ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ অধিবেশনে সরকারি দলের একাংশ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ অধিবেশনে সরকারি দলের একাংশ

মতামত

সংস্কার ও অধ্যাদেশ বিতর্ক এবং বিএনপির অবস্থান নিয়ে কিছু প্রশ্ন

সংস্কার একটি ধীর ও চলমান প্রক্রিয়া, যাকে একটি যথাযথ পরিকল্পনা এবং দিকনির্দেশনার মাধ্যমে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়। বিভিন্ন উন্নত দেশের উন্নয়নের প্রক্রিয়ার দিকে তাকালে দেখতে পাই যে তাদের রাজনৈতিক সংস্কার সময়ের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে সংগঠিত হয়েছে। এখানে রাজনৈতিক মতভিন্নতাকে দেখা হয় সংস্কারকে আরও শাণিত করার একটি প্রক্রিয়া হিসেবে, কেবল সস্তা বিরোধ তৈরির জন্য নয়।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সংস্কারবিষয়ক আলাপের পুরো প্রক্রিয়াকে অন্তর্বর্তী সরকার যখন একটি ‘বাজ-ওয়ার্ডে’ (অতি চর্চিত বিষয়) পরিণত করেছিল তখন আমরা আশ্বস্ত হতে চেয়েছিলাম যে নতুন নির্বাচিত সরকার এর ন্যায্যতার ওপর ন্যায়বিচার করবে। অর্থাৎ এ নিয়ে পরিষ্কার দিকনির্দেশনা দিয়ে একটি রোডম্যাপ বা কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করবে। কোনো তাড়াহুড়া যেন সেই অধরা সংস্কারকে অধরাই না রেখে দেয়।

আমরা জানি যে সংস্কার বিষয়ে বিএনপির বেশ কিছু নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে। সেই নোট অব ডিসেন্ট থাকাও যে একটা যুক্তিযুক্ত রাজনৈতিক প্রক্রিয়া, সেটিও আমাদের মাথায় রাখতে হবে। কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে যে নোট অব ডিসেন্ট থাকা মানে সেই বিষয়গুলো সম্পূর্ণরূপে বাতিল করা নয়, বরং এই নোট অব ডিসেন্টের অর্থ হলো ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য একটি দরজা খুলে রাখা। সেটি করা গেলেই আমরা একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উন্নীত হওয়ার পথে এক ধাপ এগিয়ে যাব।

এখানে আমাদের এটাও মনে রাখতে হবে যে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একটি সংসদীয় ব্যবস্থায় রূপান্তর হলো বলেই যে দেশে গণতান্ত্রিক চর্চা ফিরে এল, সেই আত্মতৃপ্তিতে ভুগলে কিন্তু আমরা এক বড় ভুল করব। কেননা যে দীর্ঘ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে আমাদের বিগত প্রায় দুই দশক পার হতে হয়েছে, সেটি আমাদের সব রাজনৈতিক ও সামাজিক তথা আমাদের সামগ্রিক প্রাতিষ্ঠানিক বিপর্যয় ঘটিয়েছে। এর প্রভাব আমাদের রাজনৈতিক জীবন থেকে শুরু করে সমাজজীবনের প্রতিদিনকার জীবনাচরণের প্রতিটি ক্ষেত্রে দৃশ্যমান।

যেহেতু এখন আমরা একটি সংসদীয় ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হয়েছি, সংস্কারপ্রক্রিয়ায় জনপ্রতিনিধিদের মধ্য দিয়ে জনগণের অংশগ্রহণও থাকবে, যা আমরা বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেখতে পাইনি। যদিও সেই সরকারের অনেকেই মনে করতেন তাঁরা জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছেন এবং জনগণই তাঁদের সব ম্যান্ডেট দিয়েছে, যা নিয়ে নাগরিক সমাজে বিস্তর বিতর্ক হয়েছে ও জনমনে জন্ম নিয়েছে নানা দ্বিধা।

