ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আইসিসি চেয়ারম্যান জয় শাহ, যিনি ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ছেলে
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আইসিসি চেয়ারম্যান জয় শাহ, যিনি ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ছেলে

মতামত

টি-২০ বিশ্বকাপের আড়ালে ভূরাজনৈতিক খেলায় ভারত

ক্রিকেট রোমান্টিকেরা খেলাটিকে ভদ্রলোকের খেলা বলেন, যেখানে বাউন্ডারি নির্ধারিত হয় দড়ি দিয়ে; কাঁটাতার দিয়ে নয়, যেখানে ব্যাট-বলই লড়াইয়ের একমাত্র অস্ত্র। কিন্তু সময় এত পাল্টে গেছে যে তারা হয়তো ‘খেলা’ দেখতে দেখতেই ভাবছেন, এটা ক্রিকেটই তো!

কিন্তু টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের পরবর্তী আসর যতই কাছে আসছে, ‘ভদ্রলোকের খেলাটি’র করুণ বাস্তবতা ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিশ্বকাপের হওয়ার কথা ক্রিকেটের বৈশ্বিক সেলিব্রেশন, কিন্তু তা না হয়ে এটি হয়ে উঠছে কূটনৈতিক বিরোধের মঞ্চ।

বিশ্বকাপের মতো বড় আসরের আগে আলোচনার কেন্দ্রে থাকে—ফেবারিট কারা, কারা জিততে পারে, কোন গ্রুপ বেশি শক্তিশালী, কোন গ্রুপ দুর্বল। কিন্তু এবার আলোচনার বিষয় হলো, আয়োজক দেশের ঘরোয়া রাজনীতির কারণে ক্রিকেটের শ্বাসরোধ হয়ে মরার দশা হচ্ছে কি না। প্রশ্ন উঠছে, ক্রিকেটের রাজনীতিকীকরণ করতে গিয়ে ভারত কি নিজের পায়েই কুড়াল মারছে?

আরও দুঃখজনক বিষয় হলো, ভারতের দৃশ্যত অকারণ অহমিকার একমাত্র শিকার ভারত নিজে নয়; বরং ক্রিকেট খেলাটাও অত্যন্ত বাজেভাবে আক্রান্ত হচ্ছে।
এই বিশ্বকাপ ঠিকঠাক আয়োজিত হবে কি না—এ প্রশ্নটি শুরু হয় বাংলাদেশি ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়া ঘিরে।

বছরের পর বছর ধরে ভারতীয় প্রিমিয়ার লিগে পারফর্ম করে আলোচনায় থাকা মোস্তাফিজকে এ বছর চিহ্নিত করা হলো ‘নিরাপত্তাঝুঁকি’ হিসেবে, এবং সেটাও কোনো ক্রিকেটীয় কারণে নয়; বরং ভারতে ক্রমবর্ধমান ‘বাংলাদেশবিরোধী’ মতবাদই এর মূল কারণ।

এ ঘটনাটি এমন এক স্ববিরোধিতার জন্ম দিয়েছে, যা ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) কিংবা আইসিসি—কেউই এড়িয়ে যেতে পারবে না। একজন হাই প্রোফাইল মুসলিম ক্রিকেটারকে ‘নিরাপত্তাঝুঁকি’ হিসেবে চিহ্নিত করার মাধ্যমে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ নিজেদের অজান্তেই সেই আশঙ্কাগুলোকেই সত্য প্রমাণ করেছে, যা তারা এত দিন নাকচ করে আসছিল।

ফ্র্যাঞ্চাইজি অবকাঠামোর নিরাপত্তাবলয়ে থাকা একজন একক তারকাও যদি বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিষবাষ্প থেকে নিরাপদ না থাকেন, তবে বিসিবি কীভাবে তাদের পুরো স্কোয়াড, সাপোর্ট স্টাফ, সাংবাদিক এবং সমর্থকদের সেখানে পাঠানোর সাহস করবে?

বিসিবি যখন নিরাপত্তাঝুঁকির বিষয়টি সামনে এনে ভারত সফরে অস্বীকৃতি জানাল, তখন বিভিন্ন মহল থেকে বলা হলো বাংলাদেশের ভয়টি মূলত অমূলক। অথচ আমরা বাংলাদেশের ক্রীড়া উপদেষ্টার একটি ‘বেফাঁস’ মন্তব্যে জানতে পারলাম, আইসিসির নিজস্ব নিরাপত্তা বিশ্লেষণেই ঝুঁকির ব্যাপারগুলো সামনে চলে এসেছে; যা মূলত আয়োজক দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতির বিরুদ্ধে একটি জোরালো প্রমাণ।

বিশ্লেষণটিতে এমনকি এ-ও উল্লেখ করা হয়েছে, ক্রীড়া উপদেষ্টার দাবি মতে, বাংলাদেশের নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঝুঁকিও তো ঘনীভূত হবে। এটি আসলে এক প্রকার পরোক্ষ স্বীকারোক্তি যে ভারতের আপাতত পরিবেশ এতটাই বিদ্বেষপূর্ণ ও বিষিয়ে উঠেছে যে সেখানে সফরকারী খেলোয়াড়দের—বিশেষত প্রতিবেশী দেশগুলোর মুসলিম খেলোয়াড়দের—নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

এই সংকট কেবল বাংলাদেশের সঙ্গে সীমাবদ্ধ নয়। মার্কিন ক্রিকেটার আলী খানের ভিসার আবেদনও প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। আলী খান খবরটি প্রকাশ করেছেন এক অদ্ভুত উপায়ে—একজন খেলোয়াড় যখন একমাত্র সান্ত্বনা হিসেবে এক বাকেট ফ্রায়েড চিকেন হাতে নিয়ে ইনস্টাগ্রামে নিজের ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার খবর জানাতে বাধ্য হন, তখন দৃশ্যটি হাস্যকরই মনে হতে পারে; কিন্তু এ ক্ষেত্রে হাস্যকর মনে হচ্ছে না, কারণ সবাই এর পেছনের গুরুতর কারণটি জানেন।

এখানে পাকিস্তানের জড়িয়ে পড়াটা সম্ভবত সুবিধাবাদী আচরণ। এটি বাংলাদেশের প্রতি তাদের গভীর ভালোবাসা থেকে নয়, বরং তাদের ‘চিরশত্রু’ ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশলগত আকাঙ্ক্ষা থেকেই আসছে।

এমনকি আলী খানের ব্যাপারটিও কিন্তু বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। কিছু প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ইংল্যান্ডের আদিল রশিদ ও রেহান আহমেদও একই জটিলতায় পড়েছেন। এই ঘটনাগুলো আমাদের এমন এক উদ্বেগজনক প্রবণতা দেখাচ্ছে, যেখানে অভিবাসন নীতি এবং ধর্মীয় পরিচয়কে একটি স্পোর্টস ইভেন্টের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কী হাস্যকর, এবং একই সঙ্গে করুণ ব্যাপার!

আইসিসি বিরামহীনভাবে ক্রিকেটকে বিশ্বময় ছড়িয়ে দেওয়া এবং সহযোগী দেশগুলোকে আরও সুবিধা দেওয়ার বুলি আওড়ায়। অথচ যুক্তরাষ্ট্র যখন বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে, তখন তাদের খেলোয়াড়দের সাধারণ প্রটোকলের পরিবর্তে এমন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, যাকে ‘প্রোফাইলিং’ ছাড়া আর কিছু বলার সুযোগ নেই।

ভিসা প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক যাচাই-বাছাইয়ের হাতিয়ারে পরিণত করে আয়োজক দেশটি বিশ্বকে এই বার্তাই দিচ্ছে, আপনার কাভার ড্রাইভের চেয়ে আপনার ধর্ম কিংবা জন্মস্থানই তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে সেই বৈশ্বিক সম্প্রদায়কেই দূরে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, যা আইসিসি বহুদিন ধরে গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। যে বিশ্বকাপ কোনো খেলোয়াড়কে তার পরিচয়ের ভিত্তিতে বাদ দেয়, তা আর বিশ্বকাপ থাকে না; বরং এটি পরিণত হয় নির্দিষ্ট ‘ড্রেস কোড’ মেনে চলা এক ভূরাজনৈতিক সমাবেশে।

স্বাগতিক দেশের দেওয়া নিরাপত্তার আশ্বাসের ওপর আস্থার এই গভীর সংকট কেন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে ভারতের ক্রিকেট প্রশাসন এবং দেশটির ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বিজেপির মধ্যকার অস্পষ্ট সীমারেখার মধ্যে।

আইসিসি, যারা কাগজে-কলমে এই খেলার নিরপেক্ষ অভিভাবক, বর্তমানে তাদের নেতৃত্বে আছেন জয় শাহ। তিনি কেবল একজন ক্রিকেট প্রশাসকই নন; তিনি ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছেলে, যিনি বিজেপি নেতৃত্বের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। এই সংযোগ স্বার্থের এমন এক পাহাড়সম সংঘাত তৈরি করে, যা এড়ানো অসম্ভব। যে মুসলিমবিদ্বেষী মনোভাবের কারণে আজ বাংলাদেশের মধ্যে নিরাপত্তা শঙ্কা তৈরি হয়েছে, বিজেপি সেই মনোভাব লালন-পালন করার জন্য ব্যাপকভাবে সমালোচিত।

বিসিবি বা অন্য বোর্ডগুলো যখন তাদের শঙ্কার কথা জানায়, তখন তাদের আইসিসির আশ্বাসে বিশ্বাস রাখতে বলা হয়। কিন্তু অনেকের চোখেই আইসিসি এবং ভারতীয় রাজনৈতিক এস্টাবলিশমেন্ট এখন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। বাংলাদেশ কীভাবে সেই নিরাপত্তার আশ্বাসে বিশ্বাস রাখবে, যখন আশ্বাস প্রদানকারী বৈশ্বিক সংস্থাটি এমন এক রাজনৈতিক যন্ত্রের সঙ্গে পারিবারিকভাবে যুক্ত, যাদের বিরুদ্ধেই হুমকি উসকে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে?

আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে নিরপেক্ষতাই হলো প্রধান পুঁজি, আর ২০২৬ সালে এসে আইসিসি সেখানে দেউলিয়াসম।

আইসিসির ভারতভিত্তিক এস্টাবলিশমেন্টের অনমনীয় অবস্থান একটি শূন্যস্থানের সৃষ্টি করেছে এবং প্রত্যাশিতভাবেই ভূরাজনীতি সেই স্থান দখল করে নিয়েছে। পাকিস্তান সম্প্রতি বাংলাদেশের উদ্বেগের সমাধান না হলে তারাও বিশ্বকাপে নিজেদের অংশগ্রহণের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও ঘোরতর বিপজ্জনক পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন, এখানে পাকিস্তানের জড়িয়ে পড়াটা সম্ভবত সুবিধাবাদী আচরণ। এটি বাংলাদেশের প্রতি তাদের গভীর ভালোবাসা থেকে নয়, বরং তাদের ‘চিরশত্রু’ ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশলগত আকাঙ্ক্ষা থেকেই আসছে। তবে ভারত যে সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে, তা কাজে লাগানোর জন্য পাকিস্তানকে দোষ দেওয়া যায় না। প্রতিবেশীদের নিরাপত্তাকে রাজনীতিকীকরণের মাধ্যমে ভারত নিজেই তার প্রতিপক্ষের হাতে একটি শক্তিশালী কূটনৈতিক অস্ত্র তুলে দিয়েছে।

কিন্তু পাকিস্তান যে অবস্থান নিয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে, পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে সে বিষয়ে হ্যাঁ বা না কিছু বলা হয়নি। ইসলামাবাদের এই নীরবতা নয়াদিল্লিকে তটস্থ রাখার একটি চিরাচরিত কৌশলের নতুন অধ্যায় সম্ভবত। সব মিলিয়ে আঞ্চলিক সম্পর্কগুলো সৌজন্যের সঙ্গে সামলাতে ভারতের ব্যর্থতাই আজ বিশ্বকাপকে দক্ষিণ এশীয় ক্ষোভ প্রকাশের একটি প্রক্সি ব্যাটল ফিল্ডে পরিণত করেছে। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়ার কথা ছিল ক্রিকেট পিচ, কিন্তু আসলে সব আলোচনা এখন ইমিগ্রেশন অফিসে চলে গেছে।

বাংলাদেশকে যদি গ্রুপ বদল করতে বাধ্য করা হয়, কিংবা শেষ মুহূর্তের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে খেলাগুলো শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়া হয়, তবে প্রতিযোগিতার সৌন্দর্যই প্রশ্নবিদ্ধ হবে। বিশ্বকাপ হওয়ার কথা ছিল সমতার ভিত্তিতে দক্ষতার পরীক্ষা, কিন্তু এটি হয়ে উঠছে কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তারের পরীক্ষা।

২০২৬ বিশ্বকাপ ভারতের জন্য ক্রিকেটে তাদের বিশাল প্রভাবের একটা প্রদর্শনী হতে পারত। কিন্তু তার বদলে ভারতের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রূপের একটা বিপরীত দিকই কেবল ফুটে উঠছে। ক্রিকেট যদি এই পথেই চলতে থাকে—যেখানে নিরাপত্তাব্যবস্থা হয় বৈষম্যমূলক, ভিসা ব্যবহৃত হয় রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে, এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা হয়ে ওঠে রাষ্ট্রযন্ত্রের একটি স্পষ্ট এক্সটেনশন—তাহলে খেলার শক্তি আমাদের কেবল বিভাজনেই ফেলবে, অথচ খেলাধুলার মাধ্যমে কেবল ঐক্যেরই আশা করা হয়।

  • সাইফ হাসনাত সাংবাদিক ও লেখক। ই–মেইল: saifhasnat@gmail.com

    *মতামত লেখকের নিজস্ব