যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত গ্রিনল্যান্ড দখলের পথে না গেলেও, ট্রাম্পের হুমকিটাই যথেষ্ট
যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত গ্রিনল্যান্ড দখলের পথে না গেলেও, ট্রাম্পের হুমকিটাই যথেষ্ট

মতামত

নতুন বছরে পূর্ণ শক্তিতে মেতেছে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ

নতুন বছরের শুরুতেই ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলায় আগ্রাসন চালিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্বকে আতঙ্কিত করে তুলেছেন। ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে আরও কী কী খেল দেখাতে চান, এখানে ইউরোপের কী করার আছে, তা নিয়ে লিখেছেন লেসলি ভিনজামুরি 

আমাদের মধ্যে যাঁরা বিশ্বরাজনীতি ও ভূরাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, তাঁদের মধ্যে খুব কম লোকই ২০২৫ সালকে বিদায় জানাতে দুঃখ পেয়েছি। কিছু ইতিবাচক ঘটনা থাকলেও সামগ্রিকভাবে বছরটি ছিল অত্যন্ত বিশৃঙ্খল, অস্থির ও টালমাটাল। এসব বিশৃঙ্খলা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বিপুল অনিশ্চয়তা ঢুকিয়ে দিয়েছে। এই বৈশ্বিক অস্থিরতার পেছনে একমাত্র না হলেও প্রধান চালিকা শক্তি ছিল যুক্তরাষ্ট্র। 

যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে বেশ কয়েকটি বড় বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠান থেকে সরে গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও প্যারিস শান্তিচুক্তি। দেশটি ইউএস এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (ইউএসএইড) বন্ধ করে দিয়েছে এবং জাতিসংঘের বহু সংস্থার অর্থায়ন কমিয়েছে। 

এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যব্যবস্থা পুরোপুরি অস্থির হয়ে পড়ে, আর বাণিজ্যচুক্তিগুলোকে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থের সঙ্গে বেঁধে ফেলা হয়। মার্কিন প্রশাসন তাদের গুরুত্বপূর্ণ জোটগুলো পুরোপুরি পরিত্যাগ না করলেও কোনো যৌথ এজেন্ডার দিকে এগোনোর স্পষ্ট ইঙ্গিতও দেয়নি। 

ট্রাম্প কোনো আইনের তোয়াক্কা করছেন না

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রায় এক বছর আগে তাঁর অভিষেক ভাষণে বড় বড় যুদ্ধের অবসান ঘটানো ও শান্তি প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছিলেন। বাস্তবে তা অর্জন করা কঠিনই প্রমাণিত হয়েছে। পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট অসলোর (পিআরআইও) তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে রাষ্ট্রভিত্তিক সশস্ত্র সংঘাতের সংখ্যা ছিল গত সাত দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। সেই রেকর্ড উচ্চমাত্রা ২০২৫ সালেও বজায় থাকে। বছর শেষ হয় ইউক্রেন ও সুদানে শান্তিচুক্তি অধরাই থেকে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। আর এ সময়ে গাজায় তিন ধাপের যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনাও কার্যত অচল হয়ে পড়ে। বিদেশে উন্নয়ন সহায়তা নাটকীয়ভাবে কমে যায়। 

অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (ওইসিডি) পূর্বাভাস দিয়েছিল, ২০২৫ সালে এ সহায়তা ৯ থেকে ১৭ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। বিভিন্ন হিসাব বলছে, চলতি শতকে প্রথমবারের মতো শিশুমৃত্যুর হারও বেড়েছে। 

২০২৬ কি ভালো হবে? লক্ষণ মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়। পিআরআইওর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সংঘাত পূর্বাভাস ব্যবস্থা বলছে, এ বছর যুদ্ধজনিত মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হবে ইউক্রেন, সুদান, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনে; অথচ এসব সংঘাত যুক্তরাষ্ট্র শেষ করতে চায় বলে জানিয়েছে। 

সামনে প্রশ্ন একটাই—নতুন বছরে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গঠনে যুক্তরাষ্ট্র কী ভূমিকা নেবে? তারা কি স্থিতিশীলতা আনবে? শান্তির মধ্যস্থতাকারী হবে, নাকি আগের মতোই অস্থিরতা সৃষ্টিকারী ভূমিকায় থাকবে? চলতি সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্ট করে দিয়েছে, ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে এই শেষের ভূমিকাতেই উপযোগিতা দেখছেন। 

নতুন বছরের শুরুতেই ট্রাম্পের প্রথম দিককার পররাষ্ট্রনীতির পদক্ষেপগুলোর মধ্যে ছিল গভীর রাতে ভেনেজুয়েলায় হামলা, দেশটির নেতাকে গ্রেপ্তার করা এবং তাঁকে ও তাঁর স্ত্রীকে বিচারের জন্য নিউইয়র্কে তুলে নিয়ে যাওয়া। এরপর ট্রাম্প ও তাঁর শীর্ষ সহযোগীরা ন্যাটো সদস্য ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডকে চাপ প্রয়োগ করে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে পরিণত করার হুমকি দেন। 

এরপর ৭ জানুয়ারি ট্রাম্প ঘোষণা দেন, যুক্তরাষ্ট্র ৬৬টি আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে সরে যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আন্তসরকার প্যানেল (আইপিসিসি) এবং পার্টনারশিপ ফর আটলান্টিক কো–অপারেশন, যা আটলান্টিক মহাসাগরের তীরবর্তী দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতার একটি উদ্ভাবনী বহুপক্ষীয় কাঠামো। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে থাকা শেষ অবশিষ্ট অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তিটির মেয়াদ (যেটি মোতায়েন করা কৌশলগত পারমাণবিক ওয়ারহেডের সংখ্যা সীমিত করে) আগামী মাসেই শেষ হতে যাচ্ছে। ট্রাম্প ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এখনো আলোচনা করেননি, এর জায়গায় কী আসবে। 

ইউরোপ ও এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ভূমিকা ও প্রতিক্রিয়ার দিকেও এখন বিশেষভাবে নজর দেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ ট্রাম্পের বক্তব্য ও আচরণ কেবল যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; তা সরাসরি মিত্র দেশগুলোর নিরাপত্তা ভাবনা, কূটনৈতিক অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভিত্তিকেই নড়বড়ে করে দিচ্ছে। 

এ থেকে আমরা কী বুঝতে পারি? প্রথমত, ট্রাম্প কোনো নজির, কোনো নিয়ম বা আইনের তোয়াক্কা করছেন না এবং তাঁকে নিরুৎসাহিত করার মতো কিছু এখনো করেনি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা, কংগ্রেস কিংবা আদালত। এখন পর্যন্ত এমন কোনো ইঙ্গিতও নেই যে এ অবস্থার পরিবর্তন হবে। 

লাতিন আমেরিকায় প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলো গণতান্ত্রিক মানদণ্ড দুর্বল করছে—এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। কিন্তু এ সপ্তাহে ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্প যে পদক্ষেপ নিয়েছেন, তা মোটেও গণতন্ত্র রক্ষার জন্য নয়। আর তেল নিরাপত্তার চেয়ে অন্য শক্তিগুলোকে তেল থেকে দূরে রাখাই সম্ভবত এর মূল উদ্দেশ্য। নিকোলা মাদুরোর শাসনামলে চীন, কিউবা, ইরান ও রাশিয়া—সবাই লাভবান হয়েছে। শুধু গত বছরই ভেনেজুয়েলার মোট অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশ নিয়েছে চীন। 

নতুন বছর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে নজর রাখার বিষয়গুলোর একটি হবে কংগ্রেস। মার্কিন সিনেট একটি ‘ওয়ার পাওয়ারস’ ধারা এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে ভোট দিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ভেনেজুয়েলার ভেতরে বা ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে কোনো শত্রুতামূলক পদক্ষেপ নেওয়ার আগে কংগ্রেসকে আগাম জানাতে হবে। এতে ট্রাম্প প্রশাসন প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। তবু এমন কোনো লক্ষণ নেই যে এটি বাস্তবে প্রেসিডেন্টের ওপর কার্যকর কোনো নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারবে। আইনি পথে অন্য যেকোনো প্রতিক্রিয়া মূলত একটি একাডেমিক আইনবিদদের আলোচনার ভেতরেই সীমাবদ্ধ আছে। 

