এক দশকের বেশি সময় ধরে ছোট বোর্ডগুলো ভারতীয় বোর্ডের এজেন্ডাকে সমর্থন করেছে, ভেবেছে এতে তাদের টিকে থাকা সহজ হবে।
এক দশকের বেশি সময় ধরে ছোট বোর্ডগুলো ভারতীয় বোর্ডের এজেন্ডাকে সমর্থন করেছে, ভেবেছে এতে তাদের টিকে থাকা সহজ হবে।

মতামত

ক্রিকেটে ভারতের ‘দাদাগিরি’ যে কারণে ‘মেনে নিচ্ছে’ বাকিরা

পাকিস্তান টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বর্জনের ঘোষণা দেওয়ার পরই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানায়। এক বিবৃতিতে তারা বলে, পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের এই সিদ্ধান্ত বিশ্ব ক্রিকেটের স্বার্থ এবং দর্শকদের কল্যাণেরও বিরুদ্ধে। আইসিসি বিশেষভাবে উল্লেখ করে পাকিস্তানের সেই কোটি কোটি সমর্থকের কথা, যাঁরা এখন ভারতের বিপক্ষে একটি ম্যাচ দেখা থেকে বঞ্চিত হলেন।

এই বিবৃতি এবং তার আগের সপ্তাহে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে দেওয়া আইসিসির আলটিমেটামের ভাষায় বারবার উঠে এসেছে ন্যায্যতা ও সমতার কথা। অথচ পাকিস্তানের সমর্থকেরা নিশ্চয়ই মনে রেখেছেন, ২০২৫ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফির আগে যখন ভারত রাজনৈতিক কারণে পাকিস্তানে খেলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। আইসিসির পক্ষ থেকে এমন উদ্বেগ দেখা যায়নি।

সেই টুর্নামেন্টে শেষ পর্যন্ত সেমিফাইনাল ও ফাইনাল ম্যাচ পাকিস্তান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। ভারতের আকর্ষণ ও প্রভাবের কারণে নকআউট ম্যাচগুলো আয়োজন করা হয় দুবাইয়ে। আইসিসি তখন একটি তথাকথিত হাইব্রিড মডেল গ্রহণ করে, যেখানে ভারত আয়োজক দেশের বাইরে সব ম্যাচ খেলে। এই সিদ্ধান্তই মূলত ক্রিকেটকে আজকের বাস্তবতায় ঠেলে দেয়।

ভারতের পাকিস্তানে খেলতে না যাওয়ার জবাবে পাকিস্তান ঘোষণা দেয়, তারা এবারের টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতে যাবে না। ক্রিকেট বিশ্বের দুই ঐতিহ্যবাহী দেশের এই পাল্টাপাল্টি অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এর মধ্যে বাংলাদেশও জড়িয়ে পড়ে। আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশি বোলার মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেয় রাজনৈতিক কারণে। এরপর নিরাপত্তা উদ্বেগের ফলে বাংলাদেশ দাবি তোলে, তাদের সব ম্যাচ শ্রীলঙ্কায় আয়োজন করতে হবে। এই দাবির ফলে বাংলাদেশকে পুরো টুর্নামেন্ট থেকেই বাদ দেওয়া হয়।

এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, আইসিসি ক্রিকেটকে এমন এক মাধ্যমে পরিণত হতে দিয়েছে, যার ভেতর দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব প্রকাশ করছে। আরও গুরুতর বিষয় হলো, আইসিসি এই দ্বন্দ্বে এক পক্ষকে সুবিধা দিচ্ছে। পাকিস্তানে খেলতে না যাওয়ার জন্য ভারত কখনোই কোনো ভর্ৎসনার মুখে পড়েনি।

গত বছরের এশিয়া কাপে ভারতের পুরুষ দল পাকিস্তানের খেলোয়াড়দের সঙ্গে হাত না মেলানোর যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সেটি এখন ভারতীয় বোর্ডের নারী ও অনূর্ধ্ব-১৯ দলেও অনুসৃত হচ্ছে। আইসিসির বক্তব্যকে বিশ্বাস করতে হলে ধরে নিতে হয়, আইসিসি চেয়ারম্যান জয় শাহ তাঁর বাবা ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে সম্পূর্ণ সম্পর্কহীনভাবে দায়িত্ব পালন করছেন।

এই ভারসাম্যহীনতার মূল কারণ ভারতের বিশাল ক্রিকেট অর্থনীতি। ২০১৪ সালে আইসিসিতে ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের নেতৃত্বে তথাকথিত বিগ থ্রি ব্যবস্থার পর থেকে ক্রিকেটকে প্রবলভাবে মুনাফানির্ভর পথে চালিত করা হয়েছে।

যে বোর্ডগুলো আইসিসিতে ভারতীয় বোর্ডের অবস্থানের সঙ্গে একমত নয়, তারা জানে, ভারতের সফর বাতিলের হুমকি তাদের আর্থিক ভিত্তি ভেঙে দিতে পারে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের বিরুদ্ধে নেওয়া সিদ্ধান্তে ভোট পড়েছিল ১৪ বনাম ২ ব্যবধানে। যেন সবাই জানে, কার টেবিলে বসে তারা খায়।

বর্তমানে আইসিসির মোট আয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ পায় ভারতীয় বোর্ড। আন্তর্জাতিক পুরুষ ক্রিকেটের প্রায় এক–পঞ্চমাংশ সময় দখল করে নেয় আইপিএল। এই আর্থিক ইঞ্জিনকে রক্ষা করাই হয়ে উঠেছে আইসিসির প্রধান অগ্রাধিকার।

