সাহাবিদের কথা

এক তাওরাতের পণ্ডিত যেভাবে ইসলাম গ্রহণ করেন

নবুয়তের চতুর্দশ বর্ষ। মক্কার কোরাইশদের দীর্ঘ ১৩ বছরের অমানুষিক জুলুম ও নির্যাতন পেরিয়ে রাসুল (সা.) মাত্র পদার্পণ করেছেন মদিনার মাটিতে। চারদিকে তখন উৎসবমুখর পরিবেশ, বাতাসে আনন্দের গুঞ্জন।

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিশ্বমানবতার মুক্তির দূত তাশরিফ এনেছেন এই জনপদে। মদিনার প্রতিটি অলিগলি থেকে মানুষ ছুটে আসছে একনজর দেখার জন্য—কে সেই অনন্য ব্যক্তিত্ব, যাঁর আহ্বানে কেঁপে উঠেছে গোটা আরব জাহানের জাহেলিয়াত।

তাওরাতের পণ্ডিত

মদিনায় নবীজির আগমনের এই বার্তা পৌঁছে গেল তৎকালীন বনু কাইনুকা গোত্রের প্রধান ইহুদি ধর্মীয় পণ্ডিত আবদুল্লাহ ইবনে সালামের কাছে।

তিনি ছিলেন তাওরাত ও হিব্রুধর্মীয় সাহিত্যে গভীর জ্ঞানের অধিকারী। তাওরাত গ্রন্থে আখেরি জামানার নবীর যে অনন্য বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলির বিশদ বর্ণনা রয়েছে, মক্কা থেকে আসা এই নবীর মধ্যে তা বিদ্যমান আছে কি না—তা যাচাইয়ের এক তীব্র ব্যাকুলতা অনুভব করলেন তিনি।

সত্য অনুসন্ধানের অদম্য টানে তিনি কালবিলম্ব না করে সরাসরি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র মজলিসে হাজির হলেন।

তাওরাতের গোপন সংবাদের সঙ্গে নবীজির উত্তরের এই অভ্রান্ত মিল প্রত্যক্ষ করে আবদুল্লাহ ইবনে সালামের অন্তরে আর কোনো সংশয় অবশিষ্ট রইল না। তিনি কালবিলম্ব না করে রাসুলের হাত ধরে উচ্চকণ্ঠে তাওহিদের সাক্ষ্য দিলেন।

প্রথম দর্শনে হৃদয়ের অকাট্য সাক্ষ্য

নবীজি (সা.) তখন সমবেত জনতার উদ্দেশে নসিহত করছিলেন। ভিড় ঠেলে সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন আবদুল্লাহ ইবনে সালাম। বিশ্বনবীর নুরানি চেহারার দিকে চোখ পড়তেই তাঁর অন্তরের সংশয়ের পর্দা নিমেষেই ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারলেন, এ কোনো সাধারণ মানুষের চেহারা নয়।

পরে সেই অবিস্মরণীয় মুহূর্তের স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি তাঁর চেহারার দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকাতেই অকাট্যভাবে নিশ্চিত হলাম—এটি কোনো মিথ্যাবাদীর চেহারা হতে পারে না’। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৪৮৫)

সেদিন রাসুলের জবান থেকে তিনি যে প্রথম বাণীটি শুনেছিলেন, তা ছিল, ‘হে লোক সকল! তোমরা পরস্পরের মাঝে সালামের বিস্তার ঘটাও, অনাহারীকে অন্ন দাও, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখো এবং রাতে যখন মানুষ গভীর ঘুমে নিমগ্ন থাকে তখন নামাজে দাঁড়াও; তবেই তোমরা নিরাপদে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে।’

তিনটি প্রশ্ন ও উত্তর

হৃদয় সত্যের আলোয় আলোকিত হলেও পাণ্ডিত্যপূর্ণ প্রমাণের জন্য তিনি নবীজিকে এমন তিনটি প্রশ্ন করার সিদ্ধান্ত নিলেন, যার উত্তর কোনো সাধারণ মানুষের জানা সম্ভব নয়; কেবল আল্লাহর মনোনীত সত্য নবীই তা প্রকাশ করতে পারেন।

তিনি নবীজির সমীপে এসে বললেন, ‘আমি আপনাকে এমন তিনটি বিষয়ে জিজ্ঞাসা করব, যার জ্ঞান সত্য নবী ছাড়া আর কারও জানা নেই:

১. কেয়ামতের প্রথম আলামত বা বড় নিদর্শন কী?

২. জান্নাতিরা জান্নাতে প্রবেশের পর প্রথম কোন খাবারটি গ্রহণ করবেন?

৩. সন্তান কিসের প্রভাবে পিতার আকৃতি কিংবা মায়ের আকৃতি পায়?’

