আরব মরুভূমির তপ্ত বালুকারাশিতে একদিন এক জান্নাতি সুসংবাদ প্রতিধ্বনিত হয়েছিল।
সহিহ বুখারির একটি বর্ণনায় এসেছে, নবীজিকে একবার রেশমের তৈরি অত্যন্ত চমৎকার ও কোমল একটি জুব্বা উপহার দেওয়া হয়। সাহাবিরা সেটি হাতে নিয়ে এর মসৃণতা ও কারুকার্য দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়লেন।
তাঁদের চোখেমুখে যখন সেই পার্থিব বিলাসিতার প্রতি মুগ্ধতা, তখন নবীজি (সা.) স্মিত হাস্যে এক চিরন্তন সত্য উন্মোচন করলেন।
তিনি বললেন, “তোমরা কি এর কোমলতা দেখে অবাক হচ্ছ? জান্নাতে সা’দ ইবনে মুআজের রুমালগুলো এর চেয়েও উত্তম এবং অধিকতর কোমল।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৮০২)
অর্থাৎ, এই ‘রুমাল’ কেবল এক টুকরো কাপড় নয়; এটি হলো সেই অমর বীরত্বের স্বীকৃতি, যা অর্জন করতে সা’দ ইবনে মাআজকে পাড়ি দিতে হয়েছিল ত্যাগ ও ইমানের অগ্নিপরীক্ষা।
মাত্র ৩৬ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবন, যার মধ্যে ইসলামের ছায়াতলে ছিলেন মাত্র ছয়টি বছর। কিন্তু এই অল্প সময়েই তিনি ইতিহাসের পাতায় এমন এক অক্ষয় পদচিহ্ন এঁকে গেছেন, যার বিদায়বেলায় মহান আল্লাহর আরশ পর্যন্ত কেঁপে উঠেছিল।
মদিনার ইতিহাসে আউস ও খাজরাজ গোত্রের ইসলাম গ্রহণ ছিল এক বিস্ময়কর বাঁক। বর্তমান যুগে অনেকে জাপানিদের নিয়মনিষ্ঠা দেখে মুগ্ধ হয়ে তাদের ‘অন্য গ্রহের মানুষ’ বলে অভিহিত করেন।
কিন্তু চৌদ্দশ বছর আগে মদিনার ‘আনসার’ সম্প্রদায় ভ্রাতৃত্ব ও সংহতির যে অনন্য নজির স্থাপন করেছিল, তা আজও মানব সভ্যতার জন্য এক পরম বিস্ময়। সা’দ ইবনে মুআজ (রা.) ছিলেন সেই আনসারদের অবিসংবাদিত নেতা ও প্রধান স্তম্ভ।
মক্কী জীবনের দুঃসময়ে মুসআব ইবনে উমাইর (রা.)-এর দাওয়াতে তিনি যখন ইসলাম গ্রহণ করেন, তখন তিনি নিজ গোত্র ‘বনু আবদিল আশহালে’র কাছে ফিরে গিয়ে এক ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন, “যতক্ষণ তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ওপর ইমান না আনবে, ততক্ষণ তোমাদের নারী-পুরুষের সঙ্গে কথা বলা আমার জন্য হারাম।” (ইবনে আসির, উসদুল গাবাহ ফি মারিফাতিস সাহাবাহ, ২/৪৫০, দারুল কুতুবিল ইলমিয়াহ, বৈরুত)
একজন নেতার ব্যক্তিত্ব ও আদর্শ কতটুকু প্রভাবশালী হতে পারে, তার প্রমাণ মিলল সেই সন্ধ্যায়। সূর্যাস্তের আগেই তাঁর পুরো গোত্র ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নিল।
বদর যুদ্ধের প্রাক্কালে মুসলিম বাহিনী যখন এক অসম লড়াইয়ের মুখোমুখি, তখন নবীজি (সা.) আনসারদের মনোভাভ জানতে চাইলেন। কারণ, আকাবার চুক্তিতে তাঁরা কেবল মদিনার ভেতরে সুরক্ষার অঙ্গীকার করেছিলেন। সেই সন্ধিক্ষণে সা’দ ইবনে মুআজ (রা.) দাঁড়িয়ে যে তেজস্বী ভাষণ দিয়েছিলেন, তা আজও মুমিনের হৃদয়ে শিহরণ জাগায়।
তিনি বলেছিলেন, “হে আল্লাহর রাসুল, আমরা আপনার ওপর ইমান এনেছি এবং আপনাকে সত্য বলে সাক্ষ্য দিয়েছি। আপনি যদি আমাদের নিয়ে উত্তাল সাগরেও ঝাঁপ দিতে বলেন, তবে আমরা তা-ই করব। আমাদের একজন লোকও পেছনে থাকবে না। আমরা যুদ্ধে অবিচল এবং শত্রুর মোকাবিলায় সত্যবাদী। আপনি আল্লাহর নামে আমাদের নিয়ে যাত্রা করুন।” (ইবনে হিশাম, আস-সিরাত আন-নাবাবিয়্যাহ, ২/২০০, মোস্তফা আল-বাবি আল-হালাবি, মিসর)
সা’দের এই শপথ নবীজিকে কেবল আশ্বস্ত করেনি, বরং তা ক্ষুদ্র মুসলিম বাহিনীকে এক অপরাজেয় শক্তিতে পরিণত করেছিল।
পঞ্চম হিজরিতে খন্দকের যুদ্ধে যখন সম্মিলিত শত্রু বাহিনী মদিনা ঘিরে ফেলল, তখন মদিনার ভেতর থাকা ইহুদি গোত্র বনু কোরাইজা ইহুদিরা বিশ্বাসঘাতকতা শুরু করে। এটি ছিল ইসলামের অস্তিত্ব রক্ষার এক কঠিন সময়।
সেই যুদ্ধে শত্রুর তিরের আঘাতে সা’দ (রা.) গুরুতর আহত হন। তাঁর ধমনি কেটে রক্ত ঝরছিল। তিনি দোয়া করেছিলেন, “হে আল্লাহ, বনু কোরাইজার বিশ্বাসঘাতকতার বিচার দেখার আগে তুমি আমাকে মৃত্যু দিও না।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪১২১)
পরে বনু কোরাইজা আত্মসমর্পণ করলে তারা সা’দ ইবনে মুআজকেই বিচারক হিসেবে মেনে নেয়। কারণ জাহেলি যুগে সা’দের গোত্রের সঙ্গে তাদের মিত্রতা ছিল। তারা ভেবেছিল সা’দ হয়তো পুরনো সম্পর্কের খাতিরে নমনীয় হবেন।
কিন্তু সা’দ (রা.) ব্যক্তিগত আবেগ ও সম্পর্কের ঊর্ধ্বে উঠে রায় দিলেন। রায় শুনে নবীজি (সা.) বলেছিলেন, “সা’দ আজ সেই ফয়সালাই করেছে, যা সাত আসমানের ওপর থেকে স্বয়ং আল্লাহ নির্ধারণ করেছিলেন।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৮০৪)
যুদ্ধের সেই ক্ষত থেকেই সা’দ (রা.) শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করেন। তাঁর জানাজায় সত্তর হাজার ফেরেশতা শরিক হয়েছিল বলে বর্ণনা পাওয়া যায়। নবীজি (সা.) অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ঘোষণা করেছিলেন, “সা’দ ইবনে মুআজের মৃত্যুতে আল্লাহর আরশ কেঁপে উঠেছে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৮০৩)
দুনিয়ার যে রেশমি সুতা দেখে সাহাবিরা অবাক হয়েছিলেন, তার চেয়ে সা’দের জান্নাতি রুমাল কেন বেশি মূল্যবান, তার উত্তর লুকিয়ে আছে তাঁর এই অটল সিদক বা সত্যবাদিতায়।
তিনি শিখিয়ে গেছেন, ইমান মানে কেবল মুখে স্বীকারোক্তি নয়, বরং প্রয়োজনে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে সত্যের পক্ষে পাহাড়ের মতো অটল থাকা।
সা’দ ইবনে মুআজের জীবন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, জীবনের দৈর্ঘ্য নয়, বরং জীবনের গভীরতাই আসল।
মাত্র ছয় বছরের ইসলামি জীবনে তিনি যা অর্জন করেছেন, তা হাজার বছরের ইবাদতের চেয়েও ভারী হতে পারে যদি তাতে থাকে সা’দের মতো নিখাদ আন্তরিকতা।
আজকের এই ডামাডোলের যুগে সা’দ ইবনে মুআজ আমাদের সেই আদর্শ, যিনি ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতির চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে বড় করে দেখেছিলেন।