ইতিহাসের পাতায় ২১ রমজান দিনটি বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাক্ষী। এই দিনে একদিকে যেমন মধ্যযুগের অন্যতম শক্তিশালী মুসলিম সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতার জীবনাবসান ঘটে, অন্যদিকে সিরিয়ার পুণ্যভূমিতে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে বিজয় অর্জিত হয়।
৩ হিজরির ২১ রমজান ছিল হাসান ইবনে আলি (রা.)-এর জন্মের সপ্তম দিন। এই দিনে নবীজি (সা.) তাঁর নাতির পক্ষ থেকে আকিকা হিসেবে পশু জবাই করেন এবং তাঁর মাথার চুল কামিয়ে সেই চুলের ওজনের সমপরিমাণ রুপা সদকা করার নির্দেশ দেন। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ৪/৪০৫, ১৯৫৫)
জাহেলি যুগের নামকরণের রীতি বদলে তিনি নাতির নাম রাখেন ‘হাসান’। এই ঘটনাটি মুসলিম সমাজে নবজাতকের অধিকার এবং সামাজিক সংহতির এক অনন্য শিক্ষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে।
৭২৬ হিজরির ২১ রমজান (১৩২৬ খ্রিষ্টাব্দ) অটোমান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা প্রথম ওসমান ইন্তেকাল করেন। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১৪/১২৫, ১৯৮৮)
১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দে অর্থাৎ বাগদাদ পতনের বছরে জন্মগ্রহণ করা ওসমান তাঁর ক্ষুদ্র উপজাতিকে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করেছিলেন, যা পরবর্তী ৬০০ বছর ইসলামের পতাকা উড্ডীন রেখেছিল।
মৃত্যুর সময় তিনি পার্থিব কোনো সম্পদ রেখে যাননি; কেবল তাঁর তলোয়ার, ঘোড়া এবং বর্মটি উত্তরসূরিদের জন্য রেখে গিয়েছিলেন, যা আজও ‘ওসমানের তলোয়ার’ নামে সংরক্ষিত আছে।
৫৫৯ হিজরির ২১ রমজান (১১৬৪ খ্রিষ্টাব্দ) সিরিয়ার হারিম নামক স্থানে সুলতান নুরুদ্দিন মাহমুদ জেনকির নেতৃত্বাধীন মুসলিম বাহিনী ক্রুসেডারদের জোটকে পরাজিত করে। (ইবনে আসির, আল-কামিল ফিত তারিখ, ৯/১০০, ১৯৮৭)
সুলতান এক নিপুণ রণকৌশল ব্যবহার করে ক্রুসেডারদের অশ্বারোহী বাহিনীকে পদাতিক বাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন।
এই যুদ্ধে প্রায় ১০ হাজার ক্রুসেডার নিহত হয় এবং ত্রিপোলি ও এন্টিওকের লর্ডরা বন্দি হন। এই বিজয় জেরুসালেম পুনরুদ্ধারের পথ অনেকখানি প্রশস্ত করে।
আধুনিক ইতিহাসে ১৩৫৬ হিজরির ২১ রমজান (১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দ) ফিলিস্তিনিদের জন্য শোকাবহ দিন। এই দিনে ব্রিটিশ দখলদার বাহিনী ৭৭ বছর বয়সী বৃদ্ধ যোদ্ধা শেখ ফারহান আল-সাদিকে ফাঁসি দেয়।
শেখ ইজ্জুদ্দিন আল–কাসসামের এই সহযোদ্ধা রমজানে রোজা রাখা অবস্থায় হাসিমুখে ফাঁসির দড়ি গলায় পরেন। তাঁর এই শাহাদত ফিলিস্তিনের ‘গ্রেট আরব রিভোল্ট’ বা মহান বিপ্লবের আগুনে ঘৃতাহুতি দিয়েছিল।
২৭৩ হিজরির ২১ রমজান ইন্তেকাল করেন হাদিস শাস্ত্রের অনন্য নক্ষত্র ইমাম ইবনে মাজাহ (র.)। তাঁর সংকলিত ‘সুনানে ইবনে মাজাহ’ হাদিসের প্রধান ছয়টি কিতাবের (সিহাহ সিত্তাহ) অন্যতম। (ইমাম জাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১৩/২৭৭, ১৯৮৫)
আবার ১২৭৫ হিজরির (১৮৫৯ খ্রিষ্টাব্দ) এই দিনে মিসরের সুয়েজ খাল খননের প্রাথমিক কাজ শুরু হয়। এই প্রকল্পটি বিশ্ব বাণিজ্য ও ভূ-রাজনীতির মানচিত্র বদলে দিয়েছিল, যা প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের মধ্যে যোগাযোগের নতুন পথ খুলে দেয়।