রাসুল (সা.) পরম প্রশান্ত চিত্তে বললেন: ‘এইমাত্র জিবরাইল (আ.) এসে আমাকে এ বিষয়গুলোর সংবাদ দিয়ে গেলেন।’ এরপর তিনি জবাব দিলেন:

প্রথমত, কিয়ামতের প্রথম আলামত হলো এমন এক সর্বগ্রাসী আগুন, যা মানুষকে পূর্ব থেকে পশ্চিম প্রান্তের দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে এক ময়দানে সমবেত করবে।

দ্বিতীয়ত, জান্নাতে প্রবেশের পর মুমিনদের প্রথম আপ্যায়ন করা হবে মাছের কলিজার সর্বোৎকৃষ্ট বাড়তি অংশ (জিয়াদাতু কাবাদিল হুত) দিয়ে।

তৃতীয়ত, পিতা ও মাতার মধ্যে যার বীর্য বা শারীরিক নির্যাস আগে স্খলিত ও প্রাধান্য পায়, সন্তান হুবহু তার সাদৃশ্য ও বৈশিষ্ট্য লাভ করে।

তাওরাতের গোপন সংবাদের সঙ্গে নবীজির উত্তরের এই অভ্রান্ত মিল প্রত্যক্ষ করে আবদুল্লাহ ইবনে সালামের অন্তরে আর কোনো সংশয় অবশিষ্ট রইল না। তিনি কালবিলম্ব না করে রাসুলের হাত ধরে উচ্চকণ্ঠে তাওহিদের সাক্ষ্য দিলেন—‘আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহু’ (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং নিশ্চয়ই মুহাম্মদ তাঁর বান্দা ও রাসুল)।

তারা যদি আমার আগেই আমার ইসলাম গ্রহণের খবর জেনে ফেলে, তবে তাৎক্ষণিক তারা আপনার কাছে আমার সম্পর্কে মিথ্যা অপবাদ ছড়াবে। তাই আপনি আগে তাদের কাছে আমার মর্যাদা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে তাদের মনস্তত্ত্ব পরীক্ষা করুন।
নবীজিকে আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম

মদিনার ইহুদিদের হঠকারিতা

ইসলাম গ্রহণের পর আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রা.) তাঁর নিজ সম্প্রদায়ের চারিত্রিক কুটিলতা সম্পর্কে নবীজিকে সতর্ক করে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, ইহুদিরা এক চরম মিথ্যাবাদী ও অপবাদ রটনাকারী জাতি। তারা যদি আমার আগেই আমার ইসলাম গ্রহণের খবর জেনে ফেলে, তবে তাৎক্ষণিক তারা আপনার কাছে আমার সম্পর্কে মিথ্যা অপবাদ ছড়াবে। তাই আপনি আগে তাদের কাছে আমার মর্যাদা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে তাদের মনস্তত্ত্ব পরীক্ষা করুন।’

পরামর্শ অনুযায়ী আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রা.) ঘরের আড়ালে লুকিয়ে রইলেন। এরপর মদিনার ইহুদিদের এক প্রতিনিধিদল রাসুলের দরবারে এলে নবীজি (সা.) তাদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমাদের সমাজে আবদুল্লাহ ইবনে সালাম কেমন মানুষ?’

তারা অকপটে একবাক্যে বলে উঠল, ‘তিনি আমাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি এবং আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তির সন্তান। তিনি আমাদের সবচেয়ে বড় পণ্ডিত ও সম্মানিত নেতার সন্তান।’

তখন রাসুল (সা.) তাদের প্রশ্ন করলেন, ‘যদি আবদুল্লাহ ইবনে সালাম ইসলাম গ্রহণ করে তবে তোমাদের অভিমত কী হবে?’ তারা হতভম্ব হয়ে চিৎকার করে বলল, ‘আল্লাহ তাঁকে এমন অপকর্ম থেকে রক্ষা করুন!’

ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের পর্দা সরিয়ে দৃপ্ত পদক্ষেপে সামনে এসে দাঁড়ালেন আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রা.)। তিনি তাদের চোখের সামনে উচ্চ স্বরে ঘোষণা করলেন, ‘হে আমার সম্প্রদায়, আল্লাহকে ভয় করো। আল্লাহর কসম, তোমরা ভালো করেই জানো ইনিই সেই রাসুল, যাঁর আগমনের কথা তোমরা তোমাদের তাওরাত গ্রন্থে স্পষ্টভাবে লিখিত পেয়েছ!’

মুহূর্তের ব্যবধানে দৃশ্যপট সম্পূর্ণ পাল্টে গেল। সত্য প্রকাশিত হতেই সত্যের বিরোধীরা নিজেদের চরিত্র উন্মোচন করল। একটু আগেই যাঁর প্রশংসায় তারা পঞ্চমুখ ছিল, তৎক্ষণাৎ তারা চিৎকার করে বলতে শুরু করল: ‘এ আমাদের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তি এবং সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তির সন্তান!’ এবং তারা তাঁর ওপর নানা অপবাদ চাপাতে লাগল।

আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রা.) নবীজির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আমি এই আশঙ্কার কথাই আপনাকে বলেছিলাম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৩২৯)

স্বজাতির অন্ধ গোঁড়ামি ও সামাজিক অবস্থান বিসর্জন দিয়ে আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রা.) সত্যকে যেভাবে আলিঙ্গন করেছিলেন, তা ছিল ইমান ও সততার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। পার্থিব সম্মান ছেড়ে সত্যের অনুসারী হওয়ার এই আত্মত্যাগের প্রতিদান হিসেবে তিনি দুনিয়াতেই পেয়েছিলেন জান্নাতের অকাট্য সুসংবাদ।

  • মাহমুদ হাসান ফাহিম: ইমাম ও খতিব, উপজেলা মডেল মসজিদ, কিশোরগঞ্জ