মানুষের সামগ্রিক অস্তিত্ব ও ব্যক্তিত্বের প্রকৃত সৌন্দর্য তার অন্তরের নির্মলতায় নিহিত। বাহ্যিক অবয়ব ও চালচলন আপাতদৃষ্টে যতই সুসংযত হোক না কেন, ভেতরের হৃদয় যদি ব্যাধিগ্রস্ত ও কলুষিত থাকে—তবে সেই বাহ্যিক সৌন্দর্য নিছক একটি খোলসমাত্র।
ইসলামি জীবনদর্শনে মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস, সংকল্প ও আচরণের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষ হলো এই অন্তর। রাসুল (সা.) মানবদেহে অন্তরের গুরুত্ব তুলে ধরে
দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছেন, ‘জেনে রেখো, শরীরের ভেতর একটি মাংসপিণ্ড রয়েছে; যদি তা সুস্থ ও পরিশুদ্ধ থাকে, তবে পুরো শরীরই সুস্থ থাকে। আর যদি তা বিকৃত ও ব্যাধিগ্রস্ত হয়ে পড়ে, তবে সমগ্র দেহই বিনষ্ট হয়ে যায়। আর জেনে রেখো, সেটিই হলো অন্তর।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২)
পবিত্র কোরআনেও মানবজীবনের পরম সাফল্যের মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে আত্মশুদ্ধির ওপর, ‘নিশ্চয়ই সে ব্যক্তি সফলকাম হয়েছে, যে নিজেকে (অন্তরকে) পরিশুদ্ধ করেছে; আর সে ব্যর্থ হয়েছে, যে তা কলুষিত করেছে।’ (সুরা শামস, আয়াত: ৯-১০)
মানুষের অন্তর কখনো হঠাৎ করে এক দিনে অনুভূতিহীন হয়ে পড়ে না; বরং ধারাবাহিক অবহেলা, পাপের পুনরাবৃত্তি ও কুপ্রবৃত্তির অনুসরণের মাধ্যমে তা ধীরে ধীরে কঠিন ও প্রাণহীন হয়ে ওঠে।
অন্তরের এই আধ্যাত্মিক ব্যাধি ও প্রাণশক্তি নষ্ট হওয়ার ১০টি প্রধান কারণ বিশদভাবে আলোচনা করা হলো:
১. লাগাতার পাপের মরিচা
প্রথমবার কোনো পাপে লিপ্ত হলে মানুষের বিবেক তীব্র অনুশোচনায় ভোগে এবং অন্তরে অস্বস্তি তৈরি হয়। কিন্তু যখন মানুষ তওবা না করে ধারাবাহিকভাবে সেই পাপে লিপ্ত হতে থাকে, তখন পাপবোধের সেই সংবেদনশীলতা ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে তা দৈনন্দিন স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত হয়।
পাপ কীভাবে অন্তরকে ধ্বংস করে, তা স্পষ্ট করে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘বান্দা যখন কোনো পাপে কাজে লিপ্ত হয়, তখন তার অন্তরে একটি কালো দাগ বা বিন্দু অঙ্কিত হয়। অতঃপর সে যদি পাপ পরিত্যাগ করে ক্ষমাপ্রার্থনা ও তওবা করে, তবে তার অন্তর পুনরায় পরিচ্ছন্ন হয়ে যায়। কিন্তু সে যদি পাপে পুনরাবৃত্তি করতে থাকে, তবে সেই দাগ ক্রমেই বাড়তে থাকে এবং একপর্যায়ে তা পুরো অন্তরকে ঢেকে ফেলে। আর এটিই হলো সেই মরিচা (রান), যার কথা আল্লাহ তাঁর কিতাবে উল্লেখ করেছেন।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৩৩৪)
পবিত্র কোরআনেও আল্লাহ–তাআলা সতর্ক করে ইরশাদ করেছেন, ‘কখনোই নয়; বরং তাদের কৃতকর্মই তাদের অন্তরে মরিচা ধরিয়ে দিয়েছে।’ (সুরা মুতাফফিফিন, আয়াত: ১৪)
২. আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফিলতি
মাছের জন্য পানি যেমন অপরিহার্য এবং খাদ্য ছাড়া শরীর যেমন নিস্তেজ হয়ে মৃত্যুমুখে ঢলে পড়ে, মানুষের আত্মাও আল্লাহর জিকির ছাড়া ভেতর থেকে শুকিয়ে নির্জীব হয়ে যায়। আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ হওয়াই আত্মিক অন্ধকারের মূল সূচনাবিন্দু।
আল্লাহ–তাআলা ঘোষণা করেন, ‘আর যে ব্যক্তি আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবনযাত্রাই সংকীর্ণ ও দুর্বিষহ হয়ে পড়বে এবং কিয়ামতের দিন আমি তাকে অন্ধ অবস্থায় পুনরুত্থিত করব।’ (সুরা ত্বহা, আয়াত: ১২৪)
রাসুল (সা.) জিকিরের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার রবের জিকির করে আর যে ব্যক্তি জিকির করে না—তাদের দুজনের দৃষ্টান্ত হলো জীবিত ও মৃত মানুষের মতো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪০৭)
মানুষ যখন আল্লাহর সুস্পষ্ট আদেশ-নিষেধ ও শরিয়তের সীমানা উপেক্ষা করে নিজের খেয়ালখুশি, আবেগ ও কামনা-বাসনাকে জীবনের একমাত্র পথপ্রদর্শক বানিয়ে নেয়, তখন সে প্রকারান্তরে নিজের নফসের উপাসনা শুরু করে।
৩. প্রবৃত্তির দাসত্ব
মানুষ যখন আল্লাহর সুস্পষ্ট আদেশ-নিষেধ ও শরিয়তের সীমানা উপেক্ষা করে নিজের খেয়ালখুশি, আবেগ ও কামনা-বাসনাকে জীবনের একমাত্র পথপ্রদর্শক বানিয়ে নেয়, তখন সে প্রকারান্তরে নিজের নফসের উপাসনা শুরু করে। প্রবৃত্তির প্রতিটি দাবি পূরণ করতে গেলে মানুষ ক্রমেই আত্মকেন্দ্রিক ও নৈতিকতাহীন হয়ে পড়ে।
পবিত্র কোরআনে এই আত্মঘাতী প্রবণতা সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘তুমি কি তাকে দেখেছ, যে তার কুপ্রবৃত্তিকে নিজের ইলাহ বা উপাস্য বানিয়ে নিয়েছে? আল্লাহ জেনেশুনেই তাকে বিভ্রান্ত করেছেন, তার কান ও হৃদয়ে মোহর মেরে দিয়েছেন এবং তার চোখের ওপর টেনে দিয়েছেন পর্দা! অতএব আল্লাহর পর কে তাকে সুপথ দেখাবে?’ (সুরা জাসিয়াহ, আয়াত: ২৩)
মুমিনের সার্থকতা হলো নিজের নফসকে দমন করে শরিয়তের সামনে অবনত রাখা, নফসের কাছে নিজেকে সঁপে দেওয়া নয়।
৪. হারাম উপার্জন
জীবিকার বিশুদ্ধতার সঙ্গে অন্তরের নূর ও আধ্যাত্মিক সজীবতার সম্পর্ক ওতপ্রোত। অবৈধ উপায়ে অর্জিত খাদ্য দিয়ে যে শরীর গঠিত হয়, সেই শরীরের অন্তর কখনো আল্লাহর ইবাদতে স্বাদ ও নম্রতা খুঁজে পায় না। হারাম খাদ্য বান্দার দোয়া কবুলের পথও চিরতরে রুদ্ধ করে দেয়।
রাসুল (সা.) এমন এক ব্যক্তির দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন, যে দীর্ঘ পথ সফর করে ধূলিমলিন ও ক্লান্ত বেশে আকাশের দিকে হাত তুলে ‘হে প্রতিপালক, হে পালনকর্তা’ বলে ব্যাকুল হয়ে ডাকছে; অথচ তার খাদ্য হারাম, তার পানীয় হারাম, তার পোশাক হারাম এবং সে হারাম রক্ত-মাংসে লালিত-পালিত। এরপর নবীজি (সা.) বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন, ‘তাহলে এমন ব্যক্তির দোয়া কীভাবে কবুল হতে পারে?’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০১৫)
