পাথেয়

রাগ নিয়ন্ত্রণে কোরআনের সমাধান

প্রকৃত শক্তিশালী কে—যে জিমে ১০০ কেজি ওজন তুলতে পারে, নাকি যে রেগে গিয়েও নিজেকে সামলাতে পারে? কোরআনে এর সুন্দর সমাধান আছে। আর সেই সমাধান আজকের বিজ্ঞানও স্বীকার করছে।

ঘটনাটা খুব চেনা। অফিস থেকে সন্ধ্যায় ফিরছেন। সারা দিন ক্লান্ত, রাস্তায় জ্যাম। হঠাৎ পাশ থেকে একটি রিকশা আপনার গায়ে ধাক্কা দিল। ব্যথা পেলেন। এক সেকেন্ড—শুধু এক সেকেন্ডের মধ্যে ভেতরে রক্ত গরম হয়ে গেল, গলা শুকিয়ে এল।

মাথায় একটাই চিন্তা—এখনই নেমে প্রচণ্ড শক্তি দিয়ে রিকশাওয়ালার গালে একটা চড় বসাবেন।

অথবা ধরুন বাসায় ছোট ভাই আপনার ফোনটা মেঝেতে ফেলে দিল। আপনার শখের যে গ্লাসটি দিয়ে পানি পান করতে পছন্দ করেন, তিন বছর বয়সী মেয়েটি সেটি ভেঙে ফেলল। কিংবা অফিসে বস সবার সামনে আপনাকে বকা দিলেন।

রেগে গেলে মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে পড়ে। শরীরে কর্টিসল ও অ্যাড্রেলালিন হরমোন নিঃসরণ হয়। যৌক্তিক চিন্তা বা রেশনাল থিংকিং বন্ধ হয়ে যায়।

অথবা কোনো কারণ ছাড়াই কেউ আপনার সঙ্গে বেয়াদবি করল। আপনি রাগে ফুঁসছেন বা এর বহিঃপ্রকাশ হিসেবে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালেন।

এমন অবস্থায় রাগ হওয়া স্বাভাবিক। রাগ একটি মানবিক আবেগ। কিন্তু সমস্যা হয় তখন—যখন রাগ আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, আপনি রাগকে নয়।

বিজ্ঞান কী বলছে

রেগে গেলে মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে পড়ে। শরীরে কর্টিসল ও অ্যাড্রেলালিন হরমোন নিঃসরণ হয়। যৌক্তিক চিন্তা বা রেশনাল থিংকিং বন্ধ হয়ে যায়। ঠিক সেই মুহূর্তে আপনি এমন কথা বলেন বা এমন কাজ করেন, যা পরে আর ফেরানো যায় না। দীর্ঘমেয়াদে অনিয়ন্ত্রিত রাগ হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়। (Angerer, P. et al., 2007, European Heart Journal, 28(6), pp. 722-728)

রাগ নিয়ন্ত্রণের যে পদ্ধতি আধুনিক মনোবিজ্ঞান আজ শেখাচ্ছে, কোরআন তা শিখিয়ে গেছে চৌদ্দ শ বছর আগেই।

কোরআনের নির্দেশনা

আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘এবং যারা ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে দেয়। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৩৪)

এই আয়াতে তিনটি পর্যায় লক্ষ করুন—যেন তিনটি ধাপে ওপরে ওঠার সিঁড়ি:

১. ক্রোধ সংবরণ: ক্রোধ বোঝাতে এখানে ‘কাযম’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছ, যার অর্থ পানির বোতলের মুখ আটকে রাখা। রাগ আসবে, কিন্তু তা বের হবে না।

২. মানুষকে ক্ষমা করা: শুধু চুপ থাকা নয়, মন থেকেও মাফ করে দেওয়া। রাগটা ভেতরে পুষে না রাখা।

৩. সৎকর্মশীল: যে আপনার সঙ্গে খারাপ করেছে, তার সঙ্গে ভালো আচরণ করা। এটাই সর্বোচ্চ পর্যায়। এখানেই আল্লাহর ভালোবাসা।

প্রকৃত শক্তিশালী সে নয় যে কুস্তিতে মানুষকে হারায়, বরং প্রকৃত শক্তিশালী সে, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১১৪

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রকৃত শক্তিশালী সে নয় যে কুস্তিতে মানুষকে হারায়, বরং প্রকৃত শক্তিশালী সে, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১১৪)

অন্য একটি হাদিসে এক সাহাবি নবীজির কাছে উপদেশ চাইলেন। তিনি বললেন, ‘লা তাগদাব’ অর্থাৎ ‘রাগ কোরো না।’ সাহাবি বারবার জিজ্ঞেস করলেও তিনি একই উত্তর দিলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১১৬)

কোরআনের শিক্ষা

১. রাগ শয়তানের অস্ত্র: আল্লাহ বলেন, ‘শয়তান তো চায় তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত: ৯১)

রাগের মুহূর্তে আপনি সম্পর্ক নষ্ট করেন, ভুল সিদ্ধান্ত নেন। শয়তান ঠিক এটাই চায়।

২. নবী মুসার উদাহরণ: সিনাই পর্বত থেকে ফিরে মুসা (আ.) দেখলেন তাঁর সম্প্রদায় গোবৎস পূজা করছে। রাগে তিনি তাওরাতের ফলক ফেলে দিলেন, ভাই হারুন (আ.)-এর চুল ধরে টানলেন।

আল্লাহ সেই মুহূর্তটি কোরআনে উল্লেখ করেছেন (সুরা আরাফ, আয়াত: ১৫০)। কিন্তু রাগ থামার পর তিনি দোয়া করলেন, ‘হে আমার প্রতিপালক, আমাকে ও আমার ভাইকে ক্ষমা করুন।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ১৫১)

এখান থেকে শিক্ষা হলো—রাগের মাথায় সিদ্ধান্ত নিতে নেই।

৩. নবী ইউনুসের শিক্ষা: ইউনুস (আ.) তাঁর কওমের ওপর রুষ্ট হয়ে আল্লাহর অনুমতি ছাড়াই চলে গিয়েছিলেন। পরিণামে তিনি মাছের পেটে অন্ধকারে নিক্ষিপ্ত হন। তখন তিনি দোয়া করলেন, ‘লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনায যালিমিন।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৮৭)

রাগে নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত একজন নবীকেও পরীক্ষায় ফেলেছিল—আমাদের জীবনে এর পরিণাম কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা ভাবা প্রয়োজন।

৪. নবীজির আত্মনিয়ন্ত্রণ: তায়েফের ময়দানে রক্তাক্ত হয়েও রাসুল (সা.) প্রতিশোধ নেননি। পাহাড়ের ফেরেশতা এসে ধ্বংস করে দেওয়ার অনুমতি চাইলেও তিনি বলেছিলেন, ‘না। আমি আশা করি আল্লাহ এদের বংশ থেকে এমন মানুষ বের করবেন, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবেন।’

এটাই সর্বোচ্চ রাগ নিয়ন্ত্রণ।

এই মুহূর্তে শয়তান চাইছে আপনি বিস্ফোরিত হন, আর আল্লাহ চাইছেন আপনি শান্ত থাকুন। কাকে খুশি করবেন—সিদ্ধান্ত আপনার।

রাগ নিয়ন্ত্রণের ৫ ধাপ

  • অবস্থান পরিবর্তন: দাঁড়িয়ে থাকলে বসুন, বসে থাকলে শুয়ে পড়ুন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৭৮২)

  • অজু করা: রাগ আগুন থেকে, আর আগুন নেভে পানিতে। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৭৮৪)

  • চুপ থাকা: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘রাগের সময় চুপ থাকো।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ২১৯১)

  • আশ্রয় চাওয়া: আল্লাহ বলেন, ‘শয়তানের প্ররোচনা অনুভব করলে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাও।’ (সুরা ফুসসিলাত, আয়াত: ৩৬)

  • পুরস্কারের কথা ভাবা: যে ব্যক্তি ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও রাগ সংবরণ করে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে বিশেষ সম্মান দেবেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৭৭৭; সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২০২১)

রাগ গরম কয়লার মতো। যাকে ছুড়ে মারতে চান, তার আগে নিজের হাতই পুড়ে যায়। পরের বার রাগ এলে একটু থামুন। মনে করুন—এই মুহূর্তে শয়তান চাইছে আপনি বিস্ফোরিত হন, আর আল্লাহ চাইছেন আপনি শান্ত থাকুন। কাকে খুশি করবেন—সিদ্ধান্ত আপনার।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে ক্ষমাশীল হওয়ার শক্তি দিন। আমিন।

muhsin.du@gmail.com

মুহাম্মাদ মুহসিন মাশকুর: খণ্ডকালীন শিক্ষক, আরবি বিভাগ, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়