
চলুন একটি সহজ প্রশ্ন দিয়ে শুরু করা যাক, যার সরাসরি উত্তর খুব কমই পাওয়া যায়—ইরানের ওপর বিজয় আসলে দেখতে কেমন হবে?
ওয়াশিংটন ও জেরুজালেমে এর উত্তর সাধারণত স্পষ্ট শোনায়—ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করা, তার আঞ্চলিক প্রভাব ভেঙে দেওয়া, এমনকি শীর্ষ নেতৃত্বে রাজনৈতিক পরিবর্তন চাপিয়ে দেওয়া। এটি একধরনের সিদ্ধান্তমূলক যুদ্ধের ভাষা, যার একটি পরিষ্কার সমাপ্তি রয়েছে।
কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গি যদি তেহরানের দিকে সরানো হয়, তবে সংজ্ঞাটি পুরোপুরি বদলে যায়। ইরানের জন্য বিজয় মানে টিকে থাকা। এই অসমতা পুরো সংঘাতটিকেই নির্ধারণ করে। এমন যুদ্ধে, যে পক্ষের সাফল্য দাবি করতে কম কিছু প্রয়োজন হয়, তারই সুবিধা থাকে আর এই মুহূর্তে ইরানের প্রয়োজন অনেক কম।
সামরিক ভারসাম্যহীনতা অস্বীকার করার উপায় নেই। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল অত্যন্ত নিখুঁত ও ব্যাপক সক্ষমতা দিয়ে হামলা চালাতে পারে। তারা বারবার তা প্রমাণ করেছে—অবকাঠামো, নেতৃত্ব ও কৌশলগত সম্পদ লক্ষ্য করে আঘাত হেনে।
কিন্তু কৌশলগত সফলতা এখনো রাজনৈতিক ফলাফলে রূপ নেয়নি। ইরানের রাষ্ট্র ভেঙে পড়েনি। তার শাসনব্যবস্থা অটুট রয়েছে এবং তার নেটওয়ার্ক—সামরিক, আঞ্চলিক ও আদর্শিক—চলমান আছে। এমনকি তার সবচেয়ে সংবেদনশীল সক্ষমতাগুলোও, যেমন পারমাণবিক দক্ষতা, এখনো স্থিতিশীল রয়েছে।
গভীরতর ভুল হিসাবটি হলো, তেহরান ওয়াশিংটনের মতো একই খেলা খেলছে—এই ধারণা। তা নয়। ইরান সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলকে পরাজিত করতে চাইছে না। বরং তাদের চেয়ে বেশি সময় ধরে টিকে থাকতে, তাদের লক্ষ্যকে জটিল করে তুলতে এবং খরচ বাড়িয়ে তুলতে চাইছে।
এই যুক্তি সংঘাতের গতিপ্রকৃতিতেই দৃশ্যমান। যুদ্ধক্ষেত্র সরাসরি সংঘর্ষের বাইরে বিস্তৃত হয়ে শিপিং লেন, জ্বালানি বাজার ও আঞ্চলিক জোট পর্যন্ত পৌঁছেছে। হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্ন কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়—এগুলো বৈশ্বিক প্রভাব ফেলতে পারে এমন চাপের পয়েন্ট।
ইরানের কৌশল আধিপত্য প্রতিষ্ঠা নয়, বরং জড়িয়ে ফেলা। যুদ্ধক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব না থাকলেও, যদি প্রতিপক্ষকে এমন এক সংঘাতে জড়িয়ে ফেলা যায়, যা খুব ব্যয়বহুল ও অত্যন্ত জটিল, তবে সেটিই যথেষ্ট। যখন যুদ্ধ স্থবির হয়ে পড়ে, তখন স্বাভাবিক প্রবণতা হয় উত্তেজনা বাড়ানো—আরও বোমাবর্ষণ, জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা, এমনকি চরম পরিস্থিতিতে স্থলবাহিনী মোতায়েন। ধারণা করা হয়, বেশি শক্তি প্রয়োগ করলে ভিন্ন ফল পাওয়া যাবে।
কিন্তু ইরান কোনো নিষ্ক্রিয় লক্ষ্যবস্তু নয়। এটি ইতিমধ্যে আঞ্চলিকভাবে প্রতিশোধ নেওয়ার সক্ষমতা দেখিয়েছে—সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, ওমানের পাশাপাশি জর্ডান ও ইরাককেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। ইরানের জ্বালানিব্যবস্থায় হামলা সীমাবদ্ধ থাকবে না—এটি একই দেশগুলোর ওপর পাল্টা আক্রমণ ডেকে আনবে এবং সংঘাত আরও বিস্তৃত করবে।
আরেকটি সীমাবদ্ধতা রয়েছে—ধারণা করা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে তার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র মজুদের প্রায় ৪৫ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ ব্যবহার করে ফেলেছে, যার মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে। ফলে বাস্তবতা হলো, উত্তেজনা বাড়ানোর বিষয়টি এখন আর শুধু ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে না, বরং সক্ষমতার ওপরও নির্ভরশীল। বৃহত্তর যুদ্ধে প্রশ্নটি হতে পারে, যুক্তরাষ্ট্র কত দূর যেতে পারে তা নয়, বরং তার হাতে আর কতটা অবশিষ্ট আছে।
এর প্রভাব যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরেও ছড়িয়ে পড়বে। ইরানের প্রতিক্রিয়া হবে প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর ধারাবাহিক হামলা—তাদের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পানির ব্যবস্থার ওপর। এতে তীব্র গ্রীষ্মে অঞ্চলের কিছু অংশ বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠতে পারে। বিপুলসংখ্যক মানুষ স্থান ত্যাগে বাধ্য হবে, যা আরেকটি বৃহৎ শরণার্থী সংকট তৈরি করতে পারে।
এরপরও মূল বাস্তবতা অপরিবর্তিত থাকে। ইরান দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের জন্য প্রস্তুত—যেকোনো স্থল অভিযান দীর্ঘ ও ক্ষয়ক্ষতিমূলক হয়ে উঠতে পারে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, উত্তেজনা বৃদ্ধি আসল সমস্যাকে আড়াল করে—সমস্যাটি শক্তির অভাব নয়, বরং এমন একটি রাজনৈতিক লক্ষ্য অনুপস্থিত, যা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বাস্তবিকভাবে অর্জন করা সম্ভব।
সমস্যাটিকে আরও জটিল করে তুলছে আরেকটি নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চূড়ান্ত লক্ষ্য পুরোপুরি এক নয়। ইসরায়েলের অবস্থান ইঙ্গিত দেয় সর্বোচ্চ ফলাফল অর্জনের দিকে—ইরানের ব্যবস্থাকে গভীরভাবে, সম্ভব হলে অপরিবর্তনীয়ভাবে দুর্বল করা, এমনকি শাসনব্যবস্থার পতন পর্যন্ত। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র কখনো চাপ প্রয়োগ, কখনো নিয়ন্ত্রণ, কখনো আলোচনার মধ্যে দোদুল্যমান।
এগুলো কেবল গুরুত্বের পার্থক্য নয়, এগুলো কৌশলের পার্থক্য। যৌথভাবে নির্ধারিত বিজয়ের সংজ্ঞা ছাড়া পরিচালিত যুদ্ধ খুব কম ক্ষেত্রেই বিজয় বয়ে আনে। বরং তা নিয়ে আসে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক তৎপরতা, কিন্তু কৌশলগত সমন্বয়ের অভাব—অবিরাম গতি, কিন্তু সমাধানের দিকে সামান্য অগ্রগতি।
একপর্যায়ে এসে বাস্তবতাকে যেমন আছে তেমনভাবেই বর্ণনা করা প্রয়োজন হয়ে পড়ে। এটি আর এমন কোনো যুদ্ধ নয়, যা একটি সিদ্ধান্তমূলক পরিণতির দিকে এগোচ্ছে। বরং এটি এমন এক সংঘাতে রূপ নিয়েছে, যা একটি নির্দিষ্ট ছকে স্থির হয়ে গেছে—হামলার পর বিরতি; এমন যুদ্ধবিরতি, যা ভাঙন ঠেকানোর মতো সময় পর্যন্ত টিকে থাকে এবং এমন আলোচনা, যা ব্যর্থতা এড়ানোর মতোই অল্প অগ্রগতি করে।
আর এসব যুদ্ধবিরতিই নিজস্ব গল্প বলে। এগুলোর বারবার বর্ধিত হওয়া অগ্রগতির নয়, বরং সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীন ওয়াশিংটনের শক্তিশালী প্রণোদনা রয়েছে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া, আরও বড় মাত্রার উত্তেজনা এড়ানো এবং যত দ্রুত সম্ভব যুদ্ধের ইতি টানা। কারণ, বিকল্পগুলো—আঞ্চলিক যুদ্ধ বা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কা—অনেক বেশি কঠিনভাবে সামাল দেওয়া যায়। এই বাস্তবতা তেহরানকে সুবিধা দেয়। দ্রুত ছাড় দেওয়ার প্রয়োজন নেই, কারণ সময়ক্ষেপণই তার অবস্থানকে শক্তিশালী করে।
এই অর্থে সময় নিরপেক্ষ নয়। সংঘাত যত দীর্ঘায়িত হয়, ততই তা বৈশ্বিক অর্থনীতির সবচেয়ে সংবেদনশীল চাপের জায়গাগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। জ্বালানি বাজার চাপে পড়ে, সরবরাহ পথগুলো সংকুচিত হয় এবং মজুত কমতে থাকে। যেসব শিল্প স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল—যেমন বিমান চলাচল, নৌপরিবহন, উৎপাদন—সেগুলো ক্রমশ ঝুঁকির মুখে পড়ে।
যা শুরু হয়েছিল একটি আঞ্চলিক সংঘাত হিসেবে, তা এখন পদ্ধতিগত ঝুঁকিতে রূপ নিয়েছে। এমনকি সীমিত বিঘ্নও ছড়িয়ে পড়ে দাম, সরবরাহ শৃঙ্খল ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে। অচলাবস্থা যত দীর্ঘ হয়, ততই চাপ সঞ্চিত হয় এবং তা বৃহত্তর অর্থনৈতিক ধাক্কার দিকে এগিয়ে যায়।
খাঁটি সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে উত্তরটি স্পষ্ট—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রাধান্য বিপুল। কিন্তু যুদ্ধ কেবল সক্ষমতার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় না; লক্ষ্য, ব্যয় ও সময়ের পারস্পরিক সম্পর্কই আসল নির্ধারক।
এই সমীকরণে ইরানের অবস্থান যতটা মনে হয়, তার চেয়ে শক্তিশালী। তারা সাফল্যের জন্য কম শর্ত নির্ধারণ করেছে, দীর্ঘস্থায়ী চাপ সহ্য করার উচ্চ সক্ষমতা দেখিয়েছে এবং যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরেও খরচ আরোপ করার ক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, তাদের জিততেই হবে এমন নয়; তাদের শুধু প্রতিপক্ষকে তাদের লক্ষ্য অর্জন করতে বাধা দিতে হবে। এখন পর্যন্ত তারা সেটিই করে দেখিয়েছে।
এখানেই আবার মূল প্রশ্নে ফিরে আসা যায়—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কি এই যুদ্ধ জিততে পারে? যদি জয়ের অর্থ হয় ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা বা তার কৌশলগত অবস্থান মৌলিকভাবে বদলে দেওয়া, তবে উত্তরটি ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে—তারা তা পারবে না।
তারা যা করতে পারে, তা হলো এই সংঘাত চালিয়ে যাওয়া—এটি নিয়ন্ত্রণ করা, এর বিস্তার সীমিত রাখা এবং এর প্রান্তিক দিকগুলোকে আকার দেওয়া। কিন্তু এটিকে বিজয় বলা যায় না; এটি কেবল টিকে থাকা।
আসল বিপদ পরাজয় নয়, বরং এই বিশ্বাসের স্থায়িত্ব যে আর একটু চাপ, আর একটু উত্তেজনা বা আর একটু সময় ভিন্ন ফল বয়ে আনবে। যদি সেই বিশ্বাস ভুল হয়, তবে এটি এমন কোনো যুদ্ধ নয়, যা জয়ের দ্বারপ্রান্তে; বরং এটি এমন একটি যুদ্ধ, যা অন্তহীন, যা আদৌ জেতা সম্ভব নয়।
বামো নৌরি লন্ডনের সিটি সেন্ট জর্জ’স বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিভাগের সম্মানসূচক গবেষণা ফেলো।
ইন্দ্রজিৎ পারমার একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক রাজনীতির অধ্যাপক।
স্ক্রল থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত। এই লেখাটা প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল দ্য কনভারসেশনে।