হালাল রিজিক অন্তরের সজীবতা রক্ষার অন্যতম অপরিহার্য উপাদান।
৫. আত্মগরিমার ব্যাধি
অহংকার (কিবর) হলো অন্তরের এমন এক মরণব্যাধি, যা মানুষের চোখ থেকে নিজের যাবতীয় ভুলত্রুটি আড়াল করে রাখে এবং অন্যের প্রতি তাচ্ছিল্য সৃষ্টি করে। অহংকারী ব্যক্তি সত্যের সামনে মাথা নত করতে পারে না।
আল্লাহ–তাআলা অহংকারকে চরম ঘৃণা করেন: ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো অহংকারী ও দাম্ভিককে ভালোবাসেন না।’ (সুরা নাহল, আয়াত: ২৩)
রাসুল (সা.) স্পষ্ট ভাষায় সাবধান করে দিয়েছেন, ‘যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৯১)
৬. অন্তরে হিংসা ও বিদ্বেষ পোষণ
হিংসা এমন এক গোপন আগুন, যা মানুষের অন্তরের প্রশান্তি ও ভালো কাজগুলোকে নিঃশেষ করে দেয়। অন্যের উন্নতি বা সুখ দেখে অন্তরে জ্বালা অনুভব করা মূলত আল্লাহর বণ্টনব্যবস্থার ওপর ক্ষোভ প্রকাশের শামিল। পবিত্র কোরআনে হিংসুকের অনিষ্ট থেকে আল্লাহর কাছে নিয়মিত আশ্রয় চাওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। (সুরা ফালাক, আয়াত: ৫)
রাসুল (সা.) মুমিনদের এই আত্মিক ধ্বংস থেকে রক্ষা করতে নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তোমরা একে অপরের প্রতি হিংসা কোরো না, পারস্পরিক বিদ্বেষ পোষণ কোরো না, সম্পর্ক ছিন্ন কোরো না; বরং তোমরা আল্লাহর বান্দা হিসেবে পরস্পরের ভাই ভাই হয়ে বসবাস করো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০৬৫)
তোমরা পার্থিব জীবনকেই অগ্রাধিকার দিয়ে থাকো; অথচ পরকালই হলো সর্বোৎকৃষ্ট এবং চিরস্থায়ী।সুরা আলা, আয়াত: ১৬-১৭
৭. পরকালের বিস্মৃতি
পার্থিব জীবন মহান আল্লাহর এক নিয়ামত; তবে এই পার্থিব জগৎই যখন জীবনের পরম লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, তখন মানুষ তার চিরস্থায়ী গন্তব্য আখিরাতের কথা ভুলে যায়।
অর্থবিত্ত, ক্ষমতা ও পদমর্যাদার মোহে অন্ধ হয়ে গেলে মানুষের অন্তর থেকে মৃত্যুচিন্তা ও আল্লাহর জবাবদিহির অনুভূতি লোপ পায়।
পবিত্র কোরআনে এই ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি উন্মোচন করে আল্লাহ বলেন, ‘বরং তোমরা পার্থিব জীবনকেই অগ্রাধিকার দিয়ে থাকো; অথচ পরকালই হলো সর্বোৎকৃষ্ট এবং চিরস্থায়ী।’ (সুরা আলা, আয়াত: ১৬-১৭)
রাসুল (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘ধ্বংস হোক দিনারের বান্দা, ধ্বংস হোক দিরহামের বান্দা এবং ধ্বংস হোক বিলাসবহুল পোশাকের পূজারি!’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৮৮৭)
৮. লাগামহীন আমোদ–প্রমোদ
ইসলাম নির্মল আনন্দ ও মুচকি হাসিকে উৎসাহিত করলেও জীবনকে নিছক বিনোদন, স্থূল কৌতুক ও অসার হাসিঠাট্টায় পর্যবসিত করা অন্তরের আধ্যাত্মিক মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করে। অতিরিক্ত হাসি-তামাশা মানুষকে মৃত্যু, কবর ও পরকালের ভয়াবহতা থেকে গাফেল করে দেয়।
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা অতিরিক্ত হাসাহাসি কোরো না; কেননা অতিরিক্ত হাসি মানুষের অন্তরকে নির্জীব ও মৃত বানিয়ে দেয়।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩০৫)
৯. অহেতুক মন্দ ধারণা
কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছাড়াই অন্য মুমিনের ব্যাপারে অন্তরে খারাপ ধারণা পোষণ করা এবং সন্দেহপ্রবণ হয়ে থাকা অন্তরের বড় একটি রোগ। এটি হৃদয়কে তিক্ততা ও পাপে ভরিয়ে দেয়।
আল্লাহ–তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা অধিকাংশ অনুমান ও ধারণা থেকে বিরত থাকো; কেননা কোনো কোনো ধারণা সুস্পষ্ট পাপ...।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১২)
রাসুল (সা.) আরও সতর্ক করে বলেছেন, ‘তোমরা অমূলক ধারণা ও অনুমান থেকে বেঁচে থাকো; কারণ ধারণা হলো সবচেয়ে বড় মিথ্যা কথা।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০৬৪)
১০. উপদেশ গ্রহণে অনীহা
কোরআনের আয়াত, হাদিসের নসিহত কিংবা চোখের সামনে মৃত্যুর মতো বড় সত্য বারবার প্রত্যক্ষ করার পরও যদি মানুষের হৃদয়ে কোনো পরিবর্তন না আসে, তবে বুঝতে হবে অন্তর কঠিন পাথরে পরিণত হয়েছে।
বনি ইসরাইলের অবাধ্যতার চিত্র তুলে ধরে আল্লাহ–তাআলা বলেছিলেন, ‘এরপরও তোমাদের অন্তর কঠিন হয়ে গেল; তা পাথরের মতো শক্ত কিংবা তার চেয়েও বেশি কঠোর...।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ৭৪)
মানুষের অন্তরে ফিতনার প্রভাব কীভাবে পড়ে, তা বর্ণনা করে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘একের পর এক ফিতনা মানুষের অন্তরের সামনে উপস্থাপিত হতে থাকে। যে অন্তর তাতে আকৃষ্ট হয়, তাতে একটি কালো দাগ পড়ে; আর যে অন্তর তা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে, তাতে একটি উজ্জ্বল শ্বেতবিন্দু অঙ্কিত হয়—এভাবে অন্তর দুটি শ্রেণিতে বিভক্ত হয়ে যায়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৪৪)
বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান ও পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি নিজের অন্তরের স্বাস্থ্য রক্ষা করাই একজন মুমিনের প্রধান আত্মিক সাধনা। কেয়ামতের দিন ধনসম্পদ বা সন্তানসন্ততি কোনো কাজে আসবে না; শুধু সেই ব্যক্তিই মুক্তি পাবে, যে আল্লাহর দরবারে একটি পরিশুদ্ধ ও ব্যাধিমুক্ত অন্তর (কালবে সালিম) নিয়ে উপস্থিত হতে পারবে। (সুরা শুআরা, আয়াত: ৮৮-৮৯)
নিয়মিত আন্তরিক তওবা, কোরআন তিলাওয়াত, হালাল রিজিক গ্রহণ এবং নেককারদের সাহচর্যের মাধ্যমেই শুধু ব্যাধিগ্রস্ত অন্তরকে সুস্থ ও আল্লাহর ভালোবাসায় উদ্ভাসিত রাখা সম্ভব।
ফয়জুল্লাহ রিয়াদ: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, ঢাকা