ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি ও গাজী নজরুল ইসলাম
ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি ও গাজী নজরুল ইসলাম

মিষ্টি–গাজী নজরুলের আগে বিতর্কে জড়ানো এমপিদের পরিণতি কী হয়েছিল

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরু হয় প্রায় সাত মাস আগে। এর মধ্যে গুরুতর অভিযোগে আলোচিত-সমালোচিত হন দুজন সংসদ সদস্য। দুজনের পরিণতি হয়েছে দুই রকম।

একজন জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়নে নির্বাচিত গাজী নজরুল ইসলাম এখন কারাগারে। নৈতিক স্খলনের অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কৃত হলেও তিনি সংসদ সদস্য পদে বহাল রয়েছেন।

অন্যজন বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি পদত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। ঢাকার মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় তাঁর নাম আসার পর তাঁকে পদত্যাগে নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

সংসদ সদস্যদের বিতর্কে জড়ানো, এর জেরে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কিংবা পদত্যাগের ঘটনা নতুন নয়।

অতীতে বিভিন্ন কারণে অন্তত পাঁচজন সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হওয়ার নজির রয়েছে।

অন্তত চারজন সংসদ সদস্য দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। তবে সে কারণে তাঁদের সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকার ক্ষেত্রে কোনো আইনি বাধা তৈরি হয়নি।

অবশ্য দলবদল ও দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করার ঘটনায় সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে অন্তত তিনজনের সংসদ সদস্যের পদ বাতিলের নজির অতীতে রয়েছে।

সংসদ সদস্যের আসন কী কারণে বা কখন শূন্য হবে, তার উল্লেখ আছে সংবিধানের ৬৭ অনুচ্ছেদে। সেই কারণ বা পরিস্থিতিগুলোর মধ্যে আছে, যদি নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠকের তারিখ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে তিনি শপথ নিতে ব্যর্থ হন; যদি সংসদের অনুমতি না নিয়ে তিনি অধিবেশনে টানা ৯০ কার্যদিবস অনুপস্থিত থাকেন; যদি সংসদ ভেঙে যায়; যদি আদালত তাঁকে অপ্রকৃতিস্থ বলে ঘোষণা করেন; দেউলিয়া ঘোষিত হওয়ার পর দায় থেকে অব্যাহতি না পেয়ে থাকেন; কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেন বা আনুগত্য ঘোষণা বা স্বীকার করেন কিংবা নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে দুই বছরের বেশি কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন ও তাঁর মুক্তিলাভের পর পাঁচ বছর অতিবাহিত না হয়ে থাকে।

১৯৭২ সালের দালাল আইন (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) আদেশের অধীন কোনো অপরাধের জন্য দণ্ডিত হয়ে থাকলে, প্রজাতন্ত্রের কোনো লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত থাকলে, কোনো আইনের দ্বারা নির্বাচনের অযোগ্য হয়ে থাকলে সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হতে পারে। এর বাইরে কোনো সংসদ সদস্য যদি নিজের দল থেকে পদত্যাগ করেন অথবা সংসদে নিজের দলের বিপক্ষে ভোট দেন, তাহলে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তাঁর আসন শূন্য হয়ে যায়। এ ছাড়া কোনো সংসদ সদস্য স্পিকারের কাছে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রের মাধ্যমে নিজের পদ থেকে সরে যেতে পারেন।

লতিফ সিদ্দিকী ও মুরাদ হাসানের ঘটনা

আবদুল লতিফ সিদ্দিকী

টাঙ্গাইল-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী পদে থাকা অবস্থায় আবদুল লতিফ সিদ্দিকী ২০১৪ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে নানা বিষয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেন। এর জেরে ১২ অক্টোবর তাঁকে মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণ করা হয়। একই দিন আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সভাপতিমণ্ডলীর পদ থেকে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পাশাপাশি তাঁর দলীয় সদস্যপদও সাময়িক স্থগিত করা হয়।

