শিরক হলো আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করা। এর মধ্যে ছোট শিরক (শিরকে আসগার) এমন পাপ, যা মানুষকে ইসলাম থেকে বের না করলেও ইমান দুর্বল করে এবং আমল নষ্ট করে দেয়। এটি অনেক সময় সূক্ষ্মভাবে জীবনে ঢুকে পড়ে, তাই মানুষ এর ভয়াবহতা বুঝতে পারে না।
রাসুল (সা.) বলেছেন, তিনি তাঁর উম্মতের জন্য সবচেয়ে বেশি ভয় পান ছোট শিরক—বিশেষ করে ‘রিয়া’কে (লোকদেখানো ইবাদত)। কারণ, এটি মানুষের অন্তর ও আমলকে ধ্বংস করে দেয়।
প্রকাশ্য ছোট শিরক
যে শিরক কথা বা কাজের মাধ্যমে প্রকাশ পায়, তাকে প্রকাশ্য ছোট শিরক বলা হয়। এটি কয়েকভাবে হতে পারে:
১. আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে কসম:
আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে কসম করলে ছোট শিরক হয়। কসম করা একধরনের মর্যাদা দেওয়া, যা একমাত্র আল্লাহর প্রাপ্য। অথচ অনেক মানুষ বাবার কসম, মাটির কসম, কাবার কসম বা সন্তানের দিব্বি দিয়ে থাকে।
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর নামে কসম করল, সে শিরক করল।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ৬০৭২; তিরমিজি, সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৫৩৫)।
২. আল্লাহ ও সৃষ্টিকে সমান্তরালে রাখা:
আল্লাহ ও তাঁর সৃষ্টিকে একসঙ্গে সমানভাবে বলা শিরক। যেমন: ‘আল্লাহ এবং আপনি যা চান’ বা ‘যদি আল্লাহ না থাকতেন তবে অমুক না থাকত’। এক ব্যক্তি নবীজিকে (সা.) ‘আল্লাহ এবং আপনি যা চান’ বললে তিনি বলেছিলেন, ‘তুমি কি আমাকে আল্লাহর সমকক্ষ বানিয়ে দিলে? বরং বলো, আল্লাহ যা চান’ (নাসায়ি, আস-সুনানুল কুবরা, হাদিস: ১০৮২৫; বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ৬০৫)।
৩. উপকার-অপকার অন্যের দিকে সম্পৃক্ত করা:
এটি সবচেয়ে প্রচলিত ছোট শিরক। যেমন ড্রাইভারের প্রশংসা করে বলা—‘ড্রাইভার খুবই দক্ষ ছিল, তা না হলে আজ মারা যেতাম’। কিংবা সুন্দর দৃশ্য দেখে ‘প্রকৃতির দান’ বলা। সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি হলো সবকিছু আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়, অন্যরা শুধু মাধ্যম। আল্লাহ বলেন, ‘আর যখন তারা নৌভ্রমণে চলত তখন একাগ্রচিত্তে আল্লাহকেই ডাকত; অথচ তিনি যেই মাত্র তাদেরকে স্থলে পৌঁছে দিয়ে শঙ্কামুক্ত করতেন, অমনি তারা আল্লাহর সঙ্গে শিরক করে বসত’ (সুরা আল-আনকাবুত, আয়াত: ৬৫)।
কুসংস্কার ও বিবিধ শিরক
আমাদের দেশের অনেক মানুষ নানারকম কুসংস্কারে আচ্ছন্ন। যেমন শনিবার বা মঙ্গলবারকে অশুভ মনে করা, নির্দিষ্ট পশু-পাখিকে অমঙ্গলজনক ভাবা ইত্যাদি। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কুলক্ষণে বিশ্বাস করা শিরক।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৬১৪)
একইভাবে তাবিজ, আংটি বা বিশেষ কোনো পাথরকে বিপদমুক্তির একমাত্র মাধ্যম মনে করা ছোট শিরক। আর এগুলো নিজেই কাজ করে বলে বিশ্বাস করা বড় শিরক। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ১৭৪৪১)
গোপন ছোট শিরক
যে শিরক অন্তরের মধ্যে ঘটে, তাকে গোপন শিরক বলা হয়। এটি হচ্ছে ‘রিয়া’ বা লোকদেখানো ইবাদত। যেমন—মানুষ দেখছে বলে নামাজ সুন্দর করা, প্রশংসা পাওয়ার জন্য দান করা বা সুনাম অর্জনের জন্য ধর্মীয় ইলম অর্জন করা।
রিয়া সম্পর্কে নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘আমি তোমাদের ব্যাপারে ছোট শিরক নিয়ে সবচেয়ে বেশি ভয় পাচ্ছি।’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, আল্লাহর রাসুল, ছোট শিরক কী? তিনি বললেন, ‘রিয়া’। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ২৩৬৮১)
তবে কিছু বিষয় রিয়ার অন্তর্ভুক্ত নয়। যেমন, সুন্দর পোশাক পরা, পাপ গোপন রাখা বা ভালো কাজের প্রশংসা শুনে আনন্দ পাওয়া।
বাঁচার উপায়
বড় শিরক ও ছোট শিরকের মধ্যে পার্থক্য হলো—বড় শিরক সব আমল নষ্ট করে এবং মানুষকে ইসলামের বাইরে নিয়ে যায়। অন্যদিকে ছোট শিরক নির্দিষ্ট আমলকে নষ্ট করে এবং বড় পাপের দিকে নিয়ে যায়। ছোট শিরক থেকে বাঁচার জন্য কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:
১. তাওহিদের সঠিক জ্ঞান অর্জন করা। ২. সব ইবাদত শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা। ৩. গোপনে বেশি বেশি আমল করার অভ্যাস করা। ৪. কথাবার্তায় সতর্ক হওয়া ও কুসংস্কার থেকে দূরে থাকা। ৫. শিরক থেকে বাঁচার জন্য বেশি বেশি দোয়া করা।
নবীজি (সা.) একটি দোয়ার শিক্ষা দিয়েছেন: ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযুবিকা আন উশরিকা বিকা শাইআন ওয়া আনা আলামু, ওয়া আসতাগফিরুকা লিমা লা আলামু।’ অর্থ: হে আল্লাহ, আমি জেনে-শুনে তোমার সঙ্গে শিরক করা থেকে আশ্রয় চাই এবং না বুঝে যা করি তার জন্য ক্ষমা চাই। (বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ৭১৬)
আল্লাহ–তাআলা আমাদের সব ধরনের শিরক থেকে বাঁচিয়ে রাখুন।
ইসমত আরা: শিক্ষক ও লেখক