কোরআনের কোনো বিধান পরিবর্তন বা রহিত হওয়াকে ইসলামি পরিভাষায় ‘নাসখ’ বলা হয়। ইসলামের ইতিহাসে এই বিষয়টি নিয়ে মক্কার মুশরিকরা ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টির চেষ্টা করেছিল।
তাদের মূল লক্ষ্য ছিল ওহির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুয়তকে বিতর্কিত করা। সুরা নাহলের ১০১ ও ১০২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ কাফেরদের এসব সংশয়ের জবাব দিয়েছেন এবং ওহির পবিত্রতা রক্ষা করেছেন।
মুশরিকদের অভিযোগ
মক্কার কাফেররা দাবি করত, মুহাম্মদ (সা.) তাঁর সাহাবিদের নিয়ে উপহাস করছেন। আজ তিনি একটি আদেশ দিচ্ছেন, আবার কাল তা নিষেধ করছেন।
তাদের ভাষ্যমতে, কোরআনের এই পরিবর্তন আল্লাহর পক্ষ থেকে নয়, বরং এটি নবীর নিজের বানানো কথা। মূলত এই প্রেক্ষাপটেই আল্লাহ-তাআলা আয়াত নাজিল করে নবীজির অবস্থান পরিষ্কার করেন।
আল্লাহ বলেন, ‘আর যখন আমি এক আয়াতের বদলে অন্য আয়াত উপস্থিত করি—আর আল্লাহ যা নাজিল করেন, সে সম্পর্কে তিনিই ভালো জানেন—তখন তারা বলে, আপনি তো কেবল একজন মিথ্যা রচনাকারী। আসলে তাদের অধিকাংশই জানে না।’ (সুরা নাহল, আয়াত: ১০১)
আর যখন আমি এক আয়াতের বদলে অন্য আয়াত উপস্থিত করি—আর আল্লাহ যা নাজিল করেন, সে সম্পর্কে তিনিই ভালো জানেন—তখন তারা বলে, আপনি তো কেবল একজন মিথ্যা রচনাকারী। আসলে তাদের অধিকাংশই জানে না।কোরআন, সুরা নাহল, আয়াত: ১০১
১. বিধান পরিবর্তন: আয়াতে ‘এক আয়াতের বদলে অন্য আয়াত’ আসার অর্থ হলো পূর্ববর্তী কোনো বিধান রহিত করে নতুন বিধান দেওয়া।
অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, এখানে কোরআনের আয়াতের কথাই বলা হয়েছে। (ইবনে কাসির, তাফসিরু কুরআনিল আজিম, ৪/৬০৩, দারু তাইয়িবাহ, রিয়াদ, ১৯৯৯)
২. আল্লাহর জ্ঞান: আয়াতে বলা হয়েছে—আল্লাহ যা নাজিল করেন, তা তিনিই ভালো জানেন।
অর্থাৎ মানুষের জন্য কখন কোন বিধান বেশি কল্যাণকর, তা কেবল মহান রবই জানেন। আল্লাহর প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে গভীর প্রজ্ঞা ও যুক্তি থাকে, যা সাধারণ মানুষের পক্ষে সবসময় বোঝা সম্ভব নয়।
৩. মুশরিকদের অজ্ঞতা: কাফেররা যখন নবীজিকে ‘মিথ্যা রচনাকারী’ অপবাদ দিচ্ছিল, তখন আল্লাহ তাদের ‘অজ্ঞ’ বলে অভিহিত করেছেন।
আল্লাহ বলছেন, তাদের অধিকাংশই জানে না যে কেন বিধানের পরিবর্তন ঘটে। তবে তাদের মধ্যে সামান্য কিছু লোক সত্য জানলেও কেবল অহংকার ও হিংসার বশবর্তী হয়ে তা অস্বীকার করত।
কোরআনের বিধান পরিবর্তন হওয়া মানে এই নয় যে আল্লাহ তাঁর সিদ্ধান্ত পাল্টাচ্ছেন, বরং এটি হলো মানবজাতির ক্রমবিকাশ ও পরিস্থিতির প্রয়োজনে আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত।
নবীজির প্রতিরক্ষা
কাফেরদের অপবাদের জবাবে আল্লাহ নবীজিকে শিখিয়ে দিলেন কী বলতে হবে।
পরের আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘বলুন, একে রুহুল কুদুস আপনার রবের পক্ষ থেকে সত্যসহ নাজিল করেছেন, যাতে ইমানদারদের সুদৃঢ় করেন এবং এটি মুসলমানদের জন্য পথনির্দেশ ও সুসংবাদ।’ (সুরা নাহল, আয়াত: ১০২)।
এখানে ‘রুহুল কুদুস’ বা পবিত্র আত্মা বলতে ফেরেশতা জিবরাইল (আ.)-কে বোঝানো হয়েছে। এর মাধ্যমে পরিষ্কার করা হয়েছে যে, কোরআনের কোনো কথা নবীজি নিজের থেকে বলেন না; বরং জিবরাইল (আ.) আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী তা নিয়ে আসেন।
এই ওহি অবতীর্ণ হওয়ার উদ্দেশ্য হলো মুমিনদের বিশ্বাসকে আরও মজবুত করা এবং তাদের সঠিক পথের দিশা দেওয়া।
আস্থার সংকট দূর করা
সুরা নাহলের এই আয়াতগুলো কেবল তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং এটি নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর উচ্চ মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠিত করে। ‘আপনার রব’ সম্বোধনের মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর প্রিয় নবীকে বিশেষ সম্মান দিয়েছেন।
কোরআনের বিধান পরিবর্তন হওয়া মানে এই নয় যে আল্লাহ তাঁর সিদ্ধান্ত পাল্টাচ্ছেন, বরং এটি হলো মানবজাতির ক্রমবিকাশ ও পরিস্থিতির প্রয়োজনে আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত।