বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব ও এর ফলে শিশু মৃত্যুর সাম্প্রতিক মিছিল জাতির বিবেককে নাড়া দিয়েছে। বাংলাদেশ যখন টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগকে কার্যত নিয়ন্ত্রণে সাফল্য দেখিয়েছে, তখন গত কয়েক মাসে কয়েক শ শিশুর প্রাণহানি কেবল স্বাস্থ্য সংকট নয়, এটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার নির্মম প্রতিচ্ছবি।
মরিস হিলেম্যান ষাটের দশকে হামের টিকা আবিষ্কারের পর বিশ্বজুড়ে শিশু মৃত্যুহার নাটকীয়ভাবে কমে আসে। হামের মতো অতিমাত্রায় সংক্রামক রোগ মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে উচ্চমাত্রার টিকাদান নিশ্চিত করে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ গড়ে তোলা। অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ জনগোষ্ঠী টিকার আওতায় এলে পুরো সমাজের জন্য একটি সুরক্ষা বলয় তৈরি হয়, যা সংক্রমণকে ছড়িয়ে পড়তে বাধা দেয়। কিন্তু এই সুরক্ষা বলয় একবার ভেঙে গেলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। বাংলাদেশে আজ আমরা সেই বাস্তবতার মুখোমুখি।
শিশুদের নিয়মিত টিকাদানে ব্যাঘাত, টিকা সরবরাহে বিলম্ব ও নীতিগত অদূরদর্শিতা মিলে একটি কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে বলে কয়েক সপ্তাহ ধরে গণমাধ্যমগুলোয় আলোচনা হচ্ছে। কার্যত প্রতিদিনই নতুন নতুন শিশুর মৃত্যুসংবাদ আমাদের সামনে আসছে, হাসপাতালের করিডরে বাড়ছে স্বজনদের আহাজারি।
একদিকে শিশুরা মারা যাচ্ছে, অন্যদিকে চলছে দোষারোপের রাজনীতি। বর্তমান স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দায় চাপিয়েছে পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকার ও অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর। আবার কোভিডকালীন টিকার ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকার বিষয়টিও সামনে এনেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের কেউ কেউ।
তবে ৫ মে প্রথম আলোয় প্রকাশিত ইউনিসেফের ভারপ্রাপ্ত বাংলাদেশ প্রতিনিধি স্ট্যানলি গুয়াভুইয়ার সাক্ষাৎকার নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইউনিসেফ একাধিকবার অন্তর্বর্তী সরকারের উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করেছে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে সতর্ক করেছে যে টিকার ঘাটতি তৈরি হলে রোগের প্রাদুর্ভাব, জটিলতা ও মৃত্যুহার বাড়বে। অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট মহল আগেই ঝুঁকির বিষয়ে অবগত ছিল।
তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, সারা বিশ্ব যখন হামের টিকা দেওয়াকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে, তখন আমাদের দেশে কেন হামের মতো অত্যাবশ্যকীয় টিকা সংগ্রহে দীর্ঘদিনের ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনার কথা ভাবা হলো? কোন বিবেচনায় টিকা সংগ্রহের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ ক্রয় উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে নেওয়ার সিদ্ধান্তে আগ্রহী হয়েছিলেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা? এ সিদ্ধান্ত নিলে যে টিকা সংগ্রহে এক বছর দেরি হতে পারে, তা ইউনিসেফের কাছ থেকে জানার পরও কেন তাঁরা এ পথে পা দিয়েছিলেন? জনস্বাস্থ্যের জরুরি চাহিদা ও আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যে পার্থক্য বোঝার দায় তো নীতিনির্ধারকদেরই কাঁধে ছিল, তাঁরা কেন ব্যর্থ হয়েছিলেন?
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন অধ্যাপক ইউনূসের ঘনিষ্ঠ সহকর্মীরা। তাঁদের দায়িত্বকাল নিয়ে নানা অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও সিদ্ধান্তগত প্রশ্ন গণমাধ্যমে এসেছিল। কিন্তু এসব প্রশ্নের কার্যকর জবাব কখনো পাওয়া যায়নি।
এখন যখন আন্তর্জাতিক সংস্থার পক্ষ থেকেই টিকা সংগ্রহে বিলম্বের অভিযোগ উঠছে, তখন বিষয়টি আর রাজনৈতিক তর্কের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি জনস্বার্থে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি তোলে। স্বাস্থ্য উপদেষ্টার নিজের স্বাস্থ্য ভালো ছিল না, এ যুক্তি দেখিয়ে যাঁরা পার পাওয়ার চেষ্টা করেছেন, তাঁরা দয়া করে বলবেন, তাহলে কেন তিনি ওই চেয়ার ধরে বসে ছিলেন?
