‘মিম কালচার’ আজকের ডিজিটাল দুনিয়ার এক অনিবার্য বাস্তবতা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছুই পরিবর্তিত হয়, আবির্ভাব ঘটে নতুন নতুন বিষয়ের। বর্তমান সংস্কৃতিতেও ‘মিম কালচার’ এগিয়ে চলেছে অপ্রতিরোধ্য গতিতে। সমসাময়িক যেকোনো বিষয় নিয়ে মজাদার ও চটকদার ‘মিম’ এখন ঝড়ের গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়।
‘মিম’ শব্দটা এসেছে গ্রিক শব্দ ‘মিমেমা’ থেকে, যার অর্থ এমন কিছু যাকে অনুকরণ করা হয়। ১৯৭৬ সালে বিবর্তনীয় বিজ্ঞানী রিচার্ড ডকিন্স তাঁর ‘দ্য সেলফিশ জিন’ বইয়ে প্রথম এই শব্দের উল্লেখ করেন।
মিম হলো একটি ক্ষুদ্র কিন্তু শক্তিশালী মাধ্যম। এটি হতে পারে একটি স্থিরচিত্র, কয়েক শব্দের কৌতুক কিংবা কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও। মিম মুহূর্তের আনন্দ ও রসিকতার পাশাপাশি সমাজের সমালোচনার ভাষা হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। এখানে হাসি, বিদ্রূপ এবং প্রতিবাদ মিশে থাকে একসূত্রে।
সুতরাং মিম এখন স্রেফ বিনোদনের মাধ্যম নয়; বরং বলা চলে, তা একটি যুগের সামষ্টিক মনস্তত্ত্ব ও সামাজিক প্রবণতার প্রতিবিম্ব।
ইসলাম মানুষের স্বাভাবিক হাসি ও আনন্দকে কখনো নিরুৎসাহিত করেনি। নবি করিম (সা.) নিজেও সাহাবাদের সঙ্গে রসিকতা করতেন। তবে তাঁর প্রতিটি কৌতুকের পেছনে থাকত সত্য এবং সুমহান শিক্ষা। তিনি বলেছেন, ‘আমি রসিকতা করলেও সত্য ব্যতীত অন্য কিছু বলি না।’ (সুনানে তিরমিজি: ১৯৯০)
নবীজির এই আদর্শকে ধারণ করে সাহাবিগণও আনন্দ-রসিকতায় মেতে উঠতেন। ইমাম বুখারি (রহ.) বর্ণনা করেছেন যে সাহাবিরা একে অপরের দিকে তরমুজ ছুড়ে রসিকতা করতেন; কিন্তু যখন কোনো কঠিন সত্য বা গাম্ভীর্যের সময় আসত, তখন তাঁরাই ছিলেন প্রকৃত বীর পুরুষ। (আল-আদাবুল মুফরাদ: ২৬৬)
কৌতুক তখনই প্রশংসনীয় যখন তা পরিমিত হয় এবং সত্য কথা দ্বারা হয়। কিন্তু যদি তা মিথ্যার ওপর ভিত্তি করে হয় বা তাতে অশ্লীলতা থাকে, তবে তা ফাসেকির অন্তর্ভুক্ত।আল্লামা ইবনে আবিদিন শামি (রহ.)
অর্থাৎ পরিমিত আনন্দ তাঁদের ধর্মীয় ব্যক্তিত্বকে ক্ষুণ্ণ করত না। নিছক মজার ছলে কারও শারীরিক গঠন বা ব্যক্তিগত অসহায়ত্বকে ‘ট্রল’ বা বিদ্রূপের লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়। বিদ্রূপ হলো অন্যকে তুচ্ছজ্ঞান করা ও নিচু দেখানো, যা স্পষ্ট হারাম।
আল্লাহ–তাআলা বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ, কোনো সম্প্রদায় যেন অপর কোনো সম্প্রদায়কে বিদ্রূপ না করে; হতে পারে তারা বিদ্রূপকারীদের চেয়ে উত্তম’ (সুরা হুজুরাত: ১১)
বর্তমানে অনেক মিম এই আসমানি সীমারেখা অতিক্রম করে ফেলে।
হানাফি ফিকহশাস্ত্রের অন্যতম ইমাম আল্লামা ইবনে আবিদিন শামি (রহ.) লিখেছেন, কৌতুক তখনই প্রশংসনীয় যখন তা পরিমিত হয় এবং সত্য কথা দ্বারা হয়। কিন্তু যদি তা মিথ্যার ওপর ভিত্তি করে হয় বা তাতে অশ্লীলতা থাকে, তবে তা ফাসেকির অন্তর্ভুক্ত। (রদ্দুল মুহতার: ৬/৪০৫)
আধুনিক মিমের ক্ষেত্রে এডিট করা মিথ্যা ছবি বা বিকৃত তথ্যের ব্যবহার এই ‘ফাসেকির’ই নামান্তর।
মিম বা কৌতুক আমাদের জীবনে কতটুকু থাকা উচিত—ইমাম মাওয়ার্দি (রহ.) এ বিষয়ে একটি অনন্য উপমা দিয়েছেন, ‘তোমার ক্লান্ত মনকে মাঝেমধ্যে রসিকতা দিয়ে বিশ্রাম দাও। তবে মনে রেখো, তোমার কথায় রসিকতার পরিমাণ যেন ততটুকুই হয়, যতটুকু তরকারিতে লবণের প্রয়োজন হয়।’ (আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদ দীন: ৩১১)
লবণ ছাড়া যেমন তরকারি বিস্বাদ, রসিকতাহীন জীবনও তেমনি শুষ্ক। কিন্তু লবণের আধিক্য যেমন পুরো খাবারকে নষ্ট করে দেয়, তেমনি সারাদিন মিম ও বিনোদনে বুঁদ হয়ে থাকা মানুষের অন্তরের নূর নিভিয়ে দেয়।
নবীজি (সা.) সতর্ক করেছেন, ‘তোমরা অধিক হাসবে না। কারণ অধিক হাসি অন্তরের মৃত্যু ঘটায়।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪১৯৩)।
একজন সচেতন মুসলিমের দায়িত্ব হলো সে যেন এই সাংস্কৃতিক স্রোতে অন্ধভাবে গা ভাসিয়ে না দিয়ে বরং সৃজনশীলতা ও তাকওয়ার ভারসাম্যে নিজের ডিজিটাল পদচিহ্নকে সুন্দর করে তোলে।
মিমের আরেকটি অন্ধকার দিক হলো ‘প্র্যাঙ্ক’ বা কাউকে ভয় পাইয়ে আনন্দ নেওয়া। ইমাম ইবনে হাজার হাইতামি (রহ.) কঠোরভাবে বলেছেন যে কাউকে আতঙ্কিত করে মজা করা হারাম। (তুহফাতুল মুহতাজ: ১০/২৮৭)
নবীজি (সা.) স্বয়ং বলেছেন, কোনো মুসলিমের জন্য বৈধ নয় অন্য কোনো মুসলিমকে আতঙ্কিত করা।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৫০০৪)
তবে মিমের ইতিবাচক প্রয়োগ একে ‘দাওয়াহ’তে রূপান্তর করতে পারে। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘সবচেয়ে উত্তম আমল হলো কোনো মুসলিমের মনে আনন্দ প্রবেশ করানো।’ (আল-মুজামুল আওসাত: ৫০৮১)
যদি কোনো মিম অশ্লীলতা ও মিথ্যাচারমুক্ত হয়ে মানুষের ক্লান্তি দূর করে কিংবা অন্যায়ের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করে, তবে তা প্রশংসনীয়। এমনকি কৌতুক যদি হয় অন্যের মন ভালো করার জন্য বা একঘেয়েমি কাটানোর জন্য, তবে তা সুন্নাহ ও মুস্তাহাব হিসেবেও গণ্য হতে পারে। (মিরকাতুল মাফাতিহ: ৯/১০৫)
পরিশেষে বলা যায়, মিম কালচার ইসলামের চোখে স্বতসিদ্ধ কোনো পাপ নয়, যতক্ষণ তা সত্য, ন্যায় ও মানুষের মর্যাদাবোধ রক্ষা করে। আধুনিক এই মাধ্যমকে আমরা বর্জন না করে বরং ইসলামের নৈতিক ফিল্টার দিয়ে পরিশুদ্ধ করতে পারি।
মিম যেন আমাদের ‘গাফেল’ বা বেখবর না করে তোলে, বরং তা যেন হয় চারিত্রিক মাধুর্যের একটি অংশ। একজন সচেতন মুসলিমের দায়িত্ব হলো সে যেন এই সাংস্কৃতিক স্রোতে অন্ধভাবে গা ভাসিয়ে না দিয়ে বরং সৃজনশীলতা ও তাকওয়ার ভারসাম্যে নিজের ডিজিটাল পদচিহ্নকে সুন্দর করে তোলে।
রসিকতা মানুষকে ছোট করার জন্য নয়, বরং মানুষের মুখে নির্মল হাসি ফোটানোর জন্য হওয়া উচিত।
ইফতেখারুল হক হাসনাইন : আলেম ও লেখক