সোশ্যাল মিডিয়া একটু স্ক্রল করলেই অনেক ফটোকার্ড চোখে পড়ছে ইদানীং। বিশেষ করে এই নির্বাচনকে সামনে নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এই ফটোকার্ড নিয়ে চরম যুদ্ধ শুরু হয়েছে। কে কী বলেছে, সেটা নিয়ে চলছে কাটাছেঁড়া। তবে আমি যেটা দেখতে পারছি, সরাসরি মিথ্যার চেয়েও ভয়ংকর হলো ‘আউট অব কনটেক্সট’ বা প্রসঙ্গের বাইরে গিয়ে একটি ন্যারেটিভ প্রচার করা।
একটা মানুষ হয়তো আস্ত একটি বক্তৃতা দিলেন, সেখান থেকে শুধু একটি লাইন কেটে এনে এমনভাবে উপস্থাপন করা হলো যে তাঁর আসল ‘ইনটেন্ট’ বা উদ্দেশ্যই বদলে গেল। এটা অনেকটা ওই যুদ্ধের মাঠের সাইকোলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার বা মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের মতো, যা আমাদের ফোনের স্ক্রিনে চলে এসেছে। পার্থক্য শুধু এটুকু—যুদ্ধের মাঠে শত্রু থাকে, কিন্তু এই ডিজিটাল যুদ্ধে শত্রু লুকিয়ে থাকে ফটোকার্ডের পেছনে। আর বুঝতেই পারি না, কখন আমরা তাদের টার্গেট হয়ে যাচ্ছি।
এখন এই ‘আউট অব কনটেক্সট’ ন্যারেটিভ থেকে বাঁচার উপায় কী? আমি গবেষণা করে দেখেছি, এই ডিজিটাল স্নায়ুযুদ্ধ থেকে বাঁচার উপায় আমাদের নিজেদের ভেতরেই লুকিয়ে আছে। সেটা হচ্ছে আমাদের সচেতনতা।
আমাদের প্রথম যে জিনিসটা মনে রাখা উচিত, সেটা হচ্ছে, হুট করে কোনো কিছু বিশ্বাস না করা। যেমন ধরুন, আপনি দেখলেন একজন রাজনৈতিক নেতা বলছেন, ‘আমি এই ক্ষেত্রে ট্যাক্স বাড়াব’ (আমি বাইরের একটা উদাহরণ টানছি)। কিন্তু ফটোকার্ডে তাঁর আগের কথাগুলো নেই, যেখানে হয়তো তিনি বলেছিলেন, ‘ধনীদের জন্য এই এই সেক্টরে ট্যাক্স বাড়িয়ে গরিবদের এই সুবিধা দেব।’ এই যে অর্ধেক সত্য জিনিস, এটাই সবচেয়ে বড় দ্বিধা বা বিভ্রান্তি তৈরি করে। এটাই আমাদের মধ্যে বিভেদ ছড়ায়।
কারণ, যাঁরা এই ফটোকার্ড তৈরি করছেন, তাঁরা জানেন, নেতিবাচক বা নেগেটিভ খবর ছড়ায় বেশি। তাঁরা জানেন মানুষ ভয় পেলে, রাগ করলে দ্রুত রিঅ্যাক্ট করে। শেয়ার করে। কমেন্ট করে। আর সেই শেয়ার আর কমেন্টের মধ্য দিয়েই তাঁদের ন্যারেটিভটা ছড়িয়ে যায় হাজার হাজার মানুষের কাছে। এটা একটা চেইন রিঅ্যাকশন। আপনি শেয়ার করলেন, আপনার বন্ধু দেখল; সেও শেয়ার করল, তার বন্ধু দেখল—এভাবে একটা মিথ্যা তথ্য সত্যির মতো ছড়িয়ে পড়ে।
পৃথিবীটা অনেক জটিল হয়ে উঠছে সত্যি, কিন্তু একটু কাণ্ডজ্ঞান আর ধৈর্য থাকলে আমরা ঠিকই সত্য আর মিথ্যার পার্থক্যটা বুঝতে পারব। তবে সবচেয়ে বড় কথা হলো আমাদের ভোট, আমাদের মতামত, আমাদের সিদ্ধান্ত যেন আমাদের নিজেদের চিন্তাভাবনা থেকে আসে। কোনো ফটোকার্ড বা ভাইরাল পোস্ট থেকে নয়।
আর এই কারণেই আমাদের উচিত যেকোনো সেনসেশনাল নিউজ দেখলেই সঙ্গে সঙ্গে রিঅ্যাক্ট না করে একটু সময় নেওয়া। অন্তত দুই-তিনটি আলাদা সোর্স থেকে খবরটি ভেরিফাই না করে সেটাকে সত্যি হিসেবে মেনে নেওয়াটা একদমই ঠিক হবে না। আমাদের মনে রাখতে হবে, এই প্রসেসে আমাদের ইমোশনকে কন্ট্রোল করাই হলো আসল চাবিকাঠি।
আবেগ বা অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন, আমরা জানি। বিশেষ করে, যখন দেখছেন আপনার পছন্দের কোনো নেতাকে নিয়ে বাজে কিছু বলা হচ্ছে, বা আপনার বিশ্বাসের বিপরীতে কিছু প্রচার করা হচ্ছে। তখন প্রথম রিঅ্যাকশন হয়—এটা শেয়ার করতে হবে, এটার প্রতিবাদ করতে হবে। কিন্তু এই যে প্রথম রিঅ্যাকশন, এটাই আসলে ফাঁদ। এখানেই আমাদের একটু থামতে হবে। একটু চিন্তা করতে হবে—এটা কি সত্যি? পুরো কনটেক্সট বা প্রেক্ষাপট কি আমি জানি?
আসল কথা হচ্ছে, রাজায় রাজায় এই লড়াইয়ে আমরা সাধারণ মানুষেরা অনেক সময় বিভ্রান্ত হয়ে পড়ি। আমরা অনেকেই কোনো দলের না, কোনো পার্টিরও না। আমরা শুধু চাই সঠিক তথ্য জানতে, সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে। কিন্তু যখন চারপাশে হাজারটা ফটোকার্ড ভাসছে, প্রতিটি একেক রকম কথা বলছে, তখন কী বিশ্বাস করব, সেটাই বুঝতে পারি না।
এখান থেকে বাঁচার জন্য আমাদের ইনফ্লুয়েন্সারদের পেছনে (হাজারো শেয়ার হয়েছে এমন পোস্ট) না ছুটে নিজের জাজমেন্ট বা বিচারবুদ্ধি খাটাতে হবে। কোনো ফটোকার্ড শেয়ার করার আগে নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে—এই ইনফরমেশন বা তথ্যটা দিয়ে কার লাভ হচ্ছে? কে এটা তৈরি করেছে? কেন এই সময়ে এটা ভাইরাল হচ্ছে?
এ ব্যাপারে ভালো খবরও আছে। আমাদের চারপাশে এখন অসংখ্য ফ্যাক্ট চেকিং প্ল্যাটফর্ম আছে, সেগুলোর সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলো বা তাদের মিডিয়া সেল বা অনুগত বাহিনী তাদের প্রোপাগান্ডা চালাবেই, এটা তাদের কাজ।
কিন্তু আমাদের জীবন আর আমাদের সিদ্ধান্ত যেন কোনো ফেক নিউজের ওপর নির্ভর করে না হয়। নিজের কোনো আইডিওলজি বা সিদ্ধান্তে অনড় থাকা খারাপ কিছু নয়, তবে সেই সিদ্ধান্তটা যেন সঠিক ধারণা আর সঠিক কনটেক্সট বা প্রেক্ষাপট তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।
নিজের অভিজ্ঞতায় যখনই কোনো খবর খুব বেশি রাগায়, অথবা খুশি করায়, তখনই সন্দেহ, অর্থাৎ ‘ফ্ল্যাগ রেইজ’ করি। কারণ আমি জানি, এই ইমোশনাল রিঅ্যাকশনের জন্য এই ফটোকার্ড বানানো হয়েছে। তখন আমি একটু সময় নিই। দুই-তিন ঘণ্টা পর আবার দেখি। অন্য সোর্স চেক করি। তখন বেশির ভাগ সময় দেখি, জিনিসটা পুরো সত্যি নয়। বা এটার কনটেক্সট বা প্রেক্ষাপট আলাদা।
আমাদের আলাপ একটাই। দিনের শেষে এই ‘ডিজিটাল মেইজ’ বা গোলকধাঁধায় হারিয়ে না যাওয়ার রাস্তা একটাই। সেটা হচ্ছে, এই সময়ে চোখ-কান খোলা রাখা, আর প্রতিটি তথ্যের সোর্স নিয়ে একটু ঘেঁটে দেখা বা অনুসন্ধান করা। আমরা যখন অন্ধের মতো সব বিশ্বাস করা বন্ধ করব, তবেই এই সাইকোলজিক্যাল স্নায়ুযুদ্ধে আমাদের নিজেদের বিবেক আর মানসিক শান্তি দুই-ই রক্ষা করতে পারব।
পৃথিবীটা অনেক জটিল হয়ে উঠছে সত্যি, কিন্তু একটু কাণ্ডজ্ঞান আর ধৈর্য থাকলে আমরা ঠিকই সত্য আর মিথ্যার পার্থক্যটা বুঝতে পারব। তবে সবচেয়ে বড় কথা হলো আমাদের ভোট, আমাদের মতামত, আমাদের সিদ্ধান্ত যেন আমাদের নিজেদের চিন্তাভাবনা থেকে আসে। কোনো ফটোকার্ড বা ভাইরাল পোস্ট থেকে নয়।
রকিবুল হাসান টেলিকম, অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় মানবিক রাষ্ট্র বইয়ের লেখক