মসজিদে ইমাম আবু হানিফা, বাগদাদ, ইরাক
মসজিদে ইমাম আবু হানিফা, বাগদাদ, ইরাক

ব্যক্তিত্ব

ইমাম আবু হানিফা: জীবন ও পাণ্ডিত্য

ইমাম আবু হানিফা (র.)–কে অভিহিত করা হয় ‘ইমামুল আজম’ বা ‘মহান ইমাম’ নামে। তিনি ছিলেন ইসলামি আইনের সুশৃঙ্খল বিন্যাস এবং যৌক্তিক বিচার বিশ্লেষণ পদ্ধতির অন্যতম পথিকৃৎ।

তাঁর প্রতিষ্ঠিত হানাফি মাজহাব আজ বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি অনুসৃত। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, তুরস্ক, সিরিয়া, ইরাক ও মিশরে এই মাজহাবের অনুসারী সবচেয়ে বেশি।

এই জনপ্রিয়তার পেছনে যেমন তাঁর অসাধারণ মেধা ও সুযোগ্য ছাত্রদের অবদান ছিল, তেমনি আব্বাসীয়, উসমানীয় ও মুঘল সাম্রাজ্যের মতো প্রভাবশালী মুসলিম রাজবংশগুলোর পৃষ্ঠপোষকতাও বড় ভূমিকা পালন করেছে। (মুহাম্মদ আকরাম নদভি, আবু হানিফা: হিজ লাইফ, লিগ্যাল মেথড অ্যান্ড লিগেসি, পৃষ্ঠা: ১, কুবে পাবলিশিং, ২০১০)

জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়

ইমাম আবু হানিফার প্রকৃত নাম নুমান ইবনে সাবিত। তিনি ৮০ হিজরিতে ইরাকের কুফা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৫০ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানের শাসনামলে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

তাঁর ‘আবু হানিফা’ উপনামটি নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে নানা মত রয়েছে। কেউ মনে করেন তাঁর ‘হানিফা’ নামে এক কন্যা ছিল যে অল্প বয়সেই মারা যায়, আবার কারো মতে এটি কেবল একটি উপনাম হিসেবেই প্রসিদ্ধি পায়। (আবু জাহরা, দ্য ফোর ইমামস, পৃষ্ঠা: ১২৩, দার আল তাকওয়া, ১৯৯৯)

তিনি পারস্য বংশোদ্ভূত একটি সম্ভ্রান্ত ও ধনী মুসলিম পরিবারে বেড়ে ওঠেন। বর্ণিত আছে, তাঁর পিতা সাবিত শৈশবে চতুর্থ খলিফা আলি (রা.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন এবং ইমামের দাদা খলিফাকে ‘ফালুদাজ’ (এক ধরনের মিষ্টান্ন) উপহার দিয়েছিলেন।

হজরত আলি (রা.) সাবিত ও তাঁর বংশধরদের জন্য বরকতের দোয়া করেছিলেন। পরিবারটি তখন কুফায় রেশমি কাপড়ের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিল। (আবু জাহরা, পৃষ্ঠা: ১২৬-১২৭)

বাগদাদে ইমাম আবু হানিফার সমাধিস্থল

শিক্ষা জীবনের শুরু

তিনি কুফায় বেড়ে ওঠেন এবং শৈশবেই পবিত্র কোরআন হিফজ করেন। তিনি বিখ্যাত সাত ক্বারির (বিশুদ্ধ কোরআন পাঠে অভিজ্ঞ) অন্যতম ইমাম আসিমের পদ্ধতিতে কোরআন পাঠ শিখতেন।

কোরআনের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল অগাধ; তিনি সারারাত নামাজে কোরআন তেলাওয়াত করতেন। বর্ণিত আছে যে, তিনি রমজান মাসে প্রতি বছর কয়েক ডজন বার কোরআন খতম করতেন।

পিতার ব্যবসার সূত্র ধরে প্রথম জীবনে কাপড়ের ব্যবসায় নিযুক্ত ছিলেন। কিন্তু তাঁর মেধা দেখে প্রখ্যাত তাবেয়ি ইমাম আমের শাবি (রহ.) তাঁকে ইলম বা ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের পরামর্শ দেন।

ইমাম আবু হানিফা নিজেই বলেন, “একদিন আমি শাবির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কোথায় যাও?’ আমি একজন ব্যবসায়ীর নাম বললাম। তিনি বললেন, ‘আমি বাজারের কথা বলিনি, তুমি কোন আলেমদের মজলিসে বসো?’

আমি বললাম, ‘আমি খুব একটা যাই না।’ তখন শাবি বললেন, ‘জ্ঞান অর্জন ছেড়ে দিও না, তোমার মাঝে আমি বুদ্ধিবৃত্তিক দীপ্তি দেখতে পাচ্ছি।’

তাঁর এই কথা আমার হৃদয়ে দাগ কাটল এবং আমি বাজারের ব্যস্ততা কমিয়ে জ্ঞান অর্জনে আত্মনিয়োগ করলাম।” (আকরাম নদভি, পৃষ্ঠা: ২৪)

শিক্ষকতা ও জ্ঞানতাত্ত্বিক সফর

ইমাম আবু হানিফা তাঁর যুগের প্রখ্যাত আলেম হাম্মাদ ইবনে আবি সুলাইমানের নিকট দীর্ঘ ১৮ বছর ফিকহ শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। হাম্মাদের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি তাঁর সঙ্গ ছাড়েননি।

এছাড়া তিনি প্রায় তিন শতাধিক শিক্ষকের কাছ থেকে হাদিস শ্রবণ করেছেন, যাদের মধ্যে ৭৪ জনের বর্ণিত হাদিস সিহাহ সিত্তাহ বা প্রধান ছয়টি হাদিস গ্রন্থে (বুখারি, মুসলিম ইত্যাদি) স্থান পেয়েছে।

তিনি মক্কা ও মদিনায় বহুবার সফর করেছেন এবং আতা ইবনে আবি রাবাহ ও ইমাম জুহরির মতো প্রখ্যাত তাবেয়িদের কাছ থেকে জ্ঞান অর্জন করেছেন। (আকরাম নদভি, পৃষ্ঠা: ২৯)

মজার ব্যাপার হলো, ইমাম আবু হানিফা নিজেও একজন ‘তাবেয়ি’ ছিলেন। তিনি আনাস ইবনে মালিক (রা.), সাহল ইবনে সাদ (রা.) এবং জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.)-এর মতো মহান সাহাবিদের সাক্ষাৎ পাওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন। (মুহাম্মদ মাজলুম খান, দ্য মুসলিম ১০০, পৃষ্ঠা: ৫৪, কুবে পাবলিশিং, ২০১০)

বিশ শতকের গোড়ার দিকে ইমাম আবু হানিফা মসজিদ, বাগদাদ, ইরাক

ফিকহ শাস্ত্রের সুশৃঙ্খল বিন্যাস

ইমাম আবু হানিফা অনুধাবন করেছিলেন যে, মুসলিম উম্মাহর সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন সমস্যার উদ্ভব হচ্ছে যার সমাধান সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো প্রয়োজন।

তিনি তাঁর সেরা ছাত্রদের (যেমন ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মদ) নিয়ে একটি বোর্ড গঠন করেন। সেখানে কোনো মাসআলা নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক ও আলোচনার পর যখন সবাই একমত হতেন, তখন সেটি লিপিবদ্ধ করা হতো।

এভাবেই বর্তমান সময়ের পরিচিত অধ্যায় অনুযায়ী (পবিত্রতা, নামাজ, রোজা ইত্যাদি) ফিকহ শাস্ত্র সংকলিত হয়।

কিয়াসের ৫ শর্ত

যৌক্তিক বিশ্লেষণ বা কিয়াসের (Analogy) মাধ্যমে শরিয়তের বিধান বের করার ক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। ইমাম আবু হানিফার মতে, কিয়াস সঠিক হওয়ার জন্য পাঁচটি শর্ত পূরণ হওয়া জরুরি:

১. মূল বিষয়ের কারণটি (ইল্লত) যুক্তিগ্রাহ্য হতে হবে।

২. যে বিষয়ে সমাধান খোঁজা হচ্ছে, সে বিষয়ে কোরআন বা সুন্নাহর কোনো সরাসরি টেক্সট থাকা চলবে না।

৩. মূল বিধানটি যদি কেবল একটি বিশেষ ঘটনার জন্য নির্দিষ্ট হয়, তবে তা দিয়ে কিয়াস করা যাবে না।

৪. কিয়াসের মাধ্যমে প্রাপ্ত সমাধান যেন মূল কোনো নস বা টেক্সটের পরিপন্থী না হয়।

৫. মূল কারণটি (ইল্লত) যেন কেবল নির্দিষ্ট একটি পরিস্থিতির সঙ্গেই সীমাবদ্ধ না থাকে। (আকরাম নদভী, পৃষ্ঠা: ৬৬)

ইমাম আবু হানিফার জীবন ও কর্ম প্রমাণ করে যে, নিষ্ঠা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক পরিশ্রমের মাধ্যমে কীভাবে ইসলামের সেবা করা সম্ভব। তাঁর এই জ্ঞানতাত্ত্বিক বিপ্লব আজও মুসলিম বিশ্বের আইনি কাঠামোর ভিত্তি হয়ে আছে।