ইউরোপ ও এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ভূমিকা ও প্রতিক্রিয়ার দিকেও এখন বিশেষভাবে নজর দেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ ট্রাম্পের বক্তব্য ও আচরণ কেবল যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; তা সরাসরি মিত্র দেশগুলোর নিরাপত্তা ভাবনা, কূটনৈতিক অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভিত্তিকেই নড়বড়ে করে দিচ্ছে। 

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো গ্রেপ্তার বা আটক হওয়ার ঘটনার পর ইউরোপীয় নেতাদের প্রতিক্রিয়া ছিল তুলনামূলকভাবে সংযত। অনেকেই প্রকাশ্যে তীব্র ভাষা ব্যবহার করেননি, যেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে না জড়াতে হয়। কিন্তু পরিস্থিতি বদলে যায় যখন ট্রাম্প আবারও গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি দেন। তখন ইউরোপীয় নেতারা আর নীরব থাকতে পারেননি। কারণ গ্রিনল্যান্ড কেবল একটি দ্বীপ নয়; এটি ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামো, আর্কটিক অঞ্চলের ভারসাম্য এবং ন্যাটোর ভবিষ্যৎ ভূমিকার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। 

এই প্রেক্ষাপটে ন্যাটোর ছয়টি সদস্যরাষ্ট্র এক যৌথ বিবৃতিতে জানায়, তারা এবং তাদের সঙ্গে আরও কয়েকটি মিত্র দেশ আর্কটিক অঞ্চলে নিজেদের সামরিক ও কৌশলগত উপস্থিতি বাড়িয়েছে। তারা ‘উপস্থিতি, কার্যক্রম ও বিনিয়োগ’ বৃদ্ধির কথা বলে স্পষ্ট করে দেয়, এই অঞ্চলকে নিরাপদ রাখা এবং সম্ভাব্য প্রতিপক্ষকে নিবৃত্ত করা এখন তাদের অগ্রাধিকার। এই বক্তব্য আসলে ট্রাম্পের হুমকির বিরুদ্ধে একটি পরোক্ষ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা। 

ইউরোপীয় দেশগুলোর সামনে বাস্তব বিকল্প কী

প্রশ্ন থেকেই যায়—যদি ট্রাম্প সত্যিই গ্রিনল্যান্ড দখলের দাবিতে অনড় থাকেন, তাহলে ইউরোপীয় দেশগুলোর সামনে বাস্তব বিকল্প কী? তারা কি ন্যাটো থেকে বেরিয়ে যাবে? বাস্তবে সেটি প্রায় অসম্ভব। কারণ ন্যাটোর বাইরে ইউরোপের নিজস্ব কোনো শক্তিশালী ও সমন্বিত নিরাপত্তা কাঠামো নেই, যা যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের আচরণে ক্ষুব্ধ হলেও ইউরোপীয় দেশগুলো শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারছে না। 

এই দ্বিধার একটি স্পষ্ট উদাহরণ দেখা যায় যুক্তরাজ্যের অবস্থানে। একদিকে তারা গ্রিনল্যান্ড বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্যের সমালোচনা করেছে, অন্যদিকে আবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি ‘যৌথ নিরাপত্তা স্বার্থ’ খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছে। এর ফলেই ভেনেজুয়েলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাশিয়ান পতাকাবাহী একটি তেল ট্যাংকার জব্দ করার ঘটনায় যুক্তরাজ্য ট্রাম্প প্রশাসনকে সমর্থন দেয়। অর্থাৎ বিরোধিতার পাশাপাশি সহযোগিতা—এই দ্বৈত নীতিই এখন ইউরোপের বাস্তবতা। 

এই পুরো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ট্রাম্প হয়তো আরও গভীর একটি পরিবর্তনের সূচনা করছেন—মানুষের সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ড ও জাতীয় নিরাপত্তা সম্পর্কে ভাবনার ধরনটাই বদলে যাচ্ছে। আগে যেসব বিষয়কে স্থির ও প্রশ্নাতীত ধরে নেওয়া হতো, সেগুলো এখন নতুন করে আলোচনায় আসছে। গ্রিনল্যান্ডের ঘটনাই তার উদাহরণ। আগে অনেক মানুষই গ্রিনল্যান্ডকে মানচিত্রে খুব একটা গুরুত্ব দিয়ে দেখেনি। কিন্তু এখন তার ভৌগোলিক অবস্থান, আর্কটিক অঞ্চলে তার কৌশলগত গুরুত্ব এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় তার ভূমিকা নিয়ে নতুন করে চিন্তা শুরু হয়েছে। 

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত ভূরাজনৈতিক অগ্রাধিকার কী, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এতদিন ধরে ধরে নেওয়া হচ্ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য হলো চীনের উত্থান মোকাবিলা করা। কিন্তু বাস্তবে সেটিই যে এখন শীর্ষ অগ্রাধিকার, তার পক্ষে খুব শক্ত প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না। যদিও প্রেসিডেন্ট প্রতিরক্ষা বাজেট ৫০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন এবং বলা হচ্ছে এই অর্থের একটি বড় অংশ চীনকে মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় নৌযান নির্মাণে ব্যয় হবে, তবু গ্রিনল্যান্ডের মতো ইস্যু সামনে এনে তিনি মনোযোগকে অন্যদিকে সরিয়ে নিচ্ছেন। 

সবশেষে, সবচেয়ে গভীর ও উদ্বেগজনক পরিবর্তনটি হলো—ভূখণ্ড দখলের বিরুদ্ধে যে আন্তর্জাতিক রীতি বা নীতি যুদ্ধ–পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থার ভিত্তি ছিল, তা এখন ভেঙে পড়ার মুখে। দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি অলিখিত নিয়ম ছিল—শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্রের ভূখণ্ড জোর করে দখল করা যাবে না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশ, যারা এই নিয়মের প্রধান প্রবক্তা ও রক্ষক ছিল, তারাই যখন প্রকাশ্যে একটি ভূখণ্ড দখলের হুমকি দেয়, তখন সেই রীতির ভিত্তিই নড়ে যায়। 

যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত গ্রিনল্যান্ড দখলের পথে না গেলেও, হুমকিটাই যথেষ্ট। কারণ এটি অন্য শক্তিগুলোকেও একই ধরনের আচরণের বৈধতা দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। ফলে সামনে আরও এমন ঘটনা দেখার জন্য বিশ্বকে প্রস্তুত থাকতে হবে—যেখানে ভূখণ্ড দখল, শক্তির প্রদর্শন এবং পুরোনো আন্তর্জাতিক নিয়ম ভাঙার রাজনীতি আবারও স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে। 

মহাশক্তির কঠিন ও নির্মম ক্ষমতার খেলায় নামতে ট্রাম্পের কোনো দ্বিধা নেই। এ সপ্তাহের পদক্ষেপগুলো দেখিয়েছে, তিনি পশ্চিম গোলার্ধ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষদের সরিয়ে রাখতে চান। কিন্তু একই সঙ্গে এমন কোনো প্রমাণও নেই যে তিনি অন্য কোনো অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষদের প্রভাববলয় মেনে নিতে রাজি। উল্লেখযোগ্যভাবে, কাউন্সিলের জনমত জরিপ বলছে—আমেরিকানরা প্রভাব বলয়ভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থাকে সমর্থন করেন না। 

ট্রাম্পের জনসমর্থন পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তাঁকে বৈশ্বিক ক্ষমতার এই দৌড় থেকে সরিয়ে আনবে, নাকি জনগণই ট্রাম্পের সঙ্গে সেই পথে এগোবে—তা এখনো দেখা বাকি। 

লেসলি ভিনজামুরি শিকাগো কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। 

শিকাগো কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স থেকে নেওয়া। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