হামে আক্রান্ত হয়ে এই শিশুদের মৃত্যু কোনো অনিবার্য প্রাকৃতিক ঘটনা নয়; প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগে প্রাণহানি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার ইঙ্গিত বহন করে। তাই দায়নির্ধারণ, জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ ও বিচার্ই— তিনটি প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
এ ঘটনায় যাঁরাই জড়িত থাকুক, অন্তত বিএনপি সরকার তো দায়িত্বে ছিল না। তবে এখন যেহেতু দায়িত্ব কাঁধে পড়েছে, তখন নিজেদের স্বচ্ছতার খাতিরে হলেও বর্তমান সরকারের উচিত অবিলম্বে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন গঠন করা। সেখানে জাতীয় বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। তদন্তে স্পষ্ট করতে হবে, কারা টিকা ক্রয়ে বিলম্ব করেছে, কার সিদ্ধান্তে উন্মুক্ত দরপত্রের বিষয়টি সামনে এসেছে, কোন পর্যায়ে সিদ্ধান্ত আটকে ছিল এবং সর্বোচ্চ নেতৃত্ব এ বিষয়ে কতটা অবগত ছিল।
তবে জবাবদিহি শুধু অতীত অনুসন্ধানে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। বর্তমান সংকট মোকাবিলায় সরকারকে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। দ্রুত জরুরি চিকিৎসার অভাব ও দীর্ঘসূত্রতা, আইসিইউ–সুবিধার স্বল্পতার কারণেও শিশুদের মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোয় আইসিইউ–সুবিধা কম, শিশুদের জন্য আরও কম। বিভাগীয় হাসপাতাল ও শিশু হাসপাতালগুলোয় শিশুদের জন্য আইসিইউ–সুবিধা বাড়াতে হবে। অনেক জায়গায় শিশু হাসপাতাল নির্মিত হওয়ার পর কয়েক বছর ধরে পড়ে আছে, সেগুলো চালু করতে হবে।
সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালেও হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে পাহাড়ি অঞ্চল ও প্রান্তিক এলাকায় বিশেষ নজর দিতে হবে। আক্রান্ত শিশুদের জন্য বিনা মূল্যে চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও আইসোলেশন সুবিধা দিতে হবে। যেসব পরিবার সন্তান হারিয়েছে, তাদের জন্য ক্ষতিপূরণ ও মানসিক সহায়তার ব্যবস্থাও জরুরি।
সবচেয়ে বড় কথা, শিশুদের মৃত্যু নিয়ে কোনো রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা না করে এটিকে জনস্বাস্থ্য বিপর্যয় হিসেবে দেখা প্রয়োজন। যে শিশুর মরদেহ কোলে নিয়ে মা-বাবা হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদছেন, সেই শিশুর কোনো অপরাধ ছিল না। রাষ্ট্রের নীতিগত ব্যর্থতা, সিদ্ধান্তহীনতা কিংবা প্রশাসনিক বিলম্বের দায় তার কাঁধে চাপানো যায় না।
হামে আক্রান্ত হয়ে এই শিশুদের মৃত্যু কোনো অনিবার্য প্রাকৃতিক ঘটনা নয়; প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগে প্রাণহানি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার ইঙ্গিত বহন করে। তাই দায় নির্ধারণ, জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ ও বিচার—এই তিনটি প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
ইতিবাচক দিক হলো, নতুন সরকার অন্তত পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে জরুরি ভিত্তিতে টিকা সংগ্রহ ও ক্যাম্পেইনের উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু হার্ড ইমিউনিটি একবার ভেঙে গেলে শুধু টিকা এনে তাৎক্ষণিক সমাধান সম্ভব নয়। এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে সময় লাগবে। তাই টিকাদান কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্ন রাখা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে বিশেষ নজরদারি চালানো জরুরি।
আমাদের রাষ্ট্রকে মনে রাখতে হবে, প্রতিটি শিশুর জীবন শুধু একটি পরিবারের নয়, একটি জাতির ভবিষ্যৎ। সেই ভবিষ্যৎ রক্ষায় ব্যর্থতার দায় কেউ এড়াতে পারে না। হামে শিশুমৃত্যুর এই ট্র্যাজেডির পূর্ণ সত্য উদ্ঘাটন করা হোক, দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনা হোক এবং ভবিষ্যতে যেন আর কোনো পরিবারকে এমন শোক বইতে না হয়, সেটিই এখন জাতির দাবি।
ড. নাদিম মাহমুদ গবেষক, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়। ইমেইল: nadim.ru@gmail.com
মতামত লেখকের নিজস্ব