মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান

মতামত

ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক: সৌদিকে চাপ দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভুল হবে

বড় বড় ঘোষণার ওপর নয়; বরং ওয়াশিংটন কতটা বাস্তব কৌশলগত স্বার্থ আর রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার পার্থক্য বুঝতে পারে, তার ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নির্ভর করছে।

যদি যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তিকে ইসরায়েলের সঙ্গে তাৎক্ষণিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার (নরমালাইজেশন) শর্তের সঙ্গে বেঁধে দেয়, তাহলে তারা দুটি ভিন্ন নীতিগত লক্ষ্যকে একসঙ্গে জোর করে মিলিয়ে ফেলবে।

প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, এতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বাড়বে। কিন্তু বাস্তবে এতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমে যেতে পারে এবং মধ্যপ্রাচ্যে বহুমুখী শক্তির উত্থান আরও দ্রুত হতে পারে।

প্রশ্নটি আসলে এই নয় যে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক হলে তা অঞ্চলের জন্য উপকারী হবে কি না। অনেক যুক্তি আছে যে ভবিষ্যতে এটি উপকারী হতে পারে। তবে আসল প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র কি বাস্তবসম্মতভাবে আশা করতে পারে যে সৌদি আরব তাদের দীর্ঘদিনের অবস্থান ছেড়ে দেবে? সৌদি আরব দুই দশকের বেশি সময় ধরে বলে আসছে যে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিশ্বাসযোগ্য পথ তৈরি হওয়ার পরই ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা সম্ভব।

অনেকে মনে করেন, এটি সৌদি আরবের দর-কষাকষির কৌশল। কিন্তু বাস্তবে এটি একটি স্থায়ী কৌশলগত নীতি। কারণ, সৌদি আরব ২০০২ সালের আরব শান্তি উদ্যোগের প্রধান উদ্যোক্তা ছিল। ওই উদ্যোগে বলা হয়েছিল, ইসরায়েল যদি দখলকৃত অঞ্চল থেকে সরে আসে এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে, তাহলে আরব দেশগুলো তাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করবে।

গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরও সৌদি কর্মকর্তারা বারবার বলেছেন, তাঁদের নীতির ভিত্তি এখনো এই কাঠামো। এই ধারাবাহিক বক্তব্য প্রমাণ করে, এটি সাময়িক অবস্থান নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি।

সৌদি আরবের পররাষ্ট্রনীতি গত দশকে অনেক বদলেছে। ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান দেশের অর্থনীতি পরিবর্তন করেছেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিস্তৃত করেছেন এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করেছেন। তারা ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করেছে, চীন ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেছে এবং ভিশন ২০৩০-এর মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ সংস্কার চালাচ্ছে।

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু

তবে এই বাস্তববাদী পরিবর্তনের মধ্যেও ফিলিস্তিন প্রশ্নে তাদের অবস্থান বদলায়নি। বরং তারা মনে করে, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সমর্থন তাদের আঞ্চলিক গ্রহণযোগ্যতা ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে সৌদি আরবের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তি শুধু দুই দেশের সম্পর্ক নয়, এর কৌশলগত গুরুত্ব আরও বড়। এ চুক্তি প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়াবে, পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধে সহায়তা করবে এবং সৌদি পারমাণবিক খাতের উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বজায় রাখবে।

বর্তমান বিশ্বে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। আগে যুক্তরাষ্ট্র ভাবতে পারত যে তাদের মিত্রদের অন্য কোনো বিকল্প নেই। এখন পরিস্থিতি বদলেছে। চীন উপসাগরীয় অঞ্চলে অর্থনৈতিক প্রভাব বাড়াচ্ছে, রাশিয়া এখনো সক্রিয় এবং মাঝারি শক্তির দেশগুলোও কূটনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়ে উঠছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব এখনো শক্তিশালী হলেও একক নয়।

এ পরিস্থিতিতে শর্ত আরোপের কৌশল নতুনভাবে ভাবতে হবে। শর্ত দিয়ে কূটনীতি তখনই সফল হয়, যখন সেই শর্ত বাস্তবসম্মত এবং সংশ্লিষ্ট দেশের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। কিন্তু যখন কোনো দেশকে তার গুরুত্বপূর্ণ নীতি বদলাতে বলা হয়, তখন তা কার্যকর হয় না।

গাজা যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। আরব বিশ্বে মানুষের মধ্যে ফিলিস্তিনের প্রতি সহানুভূতি বেড়েছে এবং তারা এমন কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে সন্দিহান, যা ফিলিস্তিনের অধিকারকে পাশ কাটায়। সরকারগুলো যেভাবেই সিদ্ধান্ত নিক, জনমতের এ বাস্তবতা উপেক্ষা করা যায় না।

এর মানে এই নয় যে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়া অসম্ভব। বরং সৌদি নেতৃত্ব বারবার বলেছেন, তাঁরা একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক সমাধানের মাধ্যমে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চান। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সময়ের ক্রম। সৌদি আরব চায় আগে ফিলিস্তিন সমস্যার বাস্তব অগ্রগতি, তারপর স্বাভাবিক সম্পর্ক।

যুক্তরাষ্ট্র যদি উল্টোভাবে আগে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার শর্ত দেয়, তাহলে তা সৌদি নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে।

বর্তমান বহুমুখী বিশ্বে প্রভাব শুধু সামরিক বা অর্থনৈতিক শক্তি দিয়ে নির্ধারিত হয় না। প্রকৃত প্রভাব আসে তখনই, যখন একটি দেশ তার মিত্রদের স্থায়ী স্বার্থের সঙ্গে নিজস্ব নীতি মিলিয়ে নিতে পারে। এ বাস্তবতা উপেক্ষা করলে সাময়িক শক্তি প্রদর্শন করা যায়, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী ফল পাওয়া যায় না।

যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের সম্পর্ক আট দশকের বেশি সময় ধরে টিকে আছে। এ সম্পর্ক টিকে থাকার কারণ তারা পারস্পরিক স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়েছে, মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও। এ সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হলে আগের মতোই বাস্তববাদী হতে হবে।

বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তিকে তার নিজস্ব গুরুত্ব দিয়ে মূল্যায়ন করা উচিত। এটি জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এ চুক্তিকে এমন একটি বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত করা, যেখানে সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে অনড় অবস্থানে আছে, তা বাস্তব সহযোগিতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এতে কৌশলগত সুবিধা নয়; বরং ক্ষতি হতে পারে।

কূটনীতি সফল হয় তখনই, যখন তা বাস্তবতা স্বীকার করে। যুক্তরাষ্ট্রের কাজ হওয়া উচিত সৌদি আরবকে তার নীতি বদলাতে বাধ্য করা নয়; বরং এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে আঞ্চলিক শান্তি ও কৌশলগত সহযোগিতা একসঙ্গে সম্ভব হয়। তাই একটির জন্য অন্যটি ত্যাগ করার শর্ত দিলে কোনো লক্ষ্যই অর্জিত হবে না।

  • আহমেদ আলতুয়াইজরি একজন সৌদি শিক্ষাবিদ, আইনজীবী ও কবি

    মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া। সংক্ষেপিত অনুবাদ