বাংলাদেশে তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় থাকা মানুষের সংখ্যা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ
বাংলাদেশে তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় থাকা মানুষের সংখ্যা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ

সেলিম রায়হানের কলাম

খাদ্যনিরাপত্তার সতর্কবার্তা উপেক্ষা করা যাবে না

২০২৬ সালের গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস বাংলাদেশকে নিয়ে একটি অস্বস্তিকর বার্তা দিয়েছে। বাংলাদেশ দুর্ভিক্ষের মুখে নেই কিংবা বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ খাদ্যসংকটের দেশগুলোর মধ্যেও পড়ে না। তবু দেশটি এমন এক তালিকায় উঠে এসেছে, যেখানে কোনো দেশই থাকতে চাইবে না। ২০২৫ সালে উচ্চ মাত্রার তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় থাকা মানুষের সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ ১০ দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে রয়েছে।

প্রতিবেদনের হিসাবে, ২০২৫ সালের সর্বোচ্চ সময়ে বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ সংকট পর্যায় বা তার চেয়েও বেশি মাত্রার তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মুখে ছিল। এর মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৫৬ লাখ মানুষ ছিল ‘ক্রাইসিস’ পর্যায়ে এবং প্রায় ৪ লাখ মানুষ ছিল ‘ইমার্জেন্সি’ পর্যায়ে। এ সংখ্যা বিশ্লেষিত জনগোষ্ঠীর ১৭ শতাংশ, যদিও প্রতিবেদনে এটিও বলা হয়েছে যে বিশ্লেষণের আওতায় ছিল দেশের মোট জনসংখ্যার ৫৯ শতাংশ, পুরো জনসংখ্যা নয়।

এ সংখ্যাকে সতর্কতার সঙ্গে পড়তে হবে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে বাংলাদেশের পরিস্থিতির কিছু উন্নতি হয়েছে। উচ্চ মাত্রার তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় থাকা মানুষের সংখ্যা ৭৬ লাখ কমেছে।

এ উন্নতির পেছনে বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ২০২৫ সালের শুরুর দিকে বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের অনুপস্থিতি, খাদ্য মূল্যস্ফীতির কিছুটা হ্রাস ও প্রবাসী আয় বৃদ্ধিকে। কিন্তু এখানেই উদ্বেগের জায়গাটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তুলনামূলকভাবে ভালো একটি বছরেও, যখন বড় দুর্যোগের ধাক্কা কম ছিল ও খাদ্য মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা শিথিল হয়েছিল, তখনো বাংলাদেশে তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় থাকা মানুষের সংখ্যা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ।

বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার সমস্যা শুধু বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা কিংবা হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধির ফল নয়। এসব ধাক্কা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে দ্রুত বিপদে ঠেলে দেয়। কিন্তু খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার স্থায়িত্ব আরও কাঠামোগত সমস্যার কথা বলে। নিম্ন ও অনিশ্চিত আয়, দুর্বল ক্রয়ক্ষমতা, আঞ্চলিক বৈষম্য, জলবায়ুঝুঁকি, অপুষ্টি এবং সামাজিক সুরক্ষার ঘাটতি—সবই এর সঙ্গে জড়িত। অনেক পরিবারের ক্ষেত্রে সংকটটি বাজারে খাদ্যের অভাব নয়। সংকট হলো খাদ্য কেনার সামর্থ্যের অভাব, পুষ্টিকর খাবারের অভাব এবং সংকট সামলানোর আগের উপায়গুলোও প্রায় শেষ হয়ে যাওয়া।

এখানে মূল্যস্ফীতির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি দরিদ্র মানুষের জন্য সাময়িক অসুবিধা ছিল না। এটি পরিবারের আচরণ বদলে দিয়েছে। অনেক পরিবার প্রোটিন গ্রহণ কমিয়েছে, অপেক্ষাকৃত সস্তা খাদ্যের দিকে ঝুঁকেছে, স্বাস্থ্য ব্যয় পিছিয়েছে, অনানুষ্ঠানিক উৎস থেকে ঋণ নিয়েছে এবং শিশুদের প্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়েছে।

