বাব আল–মানদেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ
বাব আল–মানদেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ

মতামত

হুতিদের হাতে বাব আল-মানদেব গেলে যা হবে

যুদ্ধে কখনো একটি কৌশলগত পদক্ষেপ বড় ধরনের কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন করে। আবার বড় কৌশলগত পরিকল্পনাও যুদ্ধক্ষেত্রে সাময়িক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ইয়েমেনের সাম্প্রতিক লড়াই, বিশেষ করে হুতিদের মোকা শহরে প্রবেশের ঘটনা, এ বাস্তবতাই স্পষ্ট করে।

ইয়েমেনের যুদ্ধকে শুধু স্থানীয় সংঘাত হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত তাৎপর্য বোঝা যাবে না। হুতিদের পাশাপাশি সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত-সমর্থিত বিভিন্ন গোষ্ঠীর লড়াই গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, সমুদ্রপথ ও কৌশলগত স্থানের নিয়ন্ত্রণের লড়াইও। মোকা শহর ও উপকূলের কাছের দ্বীপগুলো তাই শুধু একটি শহর দখলের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তায়েজ থেকে উপকূল, পশ্চিম উপকূলীয় এলাকা, ধুবাব এবং শেষ পর্যন্ত বাব আল-মানদেব প্রণালির ইয়েমেনি অংশের নিয়ন্ত্রণ।

মোকা দখলের ফলে তায়েজ ও ইয়েমেনের অভ্যন্তর থেকে পশ্চিম উপকূলে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আঞ্চলিকভাবে এটি ইরান ও তার মিত্রদের প্রভাব বাড়িয়েছে। দুটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথে চাপ সৃষ্টি করার সক্ষমতা ইরানের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও তাদের মিত্রদের সঙ্গে শক্তির ভারসাম্য বদলে দিতে পারে।

মোকা পতনের পর ধুবাবে হুতিদের পৌঁছে যাওয়া পরিস্থিতিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করেছে। ধুবাব সরাসরি বাব আল-মানদেবের দিকে তাকিয়ে আছে। ফলে লড়াইটি এখন শুধু একটি শহর বা বন্দরের জন্য নয়; বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের স্থল ও সমুদ্রপথের প্রবেশাধিকার নিয়েও।

হুতিদের এই অগ্রযাত্রা সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনীগুলোর সাংগঠনিক দুর্বলতা প্রকাশ করেছে। ৩ থেকে ৭ সেপ্টেম্বর পাঁচ দিনের সংঘর্ষে আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা প্রকল্পের হিসাবে ২৭৬ জন নিহত হয়েছেন। সৌদি, মার্কিন এবং সম্ভবত ইসরায়েলি পাল্টা প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সৌদি বাহিনী ইতিমধ্যে মোকা বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছে।

ইরান হরমুজ প্রণালিতে প্রভাব রাখার পাশাপাশি হুতিদের মাধ্যমে বাব আল-মানদেবেও চাপ সৃষ্টি করতে পারলে সৌদি আরব তার তেল রপ্তানির তুলনামূলক নিরাপদ পথ—দুই দিক থেকেই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এ কারণে রিয়াদ সরাসরি হস্তক্ষেপে বাধ্য হতে পারে।

পরিস্থিতি তিনটি দিক থেকে দেখা দরকার। প্রথমত, কে কোন ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছে। দ্বিতীয়ত, বাব আল-মানদেবের কাছের উপকূল ব্যবহার করে সমুদ্রবাণিজ্য, যুদ্ধজাহাজ ও বিমানবাহী রণতরিতে হুমকি দেওয়ার সক্ষমতা কার হাতে যাচ্ছে। তৃতীয়ত, ইরান তার আঞ্চলিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে বৃহত্তর সংঘাতে বাব আল-মানদেবকে কতটা চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে।

হুতিরা ইতিমধ্যে হোদেইদার দক্ষিণের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নিয়ন্ত্রণ শক্ত করেছে। তায়েজ ও পশ্চিম উপকূলের সরবরাহপথ দুর্বল করেছে। মোকা দখলের মাধ্যমে তারা হুতিবিরোধী বাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ কমান্ড ও সরবরাহকেন্দ্রও নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। এরপর পেরিম দ্বীপ ও বাব আল-মানদেবের দিকে অগ্রসর হয়ে তারা নজরদারি, চাপ সৃষ্টি ও হুমকি দেওয়ার সক্ষমতা বাড়িয়েছে। তবে এর অর্থ পুরো সমুদ্রপথের ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা নয়।

হুতিবিরোধী পক্ষ তায়েজ, হোদেইদা, আদ-দালি, আল-বায়দা, মারিব, শাবওয়া ও আল-জাওফকে ঘিরে একাধিক ফ্রন্টে অভিযান চালিয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল হুতিদের ক্লান্ত করা এবং পশ্চিম উপকূলে তাদের শক্তি কেন্দ্রীভূত করতে না দেওয়া। কিন্তু এতে সৌদি আরব ও তার মিত্রদের সুসংহত আঞ্চলিক সামরিক কৌশলের অভাবও স্পষ্ট হয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর হুতিদের সামরিক সক্ষমতা ও নির্ভুল হামলার কার্যকারিতা বারবার দেখা গেলেও সৌদি আরব সেই শিক্ষা যথেষ্ট গ্রহণ করেনি।

ইয়েমেনের হুতি যোদ্ধারা

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নির্বাচনের আগে অভিযান শুরুর সময়টিও ইরানকে ঘিরে সুস্পষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য দেখায় না; বরং তখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে সমন্বয় বাড়ছিল। গত মাসে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের স্বাক্ষরিত মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির জন্যও এটি একটি বড় পরীক্ষা।

তবে হুতিদের অগ্রযাত্রা তাদের জন্যও কঠিন পরীক্ষা। দক্ষিণে এগোলে তাদের সরবরাহপথ দীর্ঘ হবে এবং অবস্থান বিমান হামলা, সমুদ্র অভিযান ও পাল্টা আক্রমণের কাছে বেশি উন্মুক্ত হবে। মোকা ও ধুবাব নিয়ন্ত্রণের অর্থ শুধু যুদ্ধ করা নয়; সড়ক, বন্দর ও অবকাঠামো নিরাপদ রাখা এবং স্থানীয় ও বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠী সামলানোও। মোকা বিমানবন্দরে সৌদি হামলার লক্ষ্য সম্ভবত হুতিদের জনবল, ড্রোন ও গোলাবারুদ জড়ো করার সক্ষমতা কমানো।

মোকা থেকে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর প্রত্যাহার বাহিনী পুনর্গঠনের জন্য সামরিকভাবে যুক্তিযুক্ত হতে পারে। কিন্তু এর রাজনৈতিক ও সামরিক মূল্য অনেক। এর ফলে হুতিরা দ্রুত গতি পেয়ে বাব আল-মানদেবের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে।

হুতিবিরোধী শিবিরের বড় দুর্বলতা হলো অভ্যন্তরীণ বিভাজন। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কর্তৃপক্ষ, তারেক সালেহর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্স, তায়েজের বিভিন্ন বাহিনী, দক্ষিণাঞ্চলীয় বাহিনী এবং বিভিন্ন উপজাতীয় ও স্থানীয় গোষ্ঠীর লক্ষ্য এক নয়।

সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ইয়েমেন-ভাবনাও পুরোপুরি এক নয়। কেউ কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চায়, কেউ দক্ষিণের স্বায়ত্তশাসন চায়, কেউ বন্দর, উপকূল ও স্থানীয় প্রভাবকে বেশি গুরুত্ব দেয়। বাব আল-মানদেবের দিকে যুদ্ধ যত এগোবে, এই বিভাজনের মূল্য তত বাড়বে। মূল প্রশ্ন তাই হুতিদের থামানো নয় শুধু; রাজনৈতিক বিভাজন পেরিয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ সামরিক কমান্ড গড়ে তোলা সম্ভব কি না।

হুতিদের ধুবাবে পৌঁছানো সৌদি আরবের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। ইরান হরমুজ প্রণালিতে প্রভাব রাখার পাশাপাশি হুতিদের মাধ্যমে বাব আল-মানদেবেও চাপ সৃষ্টি করতে পারলে সৌদি আরব তার তেল রপ্তানির তুলনামূলক নিরাপদ পথ—দুই দিক থেকেই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এ কারণে রিয়াদ সরাসরি হস্তক্ষেপে বাধ্য হতে পারে।

অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হুতিদের ওপর হামলা চালানোর অনুরোধ করেছিলেন। ট্রাম্প আপাতত সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপে রাজি হননি। তবে ওয়াশিংটন সৌদি আরবকে গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে। এতে বোঝা যায়, সৌদি আরব আন্তর্জাতিক সমর্থন বাড়াতে চাইছে আর যুক্তরাষ্ট্র ইয়েমেনে নতুন সরাসরি যুদ্ধ এড়িয়ে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা রক্ষা ও অযুদ্ধ সহায়তায় সীমাবদ্ধ থাকতে চায়।

এর ফলে সৌদি আরব যেন ২০১৫ সালের ইয়েমেন যুদ্ধের শুরুতে ফিরে যাচ্ছে। অতীতে বাইডেন প্রশাসন এই যুদ্ধকে সৌদি আরবের ওপর চাপ তৈরিতে ব্যবহার করেছিল। এখন ট্রাম্পের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করাও রিয়াদের জন্য সম্ভব হচ্ছে না। হুতিরা চাইলে সৌদি আরবের গভীরে জ্বালানি অবকাঠামোয় বড় আঘাত করতে পারে। তখন রিয়াদকে অতীতের মতোই অনিচ্ছায় পরিস্থিতি মেনে নিতে হতে পারে।

  • শাদি ইব্রাহিম ইস্তাম্বুল সাবাহাত্তিন জাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইসলাম অ্যান্ড গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের গবেষণা সহযোগী

    মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