শিক্ষাকে প্রায়ই তথ্য জানা, সনদ লাভ ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার একটি মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়। এসব লক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও, শিক্ষার মাধ্যমে যা অর্জন করা উচিত, এগুলো তার একটি অংশ মাত্র। শিক্ষার প্রকৃত দর্শন আরও গভীর একটি প্রশ্ন তোলে: শিক্ষা কেমন মানুষ তৈরি করবে?
বাংলাদেশসহ বহু সমাজে শিক্ষাগত সাফল্যকে প্রায়ই পরীক্ষার নম্বর, গ্রেড-পয়েন্ট গড় ও মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার মাধ্যমে পরিমাপ করা হয়। শিক্ষার্থীরা বছরের পর বছর তথ্য মুখস্থ করে, পাঠ্যবইয়ের উত্তর পুনরুৎপাদন করে এবং পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়। তবু পরীক্ষায় উৎকৃষ্ট ফল করা একজন শিক্ষার্থীর স্বাধীনভাবে চিন্তা করার, বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানের, প্রতিষ্ঠিত সত্যকে প্রশ্ন করার বা সমাজে অর্থবহ অবদান রাখার ক্ষমতার অভাবই এখন বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য, যা একটি গভীর উদ্বেগের বিষয়। মনে হচ্ছে, শিক্ষা কেবলই একটি তথ্য সঞ্চালনের প্রক্রিয়া। প্রজ্ঞা, চরিত্র ও মানব সম্ভাবনার বিকাশ বিরাজমান শিক্ষাব্যবস্থায় অনুপস্থিত বলেই মনে হচ্ছে।
ইতিহাসের মহান চিন্তাবিদেরা প্রধানত দ্বিতীয় মতটিকেই সমর্থন করেছেন। অ্যারিস্টটল যুক্তি দিয়েছিলেন যে শিক্ষা এমন যুক্তিবোধসম্পন্ন ও নৈতিক মানুষ গড়ে তুলবে, যারা সুস্থ বিচারবোধ প্রয়োগ করতে সক্ষম। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা মনের মুক্তি ঘটাবে, তাকে অনুকরণের কঠোর ব্যবস্থার মধ্যে বন্দী করবে না। স্বামী বিবেকানন্দ শিক্ষাকে প্রত্যেক ব্যক্তির অন্তর্নিহিত পূর্ণতার প্রকাশ হিসেবে দেখেছিলেন। সক্রেটিস, যিনি সম্ভবত সমালোচনামূলক অনুসন্ধানের শ্রেষ্ঠ প্রবক্তা, বক্তৃতার পরিবর্তে প্রশ্নের মাধ্যমে শিক্ষা দিতেন এবং শিক্ষার্থীদের চিন্তা ও সংলাপের মাধ্যমে সত্য আবিষ্কারে উৎসাহিত করতেন।
এই মহান চিন্তাবিদদের মধ্যে পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও তাঁদের একটি অভিন্ন বিশ্বাস ছিল: শিক্ষা ব্যক্তিকে স্বাধীন চিন্তক হতে সাহায্য করবে।
এই নীতি একবিংশ শতাব্দীতেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আধুনিক বিশ্ব দ্রুত প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা ও জটিল সামাজিক চ্যালেঞ্জ দ্বারা চিহ্নিত। এমন পরিবেশে তথ্য মুখস্থ করার ক্ষমতার চেয়ে বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা, উদ্ভাবন ও অভিযোজনের ক্ষমতা বেশি মূল্যবান। ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে তথ্য এখন তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়। সফল ব্যক্তি ও সমাজকে আলাদা করে তোলে কেবল তথ্যপ্রাপ্তি নয়, বরং জ্ঞানকে বুদ্ধিমত্তা ও সৃজনশীলতার সঙ্গে ব্যবহার করার ক্ষমতা।
দুঃখজনকভাবে, বহু শিক্ষাব্যবস্থা এখনো মুখস্থবিদ্যার ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দেয়। শিক্ষার্থীদের প্রায়ই মৌলিক ধারণা সৃষ্টি করার বদলে প্রতিষ্ঠিত উত্তর পুনরুৎপাদনের জন্য পুরস্কৃত করা হয়। শিক্ষকদের কাছ থেকে কৌতূহল জাগানোর পরিবর্তে পাঠ্যসূচি শেষ করার প্রত্যাশা করা হয়। পরীক্ষাগুলো প্রায়ই বোঝার বদলে স্মৃতিশক্তি যাচাই করে। এ ধরনের চর্চা এমন স্নাতক তৈরি করতে পারে, যারা পরীক্ষায় ভালো ফল করলেও স্বাধীন বিচারবোধ প্রয়োজন—এমন অচেনা সমস্যার মুখে তারা খেই হারিয়ে ফেলে।
অতএব একটি সার্থক শিক্ষাদর্শন কেবল শিক্ষার্থীরা কী শিখছে, সেই প্রশ্নেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; বরং তারা কীভাবে শিখছে, সেই শিক্ষণপ্রক্রিয়ার প্রতিও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষা শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করতে, প্রতিষ্ঠিত সত্যকে চ্যালেঞ্জ করতে ও চিন্তাশীল আলোচনায় অংশ নিতে উৎসাহিত করবে। শিক্ষণ এমন কোনো নিষ্ক্রিয় কার্যক্রম নয়, যেখানে জ্ঞান শিক্ষার্থীর মনে জমা করে দেওয়া হয়। বরং এটি অনুসন্ধান, অন্বেষণ ও আবিষ্কারের একটি সক্রিয় প্রক্রিয়া।
এ কারণেই আধুনিক শিক্ষাবিদেরা শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শিক্ষার পক্ষে কথা বলেন। শ্রেণিকক্ষ হওয়া উচিত এমন স্থান, যেখানে আলোচনা, বিতর্ক, সহযোগিতা ও আত্মচিন্তা উৎসাহিত হয়। শিক্ষার্থীদের কেবল জ্ঞান গ্রহণের বদলে জ্ঞান নির্মাণে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। শিক্ষকেরা শুধু তথ্য পরিবেশক নন; তাঁরা এমন সহায়ক, যাঁরা বৌদ্ধিক অনুসন্ধানকে পথ দেখান।
শিক্ষার দর্শনের আরেকটি অপরিহার্য মাত্রা হলো শিক্ষণ ও বাস্তব জীবনের সম্পর্ক। প্রায়ই শিক্ষা সমাজে ব্যক্তির মুখোমুখি হওয়া বাস্তব চ্যালেঞ্জ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা তাত্ত্বিক ধারণায় দক্ষ হতে পারে, কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতিতে তা প্রয়োগে অক্ষম থেকে যায়।
জ্ঞান যখন অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন শিক্ষা অর্থবহ হয়ে ওঠে। প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা, ইন্টার্নশিপ, মাঠকর্ম, ল্যাবরেটরি পরীক্ষা, সামাজিক সম্পৃক্ততা এবং গবেষণা কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের তত্ত্ব ও বাস্তবের ব্যবধান কমাতে সাহায্য করে। এসব অভিজ্ঞতা সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, যোগাযোগদক্ষতা, দলগত কাজ ও নেতৃত্বের গুণাবলি গড়ে তোলে, যা শুধু মুখস্থবিদ্যার মাধ্যমে অর্জন করা যায় না।
যে জাতি এই নীতি বোঝে, তারা কেবল বিদ্যালয়ে ও পরীক্ষায় নয়, মানব সম্ভাবনার বিকাশেই বিনিয়োগ করে। দীর্ঘ মেয়াদে সেই বিনিয়োগ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক সংহতি ও জাতীয় অগ্রগতির ভিত্তি হয়ে ওঠে। তাই শিক্ষা তার শ্রেষ্ঠ রূপে তথ্যের সঞ্চয় নয়, মানবমনের মুক্তি।
একই সঙ্গে শিক্ষা তার নৈতিক ও সামাজিক মাত্রাকে অবহেলা করতে পারে না। কেবল প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত সমাজ অপরিহার্যভাবে ভালো সমাজ নয়। শিক্ষা সহমর্মিতা, নাগরিক দায়িত্ববোধ, নৈতিক সচেতনতা ও বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধা গড়ে তুলবে। নাগরিকদের শুধু ব্যক্তিগতভাবে সফল হওয়া নয়, সাধারণ কল্যাণে অবদান রাখাও শিখতে হবে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সচেতন ও সমালোচনামূলক নাগরিকসমাজ ভ্রান্ত তথ্য, চরমপন্থা, কুসংস্কার এবং প্রভাবিতকরণের প্রতি কম ঝুঁকিপূর্ণ। স্বাধীন চিন্তকেরা রাজনৈতিক দাবিকে সতর্কভাবে মূল্যায়ন করতে, প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির আওতায় আনতে ও জনজীবনে গঠনমূলকভাবে অংশ নিতে বেশি সক্ষম। তাই শিক্ষা কেবল ব্যক্তিগত স্বার্থ নয়, বৃহত্তর সামাজিক ও জাতীয় লক্ষ্যও পূরণ করে।
কয়েকটি সফল দেশের অভিজ্ঞতা এসব নীতির বাস্তব প্রয়োগ দেখায়। ফিনল্যান্ড অতিরিক্ত মানসম্মত পরীক্ষার বদলে সৃজনশীলতা, সমতা, শিক্ষক-পেশাদারি ও শিক্ষার্থীর কল্যাণকে গুরুত্ব দেয়। জাপান শক্ত ভিত্তিমূলক শিক্ষার সঙ্গে নৈতিক শিক্ষা, শৃঙ্খলা ও মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষাকে যুক্ত করে। সিঙ্গাপুর উচ্চ একাডেমিক মান বজায় রেখে উদ্ভাবন, অভিযোজনক্ষমতা এবং জীবনব্যাপী শিক্ষাকে উৎসাহিত করে ভবিষ্যৎমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।
যদিও এসব দেশের সংস্কৃতি ও ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে, তাদের একটি অভিন্ন উপলব্ধি আছে: শিক্ষাগত উৎকর্ষ কেবল পাঠ্যক্রমের বিষয়বস্তুর ওপর নয়, শিক্ষাদর্শনের ওপরও নির্ভর করে। তাদের সাফল্য এসেছে শিক্ষায় বিনিয়োগ, অনুসন্ধানকে উৎসাহ, সৃজনশীলতা লালন এবং শিক্ষার্থীদের নিষ্ক্রিয় তথ্যগ্রহীতা নয় বরং সক্রিয় শিক্ষার্থী হিসেবে দেখার মধ্য দিয়ে।
বাংলাদেশের জন্য এসব শিক্ষা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি শিক্ষায় প্রবেশাধিকার বিস্তৃত করা ও সাক্ষরতার হার বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে এখনো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় শিক্ষায় সরকারি বিনিয়োগ তুলনামূলকভাবে কম। অনেক শ্রেণিকক্ষ অতিরিক্ত শিক্ষার্থীপূর্ণ। শিক্ষক প্রশিক্ষণ আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। পরীক্ষাব্যবস্থা এখনো মুখস্থবিদ্যাকে উৎসাহিত করে। গবেষণা ও উদ্ভাবনের সংস্কৃতি এখনো পর্যাপ্তভাবে বিকশিত হয়নি।
এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য কেবল প্রশাসনিক সংস্কার যথেষ্ট নয়। এর জন্য শিক্ষার উদ্দেশ্য সম্পর্কে নতুন উপলব্ধি প্রয়োজন। শিক্ষানীতিতে সমালোচনামূলক চিন্তা, সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধান ও নৈতিক বিকাশকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পাঠ্যক্রম নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে। শিক্ষক প্রশিক্ষণে আরও মনোযোগ ও অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে। মূল্যায়ন–পদ্ধতিতে কেবল মুখস্থবিদ্যা নয়, ব্যুৎপত্তি লাভ ও অর্জিত জ্ঞানের প্রয়োগের ক্ষমতাও যাচাই করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, শিক্ষা অন্তর্ভুক্তিমূলক, ধর্মনিরপেক্ষ, যুক্তিনির্ভর ও মুক্তমনা থাকতে হবে। যে সমাজ প্রশ্ন করাকে বা বৌদ্ধিক বৈচিত্র্যকে নিরুৎসাহিত করে, সে সমাজ সৃজনশীলতা, উদ্ভাবন ও সামাজিক সম্প্রীতিকে দুর্বল করার ঝুঁকিতে পড়ে। সত্যিকারের শিক্ষা এমন পরিবেশে বিকশিত হয়, যেখানে ধারণাগুলো স্বাধীনভাবে পরীক্ষা করা যায় এবং শিক্ষার্থীদের চিন্তা করতে উৎসাহিত করা হয়।
পরিশেষে শিক্ষার দর্শন ও মানব বিকাশের দর্শন অবিচ্ছেদ্য। শিক্ষা কেবল অর্থনীতির জন্য কর্মী প্রস্তুত করার বিষয় নয়; এটি জীবনের জন্য মানুষ প্রস্তুত করার বিষয়। এর সর্বোচ্চ উদ্দেশ্য হলো এমন ব্যক্তি গড়ে তোলা, যাঁরা স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারেন, নৈতিকভাবে কাজ করতে পারেন, সৃজনশীলভাবে সমস্যা সমাধান করতে পারেন এবং সমাজে ইতিবাচক অবদান রাখতে পারেন।
যে জাতি এই নীতি বোঝে, তারা কেবল বিদ্যালয়ে ও পরীক্ষায় নয়, মানব সম্ভাবনার বিকাশেই বিনিয়োগ করে। দীর্ঘ মেয়াদে সেই বিনিয়োগ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক সংহতি ও জাতীয় অগ্রগতির ভিত্তি হয়ে ওঠে। তাই শিক্ষা তার শ্রেষ্ঠ রূপে তথ্যের সঞ্চয় নয়, মানবমনের মুক্তি।
শিক্ষার দর্শন বিষয়ে ওপরের বক্তব্য ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ-এ অনুষ্ঠিত উচ্চশিক্ষায় রূপান্তরের জন্য উদ্ভাবন, উৎকর্ষ ও গুণমানবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন ২০২৬-তে উপস্থাপিত আমার প্রবন্ধ, ‘স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা ও বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধান: দর্শন, শিক্ষণ-পদ্ধতি, পাঠ্যক্রম’-এর অংশবিশেষ।
ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সেলের প্রধান অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক ও অন্য দুই পরিচালক অধ্যাপক শাহ্রিয়ার কবীর ও অধ্যাপক এম এ আওয়াল এবং মশিউল বাশার, তাসফিয়া আক্তার তানজিল, ফারজানা আফরোজসহ ভলান্টিয়ার হিসেবে একঝাঁক তরুণ শিক্ষার্থী অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে এটা সম্ভব হয়েছে। শিক্ষা বিষয়ে এই মানের আন্তর্জাতিক সম্মেলন বাংলাদেশে এই প্রথম অনুষ্ঠিত হয়েছে জুন মাসের ১২-১৩ তারিখে।
এন এন তরুণ অর্থনীতির অধ্যাপক, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ ও সাউথ এশিয়া জার্নালের এডিটর অ্যাট লার্জ। nntarun@gmail.com