
যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ আগামীকাল মঙ্গলবার নতুন কংগ্রেস নির্বাচনে ভোট দেবেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও কয়েকজন রিপাবলিকান নেতার কথা শুনলে মনে হতে পারে, ভোটযুদ্ধ নয়, তাঁরা ধর্মযুদ্ধে নেমেছেন। তাঁদের প্রচারে আমেরিকার খ্রিষ্টীয় মূল্যবোধ রক্ষার আহ্বানের পাশাপাশি ইসলাম ও মুসলিমদের দেশটির নিরাপত্তা ও সংস্কৃতির জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
সবার নজর মিশিগানে
এই মুহূর্তে ইসলামফোবিয়া বা ইসলামভীতি প্রচারের প্রধান কেন্দ্র মিশিগান অঙ্গরাজ্য। সেখানে মিসরীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন চিকিৎসক আবদুল আল-সাইয়েদ ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী হিসেবে সিনেটের পদে নির্বাচন করছেন। আসনটির বর্তমান সিনেটর ডেমোক্র্যাট নেতা গ্যারি পিটার্স পুনর্নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন না।
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে আসনটি ধরে রাখা ডেমোক্র্যাটদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দলীয় বাছাইপর্বে হেইলি স্টিভেন্সকে অল্প ব্যবধানে হারিয়ে মনোনয়ন পেয়েছেন আল-সাইয়েদ। তাঁকে নিয়ে দলের ভেতরে মতভেদ থাকলেও এখন তাঁর পক্ষে প্রচারে নেমেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সের মতো নেতারা।
অন্যদিকে রিপাবলিকানদের হিসাব, ২০২৪ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মিশিগানে কমলা হ্যারিসকে প্রায় ৮০ হাজার ভোটে হারিয়েছিলেন ট্রাম্প। ফলে আসনটি জয়ের সুযোগ তাঁদের রয়েছে। আল-সাইয়েদকে হারাতে তাঁরা বাজি ধরেছেন সাবেক কংগ্রেসম্যান মাইক রজার্সের ওপর। তাঁদের প্রচারের একটি প্রধান কৌশল হলো আল-সাইয়েদকে ‘জিহাদি’, মুসলিম ব্রাদারহুডের সমর্থক ও প্রবল ইসরায়েলবিরোধী হিসেবে তুলে ধরা। ব্রাদারহুডের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আল-সাইয়েদ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তবু প্রচার চলছে, এমন একজন মানুষ সিনেটর নির্বাচিত হলে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিপন্ন হবে।
এই প্রচারে নেতৃত্ব দিচ্ছেন খোদ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি আল-সাইয়েদকে শুধু জিহাদি বলেই ক্ষান্ত হননি। এমন দাবিও করেছেন, আল–সাইয়েদ ও ডেমোক্র্যাটরা জিতলে যুক্তরাষ্ট্রে জিহাদিদের ঢল নামবে, সহিংসতা ও সন্ত্রাস এমন পর্যায়ে পৌঁছাবে যে ক্রিসমাসও উদ্যাপন করা যাবে না।
রাজনীতিতে অর্থের প্রভাব কমাও, মানুষের পকেটে টাকা দাও, সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করো। বিদেশে যুদ্ধের পেছনে অর্থ ব্যয়ের বদলে দেশের স্কুল, স্বাস্থ্যসেবা ও শিশুদের ভবিষ্যতে বিনিয়োগের কথা বলছেন আবদুল আল-সাইয়েদ।
তাঁর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সিনেটর টেড ক্রুজ বলেছেন, আল-সাইয়েদ নির্বাচিত হলে তাঁকে সিনেটের গোয়েন্দাবিষয়ক কমিটিতে বসানো হতে পারে। ব্রাদারহুডের প্রতি তাঁর সমর্থনের অভিযোগ সত্য হলে এর ফলে মার্কিন নাগরিকদের প্রাণহানির ঝুঁকি থাকবে বলে দাবি করেছেন ক্রুজ। বক্তব্যটির ইঙ্গিত স্পষ্ট, একজন মুসলিম প্রার্থীকে দেশের গোপন তথ্যের দায়িত্ব দেওয়া বিপজ্জনক।
ধর্মের রাজনীতি
যুক্তরাষ্ট্রে ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা নতুন নয়। প্রায় অর্ধশতক আগে ধর্মযাজক জেরি ফলওয়েল ‘মোরাল মেজরিটি’ গড়ে রক্ষণশীল খ্রিষ্টানদের সংগঠিত করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। পরে আরেক ধর্মযাজক প্যাট রবার্টসন গড়ে তোলেন ‘ক্রিশ্চিয়ান কোয়ালিশন’। তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মিত্র ছিলেন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান। তাঁর যুক্তি ছিল, নৈতিকতার ভিত্তি যেহেতু ধর্ম, ধর্ম ও রাজনীতির মধ্যে সম্পর্ক থাকবেই। বাইবেলের ভাষা ও প্রতীক ব্যবহার করে তিনি আমেরিকার জাতীয় উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতেন।
