
রাজধানীর শাহবাগ থানার ভেতরে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন অন্তত ১০ সাংবাদিক। তাঁরা সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সদস্য।
এই হামলাকে ‘মব’ বলছে সমিতি। হামলার জন্য তারা ছাত্রদলের নেতা–কর্মীদের দায়ী করেছে। হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার–শাস্তিসহ তিন দফা দাবি জানিয়েছে সমিতি।
সমিতি বলেছে, গতকাল বৃহস্পতিবার রাত আটটার দিকে এ হামলার ঘটনা ঘটে। এর আগের দিন বুধবার বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি হলে কয়েকজন সাংবাদিককে হেনস্তা–হুমকি দেন ছাত্রদলের নেতা–কর্মীরা।
সমিতির তথ্য অনুযায়ী, হামলার শিকার হন মানজুর হোছাঈন মাহি (কালের কণ্ঠ), লিটন ইসলাম (আগামীর সময়), নাইমুর রহমান ইমন (ডেইলি অবজারভার), খালিদ হাসান (দেশ রূপান্তর), সামশুদৌজা নবাব (ঢাকা ট্রিবিউন), মোহাম্মদ ইফতেখার হোসেন সিফাত (ঢাকা মেইল), হারুন ইসলাম (নয়া দিগন্ত), সৌরভ ইসলাম (রাইজিংবিডি ডটকম), আসাদুজ্জামান খানসহ (মানবজমিন) ১০ সাংবাদিক। তাঁদের মধ্যে মানজুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সভাপতি, লিটন সাধারণ সম্পাদক।
ভুক্তভোগী সাংবাদিকেরা বলেন, গতকাল সন্ধ্যায় শাহবাগ থানায় সৃষ্ট উত্তেজনার সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়েছিলেন তাঁরা। তখন তাঁদের ওপর দুই দফায় হামলা করেন ছাত্রদলের নেতা–কর্মীরা।
ভুক্তভোগী সাংবাদিকদের ভাষ্য, জাগোনিউজের ফেরদৌস ও রাইজিংবিডির সৌরভ ভিডিও ধারণ করতে গেলে তাঁদের বাধা দেন ছাত্রদলের কয়েকজন নেতা–কর্মী। এর প্রতিবাদ জানান মানজুর। তখন তাঁকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেন ছাত্রদলের সাবেক সহ-স্কুলবিষয়ক সম্পাদক ওবায়দুর রহমান সামিথ। মানজুর নিজের পরিচয় দিলে তাঁকে গালি দেওয়া হয়। ফেরদৌসসহ আরও কয়েকজন সাংবাদিক এগিয়ে গেলে ছাত্রদলের নেতা–কর্মীরা তাঁদের থানার বারান্দা থেকে ধাক্কা দিতে দিতে চত্বরে নিয়ে যান।
এ সময় ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গাজী মো. সাদ্দাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সিনিয়র সহসভাপতি মাসুম বিল্লাহ, সাংগঠনিক সম্পাদক নূর আলম ভূঁইয়া ইমনের নেতৃত্বে সংগঠনটির নেতা–কর্মীরা ‘শিবির-সাংবাদিক একসাথে চলে না’ বলে স্লোগান দিতে থাকেন বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী সাংবাদিকেরা। তাঁরা বলেন, এর কিছু সময় পর অন্য সাংবাদিকেরা থানায় উপস্থিত হলে ওবায়দুর এসে দুঃখ প্রকাশ করেন। তবে তা ছিল ‘নাটক’। এর কিছুক্ষণের মধ্যে হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল ছাত্রদলের আহ্বায়ক আবুজার গিফারী ইফাত হঠাৎ এসে বলতে থাকেন, ‘এই ভাইরে মারছে, এই ভাইরে মারছে।’ এ কথা বলে তিনি মব সৃষ্টি করেন। তখন ছাত্রদলের নেতা–কর্মীরা উপস্থিত সাংবাদিকদের ওপর হামলে পড়েন।
ভুক্তভোগী সাংবাদিকেরা অভিযোগ করেন, আবুজার গিফারীর নেতৃত্বে এই হামলায় অংশ নেয় ঢাবি ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইমাম আল নাসের মিশুক, হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল ছাত্রদলের সদস্যসচিব মনসুর রাফি, শহীদুল্লাহ হলের সদস্যসচিব জুনায়েদ আবরার, বিজয় একাত্তর হল ছাত্রদলের নেতা সুলায়মান হোসেন রবি, সাকিব বিশ্বাস ও সাজ্জাদ খান, সূর্য সেন হল ছাত্রদলের আহ্বায়ক মনোয়ার হোসেন প্রান্ত, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল ছাত্রদলের সদস্য কারিব চৌধুরী ও জাহিন ফেরদৌস জামি, কবি জসীম উদ্দীন হল ছাত্রদলের নেতা মোহতাসিম বিল্লাহ হিমেল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মমিতুর রহমান পিয়াল, নেতা হাসানসহ অর্ধশতাধিক নেতা–কর্মী। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের এক নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম অনিক, ক্রীড়া সম্পাদক সাইফ খানসহ সংগঠনটির অন্য জ্যেষ্ঠ নেতারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
সাংবাদিকদের ওপর হামলায় অংশ নেননি বলে দাবি করেন আবুজার গিফারী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওখানে তো ৪০-৫০টা মিডিয়া—সবাই ভিডিও করছিল চারদিক দিয়ে। এবং থানার ভেতরে সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে। কোনো জায়গায় কেউ দেখাতে পারবে না যে আমি কাউকে আঘাত করছি বা উসকে দিচ্ছি। তারা (সাংবাদিক সমিতি) যেহেতু অভিযোগ করেছে, এটা হয়তো কোনো ভুল–বোঝাবুঝি হতে পারে। কারণ, ভিডিও ফুটেজগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।’
ঢাবির সাংবাদিক সমিতির কয়েকজন সদস্যের ওপর হামলার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির। আজ শুক্রবার বেলা ১১টা ২৪ মিনিটে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এই দুঃখ প্রকাশ করেন।
পোস্টে নাছির উদ্দীন বলেন, গতকাল একটি কুরুচিপূর্ণ ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে শাহবাগ থানায় একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। উত্তেজনাকর পরিস্থিতির চলাকালে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে ঢাবির সাংবাদিক সমিতির কয়েকজন সদস্য আহত হয়েছেন বলে তাঁরা জানতে পেরেছেন। এ ঘটনায় তিনি ছাত্রদলের পক্ষ থেকে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছেন। ছাত্রদল সাংবাদিকদের সুরক্ষাসহ গণমাধ্যমের অবাধ স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। ভবিষ্যতে আর কোনো সাংবাদিক যাতে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হয়রানির শিকার না হন, সেই আশা করছেন তাঁরা।
সাংবাদিক সমিতির তিন দফা দাবি
সাংবাদিকদের ওপর হামলার প্রতিবাদ, হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তারসহ জড়িত শিক্ষার্থীদের একাডেমিকভাবে বহিষ্কারের দাবি জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি। সংগঠনটি একই সঙ্গে সারা দেশে স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।
গতকাল রাত সাড়ে ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে সাংবাদিক সমিতির কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সমিতির সভাপতি মানজুর বলেন, চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানের পর যে স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তা প্রশ্নবিদ্ধ করছে। গত দুই দিনে ধারাবাহিকভাবে সাংবাদিকদের হেনস্তা, হামলার ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
মানজুর আরও বলেন, একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সৃষ্টি হওয়া উত্তেজনার খবর পেয়ে সাংবাদিকেরা শাহবাগ থানায় গিয়েছিলেন। সেখানে ভিডিও ধারণ করতে গেলে ছাত্রদলের নেতা–কর্মীরা বাধা দেন। প্রতিবাদ জানালে তাঁকে ধাক্কা দেওয়া হয়। অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয়। পরবর্তী সময় একটি ‘মব’ তৈরি করে ছাত্রদলের নেতা–কর্মীরা সাংবাদিকদের ওপর হামলে পড়েন।
সমিতির সাধারণ সম্পাদক লিটন অভিযোগ করে বলেন, ঘটনাস্থলে পুলিশ থাকাকালেও তাদের ভূমিকা ছিল নীরব। আগের ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতায় গতকাল রাতের এ হামলা সাংবাদিকদের জন্য একটি স্পষ্ট হুমকি।
শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘গতকাল যত লোকজন থানায় এসেছে, আমরা কয় দিকে সামাল দেব বলেন? আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি সবকিছু সামাল দেওয়ার জন্য। পুলিশকে ঢালাওভাবে দোষারোপ করাটা তো আমাদের রীতিতে পরিণত হয়েছে।’
সমিতির সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, হামলায় যে সাংবাদিকেরা আহত হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে কয়েকজন চিকিৎসা নিয়েছেন।
সমিতির পক্ষ থেকে তিন দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। এগুলো হলো—হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা, জড়িত শিক্ষার্থীদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবিলম্বে বহিষ্কার, সারা দেশে স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ নিশ্চিত করা।
এ বিষয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে সঙ্গে নিয়ে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, হামলাকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।