যে বোর্ডগুলো আইসিসিতে ভারতীয় বোর্ডের অবস্থানের সঙ্গে একমত নয়, তারা জানে, ভারতের সফর বাতিলের হুমকি তাদের আর্থিক ভিত্তি ভেঙে দিতে পারে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের বিরুদ্ধে নেওয়া সিদ্ধান্তে ভোট পড়েছিল ১৪ বনাম ২ ব্যবধানে। যেন সবাই জানে, কার টেবিলে বসে তারা খায়।

দীর্ঘ ১২ বছর ধরে অর্থনৈতিক শক্তিকে মহিমান্বিত করার পর ক্রিকেট এখন রাজনীতির আগ্রাসনে অবাক হওয়ার সুযোগ রাখে না। অর্থনীতির পুরোনো সত্য হলো, একচেটিয়া আধিপত্য ভোক্তার বিকল্প কমিয়ে দেয়। বাংলাদেশে কোটি কোটি দর্শক আগামী কয়েক সপ্তাহে সেটাই টের পাবেন। ফেব্রুয়ারির ১৫ তারিখে ভারত–পাকিস্তান ম্যাচটি হওয়ার কথা ছিল, সেটিও আর হচ্ছে না।

বাংলাদেশ না থাকায় টুর্নামেন্টের প্রতিযোগিতামূলক মানও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ক্রিকেটে বাংলাদেশের অর্জন স্কটল্যান্ডের তুলনায় অনেক বেশি। অথচ স্কটল্যান্ডই তাদের জায়গা নিয়েছে। বাংলাদেশের বাজার এখন ছোট হলেও জনসংখ্যা, মাথাপিছু আয় এবং মানব উন্নয়ন সূচকে অগ্রগতির কারণে ভবিষ্যতে এটি বড় হতে পারে।

আইসিসি যদি এমন সম্ভাবনাময় একটি পূর্ণ সদস্যদেশকে বাদ দিতে পারে, তাহলে শ্রীলঙ্কা, নিউজিল্যান্ড বা ওয়েস্ট ইন্ডিজের মতো আরও দুর্বল বোর্ডগুলোর ভবিষ্যৎ কী হবে, সেই প্রশ্নও উঠে আসে।

এক দশকের বেশি সময় ধরে ছোট বোর্ডগুলো ভারতীয় বোর্ডের এজেন্ডাকে সমর্থন করেছে, ভেবেছে এতে তাদের টিকে থাকা সহজ হবে। কিন্তু এই আনুগত্য তাদের অবস্থানকে আরও দুর্বল করেছে। শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট বোর্ড ভারতীয় বোর্ডের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও গত ১২ বছরে তাদের কোনো সিনিয়র দল বৈশ্বিক টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালে যেতে পারেনি। তাদের টেস্ট সূচি ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ কিংবা জিম্বাবুয়ের অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়।

নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকা কিছুটা ভালো করলেও দক্ষিণ আফ্রিকাকে ভারতীয় বোর্ডের প্রকাশ্য চাপের মুখে পড়তে হয়েছে। তাদের ঘরোয়া টি-টুয়েন্টি লিগে পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের অনুপস্থিতিও ভারতীয় রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। খেলোয়াড়দের জন্মভিত্তিক বর্জন (কারও জন্মস্থান বিবেচনায় অংশগ্রহণ করতে না দেওয়া) দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রীড়া চেতনার পরিপন্থী হলেও সেটিও মানতে হয়েছে।

এখন বিশ্বকাপ শুরুর মুখে বাংলাদেশ সবচেয়ে কঠিন শিক্ষা পেল। ২০১৪ সালে ক্ষমতা ভাগাভাগিতে প্রথম সই করা বোর্ডগুলোর একটি ছিল বাংলাদেশ। ভারত নিঃসন্দেহে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ক্রিকেট শক্তি।

একসময় ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া একে অপরের আধিপত্য কিছুটা হলেও ঠেকাতে পারত। এখন সেই ভারসাম্য নেই। একটি বোর্ড সূর্য হয়ে উঠলে বাকিরা হয়ে যায় কেবল তার চারপাশে ঘুরতে থাকা গ্রহ। হয়তো একদিন ভারত অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডকেও অপ্রয়োজনীয় মনে করবে। সুপারপাওয়াররা সাধারণত তা–ই করে।

ক্রিকেট এখন স্পষ্ট করে দিচ্ছে, তার আনুগত্য কোথায়। আইসিসির ভাষায় নিরপেক্ষতার কথা থাকলেও বাস্তবে প্রতিযোগিতামূলক ভারসাম্য আর তাদের অগ্রাধিকার নয়। অন্য বোর্ডগুলো ভারতের ইচ্ছাকে এতটাই প্রশ্রয় দিয়েছে যে এখন সেই ইচ্ছা আর শুধু অর্থনৈতিক নয়, সরাসরি রাজনৈতিক। আর এই অর্থ ও রাজনীতির অন্ধকার সংযোগস্থলে ক্রিকেট ধীরে ধীরে নিজেই নিজেকে গ্রাস করছে।

  • অ্যান্ড্রু ফিদেল ফের্নান্দো শ্রীলঙ্কান লেখক ও ক্রীড়া সাংবাদিক

    আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত