়ের প্রতীক হয়ে ওঠে আশির দশক। এর প্রতিফলন ঘটেছিল মানুষের লাইফস্টাইলে। সানগ্লাস, ডেনিম জিনস, বড় বকলেসের বেল্ট, জ্যাকেট, স্টাইলিশ ব্লাউজ, বড় কানের দুল, চুড়ি, লম্বা বা কোঁকড়ানো চুল বা আকর্ষণীয় হেয়ারস্টাইল। সেই সঙ্গে মোটরসাইকেল।

এভাবে ফ্যাশনজগতে নতুন ঢেউ নিয়ে আসে এই দশক। যদিও বাংলাদেশের এই ধাক্কা পড়তে শুরু করে নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর। এ কারণে নব্বই দশক নিয়ে আমাদের এখানে বেশি স্মৃতিকাতরতা দেখা যায়।

পশ্চিমে আশির দশক নিয়ে যে আবেগ, সেটিই উছলে দিয়েছে সেখানকার ইনফ্লুয়েন্সার। ইনস্টাগ্রামের মধ্য দিয়ে যেটি টিকটক হয়ে এখন ফেসবুকে ঝড় তুলেছে। আর ফেসবুকে কোনো ট্রেন্ড শুরু হলে সেইখানে কি গা না ভাসিয়ে পারে বাঙালি!

মানুষ শুধু ব্যক্তিগতই নয়, যুগল, পারিবারিক, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আশির দশকের নস্টালজিক রঙে রাঙায়িত করছে। এআই দিয়ে যে যেভাবে পারছে মনের মতো নিজেকে হাজির করছে আশির দশকে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় নতুন নতুন ট্রেন্ড আসে আর যায়, কিন্তু আশির দশক নিয়ে এই উন্মাদনা আলাদা কৌতূহল তৈরি করেছে বলা যায়। এর পেছনে ভিন্ন কোনো রহস্য রয়েছে কি না, সেটাও খোঁজা হচ্ছে।

পারিবারিক সম্পর্কও দারুণভাবে প্রকাশ পাচ্ছে এই ট্রেন্ডে

কেন এই ট্রেন্ডে মাতল মানুষ

এটি বলা হয়ে থাকে যে জেন-জি ও মিলেনিয়ালদের মধ্যে আশি ও নব্বইয়ের দশকের পপ কালচার, ভলিউমিনাস হেয়ারস্টাইল, ডেনিম ও রেট্রো ভাইবের প্রতি আলাদা আকর্ষণ রয়েছে। সেটি এখানে উসকে দিয়েছে। আর আশি ও নব্বইয়ের দশকে যাপন করা বা সে সময়ে জন্ম নেওয়া মানুষদের স্মৃতিকাতরতা এই ট্রেন্ডকে আরও বেশি প্রবল করেছে।

আবার অনেকের ধারণা কিম কার্দেশিয়ানদের মতো প্রভাবশালী ইনফ্লুয়েন্সারদের দিয়ে মাল্টি বিলিয়ন ডলারের ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো আশির দশক নিয়ে এই ট্রেন্ডিং শুরু করিয়েছে।

করোনা মহামারির পর ইরান যুদ্ধ, এর প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানিসংকটসহ নানা কারণে আর্থিক চাপ ও মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। ফলে পশ্চিমা দুনিয়ায় বিক্রিবাট্টা কমেছে। ফ্যাশনজগতে নতুন ট্রেন্ড হাজির করে ভোক্তাদের আকৃষ্ট করতে আশির দশককে বেছে নিয়েছে ব্র্যান্ডগুলো। এটি কতটা সত্য জানি না, তবে পশ্চিমা দুনিয়ায় এমন ট্রেন্ডের পেছনে বাণিজ্যিক কারণ থাকা অস্বাভাবিক নয়।

শুধু ব্যক্তিগতই নয়, যুগল কিংবা বন্ধুত্বপূর্ণ ছবিও তৈরি করছেন অনেকে।

আবার এটা ঠিক যে রেট্রো স্টাইল বা ফ্যাশন বারবার ফিরে আসে। মানুষ একেক সময় অতীতের একেক সময়কে বেছে নেয় বা উদ্‌যাপন করে। সে হিসেবে আশির দশক নিয়ে এই স্মৃতিমেদুরতা এর ধারাবাহিক প্রবণতাই বলা যায়। এআই যুক্ত হওয়ার কারণে এবার আলাদা একটা উন্মাদনা তৈরি হয়েছে বলা যায়।

আশির দশকের ছবি নিখুঁত ছিল না। তখন ফটোশপ ছিল না। একটু ফাটাফাটা বা দানাদানা ভাব থাকত ছবিতে। মনে হতো হলদেটে রং বা জং লেগে আছে। এই অসম্পূর্ণতাই আজকের নিখুঁত ডিজিটাল দুনিয়ায় নান্দনিকতা তৈরি করেছে।

আশির দশক পুনর্নির্মাণ করতে সে সময়ের কিছুই লাগছে না। শুধু একটি ছবি আর একটি প্রম্পট দিয়ে বানিয়ে ফেলা যাচ্ছে আশির দশকের একটা আকর্ষণীয় ছবি। তবে ট্রেন্ডে গা ভাসানোর কারণে অহেতুক ছবি বানানোর প্রতিযোগিতাও তৈরি হয়েছে। ফলে এখানে এআই ব্যবহার নিয়ে পরিবেশগত একটা দিক আবারও হাজির হয়েছে।

ট্রেন্ডে কেন পানি অপচয়ের আলাপ

একটা আলোচনা তৈরি হয়েছে, এআই ব্যবহার করে যেভাবে আশির দশককে পুনর্নির্মাণের ছবি বানানোর মহোৎসব শুরু হয়েছে, তাতে না বাড়তি কত পানি খরচ হয়ে যাচ্ছে! এআই দিয়ে ছবি বানাতে কীভাবে পানি খরচ হয়? অনেকের কাছে বিষয়টি অজানা।

এআই যেভাবে মানুষের সামগ্রিক জীবনকে পরোক্ষ-প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত করে ফেলছে বা ফেলেছে, তাতে বিশ্বজুড়ে চাকরির বাজারে বড় ধাক্কা আসার বিষয়টি শুরু থেকেই আলোচনায় ছিল। এরপর যুক্ত হয়েছে পরিবেশগত বিপর্যয়ের বিষয়ও।

প্রশ্ন উঠেছে, ৮ বিলিয়ন মানুষের তৃষ্ণা মেটাতে যেখানে হিমশিম খাচ্ছে পৃথিবী, সেখানে চ্যাটজিপিটি বা জেমিনাইসহ অসংখ্য এআইয়ের তৃষ্ণা মেটাবার সামর্থ্য কি সত্যিই আমাদের আছে? কারণ, এআই সার্ভার ও ডেটা সেন্টার ঠান্ডা রাখতে যে বিপুল পরিমাণ পানির প্রয়োজন হয়, তা আমাদের ভাবনার বাইরে।

এ নিয়ে ইউনাইটেড নেশনস ইউনিভার্সিটি বা জাতিসংঘের পানি, পরিবেশ ও স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট কর্তৃক প্রকাশিত সাম্প্রতিক একটি বিশেষ পরিবেশগত গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

২০২৭ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী এআইয়ের চাহিদা মেটাতে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে ৪ দশমিক ২ থেকে ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ঘনমিটার পানি উত্তোলন করতে হবে, যা ৪-৬টি ডেনমার্ক বা সমগ্র যুক্তরাজ্যের অর্ধেক বার্ষিক পানি ব্যবহারের সমান। ওপেনএআইয়ের তৈরি করা জিপিটি-৩ এআই ভাষা মডেল একবার প্রশিক্ষণ দিতেই প্রায় ৫৪ লাখ লিটার পানির প্রয়োজন হয়েছে।

গবেষণাটিতে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে এআই-সম্পর্কিত ডেটা সেন্টারগুলোর বার্ষিক পানির ব্যবহার দাঁড়াতে পারে প্রায় ৯ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন (৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি) লিটারে। এই পরিমাণ পানি দিয়ে আফ্রিকার সাব-সাহারান অঞ্চলের প্রায় ১৩০ কোটি মানুষের পুরো এক বছরের পানির ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।

শুধু পানি নয়, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে উৎপাদিত মোট বিদ্যুতের বড় একটি অংশ এআই ডেটা সেন্টারগুলোর পেছনে ব্যয় হতে পারে। প্রতিবছর এআই ডেটা সেন্টারগুলো ৯৪৫ টেট্রাওয়াট-ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ খরচ করবে, যা অনেক দেশের সম্মিলিত বার্ষিক বিদ্যুৎ চাহিদার সমান।

গুগল, মাইক্রোসফট বা ফেসবুকের মতো প্রযুক্তি জায়ান্টের ডেটা সেন্টার নিয়েও একই বাস্তবতা খাটে। ২০২৩ সালে কেবল একটি প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ডেটা সেন্টারগুলোতেই প্রসেসর ঠান্ডা রাখার জন্য সরাসরি ২ হাজার ৯০০ কোটি (২৯ বিলিয়ন) লিটার সুপেয় পানি তুলে নেওয়া হয়েছিল এবং এর মধ্যে ২ হাজার ৩০০ কোটি (২৩ বিলিয়ন) লিটারের বেশি পানি বাষ্পীভূত হয়ে নষ্ট হয়েছে, যার প্রায় ৮০ শতাংশই ছিল পানের যোগ্য পানি। এআই আসার পর সেটিকে প্রশিক্ষিত করা এবং এর ব্যবহারের ফলে এই পানির ব্যবহার নিয়ে আরও বেশি আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

এআই সার্ভার ও ডেটা সেন্টার ঠান্ডা রাখতে যে বিপুল পরিমাণ পানির প্রয়োজন হয়, তা আমাদের ভাবনার বাইরে।

দেখা যাচ্ছে, একটি জনপ্রিয় এআই কোম্পানি দিনে ২৫০ কোটি প্রম্পট গ্রহণ করে এবং সেই অনুযায়ী কাজ সম্পাদন করে থাকে। দিন দিন এটি বাড়তে থাকবে। ২০২৭ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী এআইয়ের চাহিদা মেটাতে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে ৪ দশমিক ২ থেকে ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ঘনমিটার পানি উত্তোলন করতে হবে, যা ৪-৬টি ডেনমার্ক বা সমগ্র যুক্তরাজ্যের অর্ধেক বার্ষিক পানি ব্যবহারের সমান। ওপেনএআইয়ের তৈরি করা জিপিটি-৩ এআই ভাষা মডেল একবার প্রশিক্ষণ দিতেই প্রায় ৫৪ লাখ লিটার পানির প্রয়োজন হয়েছে।

ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, রিভারসাইডের কয়েকজন গবেষকের ‘মেকিং এআই লেস থার্স্টি’ তথা এআই পানির তৃষ্ণা কমানো–সংক্রান্ত গবেষণায় এ বিষয়গুলো উঠে এসেছে। সেখান থেকে আরও জানা যাচ্ছে, একটি এআই দিয়ে সাধারণ ছবি তৈরি বা ১০০ থেকে ৫০০ শব্দের প্রম্পট আদান-প্রদান করতে সার্ভার কুলিংয়ের জন্য প্রসেসরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শূন্য দশমিক ৫ লিটার (প্রায় দুই গ্লাস) থেকে ১ লিটার পানি খরচ হয়। উচ্চমানের একটি ১০ সেকেন্ডের এআই ভিডিও তৈরির প্রসেসিংয়ে সার্ভারের ওপর ব্যাপক চাপ পড়ে, যা ঠান্ডা রাখতে বা শক্তি উৎপাদনে গড়ে ২০ গ্লাসের মতো সুপেয় পানি অদৃশ্যভাবে বাষ্পীভূত বা ব্যবহৃত হয়ে যায়।

তার মানে ট্রেন্ডে গা ভাসিয়ে বা স্বাভাবিকভাবে একটি ছবি তৈরিতে দুই গ্লাস পানি খরচ হয়ে যাচ্ছে। পরিবেশবাদীরাও এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হবেনই। আশির দশকে ফিরে যাওয়ার এই ট্রেন্ড বা এর আগে ন্যানো ব্যানানা এআই শাড়ি দিয়ে নারীদের ছবি বানানোর ট্রেন্ড বা এসব নিয়ে অতিরিক্ত মাতামাতির কারণে বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। বলতেই হচ্ছে, এ লেখা লিখতেও কয়েকবার এআইয়ের সহযোগিতা নেওয়া লাগল, চিন্তা করছি এতে কয় গ্লাস পানি খরচ হয়ে গেল!

  • রাফসান গালিব প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী

    ই-মেইল: rafsangalib1990@gmail.com

    মতামত লেখকের নিজস্ব