চাল, ভোজ্যতেল, ডাল, ডিম, মাছ ও সবজির দাম যখন দীর্ঘ সময় ধরে বেশি থাকে, তখন ক্ষতি শুধু অর্থনৈতিক থাকে না, সেটি পুষ্টিগত ক্ষতিতে রূপ নেয়। শিশুরা নীরবে ভোগে। নারীরা অনেক সময় সবার শেষে খান, কম খান। দরিদ্র পরিবারের বয়স্ক মানুষেরা আরও বেশি অনিশ্চিত সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।

২০২৫ সালে প্রবাসী আয় কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে। এটি ইতিবাচক। কিন্তু এটিকে আত্মতুষ্টির কারণ বানানো যাবে না। প্রবাসী আয়ের সুবিধা অঞ্চল ও পরিবারের মধ্যে সমানভাবে ছড়ায় না। এটি অনেক পরিবারকে সহায়তা করে, কিন্তু জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা কৌশলের বিকল্প হতে পারে না। যে পরিবারে প্রবাসী কর্মী নেই, যে ভূমিহীন শ্রমিক মৌসুমি বেকারত্বে পড়ে, যে শহুরে অনানুষ্ঠানিক শ্রমিক উচ্চ ভাড়া দিয়ে কোনোরকমে টিকে থাকে কিংবা যে নারীপ্রধান পরিবারের আয়ের সুযোগ সীমিত, তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রবাসী আয়ের সুবিধা পায় না। তাই খাদ্যনিরাপত্তার প্রশ্নটি একই সঙ্গে বৈষম্যের প্রশ্ন।

জলবায়ু-সহনশীলতাকে খাদ্যনিরাপত্তা নীতির অংশ হিসেবে দেখতে হবে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ, লবণাক্ততা ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু-সহনশীল ফসল, ফসলবিমা, সংরক্ষণাগার, গ্রামীণ সড়ক ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা কোনো বিচ্ছিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প নয়, এগুলো জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার অবকাঠামোর অংশ।

রোহিঙ্গা পরিস্থিতি এ সংকটে আরেকটি মাত্রা যোগ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক রোহিঙ্গা আগমন, বন্যা এবং মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের দুই জেলায় জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের মধ্যে তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে। এটি শুধু মানবিক সংকট নয়, এটি কক্সবাজার ও আশপাশের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্যও একটি উন্নয়ন সংকট। সহায়তা কমে গেলে স্থানীয় শ্রমবাজার, বন, জনসেবা, পানিসম্পদ এবং সামাজিক সম্পর্কের ওপর চাপ বাড়ে। বাংলাদেশ বহু বছর ধরে এই বোঝা বহন করছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত নয় এই সংকটকে ভুলে যাওয়া সংকটে পরিণত করা।

প্রথম নীতিগত শিক্ষা পরিষ্কার। খাদ্যনিরাপত্তা নীতিকে খাদ্যের সরবরাহের বাইরে নিয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশ চাল উৎপাদন বৃদ্ধি এবং প্রধান খাদ্যের সরবরাহ বজায় রাখার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। কিন্তু খাদ্যনিরাপত্তা শুধু সরবরাহের বিষয় নয়। এটি খাদ্যের ওপর অধিকার, পুষ্টি, স্থিতিশীলতা ও মর্যাদার বিষয়ও। নীতির প্রশ্নটি তাই ‘দেশে পর্যাপ্ত চাল আছে কি না’ থেকে সরে গিয়ে হওয়া উচিত, ‘দরিদ্র পরিবারগুলো সারা বছর পুষ্টিকর খাবার কিনতে পারছে কি না।’ এর জন্য শুধু সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি নয়, নিয়মিতভাবে খাদ্যঝুড়ির ব্যয় পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, সামাজিক সুরক্ষাকে আরও দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল করতে হবে। বাংলাদেশে বহু কর্মসূচি আছে, কিন্তু সেগুলোর অনেকই খণ্ডিত, লক্ষ্যভ্রষ্ট এবং প্রশাসনিকভাবে ধীর। দাম বাড়লে, বন্যা হলে অথবা মৌসুমি কর্মসংস্থান কমে গেলে খাদ্যনিরাপত্তাহীন পরিবারগুলোর দ্রুত নগদ বা খাদ্যসহায়তা প্রয়োজন। ডিজিটাল ডেটাবেজ সহায়ক হতে পারে, তবে সেটি হালনাগাদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হতে হবে। শহুরে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার দিকেও বেশি নজর দিতে হবে; কারণ, নিম্ন আয়ের শহুরে পরিবারগুলো তাদের প্রায় সব খাদ্য বাজার থেকে কিনে থাকে।

তৃতীয়ত, বাজার ব্যবস্থাপনায় উন্নতি জরুরি। দুর্বল প্রতিযোগিতা, তথ্যের ঘাটতি, মজুত ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং অপরিকল্পিত আমদানি সিদ্ধান্ত অনেক সময় মূল্য অস্থিরতা বাড়িয়ে দেয়। একটি বিচক্ষণ খাদ্যবাজার নীতিতে থাকতে হবে উন্নত সরকারি মজুত ব্যবস্থাপনা, প্রয়োজনমতো সময়োপযোগী আমদানি, স্বচ্ছ বাজার তথ্য এবং যোগসাজশমূলক আচরণের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা। কৃষককে ন্যায্য দাম পেতে হবে, কিন্তু ভোক্তাকে অযৌক্তিক বাজার কারসাজির কাছে জিম্মি রাখা যাবে না।

চতুর্থত, পুষ্টিকে খাদ্যনীতির কেন্দ্রে আনতে হবে। লক্ষ্য শুধু ক্যালরি পূরণ হওয়া নয়। স্কুল ফিডিং, মাতৃপুষ্টি, শিশুপুষ্টি সেবা, পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা—সবই গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা ও অপুষ্টি পরস্পর সম্পর্কিত, তবে এক জিনিস নয়। একটি পরিবার প্রতিদিন খাবার খেতে পারে, তবু পুষ্টিহীনতায় ভুগতে পারে।

শেষত, জলবায়ু-সহনশীলতাকে খাদ্যনিরাপত্তা নীতির অংশ হিসেবে দেখতে হবে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ, লবণাক্ততা ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু-সহনশীল ফসল, ফসলবিমা, সংরক্ষণাগার, গ্রামীণ সড়ক ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা কোনো বিচ্ছিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প নয়, এগুলো জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার অবকাঠামোর অংশ।

অতএব, জিআরএফসি ২০২৬ প্রতিবেদনকে ব্যর্থতার রায় হিসেবে নয়, সতর্কবার্তা হিসেবে পড়া উচিত। বাংলাদেশ অগ্রগতি করেছে এবং ২০২৫ সালে কিছু উন্নতিও দেখা গেছে। কিন্তু ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ উচ্চ মাত্রার তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় থাকা একটি বড় সংখ্যা, খুবই বড়। বিশেষ করে এমন একটি দেশের জন্য, যে দেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ এবং উচ্চ-মধ্যম আয়ের লক্ষ্যের দিকে এগোতে চায়।

আসল পরীক্ষা হলো স্বাভাবিক বছরে বাংলাদেশ পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদন করতে পারে কি না, সেটি নয়। আসল পরীক্ষা হলো দাম বাড়লে, বন্যা এলে, কাজ হারালে কিংবা সহায়তা কমে গেলে প্রতিটি পরিবার নিয়মিত, পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবার পায় কি না। সেই পরীক্ষায় বাংলাদেশকে এখনো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে।

সেলিম রায়হান অর্থনীতির অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং নির্বাহী পরিচালক, সানেম

selim.raihan@gmail.com

* মতামত লেখকের নিজস্ব