‘নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন: সংসদে কার্যকর প্রতিনিধিত্ব ও ডিজিটাল নিরাপত্তা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা
‘নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন: সংসদে কার্যকর প্রতিনিধিত্ব ও ডিজিটাল নিরাপত্তা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা

নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন: সংসদে কার্যকর প্রতিনিধিত্ব ও ডিজিটাল নিরাপত্তা

ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল ও প্রথম আলোর উদ্যোগে ‘নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন: সংসদে কার্যকর প্রতিনিধিত্ব ও ডিজিটাল নিরাপত্তা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ১৪ মার্চ ২০২৬ ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে।

অংশগ্রহণকারী:

মওদুদ হোসেন আলমগীর

আহবায়ক, বিএনপি মিডিয়া সেল

এহসানুল মাহবুব জুবায়ের

সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী

মনিরা শারমিন

আহ্বায়ক, জাতীয় নারীশক্তি ও যুগ্ম আহ্বায়ক, এনসিপি

তাসনিম জারা

স্বতন্ত্র প্রতিদ্বন্ধী, ঢাকা ৯ আসন

রাশেদা বেগম

প্রশিক্ষণ সম্পাদক, বিএনপি

মারদিয়া মমতাজ

সদস্য, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী

নিলোফার চৌধুরী

স্বনির্ভর বিষয়ক সহসম্পাদক, বিএনপি

তাজনূভা জাবীন

সংগঠক, অলটারনেটিভস

শামীমা পারভীন

এআইজি, বাংলাদেশ পুলিশ

ক্যাথরিন সিসিল

চিফ অব পার্টি, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ

আমিনুল এহসান

ডেপুটি চিফ অব পার্টি, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ

লিপিকা বিশ্বাস

সিনিয়র ডিরেক্টর, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ

জুলকার নাইন

গবেষণা সমন্বয়কারী, ফ্যাক্টসওয়াচ

সঞ্চালনা:

ফিরোজ চৌধুরী

সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো

আলোচনা

মওদুদ হোসেন আলমগীর

আহ্বায়ক, বিএনপির মিডিয়া সেল

আমাদের নারী নেতৃত্বের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিয়ে কথা বলতে গেলে আগে রাজনৈতিক সংস্কৃতিটা বোঝা দরকার। দীর্ঘ সময় ধরে সমাজে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে রাজনীতির নিয়ামক শক্তি মূলত পুরুষের হাতেই থাকবে। ফলে নেতৃত্বের জায়গাটিকে অনেক সময় পুরুষের দায়িত্ব হিসেবেই দেখা হয়েছে।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতাও সহজ ছিল না। দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সংঘাত, নির্যাতন ও কদর্যতার যে পরিবেশ ছিল, সেখানে অনেক পরিবারই তাদের নারী সদস্যদের রাজনীতিতে পাঠাতে দ্বিধা বোধ করেছে। তবু আমাদের সমাজে এমন কিছু নারী নেত্রী উঠে এসেছেন, যাঁরা প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হয়ে দাঁড়িয়েছেন।

এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—নারীকে কেবল ‘নারী’ হিসেবে নয়, নাগরিক হিসেবে দেখা দরকার। কারণ, প্রতিটি আলোচনাকে যদি কেবল নারী–পুরুষের বিভাজনে সীমাবদ্ধ করা হয়, তাহলে সেখানে অনুকম্পা বা করুণার প্রত্যাশা তৈরি হয়। বরং নাগরিক হিসেবে সমান অধিকার ও সুযোগের দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা প্রয়োজন।

যখন কোনো দল নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়, তখন অনেক সময় প্রতিদ্বন্দ্বী পুরুষ প্রার্থী ধরে নেন যে তাঁর জয়ের সম্ভাবনা বেড়ে গেছে। ফলে রাজনৈতিক মাঠ তৈরি করাটাই নারী নেত্রীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে একজন প্রার্থীর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত দক্ষতা কিংবা সংসদে গিয়ে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারবেন কি না—এসব বিষয় বিবেচনায় আনা দরকার। সংসদ সদস্য মানেই সব বিষয়ে সমানভাবে দক্ষ হবেন—এমন নয়; বরং নীতি নির্ধারণে তাঁর বিশেষজ্ঞতার ক্ষেত্র স্পষ্ট থাকলে তা রাষ্ট্রের জন্যই উপকারী।

এহসানুল মাহবুব জুবায়ের

সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী

আমাদের রাষ্ট্রের প্রায় ৫৫ বছর হয়েছে। এর মধ্যে ১৯৯১ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ৩২-৩৩ বছর দুজন নারী এ দেশের নেতৃত্বে ছিলেন। তাঁরা সরকারপ্রধান ছিলেন, সংসদে প্রধান ছিলেন এবং দলীয় প্রধান ছিলেন। তাঁরা সুপার পাওয়ার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ এক্সিকিউটিভ দায়িত্ব হোল্ড করেছেন। আমরা যে বিদ্যমান কাঠামোর মধ্য থেকে আলোচনা করছি, তাতে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। নারীশিক্ষা বেড়েছে, রাজনৈতিক সচেতনতা বেড়েছে, কিন্তু এরপরও কেন সহিংসতা হচ্ছে? শক্তিশালী দুই নারী নেত্রীর হাতে অনেক সুযোগ ছিল। কিন্তু আজকের এ সমস্যাগুলো সমাধানের ক্ষেত্রে তাঁদের ভূমিকা কী ছিল, তা নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত। আমরা ঘুরেফিরে আজকেও সেই আসন আর ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলছি।

যখন একটা দলের নারীর ওপর আঘাত আসে, অন্য দলগুলো তখন চুপ থাকে, কারণ সে অন্য দলের নারী। এই মানসিকতা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। আমরা সুশিক্ষা পাইনি বরং কুশিক্ষা পেয়েছি, যার ফলে সমস্যাগুলোর গভীরতা দিন দিন বাড়ছে। এই মানসিকতা থেকে রাজনীতিবিদদের বেরিয়ে আসতে হবে।

কেন নারীদের অংশগ্রহণ কম, সে বিষয়ে দলগুলোকে স্পষ্ট হতে হবে। নারী-পুরুষের সম্মিলিত পরামর্শের ভিত্তিতে এই সমস্যাগুলোর সমাধান করতে হবে। সংসদের এই কাঠামোয় পরিবর্তন না আনলে সমস্যার সমাধান হবে না। আমাদের নির্বাচনী সিস্টেমের মধ্যে ত্রুটি আছে। জাতীয় সংসদ সদস্য সুপার পাওয়ার হয়ে ওঠেন এবং এলাকার সব উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের হর্তাকর্তা হন। অথচ স্থানীয় উন্নয়ন দেখবে স্থানীয় সরকার। জাতীয় সংসদ হওয়া উচিত জাতীয় সমস্যাকেন্দ্রিক সমাধানের জায়গা। সংসদ সদস্যদের স্থানীয়ভাবে উন্নয়নের কোনো ভূমিকা না থাকলে একজন নারী সেখানে চমৎকার মেধার স্বাক্ষর রাখতে পারবেন।

মনিরা শারমিন

আহ্বায়ক, জাতীয় নারীশক্তি ও যুগ্ম আহ্বায়ক, এনসিপি

আমি এমন একটি ফোরামে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছি, যেখানে ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় দেশের বড় দুটি রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী পুরুষ রাজনীতিবিদেরা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে যখন নারীদের জন্য ১০০টি আসনে সরাসরি নির্বাচনের বিষয়টি ওঠে, তখন তাঁদের মনোভাব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। দুঃখজনকভাবে দেখেছি, অন্য অনেক বিষয়ে জাতীয় ঐক্য না থাকলেও এই একটি বিষয়ে তাঁরা প্রায় একমত—নারীরা যেন ১০০ আসনে সরাসরি নির্বাচনের জন্য উপযুক্ত নন।

আমরা যদি ইতিহাসের দিকে তাকাই, দেখি সংরক্ষিত নারী আসনের সূচনা ১৯৭২ সালে ১৫টি আসন দিয়ে। পরে ধাপে ধাপে তা ৩০, ৪৫ হয়ে ২০১১ সালে ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে ৫০টিতে উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে এই সংরক্ষিত আসনই এখন বাস্তবতা। কিন্তু আন্দোলন ও সংগ্রামে নারীর ভূমিকা স্বীকৃত হলেও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে দলগুলোর কার্পণ্য স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে।

এই সংরক্ষিত আসনকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা গেলে এটি নারীদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হতে পারে। কিন্তু সেটি হতে হলে এই আসনগুলো যেন আত্মীয়স্বজনের মধ্যে ভাগাভাগি না হয়। বরং তৃণমূল থেকে উঠে আসা, দীর্ঘদিন দলীয় রাজনীতিতে কাজ করা যোগ্য নারীদের সুযোগ দিতে হবে।

নারী নেত্রীদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল হয়রানিও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। আমার নিজের একটি অভিজ্ঞতায় দেখেছি, একটি রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার একটি ছবি নিয়ে ব্যাপক অনলাইন আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে। পরে দলের একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি আমাকে অনেকটা শক্তি জুগিয়েছিল।

তাসনিম জারা

স্বতন্ত্র প্রতিদ্বন্দ্বী, ঢাকা ৯ আসন

নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণের সংখ্যা বাড়লেও তা সব সময় সরাসরি ক্ষমতায়ন বা নীতি নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা নিশ্চিত করে না। সংরক্ষিত নারী আসন নারীদের রাজনৈতিক উপস্থিতি নিশ্চিত করলেও অনেক ক্ষেত্রে তা জবাবদিহি বা প্রকৃত ক্ষমতায়ন তৈরি করতে পারে না। সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায়ন তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর; তবে সেখানে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও নারীরা নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হন। বিশেষ করে মনোনয়নপ্রক্রিয়ায় নারীদের ভূমিকা কম এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে পুরুষের প্রাধান্য স্পষ্ট। এ পরিস্থিতিতে আমি দুটি বিষয়কে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। প্রথমত, রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে স্বচ্ছ মনোনয়নপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে এবং নারী প্রার্থীদের নীতি নির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, স্বতন্ত্র নারী প্রার্থীদের জন্য আর্থিক, সাংগঠনিক ও নেটওয়ার্কভিত্তিক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ, দলের বাইরে অবস্থান তাঁদের জন্য অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। রাজনৈতিক অর্থায়নে নারীদের সীমিত প্রবেশাধিকার এবং দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের ঘাটতিও তাঁদের ক্ষমতায়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

এ ছাড়া আমি মনে করি, ডিজিটাল মাধ্যমে নারীর প্রতি সহিংসতা ও প্রতিহিংসামূলক আক্রমণ উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। সাইবার বুলিং, যৌন হয়রানি এবং ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার প্রায়ই নারীদের রাজনৈতিক ও জনজীবনে অংশগ্রহণ নিরুৎসাহিত করে। তাই রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত এ ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং সাইবার নিরাপত্তা, প্ল্যাটফর্ম সুরক্ষা ও ভিকটিম সাপোর্ট ব্যবস্থা জোরদার করা। ডিজিটাল পরিসর নারীদের জন্য নিরাপদ হলে তারা নিজেদের মতামত, নেতৃত্ব এবং জনস্বার্থের বিষয়গুলো আরও দৃঢ়ভাবে প্রকাশ করতে পারবেন।

রাশেদা বেগম

প্রশিক্ষণ সম্পাদক, বিএনপি

নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের চেয়ে ভিন্ন। এটি ক্ষমতার কেন্দ্রে গিয়ে নিজের মঙ্গলের জন্য ‘পাওয়ার এক্সারসাইজ’ করার সুযোগ। দেশের ভোটারের অর্ধেক নারী হলেও তাঁদের ওপর ঘটে যাওয়া অত্যাচার ও অনিরাপদ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাঁদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এখন অপরিহার্য। সমাজের সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ায় পরিবারগুলো ছেলের চেয়ে মেয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। তবু রাজনীতিতে পুরুষ নেতৃত্ব প্রায়ই ‘জেন্ডার ব্লাইন্ড’, কেবল নামমাত্র সুবিধা দিয়ে দায়িত্বের বোঝা কমাতে চায়। নির্বাচন কমিশনের ৩৩ শতাংশ নারী কোটার আইনও রাজনৈতিক দলগুলোয় পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। তাই জেলা কমিটিতে সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক বা সাংগঠনিক সম্পাদক পদে অন্তত একজন নারী রাখা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।

সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে মানুষের সমর্থন ও গ্রহণযোগ্যতা তৈরি অত্যন্ত জরুরি। দুইবারের সংসদ সদস্য হিসেবে আমার নিজের এলাকায় প্রায় ১৫ কোটি টাকা উন্নয়নে খরচ করেছি, মানুষকে আস্থা প্রদর্শনের জন্য। কিন্তু জয়ের সম্ভাবনা বাড়লে পুরুষ প্রার্থীরা নারীদের স্থান দিতে চান না, যোগ্যদের শান্ত থাকার পরামর্শ দিয়ে মনোনয়ন দেওয়া হয়। তাই শুধু ‘প্র্যাকটিক্যাল নিড’ নয়, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অবস্থান নিশ্চিত করতে ‘স্ট্র্যাটেজিক জেন্ডার নিড’ পূরণ করতে হবে।

সংসদে সংরক্ষিত আসনে মনোনয়নের ক্ষেত্রে ১৭ বছর ধরে দলের সঙ্গে যুক্ত ও অত্যাচারের শিকার নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। যাঁরা দলের জন্য কারাবরণ বা পারিবারিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন, তাঁদের মূল্যায়ন প্রয়োজন। সংরক্ষিত আসনে পেশাদার ও বিশেষজ্ঞ নারীদের অন্তর্ভুক্ত করলে সংসদের কাজের মান বাড়বে।

মারদিয়া মমতাজ

সদস্য, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী

নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন শুধু কোটার মাধ্যমে সীমাবদ্ধ নয়; এটি নারীর রাজনৈতিক সক্ষমতা, এজেন্সি ও সক্রিয় অংশগ্রহণ গড়ে তোলার একটি প্রক্রিয়া। সংরক্ষিত আসনের উদ্দেশ্য নারীদের রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা প্রকাশের সুযোগ তৈরি করা, সংসদ ও দলীয় কার্যক্রম বোঝার অভিজ্ঞতা অর্জন করা এবং সামাজিক বাধা অতিক্রম করার সক্ষমতা তৈরি করা। এর লক্ষ্য স্থায়ী নির্ভরতা নয়; বরং নারীদের ধীরে ধীরে স্বয়ংসম্পূর্ণ নেতৃত্বের অবস্থানে পৌঁছাতে সহায়তা করা।

নারীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত আগ্রহী নারী নেতাদের আবেদনপত্র ও বায়োডাটা সংগ্রহ এবং প্রক্রিয়াটি তদারকির জন্য একজন স্বাধীন তৃতীয় পক্ষকে যুক্ত করা। এতে মনোনয়নের প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি ও বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়বে। মনোনয়নের ক্ষেত্রে নারীদের নিজ আগ্রহ ও যোগ্যতার ভিত্তিতে আবেদন করার সুযোগ দিতে হবে এবং দলগুলোকে নির্দিষ্ট মানদণ্ডের ভিত্তিতে আবেদন যাচাই করতে হবে।

একই সঙ্গে নারীদের নির্বাচনী প্রস্তুতি বাড়াতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি, যেখানে নির্বাচন কমিশনের প্রতিনিধিত্ব থাকলে প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা আরও নিশ্চিত হবে। শুধু পারিবারিক পরিচয় বা ঐতিহ্যগত কারণে মনোনয়ন দিলে প্রকৃত ক্ষমতায়ন সম্ভব হয় না; বরং নারী নেতাদের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় দলীয় কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করে তাঁদের কাজ ও নেতৃত্ব প্রদর্শনের সুযোগ তৈরি করতে হবে।

নারীরা শুধু সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন না; অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত তথ্যের অপব্যবহার করা হচ্ছে। এসব মোকাবিলায় কার্যকর নীতি, অভিযোগ ব্যবস্থার নিয়মিত মনিটরিং ও দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা জরুরি।

নিলোফার চৌধুরী

স্বনির্ভরবিষয়ক সহসম্পাদক, বিএনপি

বাংলাদেশের রাজনীতি এখনো পুরুষপ্রধান। সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব খুব কম—বর্তমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে মাত্র সাত নারী সদস্য। নারীনেত্রীদের রাস্তা, মিছিল, মিটিং ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ সত্ত্বেও দলগুলো প্রায়ই তাঁদের সুযোগ দেয় না। পুরুষ নেতৃত্বের মাইন্ডসেট পরিবর্তন না হলে নারীর ক্ষমতায়ন বাধাগ্রস্ত থাকে। নির্বাচনের জন্য পুরুষেরা কখনো প্রশ্ন করেন না যে তাঁরা পারবেন কি না, অথচ নারীদের ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত সন্দেহ, বাধা ও হুমকি তৈরি হয়। সংরক্ষিত আসনও কখনো নারীনেত্রীদের জন্য নিরাপদ নয়।

নারীর ক্ষমতায়নের জন্য দলগুলোকে পাঁচ বছরের পরিকল্পিত উদ্যোগ নিতে হবে। সংরক্ষিত আসনের বাইরে নারীর প্রকৃত রাজনৈতিক দক্ষতা ও নেতৃত্বের সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। পুরুষপ্রধান সমাজে মাইন্ডসেট পরিবর্তন জরুরি, যেন নারীরা সুযোগ পেলে উন্নতি করতে পারেন এবং জনগণের সেবা করতে পারেন।

ডিজিটাল নিরাপত্তাও বড় চ্যালেঞ্জ। সাইবার বুলিং, হ্যারাসমেন্ট ও অনলাইন হয়রানি নারীনেত্রীদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধা দেয়। রাষ্ট্র বা দল পর্যায়ে যথাযথ প্রতিকার না থাকায় নারীরা প্রায়ই ট্রমার সম্মুখীন হন। শিক্ষিত ও যোগ্য নারীরা এ ধরনের প্রতিকূলতার মধ্যেও পিছপা হননি, কিন্তু তাঁদের সুরক্ষা ও সমর্থন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ শুধু সংরক্ষিত আসনে নয়, বাস্তব রাজপথে, মিছিল–মিটিং ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি স্তরে বাড়াতে হবে। নারীনেত্রীদের প্রতিকূলতা সত্ত্বেও এগিয়ে যাওয়ার সাহস রয়েছে। দলগুলো তাঁদের পূর্ণ সুযোগ ও সমর্থন দিলে সংসদে কার্যকর প্রতিনিধিত্ব ও সত্যিকার ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হবে।

তাজনূভা জাবীন

সংগঠক, অলটারনেটিভস

সংরক্ষিত নারী আসন প্রবর্তনের মূল উদ্দেশ্য ছিল নারীর নেতৃত্ব তৈরি করা। দেশব্যাপী অনেক নারী প্রমাণ করেছেন যে তাঁরা রাজনীতিতে যোগ্য, সাহসী ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কিন্তু এর পরও নারীদের ক্ষমতায়ন মূলধারায় এখনো বাধাগ্রস্ত। নারী নেত্রীরা মিছিলে, সভায়, নির্বাচনী প্রচারণায় এবং রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণে স্বতঃস্ফূর্ত, কিন্তু দল এবং সিস্টেম তাঁদের এগিয়ে যাওয়ার পথকে প্রায়ই সীমিত করে।

নারী নেত্রীদের পথ কঠিন। নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়া, সমর্থনপ্রাপ্তি এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নারী প্রায়ই অপ্রত্যাশিত বাধার মুখোমুখি হন। পারিবারিক বাধা, দলীয় স্বার্থ এবং পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা এগুলোকে প্রভাবিত করে।

অনেক নারী মনে করেন, তাঁরা যথাযথ যোগ্যতা ও দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও সুযোগ পাচ্ছেন না। রাজনৈতিক দলগুলোকে স্বীকার করতে হবে, নারীর ওপর লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, ডিজিটাল হ্যারাজমেন্ট এবং অনলাইন আক্রমণের মাত্রা ভয়ংকর।

এই বাস্তবতা সমাধান করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে কঠোরভাবে এগিয়ে আসতে হবে। প্রথম শর্ত হলো পরিস্থিতি স্বীকার করা। দলগুলোর মধ্যে একটি স্পষ্ট ‘কোড অব কন্ডাক্ট’ থাকা দরকার, যা ডিজিটাল ও লিগ্যাল সাপোর্ট নিশ্চিত করবে। নারীরা যাতে অনলাইনে নিরাপদে কাজ করতে পারেন, তার জন্য প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা অপরিহার্য। লিগাল সাপোর্টের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহ, স্ক্রিনশট সংরক্ষণ, তদন্ত এবং প্রয়োজনে আদালতে সহায়তা।

শামীমা পারভীন

এআইজি, বাংলাদেশ পুলিশ

সাইবার অপরাধ একটি নতুন ও ক্রমবর্ধমান সমস্যা, প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে ধরনও পরিবর্তিত হচ্ছে। বাংলাদেশের সক্ষমতা সীমিত। ফরেনসিক ও প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ শনাক্তে আমাদের প্রশিক্ষণ, জনবল ও লজিস্টিক সাপোর্ট কম। তবে সীমিত সক্ষমতাও আমরা ব্যবহার করছি। সিআইডির সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট সাধারণ সাইবার ও প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ তদন্ত করে। ২০২০–২৫ পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার সাইবার অপরাধ রিপোর্ট হয়েছে, কিন্তু আমরা মাত্র তিন হাজারের কম তদন্ত করতে পেরেছি।

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিবেদনকৃত অপরাধের ৬০ শতাংশ শিকার নারী, ১৮–৩০ বছর বয়সী তরুণী বেশি। ভিকটিমদের জন্য আটটি ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার, নারী পুলিশ কর্মকর্তাসহ কল সেন্টার ও ন্যাশনাল হটলাইন চালু আছে। থানাগুলোয় সার্ভিস ডেলিভারি ডেস্ক রয়েছে, যাতে নারী নিরাপদে অভিযোগ জানাতে পারেন। পুলিশ হেডকোয়ার্টারের সাইবার মনিটরিং সেল দেশের সব থানাকে মনিটর করে এবং প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেয়।

নারী পুলিশ সদস্যদের জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা, মানসিক চাপ ও অনলাইন নিরাপত্তা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। কমিউনিটি পুলিশিং, নারী পুলিশ নেটওয়ার্ক ও স্কুলে সচেতনতামূলক প্রোগ্রাম চলমান।

নারীদের ডিজিটাল নিরাপত্তা, সাইবার হেল্পডেস্ক ও লিগ্যাল সাপোর্ট নিশ্চিত করতে পার্টি এবং অন্যান্য সংগঠনকে দায়িত্ব নিতে হবে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও নারীকে মানুষ হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি অপরিহার্য। নারীদের প্রতি সম্মান, প্রশিক্ষণ এবং সহায়তা নিশ্চিত করলে সাইবার অপরাধ হ্রাস পাবে।

ক্যাথরিন সিসিল

চিফ অব পার্টি, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ

বাংলাদেশ স্ট্রেনদেনিং পলিটিক্যাল অ্যাকাউন্টেবিলিটি ফর সিটিজেন এমপাওয়ারমেন্ট (B-SPACE) প্রকল্পে সহায়তার জন্য যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস (FCDO) এবং দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশনকে ধন্যবাদ। এ প্রকল্পের মাধ্যমে ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র শক্তিশালী করা এবং দলগুলোর মধ্যে সহযোগিতা ও সম্প্রীতি বাড়াতে কাজ করছে।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে আমরা নারী নেত্রীদের নেতৃত্বের সুযোগ ও বাধাগুলো নিয়ে আলোচনা করছি। বর্তমানে সংসদে নারী নেত্রীদের সংখ্যা খুবই কমে গেছে। তাই রাজনীতিতে নারী নেত্রীদের প্রতিনিধিত্বের গুরুত্ব নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।

বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব দেশে রাজনৈতিক পদে নারী নেত্রীদের অংশগ্রহণ বেশি, সেসব দেশে নারীদের অর্থনৈতিক অধিকার ও সুযোগ বাড়াতে বেশি আইন করা হয়। এতে নারীদের কর্মসংস্থান বাড়ে এবং দেশের অর্থনীতিও শক্তিশালী হয়। ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের মতামত জরিপে দেখা গেছে, নারী নেত্রীরা জননীতি ও রাষ্ট্রের বিষয়গুলোয় গভীর আগ্রহী। অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের অগ্রাধিকার পুরুষদের থেকে আলাদা। কিন্তু যদি তাঁরা সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় না থাকেন, তাহলে তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি নীতিনির্ধারণে প্রতিফলিত হয় না।

সংরক্ষিত আসনের মাধ্যমে কীভাবে নারীর কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা যায়—সে বিষয়ে আলোচনা করা জরুরি। একই সঙ্গে জনজীবনে সক্রিয় নারী নেতাদের বিরুদ্ধে অনলাইন হয়রানি ও ডিজিটাল সহিংসতা কীভাবে কমানো যায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ সমস্যার সমাধানে আপনাদের মতামত ও অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য খুবই মূল্যবান।

আমিনুল এহসান

ডেপুটি চিফ অব পার্টি, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ

ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের সাম্প্রতিক গবেষণায় নারীর প্রতিনিধিত্ব গুরুত্বের সঙ্গে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। বাংলাদেশে ছয় কোটির বেশি নারী ভোটার আছেন।

তাঁদের প্রায় ৬০ শতাংশ স্বাধীনভাবে ভোট দেন। অন্যের প্রভাব, বিশেষ করে পুরুষের প্রভাবের ওপর নির্ভর করে ভোট দেওয়ার প্রবণতা আগের তুলনায় অনেক কমেছে।

তবে প্রায় ৬৫ শতাংশ নারী ভোটার মনে করেন, কোনো রাজনৈতিক দল তাঁদের কথা ভাবে না। রাজনৈতিক দলের নীতি, কর্মসূচি বা নারীদের জন্য নেওয়া উদ্যোগ নিয়ে তাঁরা সন্তুষ্ট নন। নারী ভোটারদের এই প্রত্যাশা ও অসন্তুষ্টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যও জরুরি।

আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে—বেশির ভাগ ভোটার প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে নারী–পুরুষকে প্রধান বিষয় হিসেবে দেখেন না। ৭০ শতাংশের বেশি ভোটার বলেছেন, তাঁরা মূলত ভালো, সৎ ও এলাকার সমস্যার সমাধানে সক্ষম প্রার্থী চান। অর্থাৎ যোগ্যতা ও নেতৃত্বের গুণই তাঁদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ফলে নারীরা যে নির্বাচনে জিততে পারেন না—এই ধারণার বাস্তব ভিত্তি খুব শক্ত নয়। বাস্তবে মাঠপর্যায়ে এমন অনেক নারী নেতা আছেন, যাঁরা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সক্ষম। কিন্তু কাঠামোগত নানা সীমাবদ্ধতার কারণে তাঁরা অনেক সময় এগিয়ে আসতে পারেন না।

এই বাস্তবতায় রাজনৈতিক দলগুলোরই উদ্যোগ নিয়ে সেই কাঠামোগত বাধা ভাঙতে হবে। যোগ্য নারীদের চিহ্নিত করে তাঁদের জন্য একটি শক্তিশালী নেতৃত্বের পাইপলাইন তৈরি করা জরুরি। এতে শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক দলই উপকৃত হবে।

লিপিকা বিশ্বাস

সিনিয়র ডিরেক্টর, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ

নারী নেতাদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন কেবল সমতার বা নারীর একক কোনো ইস্যু নয়; এটি উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও সুশাসনের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারী নেতাদের অন্তর্ভুক্ত করলে অর্থনীতি ও সমাজে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য মতে, নারীর অংশগ্রহণ বাড়লে জিডিপি প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।

সাম্প্রতিক নির্বাচনের বাস্তবতা আমাদের খুব আশাব্যঞ্জক কিছু দেখায় না। সরাসরি নির্বাচিত আসনে নারী নেতাদের প্রতিনিধিত্ব মাত্র ২ দশমিক ৩৬ শতাংশ। ফলে বাস্তবে আমাদের নির্ভর করতে হচ্ছে সংরক্ষিত আসনের ওপর। সংরক্ষিত আসনের মূল উদ্দেশ্য ছিল নারী নেতাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বে এগিয়ে আনা, যাতে তাঁরা অভিজ্ঞতা অর্জন করে একসময় সাধারণ আসনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। কিন্তু বাস্তবে তা খুব কমই ঘটেছে। এই ব্যবস্থায় একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো মনোনয়ন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার অভাব। অনেক সময় লবি বা পক্ষপাতের অভিযোগ ওঠে। তৃণমূলের অনেক যোগ্য নারী নেতা কেন্দ্রে পর্যাপ্ত যোগাযোগ বা প্রভাব না থাকায় বঞ্চিত হন। অন্যদিকে সংরক্ষিত আসনের সদস্যদের নির্দিষ্ট এলাকা না থাকায় তাঁদের কাজ করাও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে তাঁদের ভূমিকা ও কার্যকারিতা সীমিত হয়ে যায়।

এই বাস্তবতায় সংরক্ষিত আসনের মনোনয়ন প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক ও জবাবদিহিমূলক করা জরুরি। যেমন—স্পষ্ট ও লিখিত মনোনয়ন নীতিমালা প্রণয়ন, সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতার মানদণ্ড প্রকাশ, আগ্রহী নারী নেতাদের জন্য উন্মুক্ত আবেদন প্রক্রিয়া চালু করা এবং প্রার্থীদের যাচাইয়ের জন্য একটি স্বতন্ত্র নির্বাচন বা স্ক্রিনিং কমিটি গঠন করা।

জুলকার নাইন

গবেষণা সমন্বয়কারী, ফ্যাক্টওয়াচ

আমাদের ফ্যাক্টওয়াচ একটি প্রতিষ্ঠিত সংগঠন এবং পিএফসি পার্টনার। যেকোনো মিসইনফরমেশন বা টার্গেটেড ডিজইনফরমেশন, বিশেষ করে জেন্ডার ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে, আমরা শনাক্ত করে রিপোর্ট করেছি। সেই ভিত্তিতে কনটেন্ট দ্রুত রিমুভ করা হয়েছে। আমরা চেষ্টা করেছি শুধু শনাক্ত নয়, বরং প্রভাব কমানোর জন্যও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।

গবেষণার সময় দেখা গেছে, নির্বাচনের তিন মাস আগে শুরু হওয়া মিসইনফরমেশন কমে গেছে, কারণ অনেক নেতার লিডারশিপকে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রচেষ্টা সফল হয়নি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রেসপন্স মেকানিজম। এখন পর্যন্ত আমাদের কাজ অনেকটা আইসোলেটেড। কেউ একজন ফ্যাক্ট চেকিং বা রিপোর্টিং করলে, তার প্রভাব সীমিত থাকে। তবে মিসইনফরমেশন একটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ইকোসিস্টেমে পরিণত হয়েছে।

এটি আর শুধুই ভুল তথ্য নয়; এটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তাই প্রয়োজন প্রপার রেসপন্স মেকানিজম। নির্বাচনের আগে আমরা বিভিন্ন দলের নারী প্রতিনিধি ও মিডিয়া সেলের সঙ্গে আলোচনা করেছি—প্রত্যেক দলের ইন্টারনাল রেসপন্স মেকানিজম থাকা জরুরি।

আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে, নারীর নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করা থেকে রক্ষা করা, তথ্যের ভুল ব্যাখ্যা প্রতিরোধ করা এবং তাঁদের রাজনৈতিক ভূমিকা দৃঢ় করা। সমন্বিতভাবে কাজ করলে, মিসইনফরমেশন মোকাবিলা সহজ হবে, এবং নারীর ক্ষমতায়ন ও প্রতিফলন সংসদে আরও দৃঢ় হবে। এই উদ্যোগই ভবিষ্যতের রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে আরও সমন্বিত ও নিরাপদ করবে।

সুপারিশ:

■ সংরক্ষিত আসনের জন্য স্পষ্ট লিখিত মনোনয়ন নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।

■ মনোনয়নের মানদণ্ড ও প্রক্রিয়া প্রকাশ করতে হবে।

■ স্বচ্ছতার জন্য স্বতন্ত্র মনিটরিং বা পর্যবেক্ষণ কমিটি গঠন করা প্রয়োজন।

■ তৃণমূল, তরুণ যোগ্য নারী নেতাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে মনোনয়নপ্রক্রিয়া অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হবে।

■ নারী নেত্রীদের বিরুদ্ধে অনলাইন হয়রানির অভিযোগ, তদন্ত ও শাস্তির কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

■ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ডিজিটাল রেসপন্স ও সাপোর্ট মেকানিজম থাকা প্রয়োজন।

■ সাইবার অপরাধ তদন্তে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে।

■ ফ্যাক্ট চেকিং, মিডিয়া ও দলগুলোর সমন্বিত উদ্যোগে অনলাইন হয়রানি মোকাবিলায় সমন্বিত ব্যবস্থা নিতে হবে।