সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

শুল্কমুক্ত গাড়ি

অন্য অযৌক্তিক সুবিধাও বাতিল করা প্রয়োজন

সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানি–সুবিধা বাতিল করে আনা বিল জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। এখন রাষ্ট্রপতি সম্মতি দিলেই বিলটি আইনে পরিণত হবে। শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানিসহ সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের সুযোগ–সুবিধা বাংলাদেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতায় কতটা ন্যায্য ও যৌক্তিক, তা নিয়ে বহু বছর ধরেই আলোচনা চলে আসছে। এ পটভূমি বিবেচনায় বর্তমান সংসদে বিলটি পাস হওয়ায় আমরা স্বাগত জানাই।

প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, রোববার জাতীয় সংসদে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান ‘দ্য মেম্বারস অব পার্লামেন্ট (রেমুনারেশন অ্যান্ড অ্যালাউন্সেস) অর্ডার–১৯৭৩ সংশোধন বিল’ উত্থাপন করেন। বিলটির ওপর কোনো সংশোধনী প্রস্তাব ছিল না। এর ফলে কোনো আলোচনা ছাড়াই বিলটি সংসদে পাস হয়। এই বিল পাসের মাধ্যমে আইনের শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুবিধাসংক্রান্ত ধারা (৩সি) বিলুপ্ত করা হয়েছে। এ ধারা অনুসারে, সংসদ সদস্যরা তাঁদের পুরো মেয়াদকালে শুল্কমুক্তভাবে, উন্নয়ন সারচার্জ এবং আমদানি পারমিট ফি ছাড়া সরকার কর্তৃক নির্ধারিত বিবরণ ও শর্ত অনুযায়ী একটি গাড়ি, জিপ বা মাইক্রোবাস আমদানির সুযোগ পেতেন। এ ছাড়া পাঁচ বছর পর একইভাবে আরেকটি শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুযোগও পেতেন তাঁরা।

সংসদ সদস্যদের জন্য প্রথম শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানি–সুবিধা চালু হয়েছিল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের চতুর্থ জাতীয় সংসদে। নির্বাচনী এলাকায় নাগরিকদের সঙ্গে সংসদ সদস্যদের যোগাযোগ–সুবিধার কথা সংসদ সদস্যদের প্রাপ্য বেতন–ভাতার সঙ্গে শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুযোগ তৈরি করা হয়েছিল। বাস্তবতা হচ্ছে এই সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে বিগত সংসদগুলোয় সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের একটি বড় অংশ বিলাসবহুল গাড়ি আমদানি করেছেন। শুল্কমুক্ত–সুবিধায় আমদানি করা গাড়ি চড়া দামে বিক্রি করারও বহু নজির সৃষ্টি হয়েছিল। এ নিয়ে নাগরিকদের মধ্যে নানা প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনার জন্ম হলেও অতীতে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির ক্ষেত্রে ঐক্য দেখা গেছে।

আওয়ামী লীগের তিন মেয়াদে অন্তত ৫৭৬টি গাড়ি শুল্কমুক্ত–সুবিধায় আমদানি করা হয়েছিল। এসব গাড়ির আমদানিমূল্য (অ্যাসেসমেন্ট ভ্যালু ধরে) ৪২৮ কোটি টাকা। গাড়িগুলো সাধারণ মানুষের জন্য আমদানি করা হলে শুল্ক–কর দিতে হতো সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার বেশি। সংসদ সদস্যরা এমন গাড়িও আমদানি করেছেন, যার বাজারমূল্য ৯ থেকে ১২ কোটি টাকা। যে দেশে ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে, সে দেশে জনপ্রতিনিধিদের এই গাড়িবিলাস ছিল অনৈতিক ও বৈষম্যমূলক।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে নির্বাচনে বিজয়ী দল বিএনপির সংসদ সদস্যরা শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট নেবেন না বলে জানান। নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামীও শুল্কমুক্ত গাড়ি ও প্লট না নেওয়ার কথা বলেছিল। এমপিদের শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানি বন্ধের বিল পাস হওয়াটা সে ক্ষেত্রে এক ধাপ অগ্রগতি। আমরা আশা করি, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের প্লটসুবিধা বাতিলের পদক্ষেপও দ্রুত নেওয়া হবে।

অতিরিক্ত ও অনৈতিক সুযোগ–সুবিধার কারণেই সংসদ সদস্য হওয়াটা আমাদের দেশে ‘লাভজনক ব্যবসা’ হয়ে উঠেছে। ফলে জনগণের জন্য আইন প্রণয়নের চেয়ে নিজেদের ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষাটাই প্রাধান্য পেয়েছে। এই ব্যবস্থা নিশ্চিত করেই গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক শাসনকাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বর্তমান সংসদে সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির পথ বন্ধ হলেও তাঁদের জন্য সরকারি গাড়ি বরাদ্দের দাবি উঠেছে। এ রকম দাবি কতটা যৌক্তিক ও ন্যায্য, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে। সংসদ সদস্যদের অবশ্যই সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে জনপ্রত্যাশার কথা স্মরণে রাখতে হবে।

আমরা মনে করি, সংসদ সদস্যরা অন্য যেসব অযৌক্তিক সুবিধা পান, সেগুলোও বাতিল করা প্রয়োজন।