সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজায় শোকাহত লাখো মানুষ অংশ নেন। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন নেতা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজায় শোকাহত লাখো মানুষ অংশ নেন। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন নেতা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে

মতামত

একটি কফিনকে ঘিরে দাঁড়িয়ে ছিল পুরো বাংলাদেশ

চার দশকের বেশি সময় ধরে নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম, ত্যাগ আর আপসহীন নেতৃত্বের এক দীর্ঘ অধ্যায় শেষে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। শারীরিকভাবে তিনি আর আমাদের মধ্যে নেই, কিন্তু তাঁর জীবন, আদর্শ ও সংগ্রাম বাংলাদেশের ইতিহাসে এমনভাবে মিশে আছে, যা সহজে মুছে যাওয়ার নয়। সময় যত যাবে, রাজনীতির ভাষা যত বদলাবে, বেগম খালেদা জিয়ার নাম ততই উচ্চারিত হবে একজন দৃঢ়চেতা, সাহসী, বিচক্ষণ ও মানবিক নেত্রী হিসেবে।

রাজনীতির মাঠে বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন আপসহীন। ব্যক্তিত্বে ছিলেন দৃঢ়। সিদ্ধান্তে ছিলেন নির্ভীক। আবার মানুষ হিসেবে ছিলেন গভীরভাবে মানবিক। রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে থেকেও তিনি সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট ভুলে যাননি। ক্ষমতায় থাকুন বা বিরোধী দলে—দেশের মানুষের অধিকার, ভোটের অধিকার ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে তিনি কখনো পিছু হটেননি। আমি দীর্ঘ সময় দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিশেষ সহকারী হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। কাছ থেকে দেখেছি তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, তাঁর মানবিক দিক। তিনি এমন একজন মানুষ, যিনি নিজের জীবনকে সম্পূর্ণভাবে উৎসর্গ করেছেন এ দেশের মাটি ও মানুষের জন্য।

বেগম খালেদা জিয়াকে মানুষ কতটা ভালোবাসত, এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ পাওয়া গেছে তাঁর জানাজায়। লাখো মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি, অশ্রুসিক্ত চোখ, নীরব প্রার্থনা—সব মিলিয়ে সেদিন একটি কফিনকে ঘিরে দাঁড়িয়ে ছিল পুরো বাংলাদেশ। মানুষ শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে নয়, বিদায় জানিয়েছে তাদের প্রিয় দেশনেত্রীকে। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু তাঁকে যেন জীবনের চেয়েও বেশি প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে। একবিংশ শতাব্দীর রাজনীতিতে কোনো নেত্রীর মৃত্যু ঘিরে বিশ্বজুড়ে এমন শোক ও প্রতিক্রিয়া সত্যিই বিরল। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌসের মেহমান হিসেবে কবুল করুন—এটাই আমাদের প্রার্থনা।

একজন সাধারণ বাঙালি গৃহবধূ হিসেবে রাজনীতিতে পা রেখে তিনি ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিলেন দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। এই চার দশকের পথচলায় তিনি বাংলাদেশের রাজনীতির প্রায় সব উত্থান-পতনের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ও অংশীজন ছিলেন। স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণমানুষের অধিকার রক্ষার সংগ্রামে তাঁকে সহ্য করতে হয়েছে জেল-জুলুম, নির্যাতন ও অবিচার।

খালেদা জিয়ার লড়াই ছিল মানুষের মুক্তির লড়াই। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মেয়েরা সাহস, আত্মমর্যাদা ও সংগ্রামে বেগম খালেদা জিয়ার মতো হতে চাইবেন—এ-ই তাঁর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর খালেদা জিয়াকে ক্যান্টনমেন্টে বসবাসের জন্য একটি বাড়ি দেওয়া হয়েছিল। সেই বাড়ি থেকেও তাঁকে উচ্ছেদ করা হয়। গুরুতর অসুস্থ হওয়ার পরও বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ তিনি পাননি। মালয়েশিয়ায় নির্বাসিত অবস্থায় তাঁর এক সন্তানের মৃত্যু হয়। আরেক সন্তানকে দীর্ঘদিন লন্ডনে নির্বাসনে থাকতে হয়েছে। নিজে ছিলেন গৃহবন্দী। কিন্তু এত কষ্ট, এত শোক, এত নিপীড়নের পরও তিনি থেমে যাননি। মানুষের ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই চালিয়ে গেছেন অবিচলভাবে—এ-ই ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া।