আজকের রিপাবলিকান রাজনীতিতে সেই ভাষা আরও তীব্র হয়েছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সরাসরি বলেছেন, আমেরিকা খ্রিষ্টান জাতি ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আমেরিকা ও ইউরোপের অভিন্ন খ্রিষ্টীয় ঐতিহ্যের কথা বলে ‘সভ্যতা মুছে যাওয়ার’ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তাঁদের বক্তব্যে অভিবাসন, সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ও জাতীয় পরিচয় হারানোর ভয় একসূত্রে গাঁথা।
আমেরিকার প্রতিষ্ঠাতাদের গড়ে দেওয়া শাসনব্যবস্থায় খ্রিষ্টধর্মকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া হয়নি। সংবিধানের ষষ্ঠ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা আছে, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সরকারি পদ বা জনবিশ্বাসের দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হওয়ার যোগ্যতা হিসেবে ধর্মীয় পরীক্ষা নেওয়া যাবে না। ১৭৯১ সালে অনুমোদিত প্রথম সংশোধনী কংগ্রেসকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ধর্ম প্রতিষ্ঠার আইন করতে নিষেধ করেছে; একই সঙ্গে নিশ্চিত করেছে নাগরিকের স্বাধীনভাবে ধর্ম পালনের অধিকার।
কেন রাজনীতিতে আবারও ধর্ম
প্রায় ২৩৫ বছর পরও কেন খ্রিষ্টধর্মের প্রাধান্যের প্রশ্নে এত উত্তেজনা? একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা, যুদ্ধ ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ভোটারের অসন্তোষের মুখে ট্রাম্প ও তাঁর মিত্ররা ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রশ্ন সামনে এনে নির্বাচনী বিতর্কের গতিপথ বদলাতে চাইছেন। তবে শুধু অর্থনৈতিক ব্যর্থতা দিয়ে এই প্রবণতার সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা হয় না। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংগঠন এবং সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ব হারানোর আশঙ্কা।
অভিবাসন ও জনসংখ্যার পরিবর্তন সেই আশঙ্কা বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এখনো সংখ্যাগরিষ্ঠ অ–হিস্পানিক শ্বেতাঙ্গের দেশ, তবে তাঁদের জনসংখ্যার অনুপাত কমছে। আদমশুমারি ব্যুরোর মূল পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৪৫ সালের মধ্যে এই অনুপাত অর্ধেকের নিচে নামতে পারে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র একটি অশ্বেতাঙ্গ প্রধান দেশে পরিণত হবে।
এই পরিবর্তন আশঙ্কা শ্বেতাঙ্গদের একাংশের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ট্রাম্প ও তাঁর রাজনৈতিক মিত্ররা এ উদ্বেগকে নিজেদের রাজনৈতিক প্রয়োজনে ব্যবহার করতে চান।
কিন্তু উদ্বেগকে ভোটে পরিণত করার এই কৌশল কতটা সফল হবে, তা নিশ্চিত নয়। রক্ষণশীল ভোটারদের একাংশ এতে উদ্বুদ্ধ হতে পারে। আবার ধর্মীয় বিদ্বেষে বিরক্ত হয়ে অন্য ভোটাররা বিপরীত দিকেও যেতে পারেন। দ্রব্যমূল্য, জ্বালানি, বাসাভাড়া ও চিকিৎসার ব্যয় নিয়ে উদ্বিগ্ন মানুষকে শুধু সাংস্কৃতিক হুমকির কথা বলে কত দূর টানা যাবে, সেটিও প্রশ্ন।
আল-সাইয়েদ সেই অর্থনৈতিক উদ্বেগকেই সামনে রাখতে চাইছেন। তাঁর প্রচারের মূল স্লোগান, রাজনীতিতে অর্থের প্রভাব কমাও, মানুষের পকেটে টাকা দাও, সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করো। বিদেশে যুদ্ধের পেছনে অর্থ ব্যয়ের বদলে দেশের স্কুল, স্বাস্থ্যসেবা ও শিশুদের ভবিষ্যতে বিনিয়োগের কথা বলছেন তিনি।
বিদ্বেষী প্রচারের পাল্টা প্রতিক্রিয়ারও কিছু আভাস রয়েছে। আরব-আমেরিকান ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক জাতীয় জরিপে ৫৩ শতাংশ আরব-আমেরিকান সম্ভাব্য ভোটার বলেছেন, আরব ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে বাড়তে থাকা বিদ্বেষ তাঁদের রাজনৈতিকভাবে আরও সক্রিয় হতে উদ্বুদ্ধ করেছে। এটি আল-সাইয়েদের জয় নিশ্চিত করে না। তবে এটুকু বোঝা যায়, ভয় দেখিয়ে, সাংস্কৃতিক বিভাজনককে ব্যবহার করে একদল ভোটারকে সংগঠিত করতে গিয়ে অন্য দলকেও জাগিয়ে তোলা সম্ভব।
হাসান ফেরদৌস প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক