জামায়াতের ইশতেহারটিকে নানা দিক থেকে ব্যতিক্রমী বলা গেলেও এর বেশ কিছু পাতায় যেসব ছবি দেখা যাচ্ছে, তার উৎস নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়।
জামায়াতের ইশতেহারটিকে নানা দিক থেকে ব্যতিক্রমী বলা গেলেও এর বেশ কিছু পাতায় যেসব ছবি দেখা যাচ্ছে, তার উৎস নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়।

মতামত

‘ভারতবিরোধী’ জামায়াতের ইশতেহারে কেন ভারতীয় ছবি

জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটের আয়োজন করছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সেদিক থেকে নিঃসন্দেহে এবারের নির্বাচন দেশের ‘গণতান্ত্রিক’ যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ।

গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ছাড়াই নির্বাচন হতে যাচ্ছে। দলটির প্রধান সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতের আশ্রয়ে আছেন। তাঁকে আশ্রয় দেওয়ায় ভারতের ওপর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ক্ষুব্ধ।

আওয়ামী লীগের প্রতি ভারতের অতি সমর্থনের কারণে বর্তমানে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক বেশ খারাপ পর্যায়ে রয়েছে।

ভারতের সমালোচনার ক্ষেত্রে অন্যান্য রাজনৈতিক দল কৌশলী আচরণ করলেও জামায়াতে ইসলামীর নেতারা ভারতবিরোধী অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে আসছেন। তাঁরা প্রায়শই ভারতের আগ্রাসনের অভিযোগ তুলে আসছেন।

এই ছবিটি ভারতের। দিবাকর রায় নামে কলকাতার এক ফটোসাংবাদিকের তোলা ছবিটি আছে আনস্প্যালাস ডট কমে

তবে যে ভারতকে নিয়ে জামায়াতের নেতা-কর্মীরা সমালোচনায় মগ্ন থাকেন, সেই ভারতেরই নানা দৃশ্যচিত্র স্থান পেয়েছে দলটির ইশতেহারে।

ইশতেহারটিকে নানা দিক থেকে ব্যতিক্রমী বলা গেলেও এর বেশ কিছু পাতায় যেসব ছবি দেখা যাচ্ছে, তার উৎস নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়।

ধর্মীয় আবহের আড়ালে গড়া গঠনতন্ত্র থাকলেও দলটি এবারের ইশতেহারে এমন কিছু ছবি তুলে ধরেছে যা নিয়ে দলটির ‘উদার দৃষ্টিভঙ্গি’ প্রকাশ পেয়েছে।

বিশেষ করে, দলটির নারী নেত্রীরা সব সময় বোরকা পরিধান করে আসলেও তাঁদের প্রকাশ করা ইশতেহারের ছবিতে মেয়েদের শাড়ি, সালওয়ার-কামিজে উপস্থাপন করা হয়েছে।

এমনকি এখানে ধুতি পরা ও ঢোল-তবলাসহ ‘আদিবাসী’দের উপস্থাপন করা হয়েছে। ইশতেহারের কথার ফাঁকে ফাঁকে নানা ধর্মের মানুষের ছবি দিয়েও।

তবে এসব ছবি বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, দলটি ভারতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য থেকে সে দেশের মানুষের জীবনযাত্রার অনেক কিছুই কপি করে ‘বাংলাদেশের রূপ-লাবণ্য’ হিসেবে বাজারে ছেড়েছে।  

পুস্তিকাটির ৪৮ নম্বর পাতায় চতুর্থ ভাগে ‘খাদ্য’ শিরোনামে জামায়াতের ‘খাদ্যভাবনা’ তুলে ধরা হয়েছে।

সাশ্রয়ী মূল্যে খাদ্যপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা দিয়ে দলটি ১১টি পয়েন্ট নিয়ে আলোচনা করেছে। সেখানে ছবিতে একজন নারী ও একজন পুরুষকে চাতালে ‘ধান শুকানোর’ কাজ করতে দেখা যাচ্ছে।

এই ছবিটি ভারতের। দিবাকর রায় নামে কলকাতার এক ফটোসাংবাদিকের তোলা ছবিটি আছে আনস্প্যালাস ডট কমে

অথচ বাংলাদেশে বিশেষ করে উত্তরাঞ্চল জেলা নওগাঁয় আমাদের দেশের সবচেয়ে বেশি চাল-কলগুলোর আবহমান চিত্র একই ছিল। তাঁরা ইচ্ছে করলেই সেখান থেকে এ ধরনের ছবি পেশাদার চিত্রগ্রাহক দিয়ে তুলে নিতে পারতেন।

৫৪ পাতায় পঞ্চম ভাগে ‘মানবসম্পদ ও জনজীবনের মৌলিক মানোন্নয়ন’ শিরোনামে শিক্ষাব্যবস্থা, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ, সংস্কৃতি, ধর্ম ও নৈতিকতা বিষয় আলোকপাত করতে গিয়ে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের মানচিত্রের ভেতর নানা ধর্ম ও সংস্কৃতির বিষয়টি কোলাজ করেছে। কোলাজে থাকা সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর নৃত্যরত ধুতি পরিহিত ঢুলিদের ছবিটিও ভারতের।

এই ছবি ভারতের বেশ কয়েকটি পোর্টালে সে দেশের সংস্কৃতির অংশ হিসেবে তুলে ধরা হলেও গত বছরের ২ জানুয়ারি বিহার সরকারের পর্যটন বিভাগ তাঁদের ফেসবুক পেজে ছবিটি আপলোড করেছে।

এই ছবি ভারতের বেশ কয়েকটি পোর্টালে সে দেশের সংস্কৃতির অংশ হিসেবে তুলে ধরা হলেও গত বছরের ২ জানুয়ারি বিহার সরকারের পর্যটন বিভাগ তাঁদের ফেসবুক পেজে ছবিটি আপলোড করেছে।

জামায়াত যদি সত্যিই বাংলাদেশকে এমন উদারভাবে উপস্থাপন করতে চায়, তাহলে আমাদের নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ কিংবা রাজশাহী থেকে এমন কিছু ছবি তুলতে পারত। সেখানে থাকত বাংলাদেশের মাটির ঘ্রাণ।

মূলত উত্তর প্রদেশ সরকারের শ্রমিক ডিপার্টমেন্টে প্রকাশিত হয়েছে ছবিটি।

৫৫-৫৯ পাতায় দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ভাবনা তুলে ধরতে স্কুল পড়ুয়া শিশুদের ছবি দেওয়া হয়েছে।

ছবিতে দেখা যাচ্ছে, স্কুলড্রেস পরে কয়েকজন শিশু সরিষা খেতের পাশ দিয়ে যাচ্ছে। মূলত উত্তর প্রদেশ সরকারের শ্রমিক ডিপার্টমেন্টে প্রকাশিত হয়েছে ছবিটি। ভারতের সরকারি পেনসিল ডট গভ ডট ইন ওয়েবসাইটের পিডিএফ ডকুমেন্টে ছবিটা পাওয়া যাচ্ছে।

৬০-৬২ পাতায় ‘স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ’ শিরোনামে সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবার অধিকার নিশ্চিত করতে ৩৭টি পয়েন্ট আলোকপাত করতে দলটি বাবা-মায়ের সঙ্গে ডাক্তারের কাছে চিকিৎসাসেবা নিতে চাওয়া শিশুর ছবি প্রকাশ করেছে।

শাড়ি পরিহিত মায়ের কাছে নির্ভয়ে থাকা শিশুটির এই ছবি ভারতের উত্তর প্রদেশের সুলভ উপচার কেন্দ্র নামের একটি ওয়েব সাইট থেকে নামানো হয়েছে।

শাড়ি পরিহিত মায়ের কাছে নির্ভয়ে থাকা শিশুটির এই ছবি ভারতের উত্তর প্রদেশের সুলভ উপচার কেন্দ্র নামের একটি ওয়েব সাইট থেকে নামানো হয়েছে।

ইশতেহারের ৭১ পাতায় ‘ভূমি ব্যবস্থাপনায়’ বলতে গিয়ে ‘গ্রামীণ জনপদে’ রাখালের গরু নিয়ে যাওয়ার যে ছবিটি যুক্ত করা হয়েছে সেটিও ভারতের।

পিন্টারেস্ট প্রকাশিত ছবিটিতে ফটোগ্রাফার ববিজোসি ডটকম রয়েছে, যিনি ভারতে বেঙ্গালুরু এলাকার বাসিন্দা বলে ফেসবুক প্রোফাইলে লেখা আছে ।

ইশতেহারের ৭১ পাতায় ‘ভূমি ব্যবস্থাপনায়’ বলতে গিয়ে ‘গ্রামীণ জনপদে’ রাখালের গরু নিয়ে যাওয়ার যে ছবিটি যুক্ত করা হয়েছে সেটিও ভারতের।
যে ছবিটি তাঁরা এখানে তুলে ধরেছে, সেটিও ভারতের ‘কর্মজীবী’ নারীদের।

৮১ নম্বর পাতায় ‘সমাজকল্যাণ’ শিরোনামে সবার জন্য সামাজিক নিরাপত্তার স্বপ্ন দেখানো জামায়াতে ইসলামী ‘বেশ সাহসিকতার’ সঙ্গে শাড়ি পরিহিত নারীর ছবি প্রকাশ করেছে।

সেলাইরত নারীদের সামনে থাকা এই নারীকে দেখলে মনে হবে তিনি একজন নারী উদ্যোক্তা।

জামায়াতে ইসলামী যখন নারীদের কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনার কথা বলছে, দলটির নেতারা নারীকে নিয়ে আপত্তিকর কথা-বার্তা বলছে, তখন একজন শাড়ি পরিহিত কর্মজীবী নারীকে দেখলে ‘স্বাভাবিকভাবে’ জামায়াতে ইসলামীর প্রসারিত দৃষ্টিভঙ্গি বলে মনে হবে। কিন্তু যে ছবিটি তাঁরা এখানে তুলে ধরেছে, সেটিও ভারতের ‘কর্মজীবী’ নারীদের।

শ্রী স্বামী ফাউন্ডেশন ডট ইন নামক এক ওয়েবসাইটে ‘ইমপাওয়ারমেন্ট অব উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন’ শিরোনামে এই ছবি রয়েছে।

তবে জামায়াতের ইশতেহারে ছবিটি রিভার্স করে প্রকাশ করা হয়েছে। এ ছাড়াও জেলেদের মাছধরা, গ্রিন হাউসে বাঁধাকপিসহ বেশ কিছু ছবি অনলাইন থেকে নামানো হয়েছে।

এর আগে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বেশ কিছু পাঠ্যপুস্তকের কনটেন্ট ও ছবি ভারতের কোচিং সেন্টারগুলো থেকে চুরি করা হয়েছিল। গুগল অনুবাদ দিয়েও তৈরি করা হয়েছিল পাঠ্যপুস্তক

তখন বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে সমালোচনা ছিল যে আমরা কেন ভারতের কোচিং সেন্টারের কাছ থেকে পাঠ্যপুস্তকের বিষয়বস্তু হুবহু কপি করছি কিন্তু এখন পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকল, যা আমাদের ভণ্ডামিকে সামনে নিয়ে আসছে।

জামায়াতে ইসলামী সব সময় ‘সত্য ও ইসলামি আলোকে জীবন ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা পরিচালিত হবে’ বলে প্রচার করে।

নির্বাচনকে সামনে রেখে তারা ঝকঝকে একটি ইশতেহার তৈরি করল, যেখানে ভোটারদের সামনে দেশ নিয়ে ভালো ভালো চিন্তাভাবনার কথা বলতে গিয়ে মেকআপ নিল ভারতেরই।

জামায়াতে ইসলামীর ইশতেহার ভালো কি মন্দ, কতটা প্রশংসনীয় বা বাস্তবায়নযোগ্য সেসব নিয়ে অবশ্যই আলোচনা হতে পারে। তবে প্রথম যাত্রাতে অন্যদের ছবি মেরে দিয়ে নিজেদের বলে চালিয়ে দেওয়া গর্হিত কাজই বলতে হবে।

  • ড. নাদিম মাহমুদ গবেষক, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়।
    ইমেইল: nadim.ru@gmail.com
    *মতামত লেখকের নিজস্ব