এখন জিলকদ মাস চলছে। মহানবী (সা.) হিজরতের পর মোট চারবার ওমরাহ পালন করেছেন। বিভিন্ন হাদিসে দেখা যায়, নবীজির প্রতিটি ওমরাহ হজের মাসগুলোর মধ্যে জিলকদ মাসেই সম্পন্ন হয়েছে।
এর পেছনে যেমন রয়েছে ধর্মীয় বিধানের নিগূঢ় রহস্য, তেমনি ছিল তৎকালীন সামাজিক কুসংস্কারের মূলোচ্ছেদ।
হাদিস বিশারদদের মতে, রাসুল (সা.)-এর ওমরার সংখ্যা নিয়ে কোনো মতভেদ নেই; তাঁর ওমরাহ ছিল মোট চারটি। সেগুলো হলো:
১. হোদাইবিয়ার ওমরাহ: ষষ্ঠ হিজরির জিলকদ মাসে নবীজি (সা.) ওমরার উদ্দেশ্যে রওনা হন। কিন্তু হোদাইবিয়া নামক স্থানে মক্কার মুশরিকরা তাঁকে বাধা দেয়। ফলে তিনি সেখানেই পশু কোরবানি করেন এবং মাথা মুণ্ডন করে ইহরাম ত্যাগ করে মদিনায় ফিরে যান। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৮০৬)
২. ওমরাতুল কাজা: হোদাইবিয়ার চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সপ্তম হিজরির জিলকদ মাসে তিনি পুনরায় মক্কায় প্রবেশ করেন এবং তিন দিন অবস্থান করে ওমরাহ সম্পন্ন করেন।
মক্কায় অবস্থানকালীন সময়ে তিনি কখনো হারামের সীমানার বাইরে (যেমন তানয়িম বা জিইররানা) গিয়ে পুনরায় ওমরাহ করার প্রথা উম্মতের জন্য প্রবর্তন করেননি।
৩. জিঈররানার ওমরাহ: হুনাইন যুদ্ধের পর গনিমতের মাল বণ্টন শেষে জিলকদ মাসে তিনি জিইররানা থেকে ইহরাম বেঁধে মক্কায় প্রবেশ করেন এবং ওমরাহ সম্পাদন করেন।
৪. হজের সঙ্গে ওমরাহ: বিদায় হজের সময় নবীজি (সা.) যে ওমরাহ করেছিলেন, সেটিও জিলকদ মাসে শুরু হয়েছিল। তিনি মূলত ‘কিরান’ হজ করেছিলেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৯৯৬)
হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন, ‘নবীজি চারটি ওমরাহ করেছেন, হজের সঙ্গে করা ওমরাটি ছাড়া সবগুলোই ছিল জিলকদে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪১৪৮)
হজরত আয়েশাও জোর দিয়ে বলেছেন যে নবীজি কেবল জিলকদ মাসেই ওমরাহ করেছেন। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৯৯৭)
নবীজির প্রতিটি ওমরাহ ছিল মক্কায় প্রবেশকারীর ওমরাহ। অর্থাৎ তিনি সবসময় মক্কার বাইরে (মিকাত) থেকে ইহরাম বেঁধে ওমরাহ করতে আসতেন। মক্কায় অবস্থানকালীন সময়ে তিনি কখনো হারামের সীমানার বাইরে (যেমন তানয়িম বা জিইররানা) গিয়ে পুনরায় ওমরাহ করার প্রথা উম্মতের জন্য প্রবর্তন করেননি।
হিজরতের পর নবীজি (সা.) মক্কায় পাঁচবার প্রবেশের চেষ্টা করেছেন। এর মধ্যে প্রথমবার হোদাইবিয়ার সময় কোরাইশদের বাধায় ঢুকতে পারেননি। বাকি চারবারই তিনি সফলভাবে ওমরাহ সম্পন্ন করেন।
তৎকালীন মুশরিকদের একটি ভুল প্রথা ভেঙে দেওয়া। অন্ধকার যুগে আরবরা মনে করত, হজের মাসগুলোতে ওমরাহ করা একটি মহাপাপ।
বিশেষত জিইররানার ওমরার সময় তিনি রাতে মক্কায় প্রবেশ করে ওমরাহ সেরে রাতেই ফিরে যান। এ কারণে অনেকের কাছে এই ওমরাহর বিষয়টি অজানা রয়ে গেছে। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৯৩৫)
উল্লেখ্য, হজরত আয়েশা (রা.) বিশেষ কারণে তানয়িম থেকে ওমরাহ করেছিলেন। তিনি ঋতুবতী হওয়ার কারণে স্বতন্ত্র ওমরাহ করতে পারেননি বলে নবীজি তাঁর মন রক্ষার্থে ভাই আব্দুর রহমানের সঙ্গে তাঁকে তানয়িমে পাঠিয়ে ওমরার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। এটি ছিল একটি বিশেষ ছাড়, সাধারণ নিয়ম নয়।
নবীজি (সা.) কেন জিলকদ মাসকেই ওমরার জন্য বেছে নিয়েছিলেন, তার প্রধান কারণ ছিল তৎকালীন মুশরিকদের একটি ভুল প্রথা ভেঙে দেওয়া। অন্ধকার যুগে আরবরা মনে করত, হজের মাসগুলোতে ওমরাহ করা একটি মহাপাপ।
নবীজি (সা.) হজের মাসগুলোর ঠিক মধ্যবর্তী মাস জিলকদে বারবার ওমরাহ করে প্রমাণ করেছেন যে আল্লাহর ইবাদতের জন্য কোনো সময় অশুভ নয়। মূলত হজের মাসে ওমরাহ করা অন্য মাসের তুলনায় অধিক সুন্নাহসম্মত।
সুন্নাহর নিখুঁত অনুসরণের জন্য জিলকদ মাসে ওমরাহ পালন করা মুমিনের জন্য বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ।
ইলিয়াস মশহুদ: লেখক ও গবেষক