বিগত সময়ে আমাদের গবেষণা ও লেখার স্বাধীনতাকে নানাভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হতো। কীভাবে হতো সেটা এখন সবাই জানে, কিন্তু সেই সময় এ নিয়ে কথা বলা ছিল ভয়ের, বিশেষ করে বলতে হয় গুমের ভয়। যে ভয়ের সংস্কৃতি আমাদের দেশে গড়ে উঠেছিল সেই ভয়ের সংস্কৃতিতে আমরা আর ফিরে যেতে চাই না।

সেই দ্বিধা কাটিয়ে যখন নির্বাচন হলো এবং বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল, সেই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা কিন্তু দলটিকে যা খুশি তা করার ম্যান্ডেটও দেয়নি। তাইতো নির্বাচনের পর পরই লিখেছিলাম যে ভূমিধস বিজয় মানে সবকিছু পেয়ে যাওয়ার অধিকার নয়। এখানে আমাদের বিরোধী দলকেও একটি শক্তিশালী ও ইতিবাচক ভূমিকায় থাকতে হবে। এই দুইয়ের মধ্যে যদি একটি কার্যকরী সম্পর্ক না থাকে তাহলে সংসদীয় ব্যবস্থা একটি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়ানোর আগেই ভেঙে পড়তে পারে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

বিগত সময়ে আমরা যেমন বিরোধী দলকে দেখেছি কেবলই সরকারি দলের বিরোধিতাই করতে। বিরোধী দল মানেই যেন ছিল বয়কট, অনাস্থা ও সংসদ থেকে ওয়াকআউট বা বের হয়ে যাওয়া। ফলে আমরা দেখেছি, কী করে সংসদ একটি অচলাবস্থায় পর্যবসিত হয় এবং দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোও নানাভাবে ঝুঁকির মুখে পড়ে। তাই বিএনপিকে দুটি বিষয়ে সব সময় সচেতন থাকতে হবে—একটি হলো বিরোধী দলের অধিকারের প্রাপ্যতাকে যেন তারা সংসদে নিশ্চিত করে এবং সংস্কার বিষয়ে সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক থাকে।

সংস্কার বিষয়ে বিএনপিকে পরিষ্কার অবস্থান নিয়ে একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। কেননা এ বিষয়ে বিএনপি ইতিবাচক থাকলেও, তথ্যের ঘাটতি কিংবা পরিষ্কার অবস্থান না থাকলে বিরোধী দল (জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি জোট) বিএনপিকে সংস্কার পরিপন্থী একটি দল হিসেবে জনগণের কাছে তুলে ধরতে পারে।

আমরা এটি ইতিমধ্যেই কোনো কোনো বিরোধীদলীয় এমপিদের মুখে শুনছি। সেটি বিএনপির ভূমিধস বিজয় কিংবা সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে একভাবে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে। বিশেষ করে সংবিধান সংস্কার ও জুলাই সনদের সঠিক বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি জোটের যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে তা এখন দৃশ্যমান। সেই টানাপোড়েন থেকেই জনগণের একটা অংশ মনে করতে পারে বিএনপি আসলে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সংস্কার থেকে নিজেদের দূরে রাখছে, যা তাদের নেতিবাচক ইমেজ তৈরি করবে।

এ প্রসঙ্গে সাম্প্রতিক কিছু অধ্যাদেশ নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কের মধ্য দিয়ে জনমনে সেই সংশয় দানা বাঁধছে, যা বিএনপি সরকারকে জনগণের সামনে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরতে পারে যা সংস্কারকে কেন্দ্র করে তাদের ভাবমূর্তি সংকট তৈরি করতে পারে। যদিও আমরা দেখছি যে ১৩৩টি অধ্যাদেশ থেকে অধিকাংশই অর্থাৎ ৯৮টি অবিকল রাখা হচ্ছে এবং ২০টি চলতি অধিবেশনে উপস্থাপিত হবে না, যা নিয়ে আরও বিশদ যাচাই–বাছাই করার কথা তারা জানিয়েছে। তবে এর মধ্যে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম–নিষিদ্ধের অধ্যাদেশ আইনে পরিণত করার বিষয়টি আবার বিতর্ক তৈরি করছে।

ফলে দেশ গঠনে বিএনপির ইতিবাচক ভূমিকা পালনের জন্য সংস্কার নিয়ে তাদের বিশদ কর্মপরিকল্পনা পরিষ্কার করতে হবে। এখানে বিশেষ করে গুমের বিষয়টি খুব সংবেদনশীল একটি বিষয়, যা কোনোভাবেই উপেক্ষা করা উচিত নয়। কেননা গুমের নানা নেতিবাচক প্রভাবের সঙ্গে আমাদের অনেকের জীবনের গতিপথ নানাভাবে বদলে গেছে। অনেকেরই আরও ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।

বিগত সময়ে আমাদের গবেষণা ও লেখার স্বাধীনতাকে নানাভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হতো। কীভাবে হতো সেটা এখন সবাই জানে, কিন্তু সেই সময় এ নিয়ে কথা বলা ছিল ভয়ের, বিশেষ করে বলতে হয় গুমের ভয়। যে ভয়ের সংস্কৃতি আমাদের দেশে গড়ে উঠেছিল সেই ভয়ের সংস্কৃতিতে আমরা আর ফিরে যেতে চাই না।

গুমের বিষয়গুলো আমাদের মানবাধিকার ও বিচারব্যবস্থার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত, সুতরাং এই বিষয়ক যে সিদ্ধান্ত এই সরকার নিতে যাচ্ছে বা নিচ্ছে সেটি যেন আবারও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গুম, খুন ও নিখোঁজের সুযোগ করে না দেয় সেদিকে তাদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। বিএনপিকে মনে রাখতে হবে তাদের শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে অসংখ্য নেতা-কর্মীও এই গুম-খুনের শিকার।

এখানে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দুর্নীতি দমন কমিশন। আমরা বিগত সময়ে দুর্নীতির আকাশচুম্বী বিস্তার দেখেছি, যেখানে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আমাদের দেশ থেকে পাচার করে ফেলা হয়েছে, মেগা প্রজেক্টের আড়ালে চলত দুর্নীতির মহোৎসব।

তাই এগুলোসহ অন্যান্য অধ্যাদেশ এই মুহূর্তে সংসদে না তুলে আদতে তারা কতটা সংস্কার অর্জন করতে চায় এবং কীভাবে চায় তার যথাযথ ব্যাখ্যা ও পরবর্তী কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে দেশের মানুষকে এখনই পরিষ্কার ধারণা দিতে হবে। সেটি করতে না পারলে জনমনে সরকারের ভূমিকা নিয়ে দ্বিধা ও সংশয় তৈরি হবে এবং কেননা সরকারের এখন সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি অর্জন করতে হবে সেটি হলো জনগণের আস্থা ও ভরসার জায়গা। সেই আস্থা ও ভরসার জায়গা তৈরি করতে হলে জনবান্ধব নীতি ও আইন প্রণয়নের মাধ্যমে জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। যেহেতু বিএনপি সরকার অধিকাংশ সংস্কার প্রস্তাব সংসদীয় ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে পরিগ্রহণ করছে, এই অল্প কিছু অধ্যাদেশ নিয়ে তাঁদের সিদ্ধান্ত যেন সেই অর্জনগুলোকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত না করে সেদিকে নজর দেওয়া উচিত। কেননা দেশ গঠনে জনগণের দেওয়া এই বিরাট সুযোগ বিএনপির উচিত সম্পূর্ণরূপে ব্যবহার করা ও আওয়ামী লীগের মতো ভুল না করা।

  • বুলবুল সিদ্দিকী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

মতামত লেখকের নিজস্ব