
অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাহী আদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ করায় দেশের অন্যতম প্রধান দল আওয়ামী লীগ ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারছে না। অতীতে অনেক সরকার অনেক দলকে নিষিদ্ধ করে শেষ পর্যন্ত দমিয়ে রাখতে পারেনি।
শেখ হাসিনা সরকারের অন্তিম সময়ে জামায়াতে ইসলামীকে নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। অথচ দলটি এবারের নির্বাচনের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি। জিয়াউর রহমানের আমলে ডেমোক্রেটিক লীগ ও কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
প্রশ্ন উঠেছে, আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সাধারণ কর্মী-সমর্থকেরা কী করবেন? বিদেশে নিরাপদে থাকা আওয়ামী লীগ নেতারা একের পর এক হুকুম দিয়ে চলেছেন। কিন্তু তাঁদের সে হুকুম দেশে থাকা নেতা-কর্মীদের কতটা বিপদে ফেলছে, তাঁরা একবারও ভাবেননি।
গত বছর বেশ কিছু অঘটন ঘটেছে নেতাদের উসকানিমূলক বিবৃতির কারণে। তাঁরা ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের অনুসরণে শাটডাউন ও কমপ্লিট শাটডাউনের আওয়াজ তুলেও জনগণের সাড়া পাননি। বরং মিছিল করতে গিয়ে সাধারণ কর্মীরা জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন।
আওয়ামী লীগের নেতারা এখন বলছেন, ‘যেই নির্বাচনে নৌকা নেই, সেই নির্বাচন কখনো গ্রহণযোগ্য হবে না।’ আওয়ামী লীগের বর্তমান নেতৃত্ব এখন সব দলকে নিয়ে নির্বাচন করার জোর দাবি জানাচ্ছেন। কিন্তু ক্ষমতায় থাকতে তাঁরা বিরোধী দলকে বাদ দিয়ে একের পর এক জবরদস্তির নির্বাচন করেছেন।
গত ১৭ মাসে দেশে থাকা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা দুঃসহ বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। একসময়ের রাজনৈতিক ‘শত্রুদের’ কৃপা নিয়েও অনেকে বেঁচে আছেন। কেউবা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।
এ অবস্থায় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের পক্ষে আনুষ্ঠানিক ভোট বর্জন মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ সবাই না হলেও আওয়ামী লীগ সমর্থকদের একটি বড় অংশ ভোটকেন্দ্রে যাবেন এবং ভোটও দেবেন।
আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের অর্ধেক ভোটারও যদি কেন্দ্রে উপস্থিত থাকেন, তাঁরা যে দল ও প্রার্থীর জয়-পরাজয়ে মুখ্য ভূমিকা রাখবেন, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
প্রশ্ন হলো, নৌকাবিহীন ব্যালটে তাঁরা কাকে বেছে নেবেন? এ ক্ষেত্রে বিকল্প হতে পারত বাম দলগুলো। কিন্তু তারা নির্বাচনকে নিয়েছে প্রতীকী আয়োজন হিসেবে। অনেক বড় নেতা ভরাডুবির ভয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাই করছেন না। দ্বিতীয় বিকল্প হলো বিএনপি বা তাদের সমমনা দলগুলো। বিএনপির নেতাদের একাত্তরকেন্দ্রিক সাম্প্রতিক বক্তৃতা-বিবৃতিতে আওয়ামী লীগের প্রতিধ্বনি মেলে। তৃতীয় বিকল্প হবে স্থানীয়ভাবে জয়ের সম্ভাবনা আছে, এমন প্রার্থীকে ভোট দেওয়া।
বেসরকারি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটির পিপলস ইলেকশন পালস সার্ভে (পেপস) কিছুটা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মনোভাব তুলে ধরেছে। আগের আওয়ামী লীগ ভোটারদের ৩২ দশমিক ৯ শতাংশ বিএনপিকে ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা প্রকাশ করেছেন। ১৩ দশমিক ২ শতাংশ জামায়াতকে ভোট দিতে পারেন বলে জানিয়েছেন। আর ৪১ দশমিক ৩ শতাংশ এখনো সিদ্ধান্তহীন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, আগে যাঁরা সিদ্ধান্তহীন ছিলেন বা পছন্দ প্রকাশ করেননি, তাঁদের মধ্য থেকে জামায়াতের তুলনায় বেশি ভোট পেয়েছে বিএনপি। বিএনপির সম্ভাব্য ৫২ দশমিক ৮ শতাংশ ভোটের মধ্যে ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ এসেছে আগে সিদ্ধান্তহীন ও অনির্ধারিত ভোটারদের কাছ থেকে। জামায়াতের সম্ভাব্য ৩১ শতাংশ ভোটের মধ্যে ১৪ দশমিক ১ শতাংশ এসেছে একই গোষ্ঠী থেকে। সে ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের একাংশ বিএনপির দিকেই ঝুঁকছেন বলে ধারণা করি।