২০১৪ সালের ২৪ অক্টোবর লতিফ সিদ্দিকীর প্রাথমিক সদস্যপদ বাতিল করে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করে আওয়ামী লীগ। দেশে ফেরার পর নভেম্বরে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের মামলায় নয় মাস কারাগারে ছিলেন লতিফ সিদ্দিকী। তাঁর সংসদ সদস্য পদ থাকবে কি না, তা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আওয়ামী লীগের চিঠি চালাচালি হয়। একপর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে শুনানির উদ্যোগ নেয় কমিশন। ২০১৫ সালের আগস্টে সেই উদ্যোগের বিরুদ্ধে আদালতে গিয়ে বিফল হন লতিফ সিদ্দিকী।

পরে নির্বাচন কমিশনের শুনানিতে লতিফ সিদ্দিকী বলেন, শুনানির প্রয়োজন নেই। তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করবেন। এই সিদ্ধান্তের পেছনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘ইচ্ছার’ কথা বলেছিলেন তিনি। পরে একই বছরের ১ সেপ্টেম্বর সংসদে দেওয়া বক্তব্যে পদত্যাগের ঘোষণা দেন লতিফ সিদ্দিকী।

মুরাদ হাসান

অশ্লীল মন্তব্য ঘিরে ২০২১ সালের ডিসেম্বরের শুরুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী এবং জামালপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মুরাদ হাসান। সমালোচনার মধ্যে তাঁর ফোনালাপের একটি অডিও ছড়িয়ে পড়ে। এই ফোনালাপে এক চিত্রনায়িকার সঙ্গে কথা বলার সময় অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করেন তিনি। একই সঙ্গে তাঁকে হুমকিও দেন। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের নিয়েও তিনি আপত্তিকর বক্তব্য দেন।

এসব নিয়ে বিভিন্ন মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন মুরাদ হাসান। জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যাবিষয়ক সম্পাদকের পদ থেকে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়। সে সময় তাঁর সংসদ সদস্য পদ বাতিলের দাবি উঠেছিল। এ বিষয়ে উচ্চ আদালতে রিট হয়। কিন্তু সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেননি মুরাদ হাসান। মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি এই পদে বহাল ছিলেন।

২০১৩ সালে বেসরকারি ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের দুজন সাংবাদিককে পেটানোর ঘটনায় কারাগারে যেতে হয়েছিল আওয়ামী লীগের তৎকালীন সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনিকে। পরের নির্বাচনে তিনি দলের মনোনয়ন পাননি। তবে ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। বিএনপি তাঁকে পটুয়াখালী-৩ আসনে মনোনয়ন দিয়েছিল।

আসন শূন্য

মোহাম্মদ শহিদ ইসলাম ওরফে পাপুল

‘রাতের ভোট’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লক্ষ্মীপুর-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন মোহাম্মদ শহিদ ইসলাম ওরফে পাপুল। বিপুল অর্থের বিনিময়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের প্রার্থী জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ নোমানকে নির্বাচন থেকে সরিয়ে দিয়ে তিনি নিজের বিজয় নিশ্চিত করেছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছিল।

শহিদ ইসলাম কুয়েতে মানব পাচার ও ভিসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল অর্থের মালিক হয়েছেন, এই অভিযোগ আগে থেকেই ছিল। সংসদ সদস্য থাকা অবস্থায় ২০২০ সালের জুনে তিনি কুয়েতে গ্রেপ্তার হন। পরে ঘুষ লেনদেনের মামলায় ২০২১ সালের ২৮ জানুয়ারি তাঁকে চার বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের পাশাপাশি ১৯ লাখ কুয়েতি দিনার জরিমানা করেন দেশটির আদালত।

বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো সংসদ সদস্যের বিদেশের মাটিতে ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিত হওয়ার এটিই প্রথম ঘটনা। ২০২১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি শহিদ ইসলামের আসন শূন্য ঘোষণা করে জাতীয় সংসদ সচিবালয়। অর্থাৎ তিনি সংসদ সদস্য পদ হারান।

