রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান
রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান

মতামত

ইরানে আন্দোলন নিয়ে কেন ভয়ে আছে তুরস্ক

চলমান বিক্ষোভে যদি ইরানের ধর্মতান্ত্রিক ও কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, তাহলে খুব কম মানুষই চোখের পানি ফেলবে। তবে সেই ফলাফল বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপের জোরে চাপিয়ে দেওয়া হবে—এ কথা ভাবতেই বেশির ভাগ মানুষ অস্বস্তি বোধ করে। এদিকে খামেনিদের শাসনব্যবস্থা ভেঙে গেলে তার জায়গায় স্পষ্ট ও জনপ্রিয় কোনো বিকল্প আছে বলেও খুব বেশি মানুষ বিশ্বাস করে না।

সম্প্রতি ইন্টারনেট সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার পরও ইরানে বিক্ষভের বহু ফুটেজ বাইরে এসেছে। আগেও বহুবার রাস্তায় নেমেছে ইরানে মানুষ । এবার আন্দোলনের প্রধান কারণ ছিল তীব্র অর্থনৈতিক সংকট।

এ কারণে ২০২৬ সালের জানুয়ারির বিক্ষোভ কোনো নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠী বা আদর্শের নেতৃত্বে হয়নি। তেহরানের বাজারের ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ ছিল বিশেষভাবে লক্ষণীয়। সাধারণত তাঁরা সরকারপন্থী হিসেবে পরিচিত এবং আগের আন্দোলনগুলোতে অংশ নেননি। তবু সমাজের সব স্তরের মানুষের ক্ষোভ একত্র হলেও শাসনব্যবস্থাকে ভেঙে দেওয়ার মতো পর্যায়ে তা পৌঁছায়নি।

ইরানের আগের আন্দোলনগুলোর মতো এবারও সরকার বিক্ষোভের জবাবে চরম সহিংসতা ও নির্মমতা দেখিয়েছে। বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনী আন্দোলন দমনে নেমেছে। হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, ১০ হাজারের বেশি মানুষ আটক হয়েছেন এবং আরও বহু মানুষ আহত হয়েছেন।

এই দমন অভিযানে বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ও তাদের অনুগত আধা সামরিক বাহিনী বাসিজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় তথ্যও কার্যত অন্ধকারে রয়েছে। প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা হয়তো কোনো দিনই জানা যাবে না।

ইরানি সরকার এ সংকটের জন্য বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপকে দায়ী করছে। তারা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাকে অর্থনীতির দুরবস্থার প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরছে। কিন্তু অন্যকে দোষারোপ করতে তারা দ্বিধা না করলেও তারা স্বীকার করে না যে এই নিষেধাজ্ঞাগুলো এসেছে ইরানের নিজের সিদ্ধান্তের ফলেই। পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে সশস্ত্র গোষ্ঠীকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার মতো নীতির কারণেই এসব নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

ইরানের জনসংখ্যা আনুমানিক ৯ কোটি ২০ লাখ। তাই প্রতিবেশী দেশগুলো আশঙ্কা করছে, সেখানে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলে বিপুলসংখ্যক শরণার্থী সীমান্ত পাড়ি দিতে পারে। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ এবং তার ফলে সৃষ্টি হওয়া শরণার্থী সংকটের প্রভাব এখনো কাটেনি।

নিষেধাজ্ঞার প্রভাব যে পড়েছে, তা স্পষ্ট। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ইরানে মূল্যস্ফীতি ছিল ৩১ শতাংশ। বছরজুড়ে তা বাড়তে থাকে এবং অক্টোবরে গিয়ে সর্বোচ্চ ৪৮ শতাংশে পৌঁছায়। পরে ডিসেম্বর মাসে সামান্য কমে ৪২ শতাংশে নামে। বাণিজ্য সীমিত হয়ে পড়া এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের তীব্র মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষ চরমভাবে বিরক্ত ও হতাশ। গত ছয় মাসে ইরানি মুদ্রা রিয়ালের মূল্য ৬৪ শতাংশ কমে গেছে। পেনশনের টাকা দেরিতে দেওয়া হচ্ছে, দারিদ্র্য বাড়ছে এবং মানুষের সামনে সুযোগ ক্রমেই কমে আসছে।

এই দুর্দশার সঙ্গে যোগ হয়েছে শহরগুলোর বাড়তে থাকা বায়ুদূষণ। খরার কারণে কৃষি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অথচ শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত মানুষজন আরও ধনী হয়ে উঠছে। সর্বত্র দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়েছে। তারপরও ইরানের ক্ষমতাকাঠামো দেশের তহবিল শূন্য করে চলেছে। হাতে যা পয়সা আছে, তার বড় অংশই সামরিক ও পারমাণবিক অবকাঠামোতে ব্যয় কয়া হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিকে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলমান পরিবর্তনের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখতে হবে। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে তেহরানের নীতির কারণে ইরান খুব বেশি বন্ধু অর্জন করতে পারেনি। তবু আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা অনেক দেশকে সতর্ক অবস্থান নিতে বাধ্য করেছে। এখন জানা যাচ্ছে, তুরস্ক, সৌদি আরব, ওমান ও কাতার হোয়াইট হাউসের কাছে সামরিক হামলার বিরুদ্ধে চাপ সৃষ্টি করেছিল।

ইরানের জনসংখ্যা আনুমানিক ৯ কোটি ২০ লাখ। তাই প্রতিবেশী দেশগুলো আশঙ্কা করছে, সেখানে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলে বিপুলসংখ্যক শরণার্থী সীমান্ত পাড়ি দিতে পারে। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ এবং তার ফলে সৃষ্টি হওয়া শরণার্থী সংকটের প্রভাব এখনো কাটেনি। ২০১১ সালে সিরিয়ার জনসংখ্যা ছিল প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ। সেই তুলনায় ইরানে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হলে তার প্রভাব হবে অনেক বেশি গভীর ও ব্যাপক।

ইরানে বিক্ষোভকারীদের রাস্তা অবরোধ।

ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল পরোক্ষভাবে হলেও ইরানের বিক্ষোভকারীদের কিছু সহায়তা দিচ্ছে। ওয়াশিংটন ও তেল আবিব উভয়ই ইরানের শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন দেখতে চায়। ইরান পূর্ব ও পশ্চিমের বাণিজ্যপথের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থিত এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেল ও গ্যাস মজুতের একটি অংশ এই দেশেই রয়েছে।

ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদ ছিল সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানের সিদ্ধান্তের অন্যতম কারণ। কিন্তু ইরান ভেনেজুয়েলার তুলনায় অনেক বেশি শক্তভাবে সুরক্ষিত। ইরানের প্রতিরোধ সম্ভবত মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের জন্ম দিত। এ ধরনের সংঘাত এড়িয়ে চলার প্রতিশ্রুতি ট্রাম্প বারবার মার্কিন ভোটারদের দিয়েছিলেন।

প্রতিবেশী দেশগুলো জানে, এমন কোনো সংঘাত খুব দ্রুত সীমান্তের বাইরে ছড়িয়ে পড়বে। রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে হামলা চালায়, তাহলে ইরান এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে আঘাত হানবে। এই আশঙ্কার কারণেই ওয়াশিংটন কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটি থেকে কিছু মার্কিন কর্মী সরিয়ে নেয়।

এ পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে জটিল ভূরাজনৈতিক হিসাব। তুরস্ক বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন। আঙ্কারা ও তেহরানের মধ্যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্ক থাকলেও তারা মধ্যপ্রাচ্য, ককেশাস ও মধ্য এশিয়ায় একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী। সিরিয়ায় তাদের স্বার্থ একেবারেই ভিন্ন। সেখানে ইরান সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে সমর্থন করেছিল। অন্যদিকে তুরস্ক সমর্থন দিচ্ছে নতুন প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল শারাকে। শারার বাহিনী ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করে।

অন্যান্য দেশের মতো তুরস্কও মনে করে, ইরানে সামরিক হস্তক্ষেপ ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে। এতে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটবে এবং ইরান থেকে নতুন করে বড় আকারের শরণার্থী ঢল নামতে পারে।

একই সঙ্গে তুরস্কের দুশ্চিন্তা, ইরানে নতুন কোনো সরকার গঠিত হলে তা ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র হতে পারে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক দূত টম বারাকের সঙ্গে। আঙ্কারা সংযম বজায় রাখার আহ্বান জানাচ্ছে। ইরানে ভাঙন ও রাষ্ট্রীয় বিপর্যয়ের সম্ভাব্য ভয়াবহ প্রভাবের কথা তুলে ধরছে। যদিও ইরানের ভেতরে সংস্কারের সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না, তবু এমন পরিবর্তন মেনে নেওয়া শাসকগোষ্ঠীর পক্ষে কঠিন। কারণ, তাতে তাদের ক্ষমতার অবসান ঘটার আশঙ্কাই সবচেয়ে বেশি।

ইরানের আন্দোলন সাহসী ও দৃঢ়সংকল্প হলেও তা বিচ্ছিন্ন ও ঐক্যহীন। তাঁদের মধ্যে কোনো সুস্পষ্ট ঐক্য বা সংগঠিত নেতৃত্ব নেই। ফলে ইরানি শাসনব্যবস্থার বিরোধীরা একত্র হওয়ার মতো কোনো একক নেতা বা রাজনৈতিক শক্তি খুঁজে পাচ্ছে না। কেউ কেউ যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত ইরানের শেষ শাহর নির্বাসিত পুত্র রেজা পাহলভিকে রাজসিংহাসনে বসানোর আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু অধিকাংশ ইরানিই চান না গণ–অভ্যুত্থানে উৎখাত হওয়া একটি ঘৃণিত রাজবংশের উত্তরসূরির হাতে ইরানের শাসনভার তুলে দিতে।

ইরানের ভবিষ্যৎ খুব শিগগিরই নির্ধারিত হয়ে যাবে, এমন সম্ভাবনা কম। এর একটি বড় কারণ হলো, সরকার নির্মম দমন-পীড়ন চালিয়ে নিজেদের লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হয়েছে। তবে রাষ্ট্রযন্ত্রের হাতে বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রতিটি সহিংস আঘাত শাসকদের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ আরও গভীর করে তুলছে। চলমান ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে শাসনব্যবস্থা ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছে এবং ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। তবু এর চূড়ান্ত পতন এখনই ঘটবে, এমনটা বলা যায় না।

  • ওমের ওনহন সাবেক তুর্কি কূটনৈতিক ও রাষ্ট্রদূত। তিনি বর্তমানে বিভিন্ন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমে নিয়মিত লেখালেখি করেন।

আরব সাময়িকী আল মাজালা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত