দক্ষিণ আফ্রিকায় রমজান মানে বৈচিত্র্যের মিলনমেলা। এখানে ভারতীয় মশলা, মালয় ঐতিহ্য আর খাঁটি আফ্রিকান সংস্কৃতির এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ ঘটে।
মাত্র ১২ লক্ষ মুসলিম নিয়ে গঠিত এই ছোট সম্প্রদায়টি দেশের অর্থনীতির প্রায় ৩০% নিয়ন্ত্রণ করে, যা তাদের রমজান আয়োজনকে করে তোলে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ।
এ–বছর রমজান উপলক্ষে জোহানেসবার্গে অনুষ্ঠিত হয়েছে আফ্রিকার অন্যতম বড় প্রদর্শনী ‘ঈদ ফিস্ট’।
প্রায় ২০,০০০ দর্শনার্থী এই মেলায় অংশ নিয়েছেন। এখানে তুরস্কের পোশাক থেকে শুরু করে ভারতীয় মশলা—সবই পাওয়া যায়। বিশেষ করে তুর্কি পণ্যগুলো এবার দক্ষিণ আফ্রিকান মুসলিমদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছে।
রমজান এলেই এখানকার ৫০০টিরও বেশি মসজিদকে সবুজ আলোয় রাঙানো হয়। বিশেষ করে জোহানেসবার্গের বিখ্যাত ‘নিজামি মসজিদ’ রমজানে এক আধ্যাত্মিক সৌন্দর্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
দক্ষিণ আফ্রিকার দস্তরখানে তিনটি ভিন্ন সংস্কৃতির খাবার দেখা যায়:
মালয় ও ভারতীয় প্রভাব: ইফতার শুরু হয় খেজুর আর হরেক রকমের স্ন্যাকস দিয়ে। এর মধ্যে সামোসা এবং কিমা বা পনির ভরা পেস্ট্রি অন্যতম। এরপর তারা মাগরিবের নামাজ পড়েন।
আফ্রিকান ঐতিহ্য: স্থানীয় কৃষ্ণাঙ্গ মুসলিমদের প্রধান খাবার হলো ‘পাপ এন ভ্লেস’। এটি ভুট্টার আটার জাউ ও ঝলসানো মাংসের এক চমৎকার মিশেল।
চাকলাকা: এটি একটি মশলাদার সবজির ডিশ, যা পেঁয়াজ, টমেটো, গাজর আর মটরশুঁটি দিয়ে তৈরি করা হয়। এটি ইফতারের মূল খাবারের স্বাদ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
কুক-সিস্টার্স: মিষ্টি হিসেবে বিখ্যাত এই খাবারটি বিনুনি করা ভাজা ময়দার দলা, যা ঘন চিনির সিরায় ডুবিয়ে রাখা হয়। এর মচমচে স্বাদ ছোট-বড় সবার প্রিয়।
কেপ টাউন ও ডারবানের মুসলিম প্রধান এলাকাগুলোতে রাস্তার ওপর বিশাল ইফতারের আয়োজন করা হয়।
এখানে মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সবাই একসঙ্গে বসে ইফতার করেন। ‘আওকাফ’ নামক একটি সংস্থা এই বিশাল আয়োজনের সমন্বয় করে।
কেপ টাউনের ‘বো-কাপ’ এলাকায় রঙিন বাড়িগুলোর সামনে পড়শিরা একে অপরের বাড়িতে কেক এবং ইফতারের খাবার পাঠান। এটি এই অঞ্চলের কয়েকশ বছরের পুরনো ঐতিহ্য।
এ–বছর রমজান পড়েছে দক্ষিণ গোলার্ধের শীতের শুরুতে (ফেব্রুয়ারি-মার্চ)। ফলে উত্তর গোলার্ধের তুলনায় দক্ষিণ আফ্রিকায় রোজার সময় বেশ কম।
এখানে মুসলিমরা মাত্র ১১ থেকে ১২ ঘণ্টা রোজা রাখছেন। ২০২৪ সালের তুলনায় যা প্রায় ৫০ মিনিট কম।
তবে সময় কম হলেও খরচ বেড়েছে। এক বেলার ইফতারের খরচ পড়ছে প্রায় ৭৭ র্যান্ড (৪ ডলার), যা গত বছরের তুলনায় ১৩% বেশি। বিশেষ করে চিনি আর আটার দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বেড়েছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার তরুণরা সাধারণত তারাবির নামাজের পর আর ঘুমান না। তারা ক্যাফে বা রেস্তোরাঁগুলোতে আড্ডা দেন এবং পরিবারের সঙ্গে সাহ্রি সেরে তারপর বিশ্রামে যান।
রেডিও ইসলাম (জোহানেসবার্গ) বা রেডিও ৭৮৬ (কেপ টাউন) থেকে সারারাত বিশেষ ইসলামি অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হয়।