ইমাম জুয়াইনি: মুসলিম চিন্তার রূপকার

আবুল মা’আলি আবদুল মালিক ইবনে আবদুল্লাহ (রহ.) জন্মগ্রহণ করেন খোরাসানের অন্তর্গত জুয়াইন নগরীতে। তাই তাঁর নামের সঙ্গে আল-জুয়াইনি যুক্ত হয়ে যায়। তখন হিজরি ৪১৯ সন, যা আনুমানিক ১০২৮ খ্রিষ্টাব্দের কাছাকাছি। (তাবাকাতুশ শাফেঈয়াহ, ৫/১৬৫ শাজারাতুজ জাহাব, ৩/২৯৬)

তাঁর পিতা আবদুল্লাহ ইবনে ইউসুফ ছিলেন সে যুগের প্রসিদ্ধ ফকিহ। জুয়াইনি প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন সরাসরি পিতার তত্ত্বাবধানে। পিতার ইন্তেকালের পর তিনি নিশাপুরে আগমন করেন এবং সেখানকার ইলমি পরিবেশেই তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ পরিপূর্ণতা লাভ করে। (সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, ১৮/৪৬৮)

তাঁর শৈশব ও যৌবন এমন এক যুগে অতিবাহিত হয়, যখন আব্বাসি খেলাফত রাজনৈতিকভাবে দুর্বল, অথচ বুদ্ধিবৃত্তিক অস্থিরতা চরমে।

একদিকে বাতিনি ও ইসমাইলি আন্দোলনের গুপ্ত তৎপরতা, অন্যদিকে মুতাজিলা ও দর্শনঘেঁষা নানা মতবাদ—সব মিলিয়ে সুন্নি আকিদা ও শাসনব্যবস্থা একধরনের চাপের মধ্যে পড়ে যায় (আল-মুনতালাকাতুল ফিকরিয়া ইনদাল আশ’আরিয়্যাহ, পৃষ্ঠা ৭৯)

এই সংকটময় পরিবেশই ইমাম জুয়াইনিকে পরবর্তী মুসলিম চিন্তার অন্যতম স্থপতিতে পরিণত করে।

তিনি উপলব্ধি করেন, রাষ্ট্র টিকে থাকে শক্তির মাধ্যমে, কিন্তু সভ্যতা টিকে থাকে চিন্তার মাধ্যমে।

বুদ্ধিবৃত্তিক দায়িত্ব

ইমাম জুয়াইনি এমন এক সময়ে আবির্ভূত হন, যখন খোরাসান ও ইরাক অঞ্চলে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ছিল সালজুকিদের হাতে, কিন্তু ধর্মীয় কর্তৃত্ব নিয়ে চলছিল প্রবল মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব। শাসকশ্রেণির ভেতরেই কেউ কেউ বাতিনি ও কারামিয়া ধারার প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন।

এই পরিস্থিতিতে সুন্নি আকিদার পক্ষে শুধু আবেগপ্রবণ অবস্থান যথেষ্ট ছিল না, প্রয়োজন ছিল সুসংগঠিত বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরক্ষা। (জাহাবি, তারিখুল ইসলাম, ২৯/৮৫)

এই বাস্তবতা ইমাম জুয়াইনিকে কালাম ও উসুলুল ফিকহে গভীরভাবে মনোনিবেশে বাধ্য করে। তিনি উপলব্ধি করেন, রাষ্ট্র টিকে থাকে শক্তির মাধ্যমে, কিন্তু সভ্যতা টিকে থাকে চিন্তার মাধ্যমে।

এই উপলব্ধিই তাঁকে ‘ইমামুল হারামাইন’ উপাধিতে ভূষিত করে, কারণ মক্কা ও মদিনার উভয় হারামে তাঁর দরস সমানভাবে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছিল। (ওফায়াতুল আ’ইয়ান, ৩/১৬৭)

চিন্তার উত্তরাধিকার ও শিষ্যরা

ইমাম জুয়াইনির সবচেয়ে বড় অবদান তিনি সুন্নি আশ’আরি কালামকে একটি পূর্ণাঙ্গ, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দান করেন। তাঁর রচিত ‘আল-ইরশাদ’ ও ‘আশ-শামিল’ গ্রন্থদ্বয় পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে কালামচর্চার মূল ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। একই সঙ্গে উসুলুল ফিকহে তাঁর আল-বুরহান এমন একটি গ্রন্থ, যা ছাড়া পরবর্তী উসুল চিন্তার ইতিহাস কল্পনাই করা যায় না। (কাশফুজ জুনুন, ১/ ২৫৬)

তাঁর দরস থেকেই বেরিয়ে এসেছেন ইমাম গাজালি। যিনি পরবর্তী সময়ে মুসলিম চিন্তার ইতিহাসে এক অনন্য সেতুবন্ধ রচনা করেন। গাজালি নিজেই স্বীকার করেন, ‘আমি যা কিছু শিখেছি, তা মূলত জুয়াইনির দরস থেকেই।’ (সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, ১৯/৩৩৯)

এই শিষ্য–ওস্তাদ সম্পর্কই জুয়াইনি–গাজালি–রাজি ধারাবাহিকতাকে মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের মেরুদণ্ডে পরিণত করেছে।

তাঁর দরস থেকেই বেরিয়ে এসেছেন ইমাম গাজালি। যিনি পরবর্তী সময়ে মুসলিম চিন্তার ইতিহাসে এক অনন্য সেতুবন্ধ রচনা করেন।

রাজনৈতিক সচেতনতা

ইমাম জুয়াইনি পাঠশালার আলেম ছিলেন বটে। তবে রাষ্ট্র ও সমাজের বাস্তবতা সম্পর্কেও ছিলেন গভীরভাবে সচেতন।

তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘গিয়াসুল উমাম ফি ইলতিয়াসিজ জুলাম’ রাষ্ট্রচিন্তার এক বিরল দলিল, যেখানে তিনি খেলাফতের দুর্বলতা, শাসনশূন্যতার আশঙ্কা এবং বিকল্প রাজনৈতিক ব্যবস্থার সম্ভাব্যতা নিয়ে আলোচনা করেছেন। (গিয়াসুল উমাম, পৃষ্ঠা ৯–১৫)

অনেক গবেষকের মতে, এই গ্রন্থই মুসলিম রাজনৈতিক দর্শনে বাস্তববাদী চিন্তার সূচনা করে। (তারিখু মুখতাসারিদ দুয়াল, পৃষ্ঠা ১৮৯)

এই গ্রন্থে তিনি এমন সব প্রশ্ন তুলেছেন, যা তাঁর যুগে উচ্চারণ করাই ছিল দুঃসাহসিক—যেমন বৈধ ইমাম না থাকলে সমাজ কীভাবে চলবে বা জুলুমপ্রবণ শাসকের অধীনে ধর্মীয় কর্তব্যের সীমা কোথায়। এই বাস্তববাদই তাঁকে একজন মননশীল রাজনৈতিক চিন্তাবিদে পরিণত করেছে।

সংস্কার ও প্রতিরোধ

বাতেনি ও ইসমাইলি আন্দোলনের বিরুদ্ধে ইমাম জুয়াইনির অবস্থান ছিল অত্যন্ত দৃঢ়। তিনি একদিকে গ্রন্থের মাধ্যমে, অন্যদিকে প্রকাশ্য বিতর্কে অংশগ্রহণ করে তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি ভেঙে দেন। এর ফলে এক পর্যায়ে তাঁকে নৈশাপুর ত্যাগ করে হেজাজে আশ্রয় নিতে হয় এবং দীর্ঘ সময় তিনি মক্কা ও মদিনায় অবস্থান করেন। (সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, ১৮/৪৭৫)

এই নির্বাসন তাঁর জন্য ক্ষতির বদলে আশীর্বাদে পরিণত হয়। কারণ, হারামাইনেই তাঁর ইলম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে।

পরে সালজুকি উজির নিজামুল মুলকের আমন্ত্রণে তিনি নৈশাপুরে প্রত্যাবর্তন করেন এবং নিযামিয়া মাদ্রাসার প্রধান আসনে অধিষ্ঠিত হন। এখান থেকেই তিনি সুন্নি চিন্তার পুনর্গঠনমূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন। (তারিখুল ইসলাম, ২৯/৯১)

তাঁর চিন্তা ছাড়া গাজালি ও রাজিকে যেমন বোঝা যায় না, তেমনি মধ্যযুগীয় মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসও অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

ইন্তেকাল

হিজরি ৪৭৮ সনে ইমাম জুয়াইনি (রহ.) ইন্তেকাল করেন নিশাপুরে। (শাজারাতুজ জাহাব, ৩/৩০১)

তাঁর ইন্তেকালের পরও তাঁর চিন্তা থেমে যায়নি বরং গাজালি ও রাজির মাধ্যমে তা আরও বিস্তৃত ও গভীরতর হয়েছে। আশ’আরি কালাম, শাফেয়ি উসুল ও সুন্নি রাষ্ট্রচিন্তার যে কাঠামো পরবর্তী আইয়ুবি, মামলুকি ও উসমানি যুগে কার্যকর ছিল—তার বীজ রোপিত হয়েছিল জুয়াইনির হাতেই।

এভাবে বিবেচনা করলে বলা যায়, ইমাম জুয়াইনি ছিলেন মুসলিম সভ্যতার এক সন্ধিক্ষণের রূপকার। তাঁর চিন্তা ছাড়া গাজালি ও রাজিকে যেমন বোঝা যায় না, তেমনি মধ্যযুগীয় মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসও অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

ইফতেখারুল হক হাসনাইন : আলেম ও লেখক