কোরআন পড়তে গিয়ে অনেকের মনে একটা প্রশ্ন উঠতে পারে—একই কথা তো বিভিন্ন সুরায় বারবার এসেছে, একই ঘটনা একাধিক জায়গায় বর্ণিত হয়েছে প্রায় কাছাকাছি শব্দে। এই আপাত পুনরাবৃত্তিকে উলুমুল কোরআনের পরিভাষায় বলা হয় ‘আল-মুতাশাবিহ আল-লাফজি’ বা শাব্দিক সাদৃশ্য।
কিন্তু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, এই সাদৃশ্যের আড়ালে আছে এক সূক্ষ্ম শৈল্পিক বিন্যাস—প্রতিটি প্রায় একই রকম আয়াতের মধ্যে শব্দের সামান্য অদলবদল, একটা শব্দের আগে-পরে হওয়া বা বাক্যের গঠনে ছোট কোনো পরিবর্তন, যা নিছক কাকতালীয় নয়।
মানুষের লেখায় একই কথা বারবার এলে তা সাধারণত একঘেয়েমি বা অসতর্কতার লক্ষণ হিসেবে ধরা পড়ে। কিন্তু কোরআনের ক্ষেত্রে বিষয়টা ভিন্ন।
মুসলিম মনীষীরা বহু শতক ধরে এই সাদৃশ্য আয়াতগুলো নিয়ে গবেষণা করে দেখেছেন যে প্রতিটি সাদৃশ্যের পেছনে একটা নির্দিষ্ট কারণ থাকে, যা সেই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট, শ্রোতার মানসিক অবস্থা ও সুরার সামগ্রিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
এই বিশ্লেষণের জন্য গবেষকেরা মূলত তিনটা স্তরে কাজ করেন।
প্রথমত, একটা শব্দ বা বাক্যাংশের ঠিক আগে-পরে কী আছে, তা দেখে বোঝার চেষ্টা করা হয়—কেন একটা শব্দ এক জায়গায় আগে বসেছে আর অন্য জায়গায় পরে।
দ্বিতীয়ত, পুরো সুরার একটা নির্দিষ্ট মূল উদ্দেশ্য বা সুর (গরাজ) থাকে—সাদৃশ্য আয়াতগুলোকে সেই উদ্দেশ্যের সঙ্গে জুড়ে দেখলে বোঝা যায়, একই বাক্য এক সুরায় যে অর্থ বহন করছে, অন্য সুরায় তা সেই সুরার নিজস্ব ভাবকেই আরও গভীর করছে।
তৃতীয়ত, শব্দের ধ্বনিও পরিবেশের সঙ্গে মিল রেখে বদলে যায়—কঠিন পরিস্থিতির বর্ণনায় শব্দ জোরালো হয়, ক্ষমা বা দয়ার বর্ণনায় শব্দ কোমল হয়ে আসে। (আবু জাফর ইবনুজ জুবাইর আল-গারনাতি, মিলাকুত তাবিল, বৈরুত: দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, ১৯৮৩)
প্রতিটি প্রায় একই রকম আয়াতের মধ্যে শব্দের সামান্য অদলবদল, একটা শব্দের আগে-পরে হওয়া বা বাক্যের গঠনে ছোট কোনো পরিবর্তন, যা নিছক কাকতালীয় নয়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ নীতি—কোরআনের একটি আয়াতের একাধিক বিশুদ্ধ ব্যাখ্যা থাকতে পারে এবং সেগুলো একে অপরকে বাতিল করে না।
মানবীয় আইনে একটি শব্দের একটিমাত্র অর্থ ধরে নেওয়া হয়, কিন্তু কোরআনের ক্ষেত্রে পণ্ডিতরা মনে করেন, যত প্রকার সুন্দর ও যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা সম্ভব, তার সব কটিই গ্রহণযোগ্য থাকতে পারে। কারণ, ঐশী বাণীর গভীরতা কোনো একটিমাত্র পাঠে সীমাবদ্ধ নয়।
কোরআনের এই ভাষাশৈলী নিয়ে সবচেয়ে আগ্রহজনক সাক্ষ্যগুলোর একটি এসেছে স্বয়ং তার শত্রুপক্ষ থেকে।
ওলিদ ইবনুল মুগিরা কোরআন শুনে বলেছিলেন যে এই বাণীর মধ্যে এমন এক মিষ্টতা ও দীপ্তি আছে, যা অন্য কিছুর সঙ্গে তুলনীয় নয়। এটা সবকিছুর ওপর বিজয়ী হয়, এর ওপর কিছু বিজয়ী হতে পারে না। (ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, রিয়াদ: দারু তাইবা, ১৯৯৯)
কোরআন শুনে বলেছিলেন যে এই বাণীর মধ্যে এমন এক মিষ্টতা ও দীপ্তি আছে, যা অন্য কিছুর সঙ্গে তুলনীয় নয়। এটা সবকিছুর ওপর বিজয়ী হয়, এর ওপর কিছু বিজয়ী হতে পারে না।ওলিদ ইবনুল মুগিরা, কোরাইশদের অন্যতম প্রধান নেতা
ওলিদ ছিলেন কোরাইশদের অন্যতম প্রধান নেতা ও আরবের নামকরা বাগ্মী। কবিতা ও বাগ্মিতার প্রতিটা শাখায় তিনি পণ্ডিত ছিলেন। তার এই স্বীকারোক্তিই বলে দেয়—কোরআনের ভাষাশৈলী কোনো সাধারণ মানের রচনা ছিল না।
তাই কোরাইশের নেতারা তাদের অনুসারীদের নির্দেশ দিয়েছিল কোরআন পাঠের সময় হট্টগোল করতে, যাতে মানুষ এর প্রভাব থেকে দূরে থাকে। (সুরা ফুসসিলাত, আয়াত: ২৬)
আজকের যুগেও কোরআনের এই আপাত পুনরাবৃত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। অনেক সময় সংশয়বাদীরা এটাকে দুর্বলতা বা অসংগতি হিসেবে দেখাতে চান। অথচ প্রতিটি সাদৃশ্যের পেছনে একটা সচেতন, সুনির্দিষ্ট কারণ আছে।
কোরআন নিজেই তার সংরক্ষণের নিশ্চয়তা দিয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আমি এই কোরআন অবতীর্ণ করেছি, আর আমি নিজেই এর সংরক্ষক।’ (সুরা হিজর, আয়াত ৯)
আর এই ভাষাতাত্ত্বিক সূক্ষ্মতাই সেই সংরক্ষণের একটা প্রমাণ। মানুষের তৈরি কোনো লেখায় একই কথা যখন বারবার আসে, তাতে পাঠকের একঘেয়েমি লাগে। কিন্তু কোরআনের সাদৃশ্য আয়াতগুলো যতবার পড়া হয়, প্রতিবারই নতুন একটা অর্থ বা দৃষ্টিকোণ খুলে যায়।
এই বিন্যাসই বলে দেয়, এটা কোনো মানুষের রচনা নয়।