মহীউদ্দীন খান আলমগীর

২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে টাঙ্গাইল-৫ আসন থেকে নির্বাচিত হন জাতীয় পার্টির প্রার্থী আবুল কাশেম। তাঁকে ‘ঋণখেলাপি ও বিলখেলাপি’ উল্লেখ করে ২০০৯ সালের ২ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেন একই আসনে পরাজিত প্রার্থী বিএনপির মাহমুদুল হাসান। আবেদনে বলা হয়, সোনালী ব্যাংকে আবুল কাশেমের ১৫ কোটি ৪৪ লাখ ২৫ হাজার ৪৩৭ টাকা ঋণ রয়েছে। ময়মনসিংহ টেলিফোন এক্সচেঞ্জে কাশেমের নামে ৩২ হাজার ১১০ টাকা ফোনের বিল বকেয়া রয়েছে।

শুনানি শেষে হাইকোর্টের নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল আবুল কাশেমকে সংসদ সদস্য ঘোষণা-সংক্রান্ত গেজেট অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করেন। এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যান আবুল কাশেম। ২০১২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগ কাশেমের আপিল খারিজ করে দেন। ফলে তাঁর সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়ে যায়।

‘ওয়ান–ইলেভেন’–এর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে দুর্নীতির দায়ে ১৩ বছরের কারাদণ্ড হয়েছিল আওয়ামী লীগ নেতা মহীউদ্দীন খান আলমগীরের। ২০ মাস কারাগারে থাকার পর ২০০৮ সালের অক্টোবরে তিনি মুক্তি পান। ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে চাঁদপুর-১ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেন তিনি। কিন্তু কারাদণ্ডের সাজার কারণে রিটার্নিং কর্মকর্তা তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিল করেন। পরে আইনি লড়াইয়ে প্রার্থিতা বহাল হয় তাঁর।

এরপর নির্বাচনে জয়ী হয়ে সংসদ সদস্য হন মহীউদ্দীন খান আলমগীর। দণ্ডপ্রাপ্ত অবস্থায় নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার অভিযোগে ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়। মামলায় সর্বোচ্চ আদালতের রায় মহীউদ্দীন খান আলমগীরের বিরুদ্ধে যায়। সেই রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন তাঁর আসনটি শূন্য ঘোষণা করে।

২০০৮ সালের নির্বাচনে ভোলা-৩ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন মেজর (অব.) জসিমউদ্দিন। জসিমউদ্দিনকে ২০০৪ সালের আগস্টে সেনাবাহিনী থেকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছিল। তখনকার আইন অনুযায়ী, সরকারি চাকরি থেকে অবসরের পর পাঁচ বছর পূর্ণ না হলে সংসদ সদস্য পদে নির্বাচন করা যেত না। জসিমউদ্দিনের এই আইনি অযোগ্যতার বিষয়টি তুলে ধরে উচ্চ আদালতে রিট করেন তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বর্তমান সংসদের স্পিকার)। আইনি লড়াইয়ের পর উচ্চ আদালত জসিমউদ্দিনের সংসদ সদস্য পদ অবৈধ ঘোষণা করে। এরপর নির্বাচন কমিশন তাঁর আসন শূন্য ঘোষণা করে।

৭০ অনুচ্ছেদ

মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান

সংবাদপত্রের পুরোনো খবর পর্যালোচনা করে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে সংসদ সদস্য পদ বাতিলের তিনটি নজির খুঁজে পাওয়া গেছে।

কিশোরগঞ্জ-২ আসন থেকে বিএনপির সংসদ সদস্য ছিলেন মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান। ২০০০ সালে বিএনপি সংসদ বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে অধিবেশনে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। এ কারণে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তাঁর আসন শূন্য হয়। আখতারুজ্জামান এই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গিয়েছিলেন। ২০০১ সালের জুলাই মাসে সপ্তম সংসদ বিলুপ্ত হওয়ার আগপর্যন্ত তাঁর আসনটি শূন্যই ছিল।

সিরাজগঞ্জ-৭ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নে সপ্তম সংসদে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন হাসিবুর রহমান (স্বপন)। ১৯৯৮ সালে তিনি বিএনপি থেকে পদত্যাগ করে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে উপমন্ত্রী হয়েছিলেন। কিন্তু ৭০ অনুচ্ছেদের বাধ্যবাধকতার কারণে তিনি সংসদ সদস্য পদ হারান।

একই সংসদে রাজশাহী-৫ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন মোহাম্মদ আলাউদ্দিন। একপর্যায়ে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী হন। এ কারণে তাঁর আসন শূন্য হয়ে যায়। অবশ্য পরে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি আবার সংসদ সদস্য হয়েছিলেন।

বহিষ্কৃত হলেও সংসদে বহাল

সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ

কোনো রাজনৈতিক দল একজন সংসদ সদস্যকে বহিষ্কার করলেই তাঁর সংসদ সদস্য পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়, এ রকম বিধান সংবিধানে সরাসরি নেই। এ বিষয়ে স্পিকার সিদ্ধান্ত দেন। প্রয়োজনে বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠাতে পারেন স্পিকার। সংবিধানে সরাসরি বিধান না থাকায় বিভিন্ন সময়ে দল থেকে বহিষ্কৃত হলেও কারও সংসদীয় আসন শূন্য হওয়ার উদাহরণ নেই।

২০১৮ সালের নির্বাচন-পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ বেশ নাটকীয় ছিল। সেই নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মনোনয়নে আটজন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ এনে তাঁরা শপথ নেওয়া থেকে বিরত থাকেন। তবে মৌলভীবাজার-২ আসন থেকে ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচিত ঐক্যফ্রন্টভুক্ত গণফোরামের সংসদ সদস্য সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ জোটের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে শপথ নেন ২০১৯ সালের ৭ মার্চ। সেদিনই গণফোরাম থেকে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়। এরপর ২৫ এপ্রিল শপথ নেন ঠাকুরগাঁও-৩ আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপির প্রার্থী জাহিদুর রহমান। দুই দিন পর তাঁকেও দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। কিন্তু দল থেকে বহিষ্কারের বিষয়টি তাঁদের সংসদ সদস্য পদে বহাল থাকার ক্ষেত্রে বাধা হয়নি।

অবশ্য এই নির্বাচনের কয়েক মাস পর বিএনপি সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। দলের চারজন সংসদ সদস্য ২৯ এপ্রিল শপথ নেন। দলের তৎকালীন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (বর্তমান রাষ্ট্রপতি) বগুড়া-৬ আসন থেকে নির্বাচিত হলেও শপথ নেওয়া থেকে বিরত ছিলেন। পরে তাঁর আসনে উপনির্বাচনে জিতে শপথ নেন বিএনপির গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ। একপর্যায়ে জাহিদুর রহমানের বহিষ্কারাদেশ তুলে নেয় বিএনপি।

মহাজোটের মনোনয়নে ২০০৮ সালে সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন জাতীয় পার্টির নেতা এইচ এম গোলাম রেজা। জীবনবৃত্তান্তে ও সংসদে অসত্য তথ্য দেওয়ার অভিযোগে ২০১২ সালের অক্টোবরে দল থেকে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়। তবে তাঁর সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়নি।

অষ্টম সংসদ নির্বাচনে (২০০১-০৬) রাজশাহী-৪ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন সাবেক আমলা আবু হেনা। ২০০৫ সালে তিনি এলাকায় প্রকাশ্যে সংবাদ সম্মেলন করে তৎকালীন বিএনপি সরকারের এক মন্ত্রীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তোলেন। মূলত নিজের এলাকার (রাজশাহীর বাগমারা) মানুষ উগ্রবাদীদের হাতে নির্যাতিত হওয়ার পর তিনি প্রকাশ্যে মন্ত্রীর বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়েছিলেন। এই বক্তব্যের পর আবু হেনাকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়। তবে সংসদের তৎকালীন স্পিকার জমির উদ্দিন সরকার সিদ্ধান্ত দেন, আবু হেনার সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকবে।