অজু শুরুর আগে ‘বিসমিল্লাহ’ বলা বা আল্লাহর নাম স্মরণ করা নিয়ে মুসলিম উম্মাহর ফকিহদের মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে তাত্ত্বিক আলোচনা ও মতভেদ চলে আসছে। অজুর শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা কি বাধ্যতামূলক (ওয়াজিব), নাকি এটি কেবল একটি পছন্দনীয় আমল (সুন্নত)?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে প্রখ্যাত শরিয়ত বিশেষজ্ঞগণ হাদিসের মানদণ্ড ও উসুলে ফিকহ বা ইসলামি আইনশাস্ত্রের মূলনীতিগুলো বিশ্লেষণ করেছেন।
অজুর শুরুতে বিসমিল্লাহ পাঠের বিষয়ে আলেমদের মধ্যে প্রধানত দুটি মত পাওয়া যায়।
একদল আলেম এটিকে ওয়াজিব বা আবশ্যক মনে করেন। তাঁদের প্রধান দলিল হলো আবু হোরাইরা (রা.) বর্ণিত একটি হাদিস, যেখানে মহানবী (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি (অজুর শুরুতে) আল্লাহর নাম নেয়নি, তার অজু হয়নি।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১০১)
প্রাচীন হাদিস বিশারদদের একটি বড় অংশ এর সনদ বা সূত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ ফকিহদের মতে, অজুর শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা সুন্নত, ওয়াজিব নয়। তাঁদের যুক্তি হলো,
১. পবিত্র কোরআনে অজুর বর্ণনায় আল্লাহ–তাআলা বিসমিল্লাহ বলার নির্দেশ দেননি। অথচ পশু জবাই করার ক্ষেত্রে আল্লাহ স্পষ্টভাবে বিসমিল্লাহর কথা উল্লেখ করেছেন এবং তা না বললে সেই গোশত খাওয়া নিষেধ করেছেন। (সুরা আনআম, আয়াত: ১১৮-১২১)
যদি অজুর ক্ষেত্রে এটি ওয়াজিব হতো, তবে আল্লাহ অবশ্যই তা উল্লেখ করতেন।
২. বুখারি-মুসলিমের মতো বিশুদ্ধ হাদসি গ্রন্থে অজুর পদ্ধতির বর্ণনায় কোনো সাহাবিই মহানবী (সা.) অজুর শুরুতে বিসমিল্লাহ পড়তেন বলে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেননি।
যাঁরা বিসমিল্লাহ বলাকে ওয়াজিব মনে করেন না, তাঁরা হাদিসের “লা অজুয়া” (অজু হয়নি) অংশটিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেন।
ইসলামি আইনশাস্ত্রের একটি মূলনীতি হলো—কোনো কাজে যখন ‘না’ সূচক শব্দ ব্যবহার করা হয়, তখন যদি তা ওই কাজের মৌলিক অস্তিত্বকে নাকচ করতে না পারে, তবে ধরে নিতে হবে এটি ওই কাজের ‘পূর্ণতা’ বা ‘কামালিয়াত’কে নাকচ করছে।
যেমন মহানবী (সা.) বলেছেন, “যার আমানতদারি নেই, তার ইমান নেই।” (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ১২৩৮৭)
এখানে ইমান নেই বলতে ‘পূর্ণাঙ্গ ইমান নেই’ বোঝানো হয়েছে। ঠিক তেমনি অজুর ক্ষেত্রে বিসমিল্লাহ না বললে অজু একেবারে বাতিল হয়ে যায় না, বরং তা ‘পূর্ণাঙ্গ অজু’ হিসেবে গণ্য হয় না (মুহাম্মদ আল-শানকিতি, শারহু জাদিল মুস্তাকনি, ১/২৪-২৬, মাকতাবাতুল উলুম ওয়াল হিকাম, মদিনা: ১৯৯৯)
একটি হাদিসে বিষয়টিকে আরও পরিষ্কার করা হয়েছে, “যে ব্যক্তি অজু করার সময় আল্লাহর নাম নিল, তার পুরো শরীর পবিত্র হয়ে গেল। আর যে আল্লাহর নাম নিল না, কেবল তার অজুর অঙ্গগুলোই পবিত্র হলো।” (আল-মুজামুস সাগির, হাদিস: ৭৬২)
সুতরাং অজুর পূর্ণাঙ্গ সওয়াব ও বরকত লাভের জন্য শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা জরুরি। তবে কেউ যদি ভুলবশত বা অবহেলায় তা ছেড়ে দেয়, তবুও সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমের মতে তার অজু হয়ে যাবে এবং তার মাধ্যমে নামাজ পড়া বৈধ হবে।