ইউরোপীয় মানসে ইসলাম ও মুসলমানদের প্রায়ই ‘আগন্তুক’ বা ‘বহিরাগত’ হিসেবে দেখা হয়। সমসাময়িক রাজনৈতিক বয়ানে মুসলিমদের উপস্থিতি কেবল অভিবাসন, নিরাপত্তাঝুঁকি কিংবা সাংস্কৃতিক সংঘাতের চশমায় বিচার করা হয়।
কিন্তু সাংবাদিক ও ভ্রমণলেখক তারিক হুসাইন তাঁর নতুন বই ‘মুসলিম ইউরোপ’-এ এই প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে এক বড় চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছেন। তাঁর গবেষণা ও ভ্রমণের সারকথা হলো: ইসলাম ইউরোপের জন্য কোনো ভিনদেশি সংস্কৃতি নয়, বরং এটি ইউরোপীয় ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য ও সুপ্রাচীন অংশ।
তারিক হোসেনের এ বই মূলত একটি ‘রিকভারি’ বা পুনরুদ্ধারের কাজ। তিনি সাইপ্রাস, সিসিলি, মাল্টা, পর্তুগাল ও স্পেনের মতো অঞ্চলগুলো ভ্রমণ করেছেন, যেখানে কয়েক শ বছর ধরে মুসলিমরা কেবল বসবাসই করেনি, বরং সেখানকার সভ্যতা ও সংস্কৃতি বিনির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। তাঁর ভাষায়, ইউরোপে মুসলিমদের ইতিহাস কেবল অভিবাসনের ইতিহাস নয়, বরং এটি টিকে থাকার ইতিহাস।
বইটিতে তারিক কিছু বিস্ময়কর তথ্যের ওপর আলোকপাত করেছেন:
সাইপ্রাস: এখানে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর খালা (উম্মে হারাম বিনতে মিলহান) সমাহিত আছেন। এটি প্রমাণ করে, ইসলামের প্রাথমিক যুগেই এই ভূখণ্ডে মুসলিমদের পদচারণ ছিল।
স্পেন ও আন্দালুস: আন্দালুসকে কেবল বিজ্ঞানের সোনালি যুগ হিসেবে নয়, বরং সেখানকার স্থাপত্য, ভাষা ও স্মৃতিতে মুসলিমদের যে গভীর প্রভাব আজও মিশে আছে, লেখক তা নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন।
বলকান অঞ্চল: বসনিয়া, কসোভো ও আলবেনিয়ার লাখ লাখ আদিবাসী মুসলিমদের কথা তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, যারা কোনো বহিরাগত নয়, বরং এই মাটিরই সন্তান।
ইউরোপে মুসলিমদের উপস্থিতি কেবল ঐতিহাসিক নয়, সংখ্যাতাত্ত্বিক দিক থেকেও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বইটির আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আধুনিক ইউরোপের কিছু পরিসংখ্যান নিচে তুলে ধরা হলো—
বইটির অন্যতম প্রধান দাবি হলো, ইউরোপীয় ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে ‘ইউরোপকেন্দ্রিক’ (ইউরোসেন্ট্রিক) দৃষ্টিভঙ্গি মুসলিমদের উপস্থিতিকে সর্বদা ‘আক্রমণ’ বা ‘অনুপ্রবেশ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
এই দৃষ্টিভঙ্গিই বর্তমান ডানপন্থী রাজনীতিকে পুষ্ট করছে। লেখক দেখিয়েছেন, মুসলিমরা এখানে কেবল বিজয়ী হিসেবে আসেনি, বরং তারা ছিল ব্যবসায়ী, পণ্ডিত, শিল্পী ও সাধারণ নাগরিক।
তারিক হুসাইন কোনো আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে থেকে বইটি লেখেননি। তিনি মুসলিমদের ইতিহাসকে কেবল ‘ভালো’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেননি, বরং এর জটিলতা, সংঘাত ও বৈচিত্র্যকেও স্বীকার করেছেন।
তিনি দেখিয়েছেন, ইউরোপীয় পরিচয় কোনো বিশুদ্ধ খ্রিষ্টান বা ধর্মনিরপেক্ষ পরিচয় নয়, বরং এটি খ্রিষ্টান, মুসলিম, ইহুদি ও ধর্মনিরপেক্ষ—এই চার ধারার সংমিশ্রণে তৈরি।
বইটি কেবল ইতিহাস নয়, বরং লেখকের ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিক সফরেরও অংশ। একজন ব্রিটিশ মুসলিম হিসেবে তারিক অনুভব করেছেন, ইউরোপীয় মুসলিমদের নিজেদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়া জরুরি।
যদি তারা জানে যে তাদের পূর্বপুরুষেরা এক হাজার বছর আগে এ মাটিতেই নামাজ পড়েছে, জ্ঞানচর্চা করেছে এবং স্থাপত্য তৈরি করেছে, তবে তারা নিজেদের আর ‘বহিরাগত’ মনে করবে না।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ-তাআলা বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীর বৈচিত্র্য সম্পর্কে বলেছেন, ‘হে মানুষ, আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে, পরে তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হতে পারো।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১৩)
তারিক হুসাইনের এই কাজ মূলত সেই ‘পরিচিত হওয়ার’ বা অনুধাবন করার একটি আধুনিক প্রয়াস।
সূত্র: নিউ আরব ডটকম