এরই প্রতিধ্বনি পাওয়া গেল মাদারীপুর-১ (শিবচর) আসনের একটি নির্বাচনী সভায়। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় শিবচর পৌরসভার খান বাড়িতে বিএনপির প্রার্থী নাদিরা আক্তারের উঠান বৈঠকে উপস্থিত হন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের আলোচিত অন্তত ২০ জন নেতা-কর্মী। তাঁরা সবাই ধানের শীষের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার কথা বলেছেন। একজন পুরোনো অভ্যাস বশে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানও দিয়েছেন।
স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাদের দাবি, তাঁরা সাবেক চিফ হুইপ নূর-ই আলম চৌধুরী লিটনের নির্দেশে ধানের শীষের প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারে সমর্থন জানাচ্ছেন। এর অর্থ আওয়ামী লীগের নির্বাসিত নেতারা প্রকাশ্যে নির্বাচন বর্জনের আহ্বান জানালেও স্থানীয়ভাবে যাঁদের দ্বারা বিপদ কম হবে মনে করেন, তাঁদের ভোট দিতে বলছেন।
কেবল বিএনপি নয়, অন্যান্য দলও আওয়ামী লীগের সমর্থকদের পক্ষে টানতে নানা কৌশল অবলম্বন করছে। বিভিন্নভাবে প্রলোভন দেখানো হচ্ছে, কেউ কেউ সহানুভূতিও প্রকাশ করছেন। ফলে নৌকাবিহীন এবারের নির্বাচনে দলটির ভোট সহানুভূতিশীল প্রার্থীর বাক্সেই যে বেশি পড়বে, সেটা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
গত ২৮ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে প্রচারে গিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘এবার তো নৌকা নেই। নৌকা পালিয়েছে। মাঝখানে তাদের যেসব সমর্থক আছেন, তাঁদের বিপদে ফেলে গেছে। আমরা সেই বিপদে তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছি।’ জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে ঘোষণা দিয়েছেন, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের হয়রানি করা হবে না।
গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর তাঁর নির্বাচনী এলাকায় বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগের দায়িত্ব আমি নিলাম। আপনাদের একজনেরও বিন্দুমাত্র ক্ষতি হবে না।’
১৯৯১ সালের পর যে কটি নির্বাচন হয়েছে, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ছাড়া সব কটিতে অংশ নিয়েছে আওয়ামী লীগ। কোনোটিতে তারা জয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছে। কোনোটিতে বিরোধী দলে বসেছে। তিনটি বিতর্কিত নির্বাচন করেছে তারা। এসব নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সর্বনিম্ন ৩০ শতাংশ ও সর্বোচ্চ ৪৭ শতাংশ পর্যন্ত ভোট পেয়েছে।
একটানা ১৫ বছরের শাসন ও তিনটি প্রহসনমূলক নির্বাচনের কারণে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা কমেছে সত্য। কিন্তু ভূমিধস হয়নি। আওয়ামী লীগের জনসমর্থন যদি সর্বনিম্ন স্তরেও এসে থাকে, তারপরও তারা নির্বাচনের ফলাফলকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে। আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের অর্ধেক ভোটারও যদি কেন্দ্রে উপস্থিত থাকেন, তাঁরা যে দল ও প্রার্থীর জয়-পরাজয়ে মুখ্য ভূমিকা রাখবেন, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এ কারণেই বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ প্রায় সব দল আওয়ামী ভোটারদের কাছে ধরনা দিচ্ছে।
সোহরাব হাসান সাংবাদিক ও কবি
*মতামত লেখকের নিজস্ব