জিয়াউর রহমান হত্যার পর বিচারপতি আবদুস সাত্তারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় দলের একটি অংশ তাঁকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী করার প্রস্তাব দিয়েছিল। সে সময় তিনি ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিলে তাঁর রাজনৈতিক জীবন হয়তো অন্যভাবে এগোতে পারত। কিন্তু বেগম জিয়া ছিলেন হার না মানা মানুষ। স্বৈরশাসক এরশাদের বিরুদ্ধে টানা ৯ বছরের আপসহীন আন্দোলনে বেগম খালেদা জিয়া নেতৃত্ব দিয়েছেন। কোনো দেশবিরোধী শক্তির সঙ্গে তিনি কখনো আপস করেননি। তবে জনগণের মতামতকে তিনি সব সময় গুরুত্ব দিয়েছেন। জীবনে কোনো নির্বাচনে তিনি পরাজিত হননি।

রাজনীতিতে না এলে বেগম খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত জীবন হয়তো অনেক বেশি স্বস্তির হতো। একজন সেনাপ্রধানের স্ত্রী, একজন বীর উত্তমের স্ত্রী, একজন রাষ্ট্রপতির স্ত্রী হিসেবে তিনি সম্মান ও নিরাপত্তার অভাব অনুভব করতেন না। কিন্তু দেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় রাজনীতিতে যেভাবে নিজেকে যুক্ত করলেন, রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতে হয়—কঠিনেরে ভালোবাসিলেন। ৩০ বছর আগে বাংলাদেশের মতো একটি দেশে একজন মুসলিম নারীর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার লড়াই সহজ ছিল না।

আপসহীন খালেদা জিয়া সামরিক স্বৈরশাসক এরশাদকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করে জয় নিয়েই ঘরে ফিরেছেন। তাঁর শাসনামলে নারীশিক্ষায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দেশের রাজনৈতিক কাঠামো ফিরে পেয়েছে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা।

৮০ বছরের জীবনে ৪০ বছরের বেশি সময় রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা সহজ কথা নয়। তিনি তিনবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। বহুবার সংসদে ও রাজপথে বিরোধী দলের নেত্রী হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ভোটাধিকার ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপসহীন প্রতীক। কারাবন্দী ও গৃহবন্দী করে রাখার পরেও বেগম খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা কখনো কমেনি, বরং বেড়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী রাজনৈতিক সংকটে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সবার অভিভাবক।

বেগম খালেদা জিয়ার মতো নেতা যুগে যুগে জন্মান না। তিনি কী ছিলেন, তা এখন আরও স্পষ্ট—যখন তিনি নেই। তাঁর মুক্তির দাবিতে প্রতিদিন রাজপথ কেঁপেছে। আজও রাজপথে তাঁর নামেই স্লোগান ওঠে। ‘প্রিয় দেশবাসী’—এই ডাক শোনার অপেক্ষায় ছিল বাংলাদেশ। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করতেই যেন বেগম খালেদা জিয়ার জন্ম। তিনি হারেন না, থেমে যান না—বারবার ঘুরে দাঁড়ান। শতবার। বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন গণতন্ত্রের এক জীবন্ত কিংবদন্তি।

খালেদা জিয়ার লড়াই ছিল মানুষের মুক্তির লড়াই। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মেয়েরা সাহস, আত্মমর্যাদা ও সংগ্রামে বেগম খালেদা জিয়ার মতো হতে চাইবেন—এ-ই তাঁর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার। অমর দেশপ্রেম, আপসহীন সংগ্রাম আর অসীম ত্যাগের প্রতীক হয়ে বেগম খালেদা জিয়া বেঁচে থাকবেন বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ের গভীরে। তাঁর আদর্শ সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ধারণ করাই হবে তাঁর প্রতি আমাদের প্রকৃত শ্রদ্ধা।

  • শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস সদ্য প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার বিশেষ সহকারী এবং জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সমন্বয়ক

    *মতামত লেখকের নিজস্ব