ইতিহাস

যেমন ছিল আইয়ুবি যুগের মাদ্রাসা

ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবির সামরিক সাফল্য ইতিহাসের পরিচিত অধ্যায়। কিন্তু তাঁর শাসনামলে একই সঙ্গে যে শিক্ষা অভিযান চলছিল, তা নিয়ে আলোচনা তুলনামূলক কম।

মিসরে ফাতেমীয় শিয়া খেলাফতের দুই শ বছরের শাসনের পর সুন্নি ধারার পুনরুদ্ধার শুধু তরবারি দিয়ে সম্ভব ছিল না। দরকার ছিল এমন প্রতিষ্ঠান, যেখান থেকে বেরিয়ে আসবে নতুন প্রজন্মের আলেম, বিচারক ও প্রশাসক। এই উপলব্ধিই ছিল আইয়ুবি আমলের শিক্ষানীতির মূলে।

মিসরীয় ইতিহাসবিদ আল-মাকরিজি লিখেছেন, সালাহউদ্দিন ক্ষমতায় এসে কায়রো, আলেপ্পো ও দামেস্কে একের পর এক সুন্নি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি তাঁর পূর্ববর্তী সিরীয় শাসক নুরুদ্দিন জেনকির শিক্ষানীতি থেকে অনুপ্রাণিত ছিলেন। (তাকিউদ্দিন আল-মাকরিজি, আল-মাওয়াইজ ওয়াল ইতিবার বি-জিকরিল খিতাত ওয়াল আসার, ৪/৯২, আল-হাইয়াতুল মিসরিয়্যা, কায়রো)

এমনকি সালাহউদ্দিন আজহারে জুমার নামাজ ও শিয়া ধর্মীয় কার্যক্রম বন্ধ করে দেন। তাঁর মৃত্যুর সাত দশক পরে মামলুক সুলতান রুকনুদ্দিন বাইবার্স ৬৬৫ হিজরিতে আজহারকে পুনরায় সক্রিয় করেন এবং সুন্নি শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন। (জালালুদ্দিন আস-সুয়ুতি, হুসনুল মুহাদ্দারা ফি তারিখি মিসর ওয়াল কাহিরা, ২/১২, দারু ইহয়াইল কুতুবিল আরাবিয়্যা, কায়রো, ১৯৬৭)

মাদ্রাসার অর্থ আসত ফাইয়ুম অঞ্চলের ওয়াক্‌ফ করা কৃষিজমি থেকে। রাজকোষের মুখাপেক্ষী না হয়ে বরং শুধু সেই জমির গম বিক্রির আয়ে শিক্ষক-ছাত্রদের ভরণপোষণ চলত।

চার মাদ্রাসার গল্প

আইয়ুবি আমলে শুধু কায়রো আর ফুস্তাতে মিলিয়ে ২০টির বেশি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে মাকরিজির বিবরণে পাওয়া যায়, যদিও অধিকাংশই এখন আর নেই। এর মধ্যে ৪টি খুবই বিখ্যাত হয়ে ওঠে।

১. আল-মাদ্রাসাতুল কামহিয়্যা: ‘কামহুন’ শব্দের অর্থ গম। গমের সঙ্গে এই মাদ্রাসার ইতিহাস এমনভাবে জড়িত যে একে গমের মাদ্রাসা বলে নামকরণ করা হয়।

আমর ইবনুল আসের মসজিদের পাশে মালেকি মাজহাবের ফকিহদের জন্য প্রতিষ্ঠিত এই মাদ্রাসার অর্থ আসত ফাইয়ুম অঞ্চলের ওয়াক্‌ফ করা কৃষিজমি থেকে। রাজকোষের মুখাপেক্ষী না হয়ে বরং শুধু সেই জমির গম বিক্রির আয়ে শিক্ষক-ছাত্রদের ভরণপোষণ চলত।

মাদ্রাসাটির ঐতিহাসিক গুরুত্বের একটি প্রমাণ হলো মামলুক আমলে কায়রোতে আসার পর ইবনে খালদুনকে এই বিখ্যাত কামহিয়্যার প্রধান শাইখ পদে নিয়োগ দিয়েছিলেন সুলতান বারকুক। (ইবনে খালদুন, আত-তা‘রিফু বিইবনি খালদুন ওয়া রিহলাতুহু গারবান ওয়া শারকান, পৃষ্ঠা: ২৪২, কায়রো, ১৯৫১)

২. আল-মাদ্রাসাতুন নাসিরিয়্যাহ: ইমাম শাফেয়ির মাজারের পাশে শাফেয়ি ফিকহের জন্য প্রতিষ্ঠিত। এখানকার শিক্ষকরা সে যুগে প্রতি মাসে ৪০টি করে নগদ স্বর্ণমুদ্রা (দিনার) রাজকীয় ভাতা পেতেন।

৩. আল-মাদ্রাসাতুস সালাহিয়্যা: তখনকার সময়ে এটি অন্যতম সেরা মাদ্রাসা হিসেবে গণ্য হতো। জাঁকজমক ও সিলেবাসের গভীরতার কারণে ইমাম জালালুদ্দিন আস-সুয়ুতি এই মাদ্রাসাকে ‘তাজুল মাদারিস’ (সকল মাদ্রাসার মুকুট) বলে অভিহিত করেছেন। (আস-সুয়ুতি, হুসনুল মুহাদ্দারা, ২/২০)

৪. আল-মাদ্রাসাতুল ফাজেলিয়্যা: সালাহউদ্দিনের বিখ্যাত উজির কাজি আল-ফাদেল কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত। ইমাম শাতিবি (মৃ.৫৯৬ হি.) এই মাদ্রাসায় কোরআন ও তাজবিদ পড়াতেন আর তাঁর ক্লাসে ছাত্রদের ভিড় ছিল অসাধারণ। (ইবনুল জাজারি, গায়াতুন নিহায়া ফি তাবাকাতিল কুররা, ২/১৫, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত, ১৯৩২)

এই সিদ্ধান্তের পিছনে একটি রাজনৈতিক কারণও ছিল। চার মাজহাবের প্রতিটিকে সমান মর্যাদা দেওয়ার ফলে ধর্মীয় বিরোধের সুযোগ কমে আসে এবং সুন্নি একতার ভিত্তিও মজবুত হয়।

চার মাজহাব একই ছাদে

আইয়ুবি আমলের আগে প্রতিটি মাদ্রাসা সাধারণত একটি নির্দিষ্ট মাজহাবের জন্য নির্মিত হতো। কিন্তু ৬৩০ হিজরিতে (১২৩৩ খ্রি.) বাগদাদে আব্বাসীয় খলিফা মুসতানসির ‘মাদ্রাসা মুসতানসিরিয়্যা’ নির্মাণ করেন, যেখানে চার মাজহাব একসঙ্গে পড়ানো হতো।

এই ধারণা মিসরে আসে আইয়ুবি বংশের শেষ প্রভাবশালী সুলতান আল-মালিকুস সালেহ নাজমুদ্দিন আইয়ুবের হাত ধরে। ১২৪২-৪৩ খ্রিষ্টাব্দে (৬৩৯-৬৪১ হি.) কায়রোর বাইনাল কাসরাইন এলাকায়, ফাতেমীয় রাজপ্রাসাদের একটা অংশ ভেঙে, তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘আল-মাদ্রাসাতুস সালিহিয়্যা’, মিসরে প্রথম প্রতিষ্ঠান যেখানে হানাফি, মালেকি, শাফেয়ি ও হাম্বলি—চার মাজহাব একই ছাদের নিচে পড়ানো হতো, আলাদা চারটি ইওয়ান বা হলঘরে। (তারেক তুরকি, মাদ্রাসা অব আল-সালেহ, মিউজিয়াম উইথ নো ফ্রন্টিয়ার্স, ২০২৬)

এই সিদ্ধান্তের পিছনে একটি রাজনৈতিক কারণও ছিল। চার মাজহাবের প্রতিটিকে সমান মর্যাদা দেওয়ার ফলে ধর্মীয় বিরোধের সুযোগ কমে আসে এবং সুন্নি একতার ভিত্তিও মজবুত হয়। পরবর্তী যুগে মামলুক আমলে এই চার মাজহাবের আলাদা প্রধান বিচারক নিয়োগের প্রথা শুরু হয়।

এই মাদ্রাসার সবচেয়ে পরিচিত শিক্ষক ছিলেন ইমাম আল-ইজ্জুদ্দিন ইবনে আবদুস সালাম। দামেস্ক থেকে আসা যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আইনবিদ, যাঁকে সমকাল ‘সুলতানুল উলামা’ বলে সম্মান দিত। (জার্নাল অব আল-তামাদ্দুন, মালয়েশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ২০২৬)

‘ইজাজা’ দর্শন

সেকালে ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থায় ‘ডিগ্রি’র সমতুল্য ছিল ‘আল-ইজাজা’—আক্ষরিক অর্থে ‘অনুমতি’, অর্থাৎ পড়ানোর লাইসেন্স। কোনো ফরমাল পরীক্ষা ছিল না, তবে একজন শিক্ষকের পক্ষ থেকে ছাত্রের মেধা ও যোগ্যতার মৌখিক স্বীকৃতি থাকত, যা কখনো কখনো লিখিত নথিতেও লিপিবদ্ধ হতো।

আইয়ুবি শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল—রাজকোষের বাইরে ওয়াকফ্‌ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে এমন একটা স্বনির্ভর শিক্ষাকাঠামো গড়া, যা শাসক বদলালেও টিকে থাকতে পারে।

ইজাজার প্রথার দার্শনিক বার্তাটি ছিল—জ্ঞান সনদভিত্তিক নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে শিক্ষক থেকে ছাত্রের ভেতরে সঞ্চারিত হয়ে থাকে। এই ধারাবাহিকতা নিশ্চিত না হলে আলেমের মতামতের কোনো কর্তৃত্ব থাকে না।

প্রত্যেক আলেমকে জানতে হতো তিনি কার কাছ থেকে কী শিখেছেন এবং সেই শিক্ষাগুরুর পরম্পরা কোথায় গিয়ে শেষ হয়।

শেষ কথা

আইয়ুবি শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল—রাজকোষের বাইরে ওয়াকফ্‌ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে এমন একটা স্বনির্ভর শিক্ষাকাঠামো গড়া, যা শাসক বদলালেও টিকে থাকতে পারে।

সালাহউদ্দিনের মৃত্যুর পর তার বংশ আর পরে মামলুকেরা এই প্রতিষ্ঠানগুলো টিকিয়ে রেখেছিলেন, কারণ, ওয়াক্‌ফের আয় ছিল রাজনীতির বাইরে। কায়রো আজও আল-মুইজ সড়কে সালিহিয়্যার ধ্বংসাবশেষ বহন করে, একটা সুলতানের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও একটা শিক্ষাব্যবস্থার অসমাপ্ত কথোপকথনের স্মৃতি হিসেবে।