পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর-
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর-

মতামত

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ফলাফল বাংলাদেশের জন্য কী প্রভাব ফেলবে

ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসকে এইবার হারাতে পারবে কি না, তা ৪ মে ভোট গণনা সম্পন্ন হওয়ার পর জানা যাবে। বাংলাদেশেও অনেকে এই নির্বাচনের ফলাফলের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখবেন।

প্রশ্ন হচ্ছে, এই নির্বাচনে কে জিতলে বাংলাদেশের লাভ বেশি? বাংলাদেশের একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিককে প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করেছিলাম। তাঁর মতে, ‘মমতা আমাদের পশ্চিম সীমান্তে একটা “বাফার” তৈরি করেছেন। ভারতের বিজেপিশাসিত সরকারগুলো যেসব সাম্প্রদায়িকতা ও সংকীর্ণতা চর্চা করছে, পশ্চিমবঙ্গ সেই সব থেকে মুক্ত।’

তাঁর মতো অনেকে বলতে চান, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার বসলে, সীমান্তের দুপাশের জনগণের অস্থিরতা বাড়বে। পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানেরা তো বটেই, বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়বে।

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধীদলীয় নেতা ও বিজেপির নেতা শুভেন্দু অধিকারীকে কট্টরদের মধ্যে কট্টরতম ধরা যায়। শুভেন্দু তাঁর দলের হিন্দুত্ববাদী আদর্শ অনুসরণ করে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অনুভূতি কাজে লাগিয়ে রাজ্যের রাজনীতিকে মেরুকরণ করছেন।

বাংলাদেশ নিয়ে শুভেন্দু অধিকারী বিভিন্ন সময় যেসব বক্তব্য দিয়েছেন, সেগুলো নিয়ে চরম সমালোচনা তৈরি হয়েছে। ‘ইসরায়েল যেমন শিক্ষা দিয়েছে গাজাকে!’ সেভাবে বাংলাদেশকে সবক শেখানোর পক্ষে শুভেন্দু। আরেকবার তিনি মন্তব্য করেছিলেন, ‘বাংলাদেশকে ধ্বংস করতে ভারতের চার-পাঁচটা ড্রোনই যথেষ্ট।’

ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এবং নির্বাচন কমিশন কিছুদিন আগে পশ্চিমবঙ্গের ৬০ লাখেরও বেশি নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে, যা মোট ভোটারের প্রায় ৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ। বাদ দেওয়া ওই ভোটারদের বলা হচ্ছে, তাঁরা অনুপ্রবেশকারী। আপাতদৃষ্টিতে এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ সমস্যা মনে হলেও, ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য এর তাৎপর্য হতে পারে প্রচুর।

এই নিয়ে দুই মাস ধরে তীব্র বাদানুবাদ চলছে বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যে। তৃণমূল বলছে, এরা তৃণমূলের ভোটার এবং মোদি সরকার বেছে বেছে বিশেষ গোষ্ঠীর লোকদের বাদ দিয়েছে।

তিনি বিষয়টি নিয়ে দিল্লিতে গিয়ে নির্বাচন কমিশনে প্রতিবাদ জানিয়েছেন এবং ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের কাছে বিচার চেয়েছেন। সুপ্রিম কোর্ট একটি বড় আকারের বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছেন।

ভারত সরকারের এই উদ্যোগ বাংলাদেশের জন্যও বিপদ ডেকে আনতে পারে। আসামসহ ভারতের অন্যান্য বিজেপিশাসিত অঞ্চলে গত এক বছরে বিপুলসংখ্যক ভারতীয় নাগরিককে কাগজপত্র না থাকার অজুহাতে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। অনেককেই দলে দলে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এলে, পশ্চিমবঙ্গেও এর পুনরাবৃত্তি হবে না—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।

শুভেন্দুও মমতার মতো বাঙালি, তিনি যদি নির্বাচনে জেতেন এবং মুখ্যমন্ত্রী হন, বাংলাদেশের জন্য তাঁর বৈরিতা থাকবে কেন? ‘দাদা শুভেন্দু’কেও আমরা শুভেচ্ছা জানাব, যেমন করে মমতা বাংলাদেশে সর্বশেষ নির্বাচনের পর ‘তারেক ভাইকে’ অভিনন্দন জানিয়েছেন। শুভেন্দুও নিশ্চয় চাইবেন কলকাতার হোটেলগুলো বাংলাদেশি পর্যটক দিয়ে ভরপুর থাকবে এবং নিয়মিত বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গে ইলিশ মাছ আসবে।

এই ষাট লাখ লোকের মধ্যে যাঁরা ভোটার তালিকায় শেষ পর্যন্ত স্থান পাবেন না, তাঁদের ভারতীয় কেন্দ্রীয় সরকার দেশটিতে ‘অবৈধ’ ঘোষণা করবে। পশ্চিমবঙ্গে যদি বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসে, আশঙ্কা করা হচ্ছে শুভেন্দু অধিকারীও আসামে হিমন্ত বিশ্বশর্মার মতো কথিত ‘অবৈধদের’ বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিতে পারেন।

আনন্দবাজার পত্রিকার দিল্লি সম্পাদক ছিলেন প্রথিতযশা সাংবাদিক জয়ন্ত ঘোষাল। তিনি সম্প্রতি এক টিভি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহর একটা নীলনকশা আছে। তারই অংশ হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীকে সরাসরি ভবানীপুরে মমতার বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামানো হয়েছে।’

অমিত শাহ নিজেই দিল্লি থেকে এসে শুভেন্দুর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন ভবানীপুরের মনোনয়ন দাখিল করার সময়। বিজেপির ধারণা, মমতাকে যদি তাঁর একমাত্র আসন ভবানীপুরে ধরাশায়ী করা যায়, তাহলে তৃণমূল রাজ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও, মুখ্যমন্ত্রী পদে মমতা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হবেন।

আরেকটা চিন্তার বিষয় হলো, বিজেপি যদি পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে জয়লাভ করে এবং শুভেন্দু অধিকারী যদি মুখ্যমন্ত্রী হন, তাহলে বাংলাদেশের ওপর নানাভাবে প্রভাব বিস্তারে বা চাপ প্রয়োগে নতুন মাত্রা যুক্ত হবে।

এদিকে মমতার ওপরও একটা বিষয়ে বাংলাদেশিদের যথেষ্ট ক্ষোভ আছে—সেটা হলো তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে। তবে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি সরকার এলেও যে তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে ভিন্ন নীতি নেবে, তা ভাববার কোনো কারণ নেই।

মমতার রাজনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য তিনি কোনো ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বা সাম্প্রদায়িকতাকে প্রশ্রয় দেন না। কিছুদিন আগে দলের এক মুসলিম বিধায়ক, হুমায়ুন কবির মুর্শিদাবাদে বাবরি মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করে তৃণমূলের জন্য সমস্যা তৈরি করেছিলেন। মমতা সাম্প্রদিকতার অভিযোগে তাঁকে দল থেকে বের করে দেন।পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ভারতের অন্য যেকোনো রাজ্যের চেয়ে ভালো।

মমতার আরেকটা বৈশিষ্ট্য, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তিনি কখনো কোনো উৎসাহ দেখাননি। শেখ হাসিনার সঙ্গেও তাঁর আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের বাইরে কোনো গলাগলি ছিল না। পশ্চিমবঙ্গে এখন বিপুলসংখ্যক আওয়ামী লীগ নেতা ভারতীয় কেন্দ্রীয় সরকারের অতিথি হয়ে থাকছেন। যত দূর জানা যায়, মমতা তাঁদের থেকেও দূরত্ব বজায় রেখেছেন।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবার নির্বাচিত হলে, বাংলাদেশ সরকারকে নতুন কোনো উদ্বেগ নিয়ে ভাবতে হবে না। তবে শুভেন্দু যদি ক্ষমতায় আসেন, তাহলে সীমান্তের ওপারে নানা রকম ঝামেলা হতে পারে এবং বাংলাদেশ সরকারকে অনেক উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হতে পারে।

শুভেন্দুর বাংলাদেশ বৈরিতা নিয়ে আবার ভিন্নমতও আছে। কলকাতার একজন সাংবাদিকের মতে, ‘শুভেন্দু এখন বিরোধী দলে। নির্বাচনে জিতার জন্য তিনি অনেক কিছুই বলবেন, কিন্তু তাঁকে ঠিক আসামের হিমন্ত শর্মার পর্যায়ে ফেলা বোধহয় ঠিক হবে না।’

আমরাও তা–ই আশা করব। কারণ, শুভেন্দুও মমতার মতো বাঙালি, তিনি যদি নির্বাচনে জেতেন এবং মুখ্যমন্ত্রী হন, বাংলাদেশের জন্য তাঁর বৈরিতা থাকবে কেন? ‘দাদা শুভেন্দু’কেও আমরা শুভেচ্ছা জানাব, যেমন করে মমতা বাংলাদেশে সর্বশেষ নির্বাচনের পর ‘তারেক ভাইকে’ অভিনন্দন জানিয়েছেন। শুভেন্দুও নিশ্চয় চাইবেন কলকাতার হোটেলগুলো বাংলাদেশি পর্যটক দিয়ে ভরপুর থাকবে এবং নিয়মিত বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গে ইলিশ মাছ আসবে।

  • সালেহ উদ্দিন আহমদ  শিক্ষক, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    ই-মেইল: salehpublic711@gmail.com

    *মতামত লেখকের নিজস্ব