ইরানে খামেনি শাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ
ইরানে খামেনি শাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ

মতামত

ইরানে আন্দোলনে মধ্যবিত্তের ভূমিকা কেন নির্ধারক হয়ে উঠল

ইরানে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে ধারাবাহিক আন্দোলন দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থার একটি স্থায়ী বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। এসব আন্দোলনের পুনরাবৃত্তি এবং সেগুলোর প্রতি রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়াকে একাডেমিক আলোচনায় বৈধতা সংকট হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। ২০২৬ সালের শুরুতে যে বিক্ষোভ দেখা দিয়েছে, তা অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটের কারণে আগের আন্দোলনগুলোর চেয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক থেকে আলাদা।

ইরানি সমাজের বড় একটি অংশের মধ্যে রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি অসন্তোষ এখন আর সাময়িক কোনো আবেগ নয়। এটি একটি কাঠামোগত সমস্যায় রূপ নিয়েছে। এই অসন্তোষ শাসনব্যবস্থার বৈধতার ভিত্তিকে ক্রমাগত দুর্বল করে দিচ্ছে। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর যে ধর্মতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, তা শুরুতে ন্যায়বিচার, সামাজিক মর্যাদা ও স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সময়ের সঙ্গে সেই প্রতিশ্রুতি ও মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে। এর ফল হিসেবে ১৯৯৯, ২০০৯, ২০১৭-১৮ এবং ২০২২ সালে বড় ধরনের সামাজিক আন্দোলন দেখা যায়।

এই আন্দোলনগুলোর পুনরাবৃত্তি দেখায় যে ইরানের মৌলিক সমস্যাগুলো এখনো অমীমাংসিত। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা, ব্যাপক দুর্নীতি, ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ওপর কঠোর বিধিনিষেধ এবং কার্যকর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ না থাকা সামাজিক অসন্তোষকে বারবার নতুন করে জন্ম দিচ্ছে। রাষ্ট্র এসব সংকট মোকাবিলায় মূলত শক্তিশালী নিরাপত্তাকাঠামোর ওপর নির্ভর করেছে। বিক্ষোভ বাড়লে বিপ্লবী গার্ড, বাসিজ মিলিশিয়া ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সরাসরি হস্তক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

ইরানি শাসনব্যবস্থার সংকট মোকাবিলার কৌশল দীর্ঘদিন ধরেই দমনমূলক। কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে বৈধতার ঘাটতি কমানোর বদলে নিরাপত্তাব্যবস্থার মাধ্যমে সাময়িক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। এর ফলে সংকটের মূল কারণ অক্ষত থেকে যায়। প্রতিটি নতুন আন্দোলন আগের চেয়ে বেশি মৌলিক দাবি নিয়ে সামনে আসে এবং সংঘাতের মাত্রাও বাড়ে।

ইরানি সমাজের একটি বড় অংশ স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেয়। সিরিয়া ও লিবিয়ার অভিজ্ঞতা অনেক ইরানির কাছে ভয়াবহ উদাহরণ। হঠাৎ পরিবর্তনের ফলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে এই আশঙ্কা অনেক মানুষকে আন্দোলন থেকে দূরে রাখছে। পাশাপাশি বিদেশি হস্তক্ষেপের ভাষা ইরানি জাতীয়তাবাদকে উসকে দিতে পারে এবং শাসনব্যবস্থাকে সাময়িকভাবে আরও শক্তিশালী করতে পারে।

২০২৬ সালের বিক্ষোভ কয়েকটি কারণে আলাদা গুরুত্ব বহন করে। এই আন্দোলন শুরু হয় এমন এক সময়ে, যখন আঞ্চলিক পর্যায়ে ইরান বড় ধরনের কৌশলগত চাপের মুখে ছিল। ইসরায়েলের সঙ্গে স্বল্পমেয়াদি সামরিক সংঘাতের পর ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব ও মিত্র নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়ে পড়ে। সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতন এবং লেবাননে হিজবুল্লাহর শক্তি কমে যাওয়ায় ইরানের প্রতিরোধ কৌশল প্রশ্নের মুখে পড়ে। এর প্রভাব দেশের ভেতরের রাজনীতিতেও পড়ে এবং শাসনব্যবস্থার আত্মবিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটও এবারের বিক্ষোভকে আলাদা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে বিক্ষোভকারীদের সমর্থন জানান। তাঁর প্রশাসনের সর্বোচ্চ চাপনীতি পুনরায় চালুর সম্ভাবনা এবং সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি এই আন্দোলনকে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। একই সময়ে ইরানের অর্থনৈতিক দুর্বলতা আরও গভীর হয়। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্ব মধ্য ও নিম্ন আয়ের মানুষের অসন্তোষ বাড়িয়ে তোলে।

এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র আগের মতোই কঠোর দমনমূলক কৌশল গ্রহণ করেছে। বিক্ষোভের শুরুতেই নিরাপত্তা বাহিনীর হস্তক্ষেপ দেখা গেছে। ইন্টারনেট সংযোগ সীমিত করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করা এবং শারীরিক সহিংসতা ব্যবহার করে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকার আন্দোলনকে বিদেশি শক্তির ষড়যন্ত্র হিসেবে উপস্থাপন করছে, যাতে জনসমর্থন দুর্বল করা যায়।

তবে ইরানি সমাজের একটি বড় অংশ স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেয়। সিরিয়া ও লিবিয়ার অভিজ্ঞতা অনেক ইরানির কাছে ভয়াবহ উদাহরণ। হঠাৎ পরিবর্তনের ফলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে এই আশঙ্কা অনেক মানুষকে আন্দোলন থেকে দূরে রাখছে। পাশাপাশি বিদেশি হস্তক্ষেপের ভাষা ইরানি জাতীয়তাবাদকে উসকে দিতে পারে এবং শাসনব্যবস্থাকে সাময়িকভাবে আরও শক্তিশালী করতে পারে।

সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের বিক্ষোভ ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে তাৎক্ষণিকভাবে বদলে দেওয়ার সম্ভাবনা কম। শক্তিশালী নিরাপত্তাকাঠামো, সমাজের স্থিতিশীলতাকামী মানসিকতা এবং আন্তর্জাতিক চাপের বিপরীত প্রতিক্রিয়া আন্দোলনের গতি সীমিত করছে। তবে এতে কাঠামোগত সমস্যাগুলোর সমাধান হয়নি। দমন যত বাড়বে, সংকট তত গভীর হবে। দীর্ঘ মেয়াদে প্রকৃত সংস্কার ছাড়া এই বৈধতা সংকট শাসনব্যবস্থার জন্য বড় হুমকি হয়েই থাকবে।

চাগাতাই বালজি তুর্কি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ।

তুরস্কের ডেইলি সাবাহ থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত