বিভিন্ন সূচক ইতিবাচক ধারায় ফেরার পরও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলার সময় এখনো আসেনি। তা সত্ত্বেও দ্রব্যমূল্যের সাম্প্রতিক বৃদ্ধি থেকে স্পষ্ট দুটি শিক্ষা পাওয়া গেছে।
প্রথমত, অর্থনীতিবিদদের মানদণ্ডের মডেল (বিশেষত সবচেয়ে প্রভাবশালী মডেল, যাতে মনে করা হয় অর্থনীতিতে সব সময় ভারসাম্য থাকা উচিত) সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে গেছে। দ্বিতীয়ত, যাঁরা জোর গলায় বলছিলেন, বিদ্যমান ব্যবস্থা থেকে মূল্যস্ফীতিকে দূরে সরাতে পাঁচ বছর ভুগতে হবে, তাঁরাও এরই মধ্যে প্রত্যাখ্যাত হয়ে গেছেন।
মূল্যস্ফীতি নাটকীয়ভাবে কমেছে। মূল্যস্ফীতির মূল কারণ যে মহামারিজনিত সরবরাহে ঘাটতি ও চাহিদার ধরনে পরিবর্তন; মাত্রাতিরিক্ত সামষ্টিক চাহিদা এবং সুনিশ্চিতভাবে মহামারিজনিত ব্যয়ের কারণে অতিরিক্ত চাহিদা নয়, তার স্বপক্ষে ভূরি ভূরি প্রমাণ আছে। বাজার অর্থনীতিতে আস্থাশীল যে কেউ জানেন, সরবরাহজনিত বিষয়গুলোর সমাধান হবে একসময়, তবে কেউই সম্ভবত জানেন না, সেটা কখন।
সর্বোপরি আমাদের কেউই মহামারির কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড একেবারে বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং এর পরপরই সবকিছু চালু হওয়া দেখিনি। এ কারণে অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে তৈরি মডেলগুলো অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে।
এখনো আমরা ধারণা করতে পারি, সরবরাহব্যবস্থায় বাধাগুলো অপসারণ করাটা হবে মূল্যস্ফীতি প্রতিরোধী। যদিও এমন ব্যবস্থা মূল্যস্ফীতির শুরুর দিককার প্রক্রিয়াকে ত্বরিত গতিতে বা সম্পূর্ণভাবে আটকাতে পারবে না। কারণ, বাজারের প্রবণতাই হলো নিম্নমুখী সামঞ্জস্যের চেয়ে দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী সামঞ্জস্যে ফেরা।
কেউ কেউ এটি বলতে পারেন, মূল্যস্ফীতি যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা গেছে এ কারণে যে এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এমনটাই চেয়েছিল। আমাদের বাড়ির ওপর দিয়ে উড়োজাহাজ উড়ে যাওয়ার সময় আমার কুকুর উফি একই ধরনের উপসংহারে আসতে পারে। সে ভাবতে পারে, উড়োজাহাজগুলোকে সে ভয় পাইয়ে দিয়েছে এবং ঘেউ ঘেউ না করলে তার ওপর উড়োজাহাজ ধসে পড়ার শঙ্কা বাড়বে।
নীতিপ্রণেতারা প্রতিনিয়ত মাত্রাতিরিক্ত ও নামমাত্র প্রচেষ্টার ঝুঁকির মধ্যে ভারসাম্য আনার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। সুদহারের ক্রমশ বৃদ্ধির ঝুঁকি পরিষ্কার: ভঙ্গুর বৈশ্বিক অর্থনীতি মন্দায় গিয়ে ঠেকতে পারে। এতে ডলারের উচ্চমূল্য বৃদ্ধি, কম রপ্তানি আয় এবং উচ্চ সুদহারের ত্রিমুখী সংকটে থাকা মারাত্মক ঋণগ্রস্ত অনেক উদীয়মান ও বিকাশমান অর্থনীতির ঋণ সংকট অপ্রত্যাশিতভাবে বাড়তে পারে।
কোভিড-১৯ টিকার মেধাস্বত্ব দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে অহেতুক মানুষের মৃত্যুর পথ তৈরি করা যুক্তরাষ্ট্র জেনেবুঝে এমন নীতি গ্রহণ করেছে, যাতে বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অর্থনীতিগুলোর বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। চীনের সঙ্গে নতুন করে স্নায়ুযুদ্ধে জড়িয়ে পড়া কোনো দেশের এ কৌশলে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
এ পন্থার (সুদহার বৃদ্ধি) ইতিবাচক কোনো দিক আছে কি না, সেটিও স্পষ্ট নয়। সুদহার বৃদ্ধি সরবরাহব্যবস্থায় বিদ্যমান বাধাগুলো অপসারণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগকে ব্যয়বহুল করে তোলে। তাই এটি কার্যত কল্যাণের চেয়ে বেশি অকল্যাণ ডেকে আনে।
মুদ্রানীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের কড়াকড়িতে এরই মধ্যে আবাসিক ভবন নির্মাণ কমে গেছে। যদিও মূল্যস্ফীতির অন্যতম বড় উৎস বাসাভাড়ার খরচ কমিয়ে আনতে সুনির্দিষ্টভাবে দরকার আরও ভবন নির্মাণ। উপরন্তু আবাসন বাজারে দর নির্ধারণকারীরা এখন বাড়তি খরচের বোঝা ভাড়াটেদের ওপর চাপিয়ে দিতে পারেন। খুচরা ও অন্যান্য বাজারে উচ্চ সুদহার মোটাদাগে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে।
গভীরতর মন্দা সুনিশ্চিতভাবে মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসবে। কিন্তু কেন আমরা একে ডেকে আনব? ফেডারেল রিজার্ভ চেয়ারম্যান জেরোমি পাওয়েল ও তাঁর সহকর্মীরা দৃশ্যত পরিস্থিতি উপভোগ করছেন। এদিকে বাণিজ্যিক ব্যাংকিং খাতে তাঁদের বন্ধুরা ডাকাতদের মতো অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন। কারণ, ফেডারেল রিজার্ভ সঞ্চিত তিন লাখ কোটি ডলারের বেশি অর্থের ওপর ৪ দশমিক ৪ শতাংশ হারে সুদ ধার্য করেছে, যার মধ্য দিয়ে বছরে আসছে ১৩ হাজার কোটি ডলার।
উল্লিখিত সবকিছুর বৈধতা দিতে ফেডারেল রিজার্ভ চেনা জুজুর (লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, উচ্চ মজুরিজনিত মূল্যবৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না আসা) আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু এসব জুজু গেল কোথায়? মূল্যস্ফীতি কমছে। একই সঙ্গে মূল্যবৃদ্ধির তুলনায় অনেক ধীরগতিতে বাড়ছে মজুরি (যার মানে হলো উচ্চ মজুরিজনিত মূল্যবৃদ্ধি নেই) এবং মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশিত মাত্রায় রয়েছে। পাঁচ বছরের জন্য কাঙ্ক্ষিত সুদহার প্রত্যাশার চেয়ে মাত্র ২ শতাংশ বেশি।
কেউ কেউ এ ভেবে শঙ্কিত হতে পারেন যে আমরা মূল্যস্ফীতি ২ শতাংশ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা দ্রুত পূরণ করতে পারব না। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এ সংখ্যা অপ্রত্যাশিত। এর কোনো অর্থনৈতিক তাৎপর্য নেই। মূল্যস্ফীতি ২ থেকে ৪ শতাংশের মধ্যে থাকলে অর্থনীতি এর ভার বইতে পারবে না, এমন নজিরও নেই।
কেউ কেউ এটি বলতে পারেন, মূল্যস্ফীতি যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা গেছে এ কারণে যে এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এমনটাই চেয়েছিল। আমাদের বাড়ির ওপর দিয়ে উড়োজাহাজ উড়ে যাওয়ার সময় আমার কুকুর উফি একই ধরনের উপসংহারে আসতে পারে। সে ভাবতে পারে, উড়োজাহাজগুলোকে সে ভয় পাইয়ে দিয়েছে এবং ঘেউ ঘেউ না করলে তার ওপর উড়োজাহাজ ধসে পড়ার শঙ্কা বাড়বে।
উফি যা ভেবেছে, আধুনিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে এর চেয়ে বেশি কিছু থাকাটাই প্রত্যাশিত। কী হচ্ছে এবং কোন পরিস্থিতিতে জিনিসপত্রের দাম কমে এসেছে, তা নিয়ে সতর্ক পর্যবেক্ষণ আন্তসম্পর্কবাদীদের দর্শনের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ। তাঁরা মনে করেন, সরবরাহব্যবস্থায় ব্যাঘাত ঘটার পাশাপাশি চাহিদার ধরনে পরিবর্তন আসাটাই মূল্যস্ফীতির মূল কারণ। এসব বিষয় ঠিকঠাক হলে মূল্যস্ফীতি ধারাবাহিকভাবে কমে আসতে পারে।
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ইংরেজি থেকে অনূদিত
জোসেফ ই স্টিগলিৎজ নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